শুভ পরিণয়

শুভ পরিণয়

শুভ পরিণয়
ফিরোজা হাসিন

হ্যালো , হ্যাঁ আমি আভা চক্রবর্তী বলছি।আমার বাবা খুব অসুস্থ।এমারজেন্সিতে একটা বেড এখনই আমার চাই।
-কিন্তু ম্যাম বেড তো এখন খালি নেই।
-আভা ক্রুদ্ধস্বরে বলল খালি নেই তো কি হয়েছে?মনে রাখবেন আমি বর্ধমান হসপিটালেরই একজন স্টাফ।যেমন করেই হোক বেড আমার চাই।আমি গাড়িতে আছি।এই বলে ফোন কেটে দিল।

আভার গ্রাম পূর্ব বর্ধমান জেলার কুসুমগ্রামে।বর্ধমান থেকে ৩৮ কিলোমিটার দূরে।বাতাসকে দুইভাগে ভাগ করতে করতে দ্রুত গতিতে ছুটে চলেছে গাড়িটা।আভার মা আরাধ্যা দেবী অজানা আশঙ্কায় চোখ মুছছেন আঁচলের কোনায়।মেয়েকে তিনি দুর্বল করতে চান না এই পরিস্থিতিতে।আভার হৃদস্পন্দন যেন গাড়ির শব্দ ছাপিয়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে অতি দ্রুত।মা আর বাবাই তো সন্তানদের দুই পৃথিবী।আভার ছোট বোন অণুকে বাড়িতে রেখে এসেছে ওরা।তার মনেও কালবৈশাখীর আতঙ্ক।কিন্তু দিদির প্রতি বিশ্বাস পাহাড় এর দৃঢ়তার মত।অনুর দ্বিতীয় মা তো আভা ই।

একদিন বান্ধবীদের সাথে গল্প করছিল আভা,অনু তখন ছোট, দিদিকে খুব বিরক্ত করছিল ও বাড়ি যাবার জন্য।কখনো গলা ধরে ঝুলছে তো কখনো হাত ধরে টানছে,তো কখনো কামড় দিচ্ছে,কিছুতেই কথা বলতে দিচ্ছিল না,পিঙ্কি ও বিরক্ত হয়ে বলল কি করে সহ্য করিস রে আভা ? আমি হলে এতক্ষণ……..
কথা শেষ করতে না দিয়ে আভা বলল “আমি ওর মা এর মত,আমার কাছে একটু আবদার করবে না তো কার কাছে করবে ? আজ আসি রে পরে কথা হবে তোদের সাথে।আমার আরো আগে যাওয়াই উচিৎ ছিল।”এই বলে ছোট বোন এর হাত ধরে বিদায় নিল।ওর বান্ধবীরা পরস্পরের দিকে দৃষ্টিবিনিময় করে বিস্ময়ে চেয়ে রইল ওদের চলে যাবার পথের দিকে। ছোট বেলা থেকে মা এর মতই মানুষ করেছে আভা অনুকে।ওকে ছাড়া অনু স্নান খাওয়া ও করতে চাইত না প্রথম দিকে।যখন বুঝতে শিখল দিদির পড়াশোনা আছে ওকেও অনেক পড়তে হবে তখন আর কিছু বলত না কিন্তু দিদিকে কাছে পাবার এক টা সময় ও হারাতে দিত না ও।

এক ঘন্টার কিছু আগেই গাড়ি এসে পৌঁছল বর্ধমান হসপিটাল।বেড রেডি।খুব তাড়াতাড়ি চিকিৎসাও শুরু হয়ে গেল।হবে নাই বা কেন ? আভা তো এই হসপিটালেই নার্সিং ট্রেনিং করছে। তৃতীয় বর্ষ এখন।সাপ্তাহিক ছুটিতে বাড়িতে গিয়েছিল।তারমধ্যেই বাবা হঠাৎ অসুস্থ হন।কিছু টেস্ট এর পর জানা গেল ব্রেন স্ট্রোক।সারা রাত জেগে আভা বাবার দেখাশোনা করছে।বাইরের বেঞ্চে মা অপেক্ষা করছেন কালো রাত কেটে ভোর হবার।শেষ রাতে আভা বাবার পায়ের কাছে মাথা রাখল ক্লান্ত চোখে।যেভাবে ছোটা ছুটির মধ্যে কাটল এতক্ষণ।

