রহস্যগল্পঃ সাধনা

রহস্যগল্পঃ সাধনা

রহস্যবড়গল্পঃ সাধনা

 

‘লাশ চুরি করতে হবে । তরুণী মেয়ের লাশ ।’সাজ্জাদের কথা শুনে মনে হচ্ছে বাবার পকেট থেকে পকেটমানি চুরির কথা বলছে ছেলেটা । চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে থাকে মুন্না।
‘ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকিস না ।’ বিরক্তির সুরে বলে সাজ্াদ । ‘লাশ ম্যানেজ করে ফেলতে হবে । বেশি পুরোনো হলে চলবে না আবার । খুব বেশি হলে তিন দিনের মরা ।’
‘জানি তো । কিন্তু সেটা আসবে কোথা থেকে ? এতদিন তো লাশের ব্যাপারে কিছু বলিস নি । আজ কেন ?’ মুন্নার গলা শুনে বোঝা যাচ্ছে – পুরো ব্যাপারটা তার মোটেও পছন্দ না ।
‘আমি-ই জানতাম নাকি ?’ দাঁত চাপে সাজ্জাদ, ‘অর্ঘ্যভাই মাত্র কয়েক ঘন্টা আগে আপডেট দিয়েছে ।’
অর্ঘ্যভাই উচ্চপর্যায়ের প্রেতসাধক ।
ভাইয়ের অসাধ্য কিছু নেই । এমনিতে ভাই দেখতে সাধারণ । তবে ওদের দুইজনকে কম দেখাননি তাজ্জব তেলেসমাতী ! সবচেয়ে দুর্দান্ত ছিল এইচএসসির সর্বশেষ পরীক্ষাতে ওদের প্রশ্নপত্র প্রায় পুরোটাই যোগাড় করে দিয়েছিলেন আগের রাতে । সবই প্রেতচর্চার সাফল্য ।
সেই ভাই যখন চাচ্ছেন ওদের মত দুই নাদানকে প্রেতচর্চা শেখাতে – তখন ওরা আর কি ছাড়তে পারে সেই সুযোগ ?
সাজ্জাদের মোবাইল ফোনটা বেজে উঠতেই দ্রুত রিসিভ করে ও ওটা । বেশ কিছুক্ষণ হুঁ-হা করে রেখে দিয়েই লাফিয়ে উঠে খুশির সাথে ।
‘চল চল । গোরস্থানের ঠিকানা পাওয়া গেছে একটা । পরশু আত্মহত্যা করা মেয়েটাকে ওখানেই কবর দেওয়া হয়েছে ।’
কাটাকাটি করার যন্ত্রপাতির বাক্সটা একহাতে তুলে নিয়ে উঠে দাঁড়ায় সাজ্জাদ ।
চট করে একবার হাতঘড়িটা দেখে নেয় ওরা। রাত এগারোটা বাজতে চলেছে ।
লাশ চুরি করার জন্য সময়টা খুব একটা মন্দ না ।
হাত বাড়িয়ে জ্যাকেটটা তুলে সাজ্জাদের সাথে বেরিয়ে পড়ে মুন্না।

আজ রাতে চাঁদ ওঠে নি ।
চারপাশ ঘুটঘুটে কালো অন্ধকারে ডুবে থাকার কথা না তাই বলে । রাস্তায় আলোর অভাব নেই ।ওরা আজ নিজেদের আলোতে মানাতে পারে না । আজকে তাদের পরিচয় চোর । লাশ চোর ।
অন্ধকারটা দরকার ।
সামনে উৎসাহের সাথে হাঁটতে থাকা সাজ্জাদকে দেখে কয়েকদিন আগের কথা মনে পড়ে যায় ওর ।
একেবারেই হঠাৎ অর্ঘ্য ভাই ওদের প্রস্তাব দিলেন !
‘প্রেতচর্চার ব্যাপারে তোমাদের আগ্রহের তো অভাব নেই দেখছি । তবে সেটা শেখার মত সাহস আছে ?’
