লাইট হাউস

লাইট হাউস

গল্প — লাইট হাউস (ভৌতিক অ্যাডভেঞ্চার)
লেখক —কৃষ্ণ গুপ্ত

 

 

জকেও ঠিক মাঝরাতে ঘুমটা ভেঙে গেল হঠাৎ। দেওয়াল ঘড়ি বলছে রাত এখন দুটো। গরম টা সবে পড়ছে। তাই মাথার পাশের জানলা টা খোলা। সমুদ্রের ঠাণ্ডা হাওয়া আসছে ফুরফুর করে। কোথায় আয়েশ করে একটু ঘুমাবো। তা না, সেই আলোর ঝলকানি!
এই নিয়ে পর পর তিন দিন। জন্ম থেকে তিরিশ বছর ধরে এই তল্লাটে আছি। কোন দিন এই অদ্ভুত জিনিস দেখি নি, যা গত তিন দিন ধরে হচ্ছে।

সেই পরিত্যক্ত বাতিঘর থেকে আলোর বিচ্ছুরণ ! মুহূর্তে মুহূর্তে যা ঝলকে উঠে অন্ধকার সমুদ্রের জল রাশি কে রাঙিয়ে তুলছে! ওড়িশা বর্ডারের কাছে বঙ্গোপসাগরের তীরে এই বাতিঘর টি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় শত্রু পক্ষের গোলা লেগে ধ্বংস হয়ে যায়। তার পর আর পুনর্নিমাণ হয় নি। দরকারও হয় নি। আগে সমুদ্রে ধাবমান প্রতিটি জাহাজ কে সঠিক পথ দেখাতে বা লুকানো পাথর বা প্রবাল সম্পর্কে সতর্কীত করতে এই লাইট হাউস গুলোর কোন জুড়ী ছিল না।
এখন অবশ্য টেকনোলজি অনেক উন্নত। তাই লাইট হাউস গুলো তে ইলেকট্রিকাল যন্ত্র পাতি বসায় আগের থেকে অনেক উন্নত হয়েছে এই পরিষেবা।
আর ইতিহাসের নিয়ম মেনেই ক্রমশ ধ্বংস স্তূপে পরিণত হয়েছে এই সব সতেরশো, আঠারশো শতকের লাইট হাউস গুলো।
আকাশে চাঁদ উঠেছে। দূরের সমুদ্রের সাদা ঢেউ গুলো তাই ঘর থেকেই দৃশ্যমান। চাঁদের আলো পড়ায়, পুরো সমুদ্র তট টি ই যেন মোহময়ী হয়ে উঠেছে।
কিছু টা বিরক্ত হয়েই উঠে পড়লাম। না, আজ একবার দেখতেই হচ্ছে, কি হচ্ছে ঐ পরিত্যক্ত লাইট হাউস টিতে ।
এক অমোঘ আকর্ষণ যেন আমাকে টেনে নিয়ে যেতে চাইল লাইট হাউস টির দিকে।
আমার বাড়ি থেকে লাইট হাউস টির দূরত্ব বড় জোর এক কিলোমিটার। জায়গা টা এখন একটা ঘন ঝোপে পরিণত। প্রায় দু বিঘা জমি জুড়ে লাইট হাউস টি ছড়িয়ে রয়েছে। গুড়িয়ে গেছে বেশ কিছু অংশ। চুন সুরকির প্রায় সাত তলা বাড়ি সমান উঁচু পরিকাঠামো টি আজ ঝড়, বৃষ্টি আর ভূকম্পন এর হাত থেকে কোন রকমে বেঁচে আছে।
বাড়ি থেকে নিঃসারে বের হলাম। পুরো ফ্যামিলী এখন অকাতরে ঘুমাচ্ছে। তাই শব্দ করে বাইক না বের করে সাইকেল টাই নিলাম আর বেরিয়ে পরলাম।
বিচের উপর নিজেকে নিজের ই পাগল বলে মনে হল। আমি বরাবর ই অকুতোভয়। শ্মশানে-মশানে ঘুরে বেড়ানো দাপুটে ছেলে। কাথা মুড়ি দিয়ে বর্ষার বৃষ্টি বিঘ্নিত রাত্রে বা শীতের আমেজ বুকে নিয়ে ভোর বেলা তে অলীক স্বপ্ন দেখা ছেলে আমি নই। তাই লাইট হাউস এর এই রহস্য আমি উদ্ঘাটন করতে সাহস করে বেড়িয়ে পড়লাম।
মাত্র পাঁচ মিনিট লাগল বিচ ধরে আসতে।
এ তল্লাটে কোন ট্যুরিস্ট আসে না। কারণ এখানে সেই অর্থে কোন উপভোগ্য বিচ নেই। এখান কার অরক্ষিত সমুদ্রে মূলত আমার মতন মেছোয়াড়ী দের ভিড়।

