রূপ নয় , অভিশাপ

রূপ নয় , অভিশাপ

রূপ নয় ,অভিশাপ
পলাশ মাহাত

রিতুর বিয়ে বলে কথা , না গিয়ে থাকা যায় ?

গেলাম । সন্ধ্যের সময় । কত যে সাজগোছ করেছে রিতু তার ইয়ত্তা নেই । কিন্তু মুখে হাসি নেই । বিয়ের আনন্দ নেই । কেমন যেন গুমসা বেগুন । চোখে মুখে কিসের যেন আতঙ্ক । আমাকে দেখে ভাল করে কথা বলল না । আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম । রিতু আমার বেস্ট ফ্রেন্ড । সব কথা শেয়ার করাকরি হয় ।এমন-কি তার রেড জোন এলাকায় প্রথম হানা দিয়েছিল দাদুর জুবুথুবু হাতটি তার অজান্তেই , সেটা পর্যন্ত আমাকে বলেছিল রিতু । বলে হেসেও ছিল খুব ।

সেই রিতু আমাকে না চেনার মত করে কথা বলল ? আমি মুষড়ে গেলাম । ভাবলাম , চাকুরে বর পাওয়ার দেমাক । বিয়ে না হতেই সোহাগের রাতের কালারছবি আঁকছে হয়ত । আঁকুক । তাই বলে প্রিয় বান্ধবীকে অবহেলা ! কিন্তু যেই রাত দশটা বাজল এমনি শুরু হল বান্ধবীর কান্না । সে কি কান্না ! কেউ থামাতেই পারছে না ।দুচোখ দিয়ে যেন নর্দমার জল বয়ছে । মেকাপ , ভুরু প্লাই ,মেহেদি রাঙা হাত , রাঙানো ঠোঁটের – সব ধুয়ে মুছে সাফ । আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম । এই কি ? কি করছে রিতু ? আর কাঁদছেই বা কেন ? জিগ্যেস করলাম । সে জানাল তার বর পছন্দ নেই । বরের বয়স বেশি । পা সামান্য খোঁড়া ,যদিও দেখে বোঝা মুশকিল ।

তার মা বাবা এসে বোঝালেন , কিন্তু কান্না থমল না । শেষে তার বাবা বলেই ফেললেন , রিতুর এ কথা আগে বলা উচিত ছিল । এখন আর বলে কোন লাভ নেই ।

আমিও বুঝতে পারছি না ,আসল কেসটা কি ?

বর পছন্দ নয় ,এটা হতে পারে না কোনমতেই । রিতু আমাকে বলত তাহলে । সে যখন আমাকে নেমন্তন দেয় , আমি জিগ্যেস করেছিলাম , হ্যাঁ রে তোর বর কি করে ? তখন হেসে হেসে বলেছিল , চাকরি করে । বাবা মারা যাওয়ার পর বাবার চাকরিটা পেয়েছ ।

আমি জিগ্যেস করেছিলাম , দেখতে কেমন ?

কিছু না বলে হেসেছিল সে । মুচকি হাসি । অনুরাগের হাসি । মেয়ে হয়ে মেয়েদের এমনি হাসির অর্থ জানি আমি । ভেবেছিলাম , যাক , রিতু তাহলে রূপ-যৌবন ধরে রাখার মহৌষধ পেয়ে গেল ? আর পাবেই বা না কেন ? রিতুর যা রূপ ! রিতুর মত সুন্দরী আমি কাউকে দেখিনি । যেন জ্বলন্ত আঙরা । আমারই মনে হত ঝাঁপ দিয়ে দিই । ছেলেরা তো দেবেই , এ আর বড় কথা কি । আমি মেয়ে হয়েও তার মুগ্ধ ছিলাম তার রূপে । তার মুখের দিকে তাকাতাম বেশি বেশি । সে আমাকে বলত , কি দেখছি ? আমি বলতাম , তোকে । তোর রূপ দেখে তোর সংগে প্রেম করতে ইচ্ছে করছে । রিতু বলত ,মেয়েতে মেয়েতে প্রেম হয় ? আমি বলেছিলাম জানি না ।

আমার মতো রিতুর মতো অনেকেই জানে না ।

আমার সেই রিতু । আমার সে প্রিয় বান্ধবী রিতু । কাঁদছে । অঝোরে কাঁদছে । কান্না বোঝার কেউ নেই । তখন আমার শুধু মনে পড়ছে রাঙা বুড়ির কথা । সে একদিন বলেছিল , মেয়েদের রূপ না কি অভিশাপ । রূপ নিয়ে মেয়েদের জন্মাতে নেই । আমার বিশ্বাস হয়নি সেইদিন সে কথা। কিন্তু আজ হচ্ছে । রিতুকেও বোঝালাম , আর কেঁদে কেঁদে বিড়ম্বনা ডাকিস না । বর পছন্দ নেই তো কি হয়েছে ? ব্যাঙ্ক ভেবে মেনে নে । তার পর মন শান্তি করার জন্য কাউকে —

রিতু আর কিছু বলল না ।আর কাঁদেনি । বিয়েটা ভালয় ভালয় হয়ে গেল । গোটা রাতে রিতু আর কাঁদে নি । বিদায়ের সময় কেঁদেছিল । সেটা কাঁদতে হয় বলেই ।

রিতু বিদায় নিয়ে চলে গেল বরের সংগে । আমিও বাড়ি ফিরে এলাম । তার পর থেকে রিতু আর কোন খবর পায়নি । নিশ্চয় সুখে আছে । ঘরকন্না করছে স্বামীর সংগে । হয়ত আমার পরামর্শে কোন হ্যান্ডসাম দেওর তেওর পটিয়েছে । তার সংগে রোমান্স করছে । জানি না কি করছে ?

দেড় বছর পর আবার দেখা রিতুর সংগে । সে গাইনিককে দেখাতে গিয়েছিল । বরও ছিল সঙ্গে । রিতুর এখন পেট ফোলা । আমি সেই দিকে তাকিয়ে হাসলাম । সেও হাসল । তার পর অনেক গল্প হল এটা সেটা। অনেক ,অনেক । তার পর সে আর তার বর চলে গেল আমার থেকে দূরে । আমি একটা কথা জিগ্যেস করব করব করেও করতে পারলাম না । তার ব্যাঙ্ক কি শুধুই ব্যাঙ্ক , না ঘর হয়েছে ।

ঃ শেষ ঃ

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 7   Average: 3.6/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।