দুইজনই বুঝতে পারে – এর পেছনে আছে প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত – শিখতে চায় কি না ওরা, সেটা বলার সুযোগ দেয়া হল ।
দুজনের তীব্র আকাঙ্ক্ষার কাছে পরাস্ত হল অর্ঘ্যভাইয়ের সন্দেহ ।
তারই প্রেক্ষিতে তালিম দিতে থাকলেন তিনি ।
নিয়মিত চক্রে বসতে বসতে মোটামুটিভাবে আগাতে পেরেছে প্রেতসাধনার দিকে । কিন্তু একেকটা স্টেজ পার হতে হতে যেন সারা বছর লেগে যাবে ! এত সময় নষ্ট ভালো লাগে না ওদের দুই মাস যেতেই । অর্ঘ্য ভাইকে চেপে ধরে একটা তুনলামূলক শর্টকাট পথ দেয়ার জন্য ।
‘শর্টকাট ?’ ভ্রু নাচিয়ে বলেন অর্ঘ্য ভাই ।
‘জ্বী, ভাই । আছে না কোন ?’ আশায় আশায় জানতে চায় ওরা।
‘তা তো আছেই । আসলে ব্যাপারটা শয়তানের সাথে সম্পর্কযুক্ত – কাজেই শর্টকাট খুঁজতে গেলে ন্যাস্টি ওয়েতে কাজ করতে হবে ।’
‘এই পথে যখন এসেছি-ই , আজ অথবা কাল ন্যাস্টি তো হতেই হবে । ক্ষমতার জন্য ওটুকু করতে রাজি আছি আমি ।’
কাজেই পদ্ধতিটা বলে দেয় অর্ঘ্য।
তিনদিনের মাঝে অপঘাতে মারা যাওয়া তরুণীর লাশ থেকে হৃৎপিন্ড আর যকৃত কেটে বের করে নিতে হবে ।
যকৃতটাকে আধা কেজি পিয়াজের সাথে মিশিয়ে তিন চামচ করে রক্ত দিয়ে রান্না করতে হবে । রক্তগুলো অবশ্য ওদেরই – অর্থাৎ যারা সাধনাতে লিপ্ত – তাদেরই হতে হবে । যকৃতটাকে ভালো করে রান্না করে খেয়ে ফেলতে হবে ঠিক রাত বারোটাতে । সেই সাথে আওড়াতে হবে স্প্যানিশ কিছু বাক্য । বাক্যগুলো বের করে ওদের মেসেজ করে দেন অর্ঘ্য ভাই ।
হৃৎপিন্ডের ভিন্ন কাজ আছে ।
ওটার মাঝে দুই হাতের কানি আঙ্গুল ঢুকিয়ে মধুর সিরাপে ডুবাতে হবে প্রথমে । তারপর ওই মধুর সিরাপ থেকে দুই চামচ করে নিয়ে মেশাতে হবে চায়ের সাথে – এই চায়ের চাপাতা অবশ্যই লাশ ঢেকে রাখার কাজে আগে ব্যবহৃত হতে হবে ।
তারপর সেই চা পান করতে হবে যকৃত ভক্ষণের পর পরই ।
এক রাতেই কয়েক স্তর উঠে যাওয়া সম্ভব এই
একটা মাত্র টাস্কের মাধ্যমে ।
সবকিছু জোগাড় হয়ে গেছে । লাশের গা ঢাকা চা পাতাও !
কাজেই আজ ওরা এখানে ।
যাচ্ছে একটা কবরস্থানে । মরে যাওয়া একটা মেয়ের লাশ চুরি করে আনতে ।
দূরে কবরস্থানের গেট দেখা যাচ্ছে ।
এই এলাকায় কোন আলোই নেই । সব ইলেক্ট্রিসিটি লাইন কি কেটে দেয়া হয়েছে নাকি এই কবরস্থানের আশেপাশে ?
একটু থমকায় মুন্না ।
‘আরে নাচতে নেমে এখন উঠানকে বাঁকা বললে চলবে নাকি ?’ গজ গজ করে সাজ্জাদ ।
সুরেলা রিংটোন নিস্তব্ধতাকে ভেঙ্গে খান খান করে দেয় ।
অর্ঘ্য ভাইয়ের ফোন কল ।
‘তোমরা কি লাশ আনতে গেছ ?’