 




 

দু দিন আগে পূর্ণিমা গেছে। তাই ফিকে হলে ও চাঁদের আলো কিন্তু আছে। তবু ও লাইট হাউস এর নীচ টা বেশ অন্ধকার। সমুদ্রের দিকটাতে নিবিড় ঝাউ বনের সারি। আর লাইট হাউস এর বাকি অংশে প্রচুর চেনা, অচেনা ক্যাকটাস আর জংলা গাছ। সাইকেল টা একটা ঝোপের ধারে রেখে মোবাইলের টর্চ টা জ্বালালাম।
বহুকাল যে এখানে মানুষের পা পড়ে না, তা দেখলেই বোঝা যায়। তবে অন্য প্রাণীর অবশ্যই পড়ে। বালির উপর বেশ ছোট ছোট পায়ের ছাপ বলে দিচ্ছে, এখানে আশেপাশের মানুষ দের পোষা ছাগলরা চড়তে আসে। একটা সরু পায়ে চলা পথ ও বানিয়েছে ওরা। শুকনো নাদি ও পড়ে আছে।
সেই পথ দিয়েই মোবাইল এর আলো নিয়ে সিঁড়ির খোঁজ পেতে গিয়ে একটা জায়গা তে থমকে দাঁড়ালাম।
একটা জায়গায় সদ্য মাটি কেটে আবার বোজানো হয়েছে। পাশে একটা কোদাল পড়ে আছে। কারোর একটা হাতের কব্জি বেড়িয়ে আছে ব্লেজারের মধ্যে থেকে! সাদা ব্লেজারের উপর নীল সুতো তে লেখা ইংরাজির দুটো অক্ষর ‘J’ আর ‘H’ । মনে হচ্ছে কাউকে সদ্য কবর দেওয়া হয়েছে! কিন্তু এরকম জনবিরল স্হানে কাউকে কবর দেবে কে আর কেনই বা দেবে ? ওটা দেখতে গিয়ে আর একটু হলেই মরছিলাম আরকি! এই পোড়ো লাইট হাউসে সর্ব প্রথম যে প্রাণী টি আমাকে অভ্যর্থনা করল, সেটি একটি বালি বোরা সাপ!
কোন মতে লাফিয়ে বাঁচলাম। ভাগ্যিস সাপ পরিষ্কার দেখতে পায় না। তার উপর এখন অন্ধকার।
যাই হোক অবশেষে পরিত্যক্ত লাইট হাউসের ভিতর পা রাখলাম।

ছোট বেলা টা আমার বন্ধু দের সঙ্গে এখানে অনেক বার কেটেছে। তাই বছর কুড়ি আগের কিছুটা স্মৃতিচারণ করে নিলাম। তবে ভিতরের ভগ্ন দশা বহুলাংশে বেড়েছে।
মোটা দেওয়াল থেকে খসে পড়েছে চুন- সুড়কির প্যালেস্তার। খসে পড়েছে একের পর এক ইট। ভিতর টা ভয়ানক অন্ধকার। যেন এক মৃত্যুপুরি। আমাকে হা করে গিলে খেয়ে নেবে এবার। আমি গোল করে আবর্তিত সিঁড়ি পথে অন্ধকার ভেদ করে উপরে চড়তে লাগলাম। সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে এটা ওটা ভাবতে ভাবতে কখন যে নিঃশব্দে দুটো তলা পার করে এসেছি, বুঝিনি। হঠাৎ একটা হোঁচট খেয়ে সিঁড়ির উপর হুমড়ি খেয়ে পড়তেই মোবাইল টা কোথায় পড়ে নিভে গেল। কিছুতেই অন্ধকারে খুঁজে পেলাম না। বেশ একটু অসহায় মনে হল নিজেকে। ভাঙা জানলা দিয়ে বাইরে তাকাতে ঝাউ গাছের মাথার উপর দিয়ে সমুদ্র দেখতে পেয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম।