এত কঠিন কঠোর শান্তনু বাবু এখন শয্যাশায়ী।মেয়েদের ছোট খাট ভুলেও খুব কড়া শাসন করতেন তিনি।নিজে যেটা ঠিক মনে করতেন তার ওপর কারো কথা চলত না।স্ত্রী আর মেয়েদুটির গায়েও হাত তুলতেন রাগের মুহুর্তে।পরে অবশ্য অনুতপ্ত ও হতেন।সারা পাড়া জানতে পারত ঐ বাড়িতে কিছু অশান্তির কারণ ঘটলে।

আভার যখন ক্লাস এইট তখন নূর অনুকে পড়াতে আসত।আভার নূরের সঙ্গে বেশ বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।কখনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ভাল খারাপ না বুঝেই মানুষ হাতড়ে বেড়ায় মনের কথা বলার মানুষ।হয়ত বাবার কড়া শাসনে আভার ও তাই হয়েছিল।নূরকে সব কথা বলতে বলতে আভা বন্ধুত্বের গন্ডি কখন যে অতিক্রম করে ফেলে বুঝতেও পারে না।নূর যে আলাদা ধর্মের তাও তখন স্মৃতিপথে ছিল না আভার।নিজের জীবনের প্রথম পুরুষ,প্রথম বন্ধুত্ব,প্রথম ভালবাসা,প্রথম আবেগ।অনুকে পড়ানোর মাঝে ওদের কথা চলতে থাকে নীরব চোখের ভাষায় ,শব্দ ও যেন তা ভাষাই প্রকাশ করতে অক্ষম।সুযোগ পেলেই সবার চোখের আড়ালে একে অপরকে ছোঁয়ার কোন সুযোগ ও বাদ যায় না।বাড়িতে সেভাবে কথা হয় না তাই নূর এর ডাকে সাড়া দিয়ে স্কুল মাঠের পিছনে একদিন দেখা করতে গেল আভা।ফর্সা রঙ আর গোলগাল চেহারায় উপচে পড়ছে প্রথম যৌবন। গোলাপি ফ্রকের থেকেও গন্ডদেশ যেন আরো বেশি লজ্জা রাঙা,খোলা চুল সামনে এসে অনেকটা ঘোমটার কাজ করছে।কথার মাঝে নূর আভার হাত দুটো দেওয়ালের সাথে ধরে গোলাপি অধর পিষ্ট করল নিজের নিকোটিনে পোড়া ঠোঁট দিয়ে।প্রথম ছোঁয়ায় বাহ্যিক জ্ঞানশূন্য হয়ে আবেগে কেঁপে উঠল আভা।ঘন উষ্ণ নিঃশ্বাসের ওঠা নামায় নূরের বুকে স্পর্শ করলো সদ্য প্রস্ফুটিত যত্নে লালিত দুটি কুঁড়ি।কিন্তু যার নজরে পড়ল বিষয়টা ,সে ওদের কিছু না বলে সোজা গিয়ে জানাল শান্তনু বাবুকে।তিনি নূরের পড়ানো বন্ধ করে ,আভাকে কিছু না বুঝিয়ে একটা কঞ্চি নিয়ে অপরাধের চিহ্ন এঁকে দিলেন ওর গোলাপি শরীরে।আরাধ্যা দেবী ও সেই ক্রোধের সামনে নিরূপায় হয়ে কাষ্ঠমূর্তির মত দাঁড়িয়ে রইলেন।

