শ্রাবণ - সোহাগ

শ্রাবণ – সোহাগ

শ্রাবণ – সোহাগ
সজল কুণ্ডু ‘Inspiration’

এবছর বর্ষাটা যেন একটু বেশি মাত্রায় হচ্ছে। স্কুল থেকে ফেরার পথে আপাদ-মস্তক ভিজেছে সোহাগ। আজ আর প্রণয় স্যারের কাছে টউশান যেতে ইচ্ছে নেই। কিন্তু উপায় নেই, একদিকে মা’র ধমকানি। আবার সামনেই হ্যাফ-ইয়্যারলি পরীক্ষা। অগত্যা…..! র‍্যেইন কোর্টটা গলিয়ে হ্যারিকেন নিভিয়ে হন্ হন্ করে পৌঁছায় স্যারের বাড়িতে।

একি…. কেউই তো আজ আসেনি। কে-ই বা আসবে, এই দুর্যোগের রাতে। ইতিমধ্যে হ্যরিকেনটা জ্বালিয়ে নিয়েছে। মা’কে কত্তবার করে বললাম, যাক্ এই সুযোগে ইকো-জিওর পেইন্ডিং নোটস্ গুলো নেওয়া যাবে। এসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতেই স্যার আসলেন। কি-রে, কাউকেই তো দেখছিনা। আজ আর নতুন কিছু শুরু করবনা, তুই এই দুর্যোগে রাত্রি না করে বাড়ি ফিরে যা।সোহাগ এই সুযোগটাই খুঁজছিল, আমতা আমতা করে বলে স্যার বাড়িতে না থাকার দরুন কিছু ইকো-জিও নোটস্ আমি পাইনি। যদি আজ ওগুলো লিখে নিই…. সে-তো ভাল, এই বলে স্যার নোটস গুলো দিয়ে দেয়।

স্যারের স্ত্রী গত হয়েছেন মাস পাঁচেক হল এক দূরারোগ্য ব্যাধির সংক্রমণে। থাকার মধ্যে একমাত্র মেয়ে শ্রাবণ, এবছর মাধ্যমিক দেবে। প্রনয় স্যার গ্রামের উচ্চ-মাধ্যমিক স্কুলের কমার্স টিচার। যেহেতু গ্রামের দিকে কমার্স টিচার তেমন পাওয়া যায়না তাই বিজনেস অর্গানাইজেসান এবং ইকো-জিওর টিউশন আর নোটসও দেন, সাথে সমাজ সেবাটাও ফ্রী।

একথা ওকথা বলতে বলতেই পাশের পাড়ার অমিয় দা হাজির, গৌতমের বোনকে নাকি সাপে কেটেছে। তিন মাইল দূরে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। এদিকে একা একরত্তি মেয়েটা, অন্যদিকে গৌতমের বোন। প্রণয় স্যার কেমন যেন হতভম্ব্ হয়ে পড়লেন। কিঞ্চিত হলেও তাঁর সমাজসেবায় যেন ছেদ্ পড়লো। পরক্ষনেই নিজেকে সামলে “চলো অমিয়, আমি না ফেরা অব্দি সোহাগ থাকবে। কেউ একজন ওর বাড়িতে খবর দাও।” এইবলে স্যার চলে যান শ্রাবণের ঘরে। ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়ে বলেন “সোহাগ থাকবে বাড়িতে, প্রয়োজন পড়লে ডেকে নিও। আমার ফিরতে দেরী হবে, তোমরা খেয়ে নিও।”

“বাবা….”

