লালচাঁদ সিং এর ভুতুড়ে রাজবাড়ী

লালচাঁদ সিং এর ভুতুড়ে রাজবাড়ী

উৎপল দাস

 

 

 

রোহন বিজ্ঞানের ছাত্র। ভূত প্রেত জিন ইত্যাদিকে সে বুজরুকি মনে করে। তার কথায় এইসব ভূত প্রেত কিস্যু নেই। সবই হলো ঠগবাজদের ভেলকি। লোকমুখে কথিত এমন অনেক ভয়ার্ত জায়গায় সে অনায়াসে রাত কাটিয়ে প্রমান করতে চায় যে এই সবই হলো মনের ভুল। পুরোনো আমলের রাজরাজাদের ভগ্ন পরিত্যক্ত প্রাসাদে ভূত প্রেত থাকে বলে মিথ্যা প্রচার করে এই সব ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক জায়গা গুলিকে সংরক্ষিত রাখার প্রয়াস করা হয়ে থাকে মাত্র। যাতে লোকজনের গমনাগমন কম হয়।

এই দিন কয়েকের মধ্যেই ওর শান্তিনিকেতনে পিসির বাড়িতে যাওয়া হবে। সেখান থেকে মাত্র দেড় কিলোমিটার দূরে রয়েছে পুরোনো ভগ্ন প্রাপ্ত একটি রাজবাড়ী। প্রায় ২৫৬ বছর আগের কথা। ১৭৬৪ সালে লালচাঁদ সিং নামে এক তাঁত ব্যবসায়ী মেদিনীপুর থেকে ১০০০ তাঁতী নিয়ে বোলপুরে আসে। সেখানে এই বিশাল রাজবাড়ী তৈরি করে সমস্ত কর্মচারী নিয়ে থাকতে শুরু করে লালচাঁদ সিং।

লোকমুখে কথিত আছে যে আজও নাকি সেই ভগ্ন রাজবাড়ীতে গেলে তাঁতীদের তাঁত বোনার শব্দ শুনা যায়। আবার কেউ কেউ নাকি অমাবস্যার মধ্যরাতে লালচাঁদ সিং কে তার তাঁতীদের নিয়ে সভা করতেও দেখেছে। এমন অনেকেই নাকি সেই বাড়িতে গিয়ে প্রেতাত্মা দেখে পাগল হয়ে গেছে। রোহন ভাবলো এটাই প্রকৃত সময় আর জায়গা ভূত প্রেতের মিথ্যে রটনাকে প্রমান করার।

 




 

আজ ২২শে মে, অমাবস্যা। সকাল সকাল শান্তিনিকেতনে ওর পিসির বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয় রোহন। কলকাতা থেকে ট্রেনে করে প্রায় ১৬৩ কিলোমিটারের পথ শান্তিনিকেতন। এই পৌঁনে চার ঘন্টার পথ যেতে যেতে প্রায় বিকেল হয়ে গেলো। তার শান্তিনিকেতন আসার কথা সে তার পিসিকে আগে থেকে জানায়নি। স্টেশনে পৌঁছে সে ভাবলো, আজকে যদি পিসির বাড়িতে যায় তবে তার সব প্ল্যান ব্যর্থ হবে। পিসি ওকে আজ বেরুতেই দেবেনা। তাই সে সোজা বোলপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হলো।
মাত্র দেড় দুই কিলোমিটারের পথ পেরিয়ে সহসাই পৌঁছে গেলো রহস্যাবৃত সেই পুরোনো রাজবাড়ীতে। সন্ধ্যা হওয়ার আগেই সে ঢুকে গেলো বাড়িতে।

সুবিশাল সে রাজবাড়িটি অনেকটাই ক্ষয়প্রাপ্ত। চারিদিকে জঙ্গলে ঘেরা। দূর থেকে দেখলে শুধু সবুজ আর সবুজ। কোথাও দেওয়াল ফেটে চৌচির তো কোথাও আবার অবাঞ্ছিত বটবৃক্ষের আচ্ছাদন। গোধূলির আলোতেও যেন ঘুটঘটে অন্ধকার সেখানে। বাড়ির ভেতরে যাওয়ার মাত্র সরু একটি পায়ে চলা পথ। তাও আবার জংলী গাছ লতাপাতায় ঘেরা। সারা বাড়িতেই এদিক ওদিক শুধু শেওলা জমে থাকা দেওয়াল। এখানে যে সূর্যের আলো পড়েনা তা দেখলেই বুঝা যায়। কোনো দরজা বা জানালার চৌখাট চোখে পড়েনা। রোদ বৃষ্টিতে পঁচে হয়তো নষ্ট হয়ে গেছে বহু আগেই। তাই রাজবাড়ীর এই উন্মুক্ত ঘর গুলো কেমন যেন অবহেলায় লালিত। কিছু সংখ্যক বাদুড় উড়ে বেরিয়ে গেছে ঘর গুলোর একটি থেকে। অধিকাংশ দেওয়ালেরই অনেক প্রাচীন ইট খসে পড়ে গেছে। বলতে গেলে প্রকৃতি ছাড়া আর কেউই দেখাশোনা করে না এই রাজবাড়ীটির।