একটা পোড়া গন্ধ পাচ্ছি অনেকক্ষণ থেকে। সেই সঙ্গে একটা শো শো শব্দ। মনে হচ্ছে একদম টপ থেকে আসছে। কিন্তু পুরো অন্ধকারে উপরে ওঠা এখন দারুণ শক্ত কাজ। তবু অ্যাডভেঞ্চারের নেশা তে আসতে আসতে পা ফেলে উপরে উঠতে থাকলাম। এরপর তৃতীয় তলার সিঁড়ির কাছে পৌঁছতেই হৃত স্পন্দন যেন স্তব্ধ হবার উপক্রম।
পাঁচ-ছয় জোড়া চোখ জ্বলছে অন্ধকারে! আমি কিছু বোঝার আগে ই পর পর কয়েক টা শরীর আমার শরীরের উপর দিয়ে প্রবল বেগে ধাবমান হল। মুহূর্তে গড়িয়ে পড়লাম দু ধাপ নিচে।
নির্ঘাত খ্যাকশিয়ালের দল! কাঁকড়া খেতে এসেছিল নিশ্চিন্তে । অন্ধকারে দেওয়াল ধরে উঠতেই লক্ষ্য করলাম দূরে একটা আলোর বিন্দু। মনে হয় কোন জাহাজ।
আর একটু ওঠার পর টের পেলাম হাওয়ার দাপট কাকে বলে। মাঝে মাঝে মনে হল আমাকে নিয়েই হয়তো লাইট হাউস টি এক সময় উল্টে পড়বে। যাই হোক, যত উঠছি, তত পোড়া গন্ধ যেন বেড়েই চলেছে। সঙ্গে বাতাসের শব্দ।
পরের ধাপের জানালার সামনে গিয়ে মনে হল, আলোর বিন্দু টা যেন ক্রমশ এগিয়ে আসছে। তবে কি কোন জাহাজ বিপদে পড়ল?

অনুমান শক্তি বলছে আমি প্রায় টপে পৌঁছে গেছি। পোড়া গন্ধ টা সাংঘাতিক ভাবে নাকে লাগছে। সেই সঙ্গে আরও জোরে শুনতে পাচ্ছি আওয়াজ টা। এমন সময় আচমকা কয়েক টা ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ। মুহূর্তে নেমে আসতে লাগল লাইট হাউসে নিশ্চিন্তে বসত করা এক ঝাঁক বাদুর!
কোন রকমে হাত দিয়ে চোখ, মুখ ঢেকে বাদুরের সঙ্গে সংঘর্ষ এড়ালাম।
অবশেষে উপরে আসতে পারলাম। আর উপরে এসেই তাজ্জব বনে গেলাম।

উপরের ফ্লোরে চারদিকে কাঁচের আবরণ। মেঝের মাঝে একটা বিশাল অগ্নিকুণ্ড। আর একটা লোক পিছন ফিরে সমুদ্রের দিকে মুখ করে বসে ক্রমাগত আগুনের উপর কাঠ আর কয়লা নিক্ষেপ করে চলেছে।
একটা বড় লেন্স ক্রমশ বাম দিক থেকে ডান দিকে ঘুরে চলেছে। আর তার মধ্যে দিয়ে আগুনের আলো লম্বা ফোকাস হয়ে সমুদ্রের উপর পড়ছে। কাঠ, কয়লা পোড়ার গন্ধে বাতাশ ক্রমশ ভারি হয়ে উঠেছে। যে শব্দ টা নিচ থেকে পাচ্ছিলাম, তা আসলে এই লেন্সের ঘোরার আওয়াজ। কেমন যেন একটা খর খরে আওয়াজ!
ঘরের এক পাশে একটা বড় ট্রাঙ্ক। এক পাশে ডাই করা কাঠ আর কয়লা।
এর আগেও বহু বার এখানে এসেছি। ভাঙা কাঁচের ঘর টা দেখেছি। কিন্তু কোন লোক কে এভাবে আগুন জ্বালতে দেখি নি। তবে বাবার মুখে শুনেছি, যখন ইলেকট্রিক ছিল না। তখন এভাবেই এই লাইট হাউস গুলো কাজ করত। কিন্তু বহু বছর বন্ধ থাকার পর হঠাৎ কি সরকারী ভাবে এই লাইট হাউস টা আবার চালু হল? কিন্তু সেরকম তো কিছু কোন দিন শুনি নি। আর যদি তাই হবে, তবে সন্ধ্যা থেকে না চালু হয়ে কেনই বা এটি মাঝ রাতে চালু হয়? আর যদি তাই হয়, তবে কেন সরকার থেকে এটার কোন সংস্কার করে নি?
এরকম অজস্র প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। তার মধ্যে ই লক্ষ্য করলাম ঐ আলোর বিন্দু একেবারে বিচের কাছাকাছি চলে এসেছে। তবে সেটি কোন জাহাজ হয়তো নয়। মনে হচ্ছে কোন বোট।