‘জ্বী ভাই । কবরস্থানের সামনে আমরা ।’ আপডেট দেয় সাজ্জাদ ।
‘আরেকটা ব্যাপার আছে । সিদ্ধি লাভের জন্য শুধু লাশের ব্যাপারটাই যথেষ্ট ছিল না ।’
উৎকন্ঠিত হয় ওরা । এই পর্যন্ত করার জন্য মনোবল জোগাড় করে এসেছে ওরা । আরও কিছু ?
‘আগে বলেন নি কেন ?’ সাজ্জাদ জানতে চায় ঠান্ডা গলায় ।
‘আগে তো নিশ্চিত ছিলাম না এই কাজটাই করার জন্য কতটা সিরিয়াস তোমরা । এতদূর যখন এগিয়ে গেছ তখন আশা করি বাকিটা করতে পারবে । কাজটা কঠিন কি না ।’
‘কাজটা কি ?’
‘যকৃত আর চা পানের পর তোমাদের বারো ঘন্টার মাঝে একটা বলি দিতে হবে । মানুষ বলি । শয়তানের নামে ।’
‘হোয়াট দ্যা ফা-’ বাক্যটার শেষ অংশ নিজের মাঝেই গিলে নেয় সাজ্জাদ ।
‘সিদ্ধি লাভ করতে চাও তো ? তাহলে আর দ্বিধা নয় । একটা ব্যাপার সহজ । কোন বাধাধরা নিয়ম নেই । যাকে ইচ্ছে বলি দিতে পারবে । তবে বলিটা দিতে হবে বারো ঘন্টার মাঝে । আগে অথবা পরে ।’
কট করে কেটে যায় লাইন ।
‘ওটা করা যাবে ।’ ঠান্ডা গলায় মুন্না বলে । ওর হাবভাবে বেশ আত্মবিশ্বাস লক্ষ্য করা যায় ।
‘সেটাই ।’ । কাজটা বেশ কঠিন বৈকি । কয়েক স্তর ওপরে উঠতে পারবে নিশ্চিত । টেলিপোর্টেশনের ব্যাপারটা ম্যাগমা পর্যায়ে পাওয়া যায় । ওরা অতটুকু পৌঁছতে পারলেই আপাতত খুশি ।
কবরস্থানের ভেতরটা শুনশান নীরবতার চাদরে ঢাকা ।
‘কোন দিকে রে ?’ আস্তে করে সাজ্জাদের কনুইয়ে খোঁচা দেয় মুন্না ।
‘সাতাশ সারির পনের নম্বর কবরটা । নতুন খোঁড়া ।’
মোবাইলের ফ্ল্যাশের আলোয় ওরা কবর গুণে ।
নির্দিষ্ট কবরটার সামনে এসে থমকে যায় কিছুটা ।
কবরটা মাটি দিয়ে ঢাকা নয় । বরং একটা বিশাল গর্ত ।
মাটিগুলো যেভাবে বাইরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে – মনে হচ্ছে কেউ যেন প্রবল আক্রোশে ভেতর থেকে ধাক্কা দিয়ে মাটি ভেঙ্গে বেরিয়ে গেছে বাইরে ।
একটুকরো সাদা কাপড় পড়ে থাকতে দেখে ওরা । ছেঁড়া কাফন ?
ভয়ের একটা অনুভূতি ওদের তলপেটে অস্বস্তিকর শিরশিরানি তুলে দেয় !

‘কবর ফুঁড়ে বেরিয়ে গেল নাকি ?’ বিড় বিড় করে কাকে বলছে ওরা কে জানে !
চারপাশে মোবাইলের ফ্ল্যাশ মেরে দেখার চেষ্টা করে ওরা – কিন্তু সুবিশাল কবরস্থানে সেই আলো যেন মহাশূন্যের নিঃসঙ্গ জোনাকির কাজও করে না ।
‘আমার কিন্তু এগুলো ভালো লাগছে না । এখান থেকে বের হয়ে যাওয়া উচিত ।’ আস্তে করে বলে মুন্না।
মোবাইলের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে থমকে যায় – ঠিক বারোটা বাজে !