আজ অনেক মানুষই সেই বাড়ী দেখতে এসেছে। এর মধ্যে একজন বয়স্ক লোক ওর পিসির বাড়ির এক পাড়ারই, নাম  নিশিকান্ত দস্তিদার। দেখা হতেই নিশিকান্ত বাবু বললেন, “আরে রোহন আংকেল, কখন এলে? তোমার পিসি পিসু আর ভাইয়েরাও কি এসেছে তোমার সাথে?
– না না নিশি আংকেল… ওরা কেউ আসেনি। আমি একাই ঘুরতে এলাম।
– ও তাই….?
– হ্যাঁ আংকেল
– তো চলো ঘুরে দেখি বাড়িটা…

রোহন কি বলবে বুঝতে পারেনা। আজকে যে ওর থাকার প্ল্যান এই বাড়িতে, সেটা বললে তো মহাবিপদ। যদি গিয়ে পিসিকে বলে দেয় তো বড্ড রাগ করবে পিসি। তাই উপায়ন্তর না দেখে সে বললো, “ঠিক আছে চলুন ঘুরে দেখি”

নিশিবাবু রোহনকে একে একে সব ঘর ঘুরে দেখাচ্ছে। বাঁ দিকের এই ঘরটায় লালচাঁদ সিং এর হিসাবরক্ষক থাকতো। ওইযে বিশাল ইটখসা দেওয়াল ঘরটি, সেখানে থাকতো লালচাঁদ ও তাঁর স্ত্রী সন্তানেরা। আর ওই যে ডানদিকের লম্বা সারির ঘর গুলো, সেখানে স্বপরিবারে থাকতো তাঁর ১০০০ তাঁতী। তার পাশেই রয়েছে বড় ঐ পুকুরটি যেখানে তাঁতীদের স্ত্রীরা স্নান করতো।

একে একে সারাটি বাড়ী দেখিয়ে চললেন নিশিবাবু। রোহন কেবল হু হু করতে করতে ওনার সাথে এগিয়ে চললো। এদিকে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নেমে এসেছে। অনেক পর্যটকরাই বিদায় নিয়েছে। কিন্তু নিশি আংকেলের আঠালীপনায় প্রায় বিরক্ত রোহন। কোথায় সে ভাবলো, আজকের অমাবস্যার রাতটা এখানে কোনো একটি ঘরে কাটাবে, সেলফি ছবি তুলবে, সেলফি ভিডিও করবে, আর পরদিন সোশ্যাল মিডিয়ায় আপডেট দিয়ে প্রমান করবে যে ভূত প্রেত বলে কিছু হয়না, সবই মনের ভুল…  আর নিশি আংকেল নাকি তার এতদিনকার সমস্ত প্ল্যান ভেস্তে দেবে? ওঃফ…  বিরক্তিকর। রাত আটটা বেজে গেছে। নিশি আংকেলের কি বাড়িঘর নেই নাকি। ধ্যাৎ….

কি করবে এখন সে কিছুই বুঝতে পারছেনা। রোহনের হাতে একখানা টর্চ ও পিঠ ব্যাগে কিছু কাজু বাদাম, চার খানা ভেজ স্যান্ডুইচ ও লিটার খানেক জল রয়েছে। নিশি আংকেল কে টর্চ মেরে মেরে রোহানের বৃদ্ধাঙ্গুঠ ব্যাথা হয়ে গেছে, উপরন্তু টর্চের ব্যাটারি শেষ হয়ে গেলে আর প্ল্যান বানচাল করা ছাড়া উপায় থাকবে না।
নিশি আংকেলের বকবক শুনতে শুনতেই বেজে গেলো রাত্রি এগারোটা। টানা চার ঘন্টা এই রাজবাড়িতে ঘুরাঘুরি করে পরিশ্রান্ত রোহন। কিন্তু নিশি আংকেল কে দেখে বিন্দুমাত্রও পরিশ্রান্ত মনে হচ্ছে না। রোহন বললো,”নিশি আংকেল, একটু জিরিয়ে নেই চলুন, অনেক টাইয়ার্ড হয়েগেছি।”
– ঠিক আছে রোহন… চলো ঐ দিকটায় উঠোনের পাশে গিয়ে বসি”

 




 

 

সেখানে গিয়ে একটু বসা হলো সিঁড়িতে। দুজনে মিলে কাজুবাদাম আর স্যান্ডুইচ খেলো ওরা। জলও শেষ হয়ে গেলো। রোহন ভাবলো যদি রাতে পিপাসা পায় তো করবেটা কি ! পোড়া কপাল….  এই নিশি আংকেলের সাথে দেখা না হলেই তো ভালো হতো। উদাস হয়ে যায় রোহন। প্রায় ঘন্টা খানেক বিশ্রাম নিয়ে নিশি আংকেল বললো, “রোহন, প্রায় সবটা বাড়িই দেখা হয়ে গেছে, শুধু…. একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দেখার বাকি রয়ে গেলো”
– ওফঃ…  আবার কোন গুরুত্বপূর্ণ জায়গা নিশি আংকেল?
– চলো দেখাচ্ছি। এতো দূর থেকে এসেছো, আর এই জায়গাটা না দেখলেই নয়। ওইটা দেখা হয়ে গেলেই আমার বাইকে করে শান্তিনিকেতন ফিরে যাবো কেমন?