আমার ভাবনার মধ্যে ও লোক টি ক্রমশ আগুনে কাঠ, কয়লা দিয়ে যাচ্ছে। আমি যে নিঃশব্দে পিছনে এসে দাঁড়িয়েছি, তা টের পায় নি। আমি তাই একটু কেশে নিলাম। না, লোকটা শুনতে পেল না। তাই এবার জোরে ই ডাকলাম। — দাদা, শুনতে পাচ্ছেন? এটা কবে চালু হল?
না, এবারেও লোক টা শুনতে পেল না। নিজের মনে পিছন ফিরে আগুন জ্বালিয়ে যাচ্ছে।
এমন সময় ঝপাং করে একটা শব্দে আমি তো ভিরমি খেয়ে পড়েই যাচ্ছিলাম।
আমার ভাবনার মধ্যে ই একটা লোক মাথায় করে একগাদা শুকনো কাঠ পেছন ফেরা লোক টার সামনে ফেলে দাঁড়াল।
বুঝতে পারলাম, এ হল কাঠের যোগানদার। কাঠের বোঝা নামিয়ে নিচু গলায় কোন কথা বার্তা হল। আমি একটা থামের আড়াল থেকে সব দেখতে লাগলাম।
ইতিমধ্যে একটা বড় বোটই সমুদ্রের তীরে এসে ঠেকল। দূর থেকে চাঁদের আলোয় দেখলাম পর পর কয়েক টি ছায়ামূর্তি নামল।
এরা কারা? এই পরিত্যক্ত লাইট হাউসে এদের কি দরকার?
এদিকে তাকিয়ে দেখি লাইট হাউস এর লোক দুটো নিচু গলা তে কিছু কথা বার্তা বলছে।
ওরা কি বলছে, কিছুই আমার কানে আসছে না। তবুও পিলারে আড়ি পাতলাম। কতক্ষণ শুনছিলাম জানি না। হঠাৎ পিঠ দিয়ে কিছু একটা সুড়সুড়ি দিয়ে নামতে থাকায় এক ঝটকা তে লাফিয়ে উঠলাম। মুখ দিয়ে অস্ফুট একটা আওয়াজ বের হয়ে এল। — একটা কাঁকড়াবিছা!
আর একটু হলেই এখানে আসার সাহসিকতার পুরস্কার পেয়ে যেতাম। মনে হয় কাঠের মধ্যে ছিল। আগুনের তাপে বেড়িয়ে এসেছে।
এদিকে হল বিপত্তি! আমার আওয়াজ শুনে লোক দুটো এদিকে তাকাল। তার পর মুহূর্তেই কাঠ দিতে আসা লোক টার হাতে ঝলসে উঠল ছুরি। আগুনের আলোতে ফলা টা চিক চিক করে উঠল। আমি বেগতিক দেখে সিঁড়ি পথে পিছু হটতে লাগলাম। লোকটা ও ক্রমশ এগিয়ে আসতে লাগল।
আমি এবার সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নামতে লাগলাম। পিছন পিছন লোকটাও নেমে আসছে তরতর করে। পর পর কয়েক টা তলা আমি দিব্যি নেমে এলাম।

 




 

এদিকে একই সময়ে একটা পায়ের আওয়াজ নিচ থেকে ক্রমশ দ্রুত উপরে উঠছে। আমি যেন ক্রমশ মাঝে বন্দী হয়ে যেতে বসেছি। মনে হয় না আর প্রাণ নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারব বলে।
নিজেকে বাঁচাতে একটা ভাঙা জানালা দিয়ে নিচে একটা ঝাউ গাছ লক্ষ্য করে লাফ দিলাম। ভাগ্য ভাল জানলা বরাবর একটা গাছের মাথায় দিব্যি গিয়ে পড়লাম। সামান্য একটু ছড়ে যাওয়া ছাড়া আর কিছুই হল না। তবে আশি কেজির ভার টা গাছ টা কতক্ষণ নেবে বলা মুশকিল। বেশ দোলনার মত দুলতে লাগলাম।
চাঁদের আলো জানলা দিয়ে এখানে বেশ পড়েছে। তার আলোতে দেখলাম কেউ একজন নিচ থেকে উপরে উঠে ছুরি হাতে কাঠ বাহক কে কিছু বলতে দুজনেই উপরে ছুটল।ওরা মনে হয় কোন কিছু নিয়ে গভীর উৎকণ্ঠা তে রয়েছে।