‘ঠিক বলেছিস ।’ চেষ্টা করেও গলার কাঁপুনী ঠেকাতে পারে না সাজ্জাদ, ‘যাওয়া যাক ।’
ঘুরে দাঁড়ায় দুইজন একই সাথে এবং চমকে ওঠে প্রবল ভাবে ।
ওদের ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল মেয়েটা । কালো চুলে আর কালো চোখ যেন মিশে গেছে কবরস্থানের অন্ধকারের সাথে । সেই সাথে ফর্সা মুখটা আরও ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে । সারা শরীরে সাদা কাপড় জড়ানো ।
পাথরের মত মুখ করে দাঁড়িয়ে ওদের দেখছিল এতক্ষণ । এবার আস্তে করে হেসে ফেলল ।
রহস্যময় ওই হাসি সহ্য করার মত না । তারপর যখন অসম্ভব সুন্দর গলায় মেয়েটা জানতে চায়, ‘যকৃত খুঁজছ ? আমার আছে তো একটা ।’
একমুহূর্ত একজন আরেকজনের দিকে তাকায়।
তারপরেই প্রাণপনে ছুট লাগায় বিপরীত দিকে ।
*
চারপাশে কবর আর কবর ।
তার মাঝেই ছুটে যাচ্ছে ওরা । অন্ধের মত ।
ভস করে একটা গর্তে হাঁটু পর্যন্ত দেবে যায় মুন্নার । কোনমতে সেটা থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আবারও সামনের দিকে দৌড়ায় ও । সাজ্জাদ বদটা স্বার্থপর আছে । এরই মাঝে পঞ্চাশ মিটার আগিয়ে গেছে ও ।
ছুটছেও হরিণের মত ।
পেছনে কি কোন পদশব্দ শোনা যাচ্ছে ? মেয়েটাও কি এগিয়ে আসছে ?
ওরা জানে না ।
ফিরে তাকানোর সাহস ওদের নেই ।
কোনমতে কবরস্থানের অন্যপাশ থেকে বেরিয়েও ওরা থামে না ।
বিশাল লাইটপোস্টের সামনে দাঁড়িয়ে হাঁফায় দুইজনে ।
‘দোস্ত – এইটা কি হল ?’ বিহ্বলের মত জানতে চায় মুন্না।
‘চুপ কর ব্যাটা । মুখে ওই ঘটনার নাম নিবি না ব্যাটা !’ ক্ষেপে যায় সাজ্জাদ। আসলে ওর চিরচেনা পৃথিবীর বাইরের দৃশ্য দেখে অতিমাত্রায় শকড বেচারা ।
‘চল তোর রুমে যাই । চিন্তা ভাবনা করা দরকার ।’
সাজ্জাদের বাসার নিচ থেকে একপ্যাকেট সিগারেট কেনে ওরা ।
ঘটনার প্যাচ লেগে গেছে । এমনটা হওয়ার কথা ছিল না মোটেও ।
এরপরও ভাবতে হবে । তরুণীর লাশ লাগবে । থেমে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না ।
সিঁড়িঘরটা অন্ধকার ।
অন্ধকারকে এই প্রথম একটু ভয় করে ওদের ।
রুমে এসে খাটের ওপর ধপ করে বসে পড়ে দুইজনেই ।
‘দাঁড়া ভাইকে একটা ফোন লাগাই ।’
ভাই ফোন ধরেন না ।
সম্ভবত চর্চায় আছেন । রাত একটা বাজে । এখন তাঁর সাধনার জগতেই থাকার কথা ।
‘ওই মেয়ের কথা মাথা থেকে সরিয়ে কাজ করা লাগবে আমাদের ।’মুন্না ঠান্ডা হয়েছে কিছুটা ।
‘হুঁ ।’ একমত হয় সাজ্জাদ ও । ‘নতুন মেয়ে লাগবে । আরেকটা লাশ । সবগুলো তো আর সারি দিয়ে বের হয়ে আসবে না কবর থেকে । এই কেসটা কেমন জানি কাবজাব লেগে গেল !’
‘একদম ঠিক বলেছিস । আর কিছু খোঁজ খবর নিয়ে -’
এই সময় দড়াম করে খুলে গেল ওয়াল-ওয়ারড্রোবের দরজা ।
ঘরের ভেতরটা ভরে যায় সুন্দর একটা গন্ধে । গন্ধটা একই সাথে মন খারাপ করা ।
মৃতদেহের গোসলের পর এমন গন্ধই পাওয়া যায় তাদের শরীর থেকে ।
সাজ্জাদের কোটটা ঝুলছিল – ওটা ঠেলে বেড়িয়ে আসে একটু আগে দেখে আসা কবরস্থানের মৃত মেয়েটা ।

সাজ্জাদের কাঁপাকাঁপি লেগে গেছে ।
মুন্নার অবস্থাও সুবিধের না ।
তবে সেই সব দিকে লক্ষ্যই করে না যেন মেয়েটা !