তার একসপ্তাহ পরে আভা নূরের বিয়ের খবর পেল অরূপের কাছে।স্কুল থেকে ফেরার পথে নূরদার মুখোমুখি হয়ে সত্যতা জানতে চাইল।নূর হোসেনের মুখে বিদ্রূপের হাসি খেলে গেল তখন।অবলীলায় বলল” হ্যাঁ বিয়ে তো ঠিকই ছিল।তোমার সাথে কবে বিয়ের কথা হয়েছে ? তাছাড়া তুমি হিন্দু আমি মুসলিম।তুমি আমার কাছে আসতে চেয়েছ।এমনিতেই কোন মেয়েকে আমি ফেরাইনি কখনো।মেয়েরা সাপ হলে আমি চন্দন গাছ বুঝলে।তাছাড়া এমন কি হয়েছে আমাদের মধ্যে ? সে সুযোগ তো আর ঘটল না।তবে তুমি চাইলে আমার বিয়ের পরেও সম্পর্ক রাখতে পারো।”এ সব শুনে আভার যেন পায়ের নীচের মাটি সরে যেতে লাগল।বাস্তবের কঠিন দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ভেঙে পড়তে লাগলো সংসারের স্বপ্নগুলো।কান্না চেপে ওড়নায় মুখ ঢেকে চিরতরে বিদায় নিল ও নূরের জীবন থেকে।তখন বাবার মুখটা ভেসে উঠল আভার চোখে।সব শাসনকে স্নেহ মনে হতে লাগল।অনেক পরিণত হয়ে গেছে যেন ও এই কয়েক মুহূর্তে।কিছুদিনের মধ্যে চোখের জলে ধুয়ে গেল সব দুর্বলতা।সামনে মাধ্যমিকের কথা ভেবে পড়াশোনায় মন দিল আভা।

পরীক্ষা হল যথা সময়।রেজাল্ট ও ভাল হল।তারপর নতুন স্কুল, নতুন পরিবেশ,নতুন বন্ধু বান্ধবী।ড্রেস হল শাড়ি,প্রথম প্রথম শাড়ি পরে সাইকেল সামলানো বেশ কঠিন নতুন শাড়ি পড়ুয়াদের কাছে।তবু কি আর করার শাড়ি ই ড্রেস।দ্রুততার সাথে দিন যেতে লাগল।ছোট থেকেই আভা কবিতা ,ক্যুইজ ,বিতর্কে অংশ নিতে ভাল বাসত।অনেক প্রাইজ ও ছিল সে সবের।স্যার ম্যাম দের ভালবাসা ছাড়াও কিছু পরিচিতিও ছিল আভার,ভাল পড়াশোনার সাথে সাথে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ এর জন্য।প্রিয় বান্ধবী ছিল অদিতি,সুপ্রিয়া,রেশমি।বন্ধু স্বপ্ননী‌ল আর গৌতম।একাদশ পেরিয়ে দ্বাদশ যেন নিমেষেই চলে এল ঘড়ির কাঁটার সাথে প্রতিযোগিতা করে।সামনে উচ্চ মাধ্যমিক , পড়াশোনা জোর কদমে চলল সবার।পরীক্ষা নির্বিঘ্নে শেষ ও হল।রেজাল্ট ও বেশ ভালই হল সবার।সব বন্ধু বান্ধবী আলাদা বিষয় নিয়ে আলাদা কলেজে চলে গেল।তার মধ্যে স্বপ্ননীল আর আভাই শুধু বাংলা অনার্স নিয়ে বিবেকানন্দ কলেজে ভর্তি হল।রেশমির বিয়ে হয়ে গেল।অদিতি , সুপ্রিয়া ইংরাজি আর গৌতম ইতিহাস অনার্স নিয়ে ভর্তি হল আলাদা আলাদা কলেজে।সবাই স্মার্ট ফোন কিনল,আর ফেসবুক,হোয়াটস অ্যাপ প্রোফাইল করলো বন্ধুত্বটা অটুট রাখতে।

কলেজের নবীন বরণে স্বপ্ননীলের একটা মেয়েকে খুব ভাল লাগল।কোঁকড়ানো চুল, ফর্সা রঙ,চোখে চশমা ,তাকে নীল শাড়িতে দেখে ঘুম উড়ল স্বপ্ননীলের।ও আভাকে বলল এটাও না ক‍রতে পারলে তুই আর কিসের বন্ধু ।অগত্যা আভা নিরুপায় হয়ে খোঁজ নিয়ে দেখল মেয়েটির নাম আঁখি।মাইক্রোবায়োলোজি ডিপার্টমেন্ট।আভা আঁখির সাথে আলাপ করলো।আলাপ বন্ধুত্ব এ পরিণতি পেল।বেশি সময় নষ্ট না করে আঁখির সাথে স্বপ্ননীল এর পরিচয় করিয়ে দিল।চোখ আর স্বপ্নের নিবিড় সম্পর্কের মত ওরাও প্রেমের নদীতে তরী ভাসালো।কিন্তু তা বেশিদিন স্থায়ি হল না।আঁখির বিয়ে হয়ে গেল তাড়াতাড়ি ওর বাবা অসুস্থ থাকার জন্য।তখন স্বপ্ননীল ছাত্র।প্রতিষ্ঠিত হতে অনেক দেরি।এই জন্য যে কত সমবয়স এর প্রেম টুকরো টুকরো হয়ে গেছে তা বুঝি কলেজ এর দেওয়াল গুলই জানে।তাই হয়ত তারা নির্বাক হয়ে গেছে।