শ্রাবণ তার বাবাকে খুব ভালোভাবেই চেনে, কোনো ভাবেই তাঁকে টলানো যাবেনা। আর ও সেটা চায়ও না। কারণ সে জানে এই গ্রামের সুখে-দুঃখে তার বাবাই একমাত্র সম্বল। এদিকে সোহাগ বেচারা তো নিরুপায়। একদিকে অঝোর ধারায় বৃষ্টি, অন্যদিকে আলোটাও গেছে নিভে। মা-বাবা হয়তো চিন্তা করছে, আবার এদিকে দায়িত্ব ছেড়ে যেতেও পারছেনা।

গুটি গুটি পায়ে পৌঁছায় শ্রাবণের দরজায় “আমার আলোটা নিভে গেছে। জ্বেলে দেবে?” প্রথমে ঘাবড়ে গেলেও নিজকে সামলে নিয়ে আলো জ্বালায় শ্রাবণ। কিছুটা সাহস জুগিয়ে চোখ তুলে এইভেবে তাকায় যে বাবার ছাত্র, আবার ওর ভরসাতেই বাবা রেখেছেন। তাই ভয়ের কিছু নেই। কিন্তু একি দেখছে শ্রাবণ….তবে ও কি পাগল হয়ে গেছে? ও কি সত্যি  দেখছে? সোহাগ এখানে….? সোহাগ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেনা। ভেসে যায় প্রণয়ীর জীবন তরঙ্গে। প্রতিটা মূহুর্ত যেন ভেসে চলেছে দুজনে। সময়ও পরাজিত আজ ওদের মিলনে, এভাবে কখন যে রাত্রি এগারোটা পেরিয়ে গেছে তার হিসাব কেউই রাখেনি। রাখেই বা কেমন করে।

ছন্দপতন ঘটল স্যারের আগমনে। সোহাগ….. ছিঃ। ঘৃণার যোগ্যও তুমি না। তোমায় সন্তানের মতো দেখতাম। প্রণয় স্যার আর সহ্য না করতে পেরে চূড়ান্ত অপমান করে সোহাগকে তৎক্ষণাৎ বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বলেন এবং এও বলেন যে সে যেন আর টিউশন পড়তেও না আসে। সোহাগ মাথা নামিয়ে দরজার দিকে যেতে উদ্যত হতেই শ্রাবণের দুচোখে বেয়ে নেমে আসে শ্রাবণ-ধারা। আর থাকতে না পেরে সে ও দরজার দিকে পা বাড়ায়। এমতাবস্থায় প্রণয় স্যার হয়ে পড়েন কিংকর্তব্যবিমুখ, কিন্তু রাগের বশে কাউকেই বাধা দেননা। দুজনে আপদ-মস্তক ভিজে সোহাগদের বাড়ি পৌঁছায় তখন রাত্রি বারোটা বেজে পেরিয়ে গেছে।

ভুল ভাঙলো পরেরদিন সকালেই, যখন সোহাগের বাবা বিমলবাবু দুজনকে সঙ্গে নিয়ে প্রণয় স্যারের বাড়িতে হাজির হন তখন সবে আকাশ ফর্সা হয়েছে। বৃষ্টিও ধরেছে একটু।আসলে সোহাগের মামাতো বোন দৃজার বান্ধবী শ্রাবণ। বছর দুই আগে ওদের স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় বোনের অনুরোধ রাখতে যেতে হয়েছিল সোহাগকে। সেখানেই পরিচয়, এবং পরবর্তী সময়ে তা প্রণয়ে পরিবর্তিত হয়। পরে দু-একবার দেখাও হয়েছে দৃজার দৌলতে। এক বছর আগে শ্রাবণের মা-বাবা গত হয়েছেন এক পথ দূর্ঘটনায়। সোহাগ সেকথা দৃজার থেকে শুনেছে। কিন্তু শ্রাবণের কোনো খবর দিতে পারেনি। শ্রাবণের বাবা অরূপবাবু নিঃসন্তান প্রণয় স্যারের স্কুল জীবনের বন্ধু। বন্ধু দম্পতির অকাল মৃত্যুতে প্রণয় স্যার এড্যাপ্ট করে শ্রাবণকে নিয়ে আসেন এই গ্রামে।

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 11   Average: 5/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।