‘তিথী আমার নাম ।’ ভীষণ শীতল কন্ঠে বলে মেয়েটা ।
চুপ হয়েই থাকে দুইজনই ।
‘তোমরা সাজ্জাদ আর মুন্না । আমার হৃৎপিন্ড আর যকৃত দরকার । প্রেতচর্চা আর শয়তানের পূজারীর একটা রিমিক্সড ভার্সনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছ ।’
খুক করে কাশে মুন্না ‘ব্যাপারটা ব্যক্তিগত ভাবে নেবেন না আশা করি । আমাদের সামনের স্তরে ওঠার জন্য -’
হাত তুলে ওকে থামায় তিথী, ‘জানি আমি । আমার মত যারা – তাদের অনেক কিছুই জানতে হয় । নিজের শরীরের প্রতি একটা মায়া আমার ছিলই । তবে তোমাদের আমার কাহিনী শুনতে হবে । তারপর হৃৎপিন্ড আর যকৃত আমি স্যাক্রিফাইস করে দিতে রাজি আছি । আমার আত্মার মুক্তির পর অবশ্য দেহ নিয়ে কি করলে সেটা নিয়ে আমার মাথাব্যাথা নেই । আমি শুধু এই বিভীষিকা থেকে মুক্তি চাই ।’
‘আপনার প্রস্তাবটা কি ?’ প্রথমবারের মত মুখ খোলে সাজ্জাদ।
‘আমার মৃত্যুর ব্যাপারটা সবাই আত্মহত্যা হিসেবেই জানে ।’ সাজ্জাদের প্রশ্নকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে বলে মেয়েটা । ‘কিন্তু আসল ঘটনা সেটা না । তোমরা কি জানো কখন একটা মৃতদেহ থেকে আত্মা চলে যেতে পারে না ? ’
আগ্রহের সাথে তাকিয়ে থাকে ওরা ।
‘যখন সেই মানুষটার অতৃপ্ত বাসনা থেকে যায় ।’ নিজের প্রশ্নের জবাব নিজেই দেয় তিথী , ‘হ্যাঁ – প্রশ্ন থেকে যায় – প্রতিটা মানুষই কিছু অতৃপ্ত বাসনা নিয়ে মারা যায় – সেক্ষেত্রে কেন কিছু আত্মার মুক্তি হয় না ? কারণ, আত্মার বাসনাটা হতে হয় খুবই তীব্র । আমাকে দেখছ হেঁটে বেড়াতে – কিন্তু সারা শরীরে প্রচন্ড যন্ত্রণা হচ্ছে আমার । তোমাদের কি বলে বোঝাবো -’ কিছুক্ষণ চুপচাপ উদাহরণ খোঁজে মেয়েটা, ‘অনেকটা একই সাথে গায়ে আগুন আর বরফ ধরিয়ে দেয়ার মত । পার্থিব কোন যন্ত্রণা না এটা । অতৃপ্ত আত্মাদের দীর্ঘশ্বাস কিংবা শীতল গলায় ভড়কে যায় সবাই – সেটার উৎপত্তিস্থল কিন্তু এই যন্ত্রণা ।’
বিষাদের ছায়া পড়ে মেয়েটার মুখে । ওর দিকে ব্যাথাভরা চোখে তাকিয়ে থাকে ওরা।
‘এই যন্ত্রণাকে সহ্য করে নিয়েও যখন কোন আত্মা তীব্রভাবে চায় পৃথিবীর বুকে থেকে যেতে অসমাপ্ত কাজ সমাধার জন্য – তখন আমরা আর দেহ ছেড়ে যেতে পারি না । যতক্ষণ না আমাদের বাসনা পূর্ণ হবে – দেহ ছাড়া আমাদের পক্ষে সম্ভব হয় না । এখানেই আসছ তোমরা – এই যন্ত্রণা থেকে তোমরা আমাকে মুক্তি দেবে – দেহটা পেয়ে যাবে । তোমাদেরও সাফল্য আমারও শান্তি । ’
একজন আরেকজনের দিকে তাকায়।