এদিকে সেই বোট থেকে আট, দশ জনের একটা দল ক্রমশ ঝোপ, ঝাড় ভেঙে লাইট হাউস এর দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। মনে হয় এরা জলদস্যু। না হলে কেনই বা এখানে হানা দেবে? ওদের সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসার ভারী বুটের শব্দ পেয়ে বেশ একটু ঘাবড়ে গেলাম।
অন্ধকারে ঠিক কত জন উপরে উঠল জানি না। তবে একটু পরে ই শুনতে পেলাম তীব্র সংঘর্ষের শব্দ! সেই সঙ্গে মর্মভেদী চিৎকার ও। আমি যেখান টা তে গাছে বসে আছি, তা লাইট হাউস এর মাঝা-মাঝি। তাই আগ্রহ থাকলে ও কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম না। শুধু কয়েক টা কান ফাটানো আর্তনাদ, যা রাতের নীরবতা কে খান খান করে দিচ্ছিল। বেশ কিছুক্ষন পর আস্তে আস্তে সব নিস্তব্ধ হয়ে গেল। শুধু ভারী ধাতব কোন কিছু টেনে নামাবার আওয়াজ পেলাম। একটু পরেই দেখলাম ঐ জলদস্যুরা কাঁচ ঘরের বড় ট্রাঙ্ক টা সিঁড়ি দিয়ে টেনে নামাচ্ছে। কি আছে ওতে?
না, এই প্রশ্নের কোন উত্তর নেই আমার কাছে। উপরে এতক্ষণ কি হল জানি না। তবে কল্পনা করছি কোন মর্মান্তিক কিছু ই হয়ে থাকবে হয়তো।
ট্রাঙ্ক টা টেনে নামিয়ে জলদস্যুরা বেড়িয়ে যেতেই গাছের ডালে ঝুলে জানলা গলে আবার ভিতরে ঢুকলাম। একটা পাতলা শক্ত কিছুর উপর পা পড়তেই আলো জলে উঠল। — আরে এই তো আমার মোবাইল টা! কতক্ষণ দেখতে পাই নি ওটাকে।
ওটা জ্বালিয়ে সাহস করে আবার উঠতে শুরু করলাম। কোন অদৃশ্য শক্তি যেন আমাকে টানছে উপরে।
চতুর্থ আর পঞ্চম তলার মাঝামাঝি হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়তে হল।
কাঠ বয়ে আনা লোকটা পড়ে আছে। তবে জীবিত না, মৃত। বুকের উপর ছুড়ি টা গাঁথা।
টাটকা রক্ত গড়িয়ে পড়ছে সিঁড়ি দিয়ে। রক্ত এড়িয়ে আবার সিঁড়ি চড়তে লাগলাম। একদম টপ ফ্লোরের আগে দেখলাম কোন এক অল্প বয়সী তরুণের বাম হাতের কব্জি কাটা অবস্হায় পড়ে আছে। কিন্তু বাকি শরীর টা উধাও!
দেখে শিউরে উঠলাম। এখন আর আমার শুধু ভয় করছে না। কর্মচারী দের কথা ভেবে মন টাও বিষণ্ণ লাগছে। আমি জানি কাঁচ ঘরে কর্মরত তৃতীয় ব্যক্তি ও আর বেঁচে নেই। তবু ও কিসের এক অমোঘ টানে আমি ক্লান্ত, ভারাক্রান্ত হৃদয়ে উপরে উঠে চলেছি। অবশেষে মন কে শক্ত করে কাঁচের ঘরে পা রাখলাম। পোড়া গন্ধ টা আর প্রায় নেই। আসলে অগ্নিকুণ্ডে কাঠ দেবার ও কেউ নেই। লোকটার রক্তাক্ত শরীর চিত হয়ে পড়ে আছে। দৃষ্টি সিঁড়ির দিকে স্থির। নিভন্ত আলোতে লোক টার মুখ টা দেখে বুক টা কেমন ছ্যাঁত করে উঠল। খুব চেনা কারোর মুখ! পরিস্কার করে দেখব বলে মোবাইল এর টর্চের আলোটা লোকটার মুখের উপর ফেললাম। তারপর যা দেখলাম, বিশ্বাস করতে পারলাম না। এটা তো আমার ই মুখ! আমার গা গোলাতে লাগল। সারা শরীর তখন উত্তেজনায় কাঁপছে। মাথা টা প্রবল বেগে ঘুরছে। তারপর…..

