‘লুচি’

‘লুচি’

‘লুচি’

–অনীশ ব্যানার্জ্জী

 

‘লুচি’ শব্দটি আমাদের সবারির কাছেই পরিচিত। আমারা সকলেই চাই বিশেষ করে আমি যে লুচি যেন ফুলকো আর গরম গরম হোক। সমাজটাও যেন তাই চায়, যে ব্যক্তি ফুলকো লুচির মত সাহসে বুক ফুলিয়ে ঘুরবে আর লুচির উত্তাপের মতই মন তেজে পরিপূর্ণ। ঠিক যেন গরম লুচি উপভোগের বস্তু, রেগে যাবেননা আপনাকে কটাক্ষ করছিনা। আর সেই লুচিই যখন ঠাণ্ডা হয়ে যাবে মনে হয় কত তেল ধরেছে, আমার একদম ভালো লাগেনা। এই সামান্য লুচি নিয়েই একটি গল্প বলি।
একটি অফিসে হিরন্ময় বাবু ও রৌনক একসাথে চাকরি করে। হিরন্ময় বাবু বয়সে রৌনকের থেকে বছর ১৫-২০ বড়। রৌনক একটু আধুনিক বর্তমান যুগের মডার্ন, পড়নে জিন্সের প্যান্ট হাতে স্মার্ট ফোন অন্যদিকে হিরন্ময় বাবু একটু পুরনো দিনের মানুষ পড়নে ছিটের প্যান্ট আর হাতে স্মার্ট ফোন যেটা রৌনক তাকে জোর করে কেনা করিয়েছে। হিরন্ময় বাবুর বাবার বয়স প্রায় ৮৯ বার্ধক্য জনিত কারনে শয্যাশায়ী।
একদিন রৌনক গেল হিরন্ময় বাবুর বাড়িতে তার অসুস্থ বাবাকে দেখতে। হিরুবাবু দরজা খুলে দিলেন, ভিতরে এল এবং ফলের প্যাকেট ও কমপ্লান হিরুবাবুর স্ত্রীর হাতে দিলেন। “ বৌদি এসেছি যখন আপনার হাতের চা না খেয়ে যাচ্ছি না”। বৌদি বলল “আমি এখুনি চা বানাচ্ছি বাবাকে দেখে এস যাও”। তিনজনই একসাথে চা খেতে বসল দুজন বিস্কুট দিয়ে কেবল বৌদি একটা বাসী লুচিকে চায়ে ডুবিয়ে খাচ্ছে। রৌনক দেখে আর থাকতে না পেরে বলল “অম্বোলের জন্যই খাচ্ছেন জেনে রাখবেন”, বৌদি হেসে উত্তর দিলেন “তা নষ্ট হবে ফেলেদেব বল? তুমি খাওনা বুঝি?”
“একদমই না। গরম দিলে খাই না হলে কী তেল ধরে বাপরে!”
বৌদি বললেন “ তা তেলটা না হলে লুচিটা ভাজা হত?” রৌনকের মুখে আর কোন কথা নেই। চা খেল হিরুবাবু বললেন তার জীবনের কথা বলতে, যা অফিসে শোনার সময় হয়না। বৌদি বললেন গরম লুচি হচ্চে সে যেন খেয়ে যায়; রৌনক ভোজনরসিক সে জানাল না খেয়ে সে যাচ্ছেনা। এই বলে সে তার গল্প শুরু করলেন..