আঁখি যাবার পর স্বপ্ননীল খুব ভেঙে পড়ল।আভা তাকে দিন রাত সান্ত্বনা দিতে লাগলো সাক্ষাৎএ ও ফোনে।সেই সময় দিঘা যাওয়া ঠিক হল কলেজ ট্যুর এ।খুব তাড়াতাড়ি যাওয়া ও হল।এক একটা রুমে তিন জন করে থাকার ব্যবস্থা।সাগরিকা নাম এর খুব সুন্দর হোটেল।জানালা থেকে সাগর দেখা যায় তাই হয়ত এমন নাম হোটেলটার।সবাই খুব মজা করতে লাগলো পৌঁছেই।যে যার রেডি হয়ে বেড়িয়ে পড়ল হুল্লোর করে।আভার অনেক অনুরোধে স্বপ্ন ও গেল সাগরপাড়ে ।আনমনে বালিতে লিখতে লাগল আঁখির নাম।কিন্তু লেখার সাথে সাথেই ঢেউ এসে ধুয়ে দিল সেই নাম।আর স্বপ্ন আবার কেঁদে চলেছে।কি করবে বুঝতে পারছে না আভা।কি বলে যে সান্ত্বনা দেবে,কিছুক্ষণ পর স্বপ্ন শান্ত হয়ে ক্ষমা চাইল।তার জন্য আভার বেড়ানোটাও মাটি হচ্ছে বলে।আভা কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু হাতঘড়ির দিকে নজর পড়ে বলল চল আরো দেরি হলে খাবার পাওয়া যাবে না।তখনি ওরা হোটেলে ফিরল অবসন্ন মনে।পরদিন আভার আর বেরনো হল না।স্বপ্ননীল এর মন খারাপ বলে।কিভাবেই বা যাবে স্বার্থপরের মত?সব বন্ধুদের মধ্যে ওরা দুজনেই মাত্র এক কলেজে পড়ছে।স্বপ্ননীল আভার রুমে এল আর কাঁদতে লাগলো আভাকে জড়িয়ে।যেন একমাত্র অবলম্বন পেয়েছে ও।এই মুহূর্তের জন্য ওরা তৈরি ছিল না।কিন্তু স্বপ্ননীল আভার মধ্যে মিশে যেতে চাইছে।আর আভা ও সম্মোহিতের মত নিজেকে মেলে দিচ্ছে স্বপ্ননীলের কাছে।এ কি হল আভার ? সান্ত্বনা দিতে গিয়ে নিজে এমন দুর্বল হয়ে যাবে ও ভাবেনি।কিন্তু সেদিন সব বাধার বাঁধ ভেঙেচুরে শরীরী আবরণের সুতো আলগা করে একে অপরকে প্লাবিত করল দেহ দুটি।সেই প্লাবনে সব ভেসে যাওয়াকে সামলে নিয়েছিল একটি ছোট্ট মুসুরডালের মত মেডিসিন।

বর্তমান সময়ে সরকারি চাকরির অবস্থা খুব খারাপ।তাই অনেকের পরামর্শে আভা নার্সিং এর ফর্ম ফিল আপ করে রাখল।কিন্তু স্বপ্ননীলের মধ্যে বিভোর হয়ে গেল।অভ্যাস এ পরিণত হল ওদের মেলামেশা।কখন যে নূর দার জন্য পাগলামি করেছে সেটা ভেবেই হাসি পেতে লাগল আভার।স্বপ্ননীলের সাথে স্বপ্নের মত ই দিন যাচ্ছে।কখনো পার্ক , কখনো সিনেমা হল বা কখনো স্বপ্ননীলের মেস।