‘এলাকায় আত্মহত্যার ঘটনাই প্রকাশ হয়েছে । আপনি মারা গেলেন কিভাবে, যদি আত্মহত্যা না হয় সেটা ?’ মুন্না জানতে চায় মোমের মত সাদা মুখটার দিকে তাকিয়ে । ওর দিকে প্রাণশূন্য চোখ ঘুরিয়ে তাকায় এবার মেয়েটা ।
‘রাজীব আমার বয়ফ্রেন্ড । আমাদের সম্পর্কটা ছিল অনেক দীর্ঘ । সাত বছর ।’ দীর্ঘশ্বাসের মত শব্দ হয় একটা ঘরের মাঝে । ‘গত একবছর আমরা একসাথে ছিলাম । উই ওয়্যার লিভিং টুগেদার । বাট হি লেফট মি । লেফট মি উইদ আ গুডবাই গিফট ।’
‘বুঝলাম না ।’ মাথা নাড়ায় মুন্না।
‘আমাকে তাড়িয়ে দেয় ওর অ্যাপার্টমেন্ট থেকে । আমি অন্তঃসত্ত্বা জানার পর পরই । আমাকে বিয়ে করার ইচ্ছে ওর কোনদিনও ছিল না । নিজের ওপর তীব্র ঘৃণা হত তখন । আরও বেশি ঘৃণা হত রাজীবের ওপর । কিন্তু আমি আত্মহত্যা করি নি । আমার একটা তুলতুলে বাবু হত ! একটা পিশাচের কাছে নিজের জীবনযুদ্ধে হেরে যাবার মত বোকা আমি ছিলাম না । কিন্তু সাতদিনের মাথায় টুপ করে মরে গেলাম !’
‘কিন্তু কিভাবে ?’ একসাথে জানতে চায় ওরা ।
‘মেডিকেশন ।’ চোখ মুছে জবাব দেয় তিথী। ‘আমার রোজ দুইটা ওষুধ নিতে হত । সেটার সাথে একই রকম দেখতে সায়নায়িড পিল রেখে দিয়েছিল রাজীব । পনেরটা ট্যাবলেটের মাঝে একটা বিষ সেটা আমি কি করে জানব ? ওর বাসা থেকে চলে যাওয়ার সময় তো নিজের সবকিছুই সাথে করে নিয়ে এসেছি । মেডিসিন নেয়া থামানোর কোন কারণ ছিল না । প্রেশার লো হয়ে যায় ভয়ানক ভাবে সেটা থামালে । শেষের দিকে এসে এক পর্যায়ে না জেনেই নিয়ে ফেললাম বিষটা । আত্মহত্যা ছাড়া আর কোন ভাবে দেখবে না কেউ-ই ।’
জ্বলন্ত চোখে দেখে ওদের মেয়েটা । চোখ কিভাবে ধ্বক ধ্বক করে জ্বলে ! শুনে ওদের হার্টবীট বেড়ে যায় । ওদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে কিছুই করার থাকবে না ।
মৃত মানুষের সাথে লড়াই করা যায় না ।
তবে আবার শান্ত হয়ে বলতে শুরু করে মেয়েটা ।
‘মারা যাওয়ার সময় আর পরের বেশ কয়েক ঘন্টা খুব কষ্টের, জানো ? কিন্তু তারপরই সব বিষয়ে তুমি জেনে যাবে । এত এত জ্ঞান – উফফ !’ মাথা আঁকড়ে ধরে তিথী । ‘তখন জেনে গেলাম – কিভাবে মারা গেছি আমি । কিভাবে আমাকে ঠকিয়ে ভবিষ্যতের ঝামেলাও দূর করেছে রাজীব । তোমাদের কাছ থেকে আশা করি – এই রাজীবকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেবে । যেখানে আমাকে থাকতে দেয় নি ও নিজের সুখের জন্য – সেখানে আমিও তাকে থাকতে দেব না । আমার ইচ্ছে এতটুকুই – এর জন্যই মুক্তি পাচ্ছি না আমি ।’
মৃত প্রত্যাশা নিয়ে ওদের দিকে তাকায় ও ।
‘কাজটা আপনি করছেন না কেন ?’ জানতে চায় মুন্না ।
‘কারণ , ‘একবার মরে গেলে আমরা আর কিছু স্পর্শ করতে পারি না যে !’