“আমি আমার মা-বাবার একমাত্র সন্তান। বাবা দুবছর আগে মারা গেছেন, স্ত্রী একছেলে আর মাকে নিয়ে থাকি। ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল বড় একজন ইঞ্জিনিয়ার হব, পড়াশোনায় খুব একটা ভালো না হলেও খারাপ ছিলামনা; কিন্তু আমার সক আর স্টাইলটা ছিল প্রবল। প্রতিবার পরীক্ষার ফল বেড়োনর পর বাবা আমাকে খুশি হয়ে একটি করে উপহার দিতেন, খুব আনন্দ পেতাম। পাড়া প্রতিবেশী আত্মীয় স্বজন সবাই আমার প্রশংসা করে ফাটিয়ে দিত। তারপর উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিলাম ফল খারাপ হল, ইঞ্জিনিয়ারিইয়েও চান্স পেলামনা, ব্যাস শুরু হল সমালোচনার ঝর। যারা প্রিয়জন ছিল প্রশংসায় ফাটিয়ে দিত আড়ালে শুনতাম আমার সমালোচনা আমার নাকি অধিক স্টাইল যা পড়াশোনা না হবার কারন, প্রিয়জনদের কাছে যেন আমি প্রয়োজনহীন।বাবা মা কিছুই বলেননি শুধু অনুপ্রেরনা দিয়েগেছেন। দ্বিতীয়বার যখন ব্যর্থ হলাম বাবার পরামর্শে ডিপ্লোমা তে ভর্তি হলাম। প্রতিবার প্রথম হয়েছি পরে স্বর্ণ পদক নিয়ে পাশ করেছি ইঞ্জিনিয়ারিং। তারপর ভালো একটা চাকরি পেয়ে আপনার সাথে বসে চা খাচ্ছি”। হিরন্ময় বাবু বললেন “বাব্বা এতো কষ্ট করেছ। তারপর তোমার বাবার ব্যাপারে বল শুনব”। রৌনক আবার শুরু করল বলতে
“স্বর্ণ পদক আর চাকরি এই দুইই বাবাকে খুব খুশি করেছিল তিনি আত্মীয় স্বজন সবাইকে ডেকে খাইয়েছিলেন। খুব খাওায়াতে ভালবাসতেন। দশ হাতে বাবা দশদিক সামলাতে পারতেন, বাবা থাকতে আমি কোনদিন বাজারে যাইনি। স্নানাগার পরিস্কার থেকে সাইকেল মোছা সবই করেদিতেন। দিব্য শক্ত সামর্থ্য মানুষটার হঠাৎ করে কি যে হল? তবে চলে গেছেন শান্তি পেয়েছেন। শেষ দিকটা সবাই বিরক্ত হচ্ছিলাম কিন্তু আপনাদের চোখে কোনও বিরক্তির ছোঁয়া নেই। সত্যিই অবাক হলাম দেখে” কথা শেষ হতেই বৌদি লুচি তরকারি নিয়ে হাজির। রৌনক হাত ধুতে গেল হিরুবাবু একটা ছোট প্লেটে একটা বাসী লুচি দিতে তার স্ত্রীকে বললেন আর রৌনক আসতেই তার থালা থেকে গরম লুচি একটা তুলে নিলেন।
হিরুবাবু না খেয়ে প্লেটটা রৌনককে বাড়িয়ে দিলেন বললেন “আচ্ছা রৌনক এই দুটো লুচির মধ্যে যদি একটা নিতে বলা হয় তুমি কোনটা নেবে?”
“অবশ্যই গরমটা” রৌনক জবাব দিল।