একটি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে রোহন উঠে নিশি আংকেলের সাথে বাড়ির দক্ষিণ প্রান্তের দিকে এগুতে থাকলো। ঘড়িতে তখন রাত ১২ টা বেজে গেছে। টর্চের আলো ক্ষীণ হয়ে আসতে লাগলো। হেটে আরও পাঁচ মিনিট এগিয়েই থমকে দাঁড়িয়ে গেলো রোহন। বাজারহাটে লোকজনের যেমন গুঞ্জন শোনা যায়, ঠিক তেমনি গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। এই দক্ষিণ প্রান্তের হলঘরটি থেকে আওয়াজ আসছে। ইতি মধ্যে একটু এগিয়ে গেছে নিশি আংকেল। হঠাৎ তিনি রোহন কে ডাকলেন।
– রোহন, এইদিকে এসো।
রোহন এগিয়ে গেলো। গিয়ে দেখে নিশি আংকেল দেওয়ালের ফাটলের একটি ছিদ্র দিয়ে তাকিয়ে আছে।
– কি দেখছেন নিশি আংকেল?
– তুমি নিজেই দেখো, এই হলঘরটি থেকেই গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিলো।
নিশি আংকেল একটু সরে গিয়ে রোহনকে দেওয়ালের ফোটোয় চোখ রাখতে দেয়। রোহন অবাক হয়ে যায় দেখে। সে দেখতে পায় হলের ভেতরে অনেক অনেক মানুষ !!! দেখে ওদের তাঁতী বলেই মনে হচ্ছে। হলের অপর প্রান্তে একটি স্টেজে একজন বড় শেঠ বসে আছে। ওনার দুদিকে দুজন বড় বড় পাখা দিয়ে হাওয়া করছে। নাজানি কি সব বলছে ওরা। হঠাৎ যেন সবাই একসাথে বলে উঠে, “লালচাঁদ সিং জী কি….  জয়…. ”
ভয়ে রোহনের সমস্ত শরীর অসাড় হয়ে এলো। ওর হাতপা থরথরিয়ে কাঁপছে। প্রচন্ড ভয়ে মৃদু এবং কাঁপা গলায় সে ডাকলো, “নিশি আংকেল….. ”
পেছনে ফিরে দেখে তিনি নেই !!! তার বদলে এক সাত আট ফুট লম্বা আপাদমস্তক কালো কাপড়ের ঢাকা কালো ছায়া ফিসফিস করে গম্ভীর ও ভয়ার্ত স্বরে বললো, “রোহন………. ভূত প্রেত মিথ্যে নয়… হা হা হা হা হা হা হা হা হা হা হা…… ”
এই বিকট হাসি শোনে রোহন ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যায়।

“রোহন… এই রোহন… উঠনা বাবা….”- ডাক শুনতেই চোখ খুলে রোহন। জ্ঞান ফিরতেই সে নিজেকে ওর পিসির বাড়িতে দেখতে পায়। পিসি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
– পিসি আমি তোমাদের বাড়িতে কি করে এলাম গো?
– তুই তো আমার বাড়িতে আসবি বলেই বেরিয়ে ছিলি কলকাতা থেকে। তোর মোবাইলে অনেক বার ফোন করেও ফোন তুলিসনি বলে তোর বাবা আমায় ফোন করলো আজ ভোরে। তখনি জানতে পারলাম তুই কালই বেরিয়েছিলিস। তো বোলপুরের রাজবাড়িতে গিয়েছিলি কেনো?
– তুমি কি করে জানলে গো পিসি?
– আমি জানবো নে? তোর পিসু রোজই ঐদিকে মর্নিং ওয়াকে যায়। আজ গিয়ে দেখে রাজবাড়ীর সামনে অনেক লোকের ভিড়। ভিড় ঠেলে এগিয়ে গিয়েই তোকে অজ্ঞান অবস্থায় দেখতে পায়, আর রিক্সা করে বাড়ী নিয়ে আসে।
– ও…  তাই….? জানো পিসি, কালকে আমি রাজবাড়ীতে নিশি আংকেলের সঙ্গেই ছিলাম।
– কি যা তা বলছিস? নিশি দা তো সেই কবেই সুসাইড করে মারা গেছে… প্রায় বছর ছয়েক হলো। তুই আবার কোত্থেকে দেখলি ওনাকে? মরা মানুষ কি আবার ফিরে আসে নাকিরে পাগল ছেলে….? ! নে বাবা উঠে পর এবার….  রান্না হয়ে গেছে। স্নানটা সেরে খেতে আয়। সবাই তোর জন্য অপেক্ষা করছে।

 




 

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total:    Average: /5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।