“কি হয়েছে আভা ? কাঁদছিস কেন আমাকে তো বলবি ”
স্বপ্ননীলের হাতে চিঠিটা ধরিয়ে দিল আভা।স্বপ্ন ঊর্ধ্বস্বরে বলে উঠল congratulations আভা।কাঁদছিস কেন ? এ তো খুব ভালো খবর যে তুই নার্সিংটা পেয়েছিস।ট্রেনিং শেষ হলেই চাকরি রে পাগলি।
“আর তুই ? তোকে ছেড়ে কিভাবে থাকব বল স্বপ্ন।”
মানে ? কি বলছিস তুই ? আমরা ভালো বন্ধু ছাড়া কিছুই নই তো।মাঝখানে কোন প্রতিশ্রুতি তো ছিল না।দুজনের ই ভালো লেগেছে তাই ………..
থাক ! আমার ই ভুল হয়েছে স্বপ্ন।খুব বড় ভুল হয়েছে।আমি বুঝতে পারিনি যে ভালবাসা টা বলে বলে বোঝাতে হয়,প্রতিশ্রুতি থাকতে হয়,প্রমাণ রাখতে হয় ।ভালো থাকিস তুই।আমার সাথে আর যোগাযোগ করার দরকার নেই।এক সপ্তাহের মধ্যে যেতে হবে আমাকে।বলে দ্রুতগতিতে বেড়িয়ে পড়ল আভা।চোখের জলে ধুয়ে যাচ্ছে যাত্রাপালার মত মনের ক্যানভাসে ভেসে ওঠা সব ভালো মুহূর্তগুলো।

শান্তভাবে বাড়িতে ঢুকল আভা।যেন কিছুই হয়নি।মনের মধ্যে গড়ে ওঠা স্বপ্নগুলোর যে এইমাত্র সমাধি হয়েছে কেউ জানতেও পারল না।বাবা মাকে জানালো ওর নার্সিং এ চান্স পাবার কথা।ফর্ম ফিলাপ এর সময় জানায়নি, পাবে কিনা সিওর ছিল না বলে।এখন যা কম্পিটিশন বাড়ছে দিন দিন।শান্তনু বাবু শুনেই প্রচণ্ড রাগে জ্বলে উঠলেন ও জানিয়ে দিলেন যাওয়া হবে না।গেলে এ বাড়িতে আর জায়গা হবে না।মেয়েদের নাইট ডিউটি , রাত দুপুরে ডাক্তারদের সাথে নষ্টামী আর লোকের বাঁকা কথা তিনি কিছুতেই মেনে নেবেন না।
এই প্রথম আভা বাবার মুখের ওপর কথা বলল।শান্তভাবে জানিয়ে দিল সে যাবেই।কারণ এখন যা চাকরির অবস্থা আর পাওয়া যাবে কিনা কোন নিশ্চয়তা নেই।আর শুধুমাত্র গৃহবধূ হয়ে একটা পুরুষকে বিশ্বাস ও ভরসা করে বাকি জীবনটা কিছুতেই কাটাতে পারবে না সে।তাতে যদি এবাড়িতে আর জায়গা নাও হয় তো ঠিক আছে।তুমুল অশান্তি শুরু হল।হাঁড়ির ভাত হাঁড়িতে পড়ে রইল সেই বেলা।পরদিন সকালে সব উপেক্ষা করে আভা পা বাড়ালো নিজের স্বনির্ভরতার লক্ষ্যে।মা আর অনুর সম্মতি ছিল।বিশেষ দরকারের জন্য atm টা বাবাকে লুকিয়ে দিদির হাতে দিয়ে গেল অনু।

নতুন জায়গা , নতুন বান্ধবী,নতুন পড়াশোনার মধ্যে কেটে গেল একটা বছর।একাউন্টের টাকায় হাত না দিয়ে ট্রেনিংয়ের ঐ সামান্য টাকাতেই যা হোক করে চালিয়ে নিচ্ছিল আভা।বাবাকে লুকিয়ে মা ও অনু মাঝে মাঝে এসে কিছু দিয়ে যেত অবশ্য।সব বান্ধবী রা ফোনে রিচার্জ করতে যেত পাশের যে দোকানে সেই দোকানের মালিক ছিল অনিন্দ্য একসঙ্গে অনেককটা দোকান ওদের।বয়স আন্দাজ ২৬-২৭,বাংলায় এম.এ পাস।ফর্সা রঙ,গোলগাল চেহারা চোখে কালো ফ্রেমের চশমা।গার্লস হোস্টেলে সবাই বেশ আলোচনা করত তাকে নিয়ে ।আভা যদিও অতটা পাত্তা দেয়নি।এত ফেসবুকের বন্ধু,জুনিয়র ডাক্তার কখন যে কার সাথে ডেটে যায় অত মনে থাকেনা ওর।অনুভূতিরা তো কবেই মরে গেছে।

