শুভ নববর্ষ

গল্পের নাম: শুভ নববর্ষ

লেখক: অভিজিৎ ঘোষ

 

 

কালবেলায় মিনতির ফোন কলে ঘুম ভাঙলো বিনোদের।
‘হ্যালো….. শুভ নববর্ষ!’— ওপাশ থেকে মিনতি বলল।
চোখ কচলাতে কচলাতে বিরক্তির স্বরে বিনোদ বলল, ‘হুঁ…’
‘ঘুম ভাঙ্গলো এখন?’
‘হ্যাঁ..’
‘কাজে যাবে কখন?’
‘এই তোহ্… এখুনি।’
‘আজ কিন্তু নতুন জামাটা পড়ো…. ঐ যে, যেটা বাবা তোমাকে পুজোর সময় দিয়েছিল। তুমি তো ওটা পড়োই নি!’
‘ঠিক আছে।’
‘আর শোনো, বছর পয়লার দিন, ভালো কিছু খেয়ে নিও।’
‘আচ্ছা..’
‘এই নাও বাবুর সাথে কথা বলো’—বলে মিনতি তাদের পাঁচ বছরের ছেলে বিট্টুর কানে মুঠোফোনটা চেপে ধরলো।
‘বাবা তুমি কবে আসবা? তুমি নেই তাই মা আমাকে পড়া না পারলেই মারে। জানো, আমার স্কুলের বন্ধু রিভুর কাছে একটা ইয়া বড় ব্যাট আছে। আগের বার তুমি যেটা এনেছিলে সেটা তো ভেঙ্গেই গেছে। এবার আসার সময় আমার জন্য ব্যাট নিয়ে আসবে?’— কথাগুলো খুব উৎসাহের সঙ্গে একদমে বলে বিট্টু জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগল।

 




 

দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বিনোদ বলল,‘হ্যাঁ বাবা, ভালো করে পড়াশোনা করো সব এনে দেবো।’
ফোন রেখে শীর্ণ হাত দুটোর চেটোতে মুখ রেখে আকাশ পাতাল ভাবতে লাগলো বিনোদ। একে একে মনে পড়ছে ফেলে আসা দিন গুলোর কথা। সেই মিনতির সাথে প্রথম দেখা, তারপর প্রেম, বিয়ে, সংসার। সব কিছু বেশ চলছিল। বিয়ের আগে বুক ফুলিয়ে মিনতির বাপের কাছে বলেছিল, ‘কোম্পানিতে ম্যানেজারের চাকরি করি’। হ্যাঁ ম্যানেজারের চাকরিই বটে! তবে দিল্লি সংলগ্ন একটা ছোট খাটো গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির ম্যানেজারের কাজ। মাসোহারা বাবদ যা পেত তাতে ঘরে টাকা পাঠিয়েও কিছু সঞ্চয় থাকত। ভেবেছিল কাজে আরেকটু থিতু হয়ে সঞ্চয়ের টাকা দিয়ে বর্ধমানে একটা জায়গা কিনবে। অনেক দিন তো ভাড়া বাড়িতে থাকা গেল। এবার একটা নিজের বাড়ি হবে। স্বপ্নের বাড়ি! কিন্তু অদৃষ্টের পরিহাস! বছর দুয়েক আগে মালিক পক্ষ ঠিক করলো ফ্যাক্টরির জায়গায় শপিং কমপ্লেক্স গড়বে। তারপর অনেক স্ট্রাইক হল, কিন্তু মালিক পক্ষকে টলানো গেল না।

বছর খানেক আগে চাকরিটা চলে গেছে। এখনো মিনতি তা জানে না। বিনোদ জানায়নি, ঘরেও ফেরেনি। একটা চাকরির জন্য অনেক ঘুরেছে। মেলেনি। মিনতিকে জানাতে ভয় হয় তার। যদিও মিনতি টাকার জন্য ভালবাসে নি তাকে। ভালোবাসে অন্তর দিয়ে। কিন্তু পেটে ক্ষিদে থাকলে আর প্রেম আসে না। তখন কঠিন বাস্তবতার নিষ্ঠুর পদাঘাতে প্রেম পালায় যৌবনের জানালা খুলে। ঝড়া পাতার মতো শুকিয়ে পড়ে থাকে দায়িত্বটুকু। পরিবার-পরিজনের দায়িত্ব। সেই যে বিয়ের সময় মিনতির ‘ভাত কাপড়’-এর দায়িত্ব নিয়েছিল। নিজে কোনভাবে উচ্চ-মাধ্যমিকের গণ্ডিটা পেরিয়েছিল। ফটাফট ইংরেজিতে বলতে পারে না বলে অনেকেই হেয় করে। তাই ভেবেছিল ছেলেটাকে ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে পড়াবে। করেছেও তাই।

 

 




 

একটা কিন্ডার গার্ডেন স্কুল পড়ে বিট্টু। কত অফিসার, আমলাদের ছেলেমেয়েদের সাথে টেক্কা দিয়ে চলতে হয় সেখানে। সব দিক থেকেই। স্কুলের খরচও অনেক। তবুও হাল ছাড়েনি সে। চাকরি যাওয়ার পর মুটে-মজদুর খেটেছে; কখনো রাজমিস্ত্রির কাজ, কখনো ইলেকট্রিশিয়ান, যখন যা পায় টুকটাক সবই করে। একটু ওভারটাইমের আশায় খাটে দিন-রাত। তবুও খরচে কুলোতে পারেনি। ফলে সঞ্চয়ে হাত পড়েছে। এখন সবই শেষ হয়ে গেছে। আর লক্ ডাউনের পর তো কোনো কাজ নেই। এক জায়গায় রাজমিস্ত্রির কাজ করেছিল। পাওনা বাকি এখনো। এক সপ্তাহ ধরে ফোন করছে সেই মালিককে। সেও বেপাত্তা। আপাতত কিছু সহৃদ মানুষের অনুদানে চলছে পেট। কিন্তু তা আর কতদিন। বাড়ি ফিরে যেতেও সাহস হয় না।

মাথাটা ঘোরাতে লাগলো বিনোদের। টলতে টলতে বিছানা ছেড়ে উঠলো। পড়নের লুঙ্গিটায় অসংখ্য ফুটোফাটা— ঠিক যেন নেট কাপড়। ওটাই শেষ পরিধেয়। বাকি সব বিকিয়ে গেছে স্টেশনের সামনে লাট কাপড় হিসেবে। অথবা শিক্ষা কিনতে গিয়ে!
খিদের জ্বালাটা ভীষণ হয়ে উঠেছে। কাল রাত থেকে কিছু খায়নি সে। টলতে টলতে ঘরময় খুঁজে নিয়েছে, কোথাও খাওয়ার কিছু নেই। শুধু পড়ে আছে কাল সকালের খাওয়া ভাতের ফ্যানটুকু। পাঁচ বাই আটের ঘরটা যেন অট্টহাস্য করে উঠলো তার দারিদ্রতার প্রতি; নাকি উন্নাসিকতার প্রতি! দেওয়ালগুলো যেন চেপে ধরতে চাইছে তাকে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। খুব কষ্ট। বিনোদ টলছে— নেশাগ্রস্থের মত।

সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © অভিজিৎ ঘোষ

 




গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total:    Average: /5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।