জ্ঞান ফেরার পর যখন চোখ মেললাম, তখন সকাল। আমি বাড়ির বিছানা তে শুয়ে আছি। আমার চার পাশে আত্মীয় আর প্রতিবেশী দের ভীড়। কি হয়েছিল আমার? উঠতে গিয়ে মাথা টা টলে গেল। গত কালের সব ঘটনা গুলোই টাটকা। কিন্তু আমি এখানে কেন? কে বাঁচালো আমাকে? না কি কোন দুঃস্বপ্ন দেখছিলাম?
— এখন উঠতে হবে না রিক। ডাক্তার বলেছে সারা দিন বিশ্রাম নিতে। — আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে মা বলল।
আমি কিছু পরিস্কার বলতে পারছিলাম না। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েছিলাম।
— জানিস রিক, তোকে আমরা আজ কোথায় পেয়েছি?
একটা দুধের গ্লাস এগিয়ে দিয়ে দাদা বলল। — সারা রাত খুঁজে না পেয়ে ভোর বেলা তোর সাইকেল টা লাইট হাউসের সামনে পেয়ে সবাই মিলে ওর ভিতর থেকে তোকে উদ্ধার করি। কেন গেছিলি বলত? নিশ্চয়ই জিন ডেকেছিল?
দুধ টা কয়েক চুমুকে শেষ করে বাক শক্তি ফিরে পেলাম।
বললাম, তা না, আসলে লাইট হাউস এর আলো দেখে বেড়িয়েছিলাম। আমার সামনে তিন তিন টে খুন হয়ে গেল কাল।
— খুন! কি যা তা বলছিস? — দাদা ধমকের সুরে বলল। — কোথায় ও কোন খুন টুন হয় নি। আর লাইট হাউসে আলো তো আমাদের বাবারাও দেখে যায় নি। তোর নিশ্চয়ই মাথা খারাপ হয়েছে। এবার তার ডাক্তার দেখাতে হবে। না হলে বুঝতে হবে, তোকে ভুতে ধরে ছিল।
আমি মৃদু হেসে বললাম, –তা তোমরা এখন এসব বলতেই পার। কিন্তু যে ঘটনা টা গত কাল আমার সামনে ঘটল, তা অস্বীকার করি কি করে?
—কি ঘটেছিল বলতো?
মা উৎসুক হয়ে তাকাল।

আমি ধীরে ধীরে সব বললাম। ওরা অবাক হয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল সব শোনার পর।
— যদি ধরে নিই, তুই সব সত্যি কথাই বলছিল, তবে ঐ লাশ তিনটে, কাঠ, কয়লা, লেন্স গুলো গেল কোথায়? আর যদি ধরে নিই, এগুলো মনের বা চোখের ভুল। তবে তোকে কি সত্যি জিন ধরেছিল? আর ঐ লোকটার সঙ্গে তোর মুখের মিল ই বা কি করে হবে?
— আমার মনে হয় দাদা, ঐ লাইট হাউসের কোন ইতিহাস আছে। যদি সেটা কোন ভাবে জানা যেত, তবে আমার কথা গুলো কে কেউ মিথ্যে বলতে পারত না। — আমি আসতে আসতে উঠে বসে বললাম।

— সেটা হতেই পারে। তাহলে এক কাজ করা যাক, একবার বিপিন বাবুর সঙ্গে আলাপ করা যাক এই প্রসঙ্গে। বিপিন সেন লোকটা কিন্তু একজন প্রবীণ ইতিহাসবিদ। কাছেই থাকে, একবার ঘুরে আসা যাক।
দাদার কথায় আমি সম্মতি দিলাম। আর সেদিন ই সন্ধ্যা বেলা তে তার বাড়ি ছুটলাম দু জনে।
ভদ্রলোকের বয়স প্রায় নব্বই অতিক্রান্ত। বাম হাত টা কব্জি থেকে কাটা। শরীরের চামড়া ঝুলে গেছে। অথচ এখন ও, সোজা হয়ে দাঁড়ান। আমাদের বসতে দিকে প্রাথমিক আলাপচারীতার পর ভদ্রলোক আমার কাহিনী মন দিয়ে শুনলেন। তারপর হেসে বললেন, — সে এক দারুণ গল্প রিক। সেটাও কম অ্যাডভেঞ্চার নয়। আমি বিভিন্ন পুরানো খবরের কাগজ, সরকারী নথি আর পূর্ব পুরুষের থেকে যে তথ্য সংগ্রহ করেছি, তার ভিত্তিতেই এই কাহিনী বলতে পার।