বেশ কয়েকদিন থেকে আভার হোয়াটস অ্যাপে নিয়ম করে একটা নাম্বার থেকে ম্যাসেজ আসতে থাকে।আভার ভালো মন্দের খবর জানতে চায় কেউ।কোন ডি.পি নেই , ফোন করতে গিয়ে দেখেছে ফোন ও বন্ধ থাকে।কখনো আভার কোন সালোয়ার এর রঙে ওকে বেশি ভালো লাগে তার বর্ণনা।তার মানে কেউ ওকে লক্ষ্য করে ,এটা ভেবে কখনো খুব ভয় হয়।আবার ভালো ও লাগে।মা-বাবার লুকোচুরি আর ভালো লাগে না।বাবার রাগে পরিবারটাই যেন হারিয়ে গেল আভার।যেন নিজের বলে কিছুই নেই।হোস্টেলে ছুটি পড়লে কারো সাথে ডেট বা নেশা করে পড়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই নেই।ঐ অপরিচিত নাম্বারে আভাও কখনো উত্তর দিত।তারপর কোন যদি ম্যাসেজ আসতে দেরি হত বারবার নেটওয়ার্ক চেক করত ও।মনের অজান্তে একটা অপেক্ষা থাকত নীরবে অনামী ম্যাসেজ এর জন্য।

শান্তনু বাবুকে সবাই বোঝালেন।তাছাড়া আভার জন্য এমনিতেই মন খারাপ হত প্রায়।তিনি তা গোপন করতেন আগের ব্যবহারের জন্য।যাই হোক আভা বাড়ির প্রথম সন্তান।পুজোর ছুটিতে অনু আর ওর মা আভাকে বাড়ি নিয়ে যেতে গেলেন।আভাও ছটফট করছিল এই দিনটার জন্য।বাড়িতে অপেক্ষা করছিলেন শান্তনু বাবু।গাড়ি এলেই বাইরে বেড়িয়ে মেয়েকে খুঁজছিলেন।একসময় আভাও পৌঁছে বাবাকে প্রণাম করল।শান্তনু বাবু মেয়েকে আশীর্বাদ করে কাছে টেনে নিলেন।আভার গাল বেয়ে নেমে গেল সব অভিমানের ধারা।খুব সুখ শান্তিতে কাটল কয়েকটা দিন।তারপর একদিন হঠাৎ অসুস্থ হলেন শান্তনু বাবু।সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি ডেকে বাবা-মাকে নিয়ে বর্ধমান রওনা দিল আভা।

শান্তনুবাবু জ্ঞান ফিরে পায়ের ওপর আভাকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখলেন,চোখের কোনটা চিকচিক করে উঠল।কেন যে মেয়েকে এতদিন দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন সেই জন্য নিজেকে অপরাধী মনে হতে লাগল।পা নড়ে উঠতেই আভা জেগে উঠে বলল ” এখন শরীর কেমন বাবা ?”
ঘাড় নেড়ে ভালো থাকার উত্তর এল।
আভা মাকে ফোনে ডেকে নিলেন।আর ভয়ের কোন কারণ নেই জেনে আরাধ্যাদেবী ও কিছুটা আশ্বস্ত হলেন।
আভা স্নানে যাবার আগে অনলাইন হল-আবার সেই নাম্বারের ম্যাসেজ
“বাবার শরীর এখন কেমন ?”
-ভালো লিখে আভা রুমে এসে ফোন চার্জে দিয়ে স্নানে গেল।সাওয়ার এর নীচে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল কে এমন ছায়ার মত অনুসরণ করতে পারে ? অনেক ভেবেও কিছু উদ্ধার হল না।এতদিন তো অনেক ছেলেই জীবনে এসেছে কিন্তু কারো মধ্যে এমন তো দেখেনি ও।নিজের স্বার্থের বাইরে যে এত খোঁজ রাখবে ওর।তারপর ভাবল যাই হোক পরে দেখা যাবে।স্নান সেরে ডাক্তারবাবুর সাথে কথা বলে জানতে পারল বাড়ি নিয়ে যাবার পর নিয়মিত ফিজিওথেরাপি করাতে হবে।মাকে আগেই পাঠিয়ে দিল ও অনুর কাছে,উনি যেতে না চাইলেও অনুর কথা ভেবে রাজি হলেন।৫ দিন পর নিজেই বাবাকে নিয়ে বাড়ি ফিরল আভা।সেই দিনটা থেকে ফিজিওথেরাপি ডাক্তারকে ফোন করে ঠিক করে মা ও বোনকে বাবার ওষুধ বুঝিয়ে দিয়ে আবার ট্রেনিং জয়েন করল আভা।