“কেন দুটোই তো একই ময়দার তৈরি?” আবার প্রশ্ন;
যথারীতি সেই এক উত্তর “আরে এটা কী তেল ধরেছে দেখুন; খেলে যে ফ্যাট কোলেস্টেরল বেড়ে যাবে”
হিরুবাবু হাসলেন বললেন “ভালো করে তাকাও তো, গরম লুচিটায় তেল নেই? খেলে তোমার ফ্যাট কোলেস্টেরল বাড়বে না?”
রৌনক অবাক হল কী ইঙ্গিত করছেন হিরুবাবু?
হিরুবাবু বললেন “ দ্যাখো ভালো করে, এই লুচিটা যদি তুমি হও তেলটা তোমার সেই বাবার কিনে দেওয়া সক বিলাস দ্রব্যগুলি যেগুলিকে ছাড়া তুমি বাঁচতে পারতেনা ঠিক তেমনি লুচিটাও ভাজা হতনা। লুচির এই উত্তাপ তোমার সাফল্য এবং ঠাণ্ডা লুচিটা তোমার খারাপ সময়ের তুমি। তুমি হলে তোমার সমাজ আত্মীয় স্বজন। এই ঠাণ্ডা লুচিটাও কিছুক্ষণ আগে এই গরম লুচিটার মতই ছিল এখন ঠাণ্ডা বলে তুমি তাকে খারাপ বলছ। ঠিক তোমার আত্মীয় স্বজনদের মত।
রৌনক অবাক হয়ে বলল “ঠিকতো!! কিন্তু একটা বিষয় দেখুন আমিতো খারাপের পর আবার ভালোর মর্যাদা পেয়েছি, ঠাণ্ডা লুচিটাকে কী আর আপনি গরম করতে পারবেন?”।
হিরন্ময় বাবু বললেন “নিখুঁত উদাহরন শুনতে চাও?”
“হ্যাঁ! অবশ্যই” রৌনক উত্তর দিল।
হিরন্ময় বাবু বললেন “তোমার বাবা। গরম লুচিটা তোমার বাবার যুবক শক্ত সামর্থ্য অবস্থা আর ঠাণ্ডাটা শয্যাশায়ী। ঠাণ্ডা লুচিকে যেমন আর গরম করা যাবেনা তেমনি তুমি তোমার বৃদ্ধ বাবাকেও আর যুবক করতে পারবেনা। যতদিন উনি দশহাতে দশদিক সামলেছেন তুমি তাকে গরম লুচির মতই উপভোগ করেছ কিন্তু যখন মৃত্যু শয্যায় তার ওই অবসন্ন শরীরটাকে তার নিঃশ্বাস প্রশ্বাসকে লুচির তেলের মতই বিরক্তির চোখে দেখেছ যেটা তার সবসময়ই ছিল।
তোমার বৌদি যেমন বাসী লুচির স্বাদ চায়ে উপভোগ করে তেমনি বাবাকে সেবাটাও আনন্দের সাথেই করে কারন বাবা শক্ত থাকাকালীন আমরাও তাকে তোমার মতই উপভোগ করেছি।আজ ডাক্তার জবাব দিয়েছেন আমরা গল্প করে মনোবলটুকু দিতে পারি, ওটাই আসল।
গরম লুচিটা একটু পরেই ঠান্ডা হয়ে যাবে কাল বাসী হবে ঠিক তেমনি তুমিও কাল তোমার পিতার মতই বৃদ্ধ হবে , তখন তোমার সবকিছুই ওই লুচির তেলের মতই বিরক্তির কারন হবে তোমার ছেলের কাছে; সে তো তোমাকে দেখেই শিখবে”।




এই কথা শুনে রৌনকের চোখে জল এসে গেল আর বসে থাকতে না পেরে উঠে হিরুবাবুর পা ছুঁয়ে প্রনাম করলেন।
হিরুবাবু অস্বস্তিতে পড়ে গেলেন বললেন “এ কী করছ?”
রৌনক বলল “ করতে দিন মাথার উপর আপনার মত একটা দাদা থাকলে বাবাকে হয়ত সুস্থ করে তুলতে পারতাম, ছেলের শিক্ষাটাও ভালো হত”। হঠাৎ হিরু বাবুর স্ত্রী এসে এসব দেখে হতবাক বললেন “ কী করছ? দিলেতো ছেলেটাকে কাঁদিয়ে”। চোখ মুছে রৌনক বলল “না বৌদি আজ একটা দারুন সুন্দর শিক্ষা পেলাম তাই আনন্দে আমার চোখে জল আসছে। সুন্দর আধুনিক পোশাক পড়লেই মডার্ন হওয়া যায়না, মা বাবাকে যে বাঁচিয়ে রাখতে জানেনা সে আবার কীসের মডার্ন? মডার্ন আপনারা আপনাদের চিন্তা ভাবনা-মানসিকতা।” হিরুবাবু বললেন “যা হয়েগেছে ভুলে যাও মাকে যেন এইভাবেই সেবা করে বাঁচিয়ে রাখতে পার সেই চেষ্টা কর”। বৌদি বললেন “দ্যাখ ভাই রামমোহন বিদ্যাসাগর তো ইংরেজদের মত আধুনিক পোশাক পড়েননি, সাধারনের মত ধুতি পড়তেন কিন্তু চিন্তায় কত মডার্ন যা ইতিহাসের পাতায় তাদের স্থান করে দিয়েছে। লুচিগুলো ঠাণ্ডা হয়ে গেছে তুমি খেতে পারবেনা দাড়াও আমি গরম ভেজে আনি”। রৌনক বাঁধা দিল বলল “আমার কষ্ট হবেনা এগুলোই খাব আমি আজ থেকে আমি আপনাদের মত” এই বলে সে প্লেট থেকে বাসী লুচিটাকেই প্রথম মুখে পুড়ে দিল, অন্য দুজন অম্লান বদনে হেসে উঠলেন।

Po-J

 

বর্তমান ভারত ও বিজ্ঞান

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 2   Average: 3/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।