এই ঘটনা টা প্রায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কিছু আগের। ভারতে সে সময় চলছে ইংরেজ রাজত্ব। তখন এই লাইট হাউস টি বেশ সক্রিয় ছিল। তার রক্ষণাবেক্ষণে তখন বেশ কিছু কর্মচারী নিযুক্ত। তখন সমুদ্র পথেও নজরদারি তুঙ্গে। শুধু যে বিপদে পড়া জাহাজের সংকেত বান্ধব হয়ে এই লাইট হাউস গুলো কাজ করতো, তা নয়। সমুদ্র পথে নজরদারি ও চলত।
এরকম ই এক মার্চ মাসের রাতে তে ব্রিটিশ ক্যাপ্টেন জেমস হোপস মাঝ সমুদ্রে বিপদে পড়েন। তাদের ছোট বাণিজ্যিক জাহাজ লিভিং হাউস, যার গন্তব্য ছিল কলকাতা বন্দর, সেটি মাঝ সমুদ্রে বিকল হয়ে যায়। বাণিজ্যিক জাহাজ হলেও ক্যাপ্টেনের হাত দিয়ে বেশ কিছু দরকারী নথি গোপনে ভারতে আসছিল। সঙ্গে হয়তো আরও কিছু দুর্লভ বস্তুও ছিল। জাহাজ বিপদে পড়তেই ক্যাপ্টেন নিকটবর্তী জাহাজ গুলো কে তার বার্তা পাঠায়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ভাবে সে সময় কোন জাহাজ কাছাকাছি ছিল না। উপরন্তু কোন ভাবে এই বার্তা পেয়ে একটি পর্তুগিজ জাহাজ দ্রুত লিভিং হাউসের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। প্রথম দিকে ক্যাপ্টেন ভাবেন, এই জাহাজ টি তাদের উদ্ধার করতে আসছে। কিন্তু পরে বোঝা যায়, এটি জলদস্যু দের জাহাজ।
বিপদ ঘনীভূত বুঝতে পেরে ক্যাপ্টেন হোপস তার মূল্যবান জিনিস ভর্তি একটা ট্রাঙ্ক নিয়ে একটা ছোট ডিঙি নৌকা তে উঠে পাড়ের দিকে রওনা দেন। জাহাজের ভার ছেড়ে দেন অসহায়, নিরস্ত্র নাবিক দের হাতে।
হোপস এর পর উত্তাল সামুদ্রিক ঢেউ উপেক্ষা করে দাঁড় বেয়ে এগিয়ে যেতে থাকেন সমুদ্র তটের খোঁজে। নিজেকে বাঁচানোর থেকে ও সে মুহূর্তে বেশী গুরুত্বপূর্ণ ছিল গোপন যুদ্ধ সংক্রান্ত নথি গুলো বাঁচাবার।
বেশ কিছু টা আসার পরই তিনি দেখতে পান লাইট হাউস টিকে। মরিয়া হয়ে চেষ্টা করতে থাকেন পাড়ে পৌঁছানোর। দীর্ঘ নৌ যাত্রায় ইতিমধ্যেই তার শরীর দুর্বল হয়ে পড়েছিল। হাত, পা আর চলছিল না। কারণ প্রায় পাঁচ- ছয় ঘণ্টা পেটে এক ফোটা জল বা আহার পরে নি তার।
অবশেষে তিনি কোন মতে পাড়ে পৌঁছন। লাইট হাউস থেকে ওনাকে পাড়ে ভিড়তে দেখে ছুটে এল দুই কর্মচারী।
কিন্তু ক্যাপ্টেনের তখন কোন কথা বলার অবস্হাও নেই।
বুকে অসহ্য যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। কোন ক্রমে দরকারী কিছু বলার চেষ্টা করে ক্যাপ্টেন ওখানেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
যে দুজন ওখানে তাকে মিট করেছিল, তাদের একজনের বয়স তখন পনেরো- ষোলো হবে। কলেজে পড়ছে। ইংরেজির যথেষ্ট জ্ঞান ও ছিল। সে ঐ ট্রাঙ্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ জিনিস আছে বুঝতে পেরে দুজন ধরাধরি করে সেটা লাইট হাউসে নিয়ে যায়।
তবে যাবার আগে ক্যাপ্টেন কে লাইট হাউস এর নিচে কবর দিতে ভোলে না তারা।

 




 