এতদিনে শান্তনুবাবু বুঝলেন বাড়ির একজন চিকিৎসার লাইনে গেলে কতটা সুবিধা হয়।আজ মেয়ের জন্য জীবন ফিরে পেলেন তিনি।একদিন প্রতিবেশীরা খারাপ কথা বলবে বলে কত বকাবকি না করেছেন মেয়েকে কিন্তু আজ তো মেয়ে ছাড়া কেউই পাশে নেই।মেয়ের সিদ্ধান্ত ও সাহসে আজ তিনি গর্বিত।

নাইবা হল জ্যোৎস্না ভেজা,আর সবার মতন করে।
ভাটার টানে শিশির ছোঁব কাঁপা হাতে খুব ভোরে।
বেলাশেষে শান্ত মনে আসবি যখন ধীর পায়ে।
শীতল বাতাস না লাগে তাই চাদর টেনে দিবি গায়ে।
তীব্র জ্বরে তিক্ত ওষুধ হারবে যখন পাঞ্জা লড়ে
দেহ ছেড়ে আত্মা দুটি পাড়ি দেবে মেঘের ঘরে।……..

আবার ম্যাসেজ সেই নাম্বার থেকে।কে ? কি বলতে চাইছে কে জানে ? ব্লক করতে গিয়েও কোন এক অজানা কারণে করা হয় না।

-কি বলতে চান ?
-ভালবাসি তোমায়
-অনেক ভেবে আভা লিখল

তুমি কি পারবে পুরুষ না হয়ে প্রেমিক হতে?
দেহের প্রতিবিম্ব পেরিয়ে আত্মার সীমান্তে পৌঁছতে?
ভাঙা মনের মেঘ সরিয়ে কোজাগরী আলো ঢালতে?
পারবে কি অশ্রু আঁকা আলপনাগুলি পড়তে?
অন্তর্দহনের ডানা ঝাপটানো বলাকাগুলিকে-,
পারবে কি তোমার হৃদয়াকাশে আশ্রয় দিতে?
পারবে না তো।তবে কেন মিছে বলো ভালবাসি ?

এই উত্তরে সেই নাম্বার থেকে প্রথমবার ফোন এল।
-হ্যাঁ পারব।বিকালে কি একবার হোস্টেলের বাইরে দেখা করতে পারি ?
-হ্যাঁ আমিও জানতে চাই কে আপনি ?
-তাহলে বিকাল ৫ টা
-ঠিক আছে।

হাতের কাছে রাখা নীল সালোয়ার টা পড়ে খুব সাধারণভাবে ৫ টার আগেই বেড়িয়ে পড়ল আভা।আর সেরকম ভরসা হয়না কারো প্রতি যে পরিপাটি করে যাবার কথা ভাববে।এমনিতেই এই বয়সে কম তো দেখল না ও।স্বার্থসিদ্ধির জন্য কত নিখুঁত অভিনেতা সব।
-আরে অনিন্দ্য দা যে দোকান ছেড়ে কোথায় চললে ?
-অনিন্দ্য আভার নাম্বারে ফোন করলে আভা সব বুঝতে পারল।
-আভা হেসে বলল হোস্টেলের সব মেয়েদের ক্রাশ অনিন্দ্য দা শেষে আমার মত মেয়ের প্রেমে পড়ল।
তবে আমার অতীত সম্পর্কে তোমার জানা দরকার।আমি খুব বাজে………..অনিন্দ্য আভার ঠোঁটে আঙুল ছুঁইয়ে বলল আমি জানতে চাইনা অতীত।তোমাকে জীবনসঙ্গীনী করতে চাই তোমার বর্তমানকে নিয়ে।
-” এ হবার নয় অনিন্দ্য দা । আমি , আ-আমি তোমার ভালবাসার অযোগ্য”
-আর কোন কথা না বলে আভা চলে গেল।