‘রাজীবটা থাকে কোথায় ?’ মেঘ গলায় জানতে চায় সাজ্জাদ।
‘আপনার হয়ে আমরা প্রতিশোধ নেব আপু ।’মুন্নাও সায় দেয়, ‘তাছাড়া আমাদের একজন মানুষ বলি দিতে হবে বারো ঘন্টা আগে অথবা পরে । আপনার কথা যদি আপনি রাখেন – কাল রাতে আপনার শরীর থেকে আমরা ইয়ে – ওই দুটো পার্টস বের করে নিতে পারব । বারো ঘন্টা আগে রাজীবকে শেষ করে দেব ।’
ওদের মাথায় তখন চলছে এক ঢিলে দুই পাখি মারার ইচ্ছে ।
‘আমি রাজি আছি ।’ মাথা ঝাঁকায় বিষন্ন আত্মা ।
রাজীবের ঠিকানা তুলে নিতে থাকে বাশার ।
ওরা ডিটেইলস শুনতে চায় লোকটার ব্যাপারে । খুনোখুনির কাজ – ভুল করা চলবে না ।
বাইরে তখন রাত সাড়ে তিনটার অন্ধকার !

পরদিন বিকাল পাঁচটা ।
পার্কটার এক কোণায় দাঁড়িয়ে আছে সাজ্জাদ।
মুন্না আছে অন্য কোথাও – ওকে দেখা যাওয়ার কথা না ।
এদিক দিয়েই আজ যাবে রাজীব । নিশ্চিত করেছে তিথী । কাজেই তথ্যসূত্র যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য ।
তিথীকে ওরা বাসার একটা অন্ধকার কাপবোর্ডে রেখে এসেছে । দিনের বেলার আলো ওদের সহ্য হয় না ।
তাছাড়া আত্মার মুক্তির সাথে সাথে মৃতদেহটা আর দশটা সাধারণ মৃতদেহের মতই পড়ে থাকবে । নড়তে পারবে না ।
ওরা চায় না খানাখন্দে পড়ে থাকুক এই মরাটা – এতকিছুর পর আরেকটা মেয়ের মৃতদেহ পাওয়াটা কঠিন হয়ে যাবে ।
সেজন্যই সকালের আলো ভালোভাবে ফোটার আগ পর্যন্ত পাহাড়া দিয়ে রেখেছিল ওরা । নিশ্চিত হয়েছে মেয়েটার দেহ ওখানেই আছে । তারপর বের হয়েছে ।
প্ল্যানটা বাস্তবায়ন করা হবে খুবই সহজ উপায়ে । তবে রাজীবের আর নিস্তার নেই আজকে ।
ওই যে আসছে – তিথীর বর্ণনা অনুযায়ী এই মানুষটারই রাজীব নামের সেই পিশাচ হওয়ার কথা ।
একটা মেয়েকে মাত্র তিনদিন আগে মেরে ফেলেছে এমন কোন চিহ্ণই নেই তার চোখেমুখে । বেশ নিশ্চিন্ত মনেই হেঁটে আসছে । মরা মানুষ তো আর প্রতিশোধ নিতে পারে না !