ইতিমধ্যে জলদস্যুরা লিভিং হাউস আক্রমণ করে নিরস্ত্র নাবিক দের নির্বিচারে হত্যা করে। তারপর তাদের মুখ থেকে শোনা কথার উপর ভর করে যে পথে ক্যাপ্টেন পালিয়েছে, সেই দিকে দ্রুত ধাবিত হয়। এক সময় লাইট হাউস টি ওদের ও নজরে আসে। মাঝ রাতে সমুদ্রের পাড়ে নিঃশব্দে তাদের বোট এসে থামে। তার পর তারা সশস্ত্র হয়ে লাইট হাউসে আক্রমণ করে সবাই কে হত্যা করে ঐ গুরুত্বপূর্ণ নথি সমেত ট্রাঙ্ক টা ছিনিয়ে নিয়ে যায়। কোন ক্রমে তাদের হাত থেকে পালিয়ে আসা সেই পনেরো বছরের কর্মীর থেকে পরবর্তী কালে পুরো ঘটনা টা জানা যায়। যদিও ঐ ভয়ানক ঘটনার সংঘর্ষে ছেলেটির বাম হাত টা কব্জি থেকে উড়ে যায়।
তবে এতদিন আমি বললেও এই ঘটনার সত্যতা জানার কোন উপায় ছিল না। যত দূর বিভিন্ন নথি পত্রে খোঁজ নিয়েছি, তাতে ঐ কর্মচারীর কথা ভারতের শাসক রাও বিশ্বাস করে নি। সন্দেহের অবকাশ থাকায় আর চর বৃত্তির অভিযোগে ঐ কর্মচারী কে কালাপানি তে পাঠান হয়। এরপর অবশ্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গোলা এসে সত্যি সত্যিই লাইট হাউস টি প্রায় গুড়িয়ে যায়।
এতক্ষণ বিপিন বাবুর কথা আমরা দু ভাই মন্ত্রমুগ্ধের মতন শুনছিলাম। সব শোনার পর জিজ্ঞাসা করলাম, — কিন্তু ঐ লোক টা কে পুরোপুরি আমার মতন দেখতে ছিল, এটা কি ভাবে সম্ভব? আর কেন ই বা কোন এক অদ্ভুত শক্তি আমাকে এত বছর পর সেখানে টেনে নিয়ে গেছিল?

আমার কথায় বৃদ্ধ হাসল। বলল, — দেখ আমাদের শরীরের বিনাশ হয়। আত্মার হয় না। তাদের আবার পুনর্জন্ম হয়। হতে পারে তোমার পুনর্জন্ম হয়েছে। আর এই ঘটনার সত্যতা জানার জন্যই তোমার চোখের সামনে পুরো ব্যাপার টা পুনরায় আবার ঘটে। ঐ ছেলে টি যে সত্য বলেছিল, তা এবার প্রমাণিত হল।

আমি আর দাদা অনেকক্ষণ ধরে বৃদ্ধের গল্প শুনছিলাম। গল্প থামলে বললাম, আপনার কথা শুনে মনেই হচ্ছে না যে আপনি একজন ইতিহাসবিদ।মনে হচ্ছে আপনি একজন প্রত্যক্ষদর্শী। না হলে এত সুন্দর ভাবে উপস্হাপনা সম্ভব নয়। তা আপনার এই হাত টা কাটা গেল কিভাবে? যদিও এই প্রশ্ন টা হয়তো আমার অনধিকার চর্চা হয়ে গেল।
আমার কথায় বৃদ্ধ হাসল। বলল, –প্রথমে বলি, তুমি কবরের উপর যে ব্লেজারের থেকে কাটা হাত বেড়িয়ে থাকতে দেখেছ, সেই ব্লেজারের ‘J’ আর ‘S’ আসলে ক্যাপ্টেন James Hopes এর আদ্য অক্ষর দুটো। আর এত সুন্দর ভাবে উপস্হাপন করতে পারলাম, কারণ আমিই সেই পনেরো বছরের ছেলেটি। যে ঘটনার দিন রাতেও ওখানে কর্মরত ছিলাম। জলদস্যু দের হাত থেকে আমি প্রাণে বাঁচলেও আমার হাত টা বাঁচে নি। আর ইংরেজরা সব কথা বিশ্বাস না করায় আমাকে কালাপানি তে জীবনের কতটা মূল্যবান সময় কাটাতে হয়। পরে দেশ স্বাধীন হলে আবার ভারতে ফিরে আসি। এত বড় শাস্তি পাবার পরও কোন দিন ভাবি নি, আমার এই ঘটনাটির সত্যতা একদিন অন্যরকম ভাবে হলেও ঠিক প্রকাশ পাবে। আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ রিক, যে একটি ভৌতিক ঘটনার মধ্যে দিয়ে তোমার হাত দিয়েই সেই সত্য প্রকাশ পেল।

 

—— সমাপ্ত——

 

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 0   Average: 0/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।