রাতে ফোন করল অনিন্দ্য।ফোন ধরে কান্না আর থামে না আভার।কিছুক্ষণ পর ধরা গলায় আভা বলে চলল সব অতীত।অনিন্দ্য কোন বাধা দিল না,ওর মনের মেঘ হালকা করতে ।
-একদিন তো সত্যিকার ভালবাসা দিয়ে ঘর বাঁধতে চেয়েছিলাম , তখন প্রতারিত হয়েছি।নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম কৃত্রিমতার ভিড়ে।এখন তোমাকে কিভাবে……….. ?আমার রহস্য উন্মোচিত হলে তুমিও তো ওদের মতোই চলে যাবে একদিন।তোমাকে অবিশ্বাস করতে না চাইলেও কিভাবে বিশ্বাস করি যে তুমি তাদের চেয়ে আলাদা ?

-তোমার বাড়িতে কনফারেন্স করো আভা,তোমার সন্দেহ নিরসন হবে।আমি এমনিতেই আমার বাড়িতে তোমার কথা জানিয়ে রেখেছি।

আভা বেশি সময় না নিয়ে মাকে কানেক্ট করল ফোনে।অনিন্দ্যর সাথে পরিচয় করিয়ে দিল মায়ের।
অনিন্দ্য জানালো ওনাদের আপত্তি না থাকলে সে আভাকে জীবনসঙ্গীনী করতে চায়।
আরাধ্যাদেবী সময় চাইলেন।আভার বাবার মতামত জেনে জানানোর কথা বললেন।

শান্তনুবাবু এখন একবারে আলাদা মানুষ।উনি অনিন্দ্যর বাবা – মার সাথে কথা বলতে চাইলেন।এও বললেন মেয়ে যার সাথে সুখী হবে তার মাঝে আমরা বাধা দেবার কেউ নই।তাতেই আমাদের সুখ।অনু তো বিয়েতে কেমন সাজবে,কোন কোন বন্ধু-বান্ধবীদের নিমন্ত্রন করবে সেই সব নিয়ে লিস্ট করতে শুরু করে দিল।

আভার ট্রেনিং এর শর্ত ছিল ট্রেনিং চলাকালীন বিয়ে করতে পারবে না কেউ।ততদিন দুই পরিবারের কথা হয়ে বিয়ে ঠিক হয়ে রইল,অনিন্দ্যর বাড়ি থেকে কেউ পণ চান না।অনির মা রিক্তা দেবী আভার মধ্যেই যেন নিজের মেয়েকে খুঁজে পেলেন।অনিন্দ্যর বোন অনুপমার অকালমৃত্যু না হলে সে আজ আভার মতোই হত নিশ্চয়।এদিকে ভবিষ্যতের স্বপ্ন সাজানো রাতজাগা দু জোড়া চোখ ভালবাসা ও অভিমানের মধ্য দিয়ে একে অপরের অন্তর আবিষ্কার করতে লাগল।অবশেষে ট্রেনিং শেষ হল।না এরপর আর কোন অঘটন ঘটেনি আভার জীবনে।যা হয় তা হয়ত ভালোর জন্য ই হয়।ইন্ট্রানের পর আভার চাকরি হল।চাকরির ঠিক এগারো মাস পর অনিন্দ্য ও আভার শুভ বিবাহ সম্পন্ন হল নির্বিঘ্নে।এগারো মাস দেরির কারণ ছিল আভা নিজের বিয়ের সব খরচ নিজে করতে চেয়েছিল।শান্তনুবাবু বুঝতেই পারলেন না মেয়ের বাবা হিসাবে কোন রকম চাপ ছাড়াই আভার বিয়েটা কিভাবে নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হল।আভাও লাল বেনারসীতে চন্দন সাজে ফুলের মাধুরী মেখে অতীত ভুলে অনির বাহুডোরে নতুন করে ভালবাসার সংজ্ঞা শিখল।

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 4   Average: 5/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।