হুম – পার্কের তিন নম্বর গেইটের দিকেই যাচ্ছে রাজীব । জানিয়ে দেয় সেটা মুন্নাকে ।
কল করে রেখেছে ও আগে থেকেই । যাতে প্রতিটা সেকেন্ডই নিজেদের মাঝে যোগাযোগ থাকে ।
সেকেন্ডের ভগ্নাংশের হিসেবটাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ।
রাজীবের হাঁটার গতিবেগ থেকে বোঝা যাচ্ছে আর পনের সেকেন্ডের মাঝে ও পৌঁছে যাবে গেইটে ।
‘ডু ইট ! নাউ !’ মুন্নাকে তাড়া দেয় সাজ্জাদ ব্যাস্ত গলায় ।
ঘড়ি দেখে একটু পর । দশ সেকেন্ড মত পেরিয়ে গেছে ।
এই সময় তিন নম্বর গেইটের বরাবর চলে যাওয়া রাস্তাটা থেকে তীব্র বেগে ছুটে আসতে দেখা যায় গাড়িটাকে ।
রাজীব বের হতেই প্রচন্ড জোরে ধাক্কা দিয়ে উড়িয়ে নিয়ে ওকে পার্কের ভেতর ফেলে গাড়িটা । এবং ছুটে আসতে থাকে ।
রাজীব আর গাড়ির দূরত্ব পূর্ণগতিতে ছুটে আসা বাহনটার পেরুতে মিলিসেকেন্ড লাগে ।
রাজীবের মাথার ওপর দিয়ে বাম চাকা উঠিয়ে দেয়ায় মাথা ভাঙ্গার আর মগজ ছিটকে পড়ার দৃশ্যটা বেশ স্পষ্ট দেখতে পায় সাজ্জাদ, মুন্নার শয়তানের উদ্দেশ্যে করা চিৎকারটাও স্পষ্ট শুনে ও, ‘ট্যোমা মি রিগ্যাল্যো !’
*
বেশ প্রফুল্ল মনেই বাশারের বাসাতে ফিরে আসে ওরা দুইজন ।
তিনঘন্টা পরে ।
রাত নেমে গেছে ।
‘ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার পর প্রথম কাজ হবে আমেরিকার তান্ত্রিকদের সাথে যোগাযোগ করা ।’ হেসে সাজ্জ্াদ নিজের পরিকল্পনা জানায় মুন্নাকেকে , ‘বিশ্বের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটই পালটে দেব আমরা । উইচ হান্টিং-ও ঊঠিয়ে দেব পৃথিবী থেকে । আর যাতে লুকিয়ে করতে না হয় কাওকে ওসব ।’
হাসিমুখে ওকে সায় দেয় মুন্না ।
কাপবোর্ডের ডালা তুলেই থমকে যায় ।
কোন শরীর নেই সেখানে ।
একটা অদ্ভুত গন্ধ শুধু সেখানে ।
*** পরিশিষ্ট ***
‘Target is terminated’
মেসেজটা ক্লায়েন্টের মেইলে সেন্ড করে দেয় ট্রিপল অাই।
ওর আসল নাম কেউ জানে না । প্যাসিভ কিলিং এজেন্সীটার ওই হর্তাকর্তা বিধাতা ।
প্যাসিভ কিলিং এজেন্সী যে তৈরী করা যায় সেটা শুধু বিশ্বাস নয় – কাজে করিয়ে দেখেছে ও ।
পৃথিবীর প্রথম এধরণের এজেন্সী !
চমৎকারভাবে অ্যাকাউন্টে আরও পঁচিশ লাখ টাকা যুক্ত হয়ে যেতে দেখে একটা আনন্দ অনুভব করে ও ।
অ্যাডভান্স পঁচিশ আর এই নিয়ে মোট আধ-কোটির একটা ডীল – তিনদিনে কামিয়ে ফেলেছে কতটা সহজে ! এখানে খরচ মাত্র দুই লাখ । তিথী মেয়েটা পাবে সেটা । ভালোই অভিনয় করেছে সাজ্জাদ অার মুন্নার সামনে ।
আর কবরস্থানের পরিবেশ সামলাতে ওখানকার সিকিউরিটিকে মাত্র দশ হাজার দিতে হয়েছে ।
এরকম আধ-কোটি উপার্জন রেগুলার হচ্ছে । কখনও আরও বেশি !
ব্যাবসাটা সেরকম লাভজনক ।
শুধু দরকার নিখুঁত একটা প্ল্যান । সবখানেই খুন করার মত মানুষ পাওয়া যায় । শুধু তাদের ডুবিয়ে দিতে হয় একটা ইলিউশনের মাঝে । ক্রিমিনাল মাস্টারমাইন্ড ট্রিপলঅাই এই কাজটা ভালোই পারে ।
ইলিউশনে ডুবে থাকা ছেলে দুইটা হয়ত ভাবছে – অর্ঘ্য ভাই ফোন ধরছে না কেন ?
আলতো একটা হাসির রেখা ফুটে ট্রিপলঅাই এর মুখে ।

(অপরেশ পাল)
খুলনা,বাংলাদেশ

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 7   Average: 3.9/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।