শ্রাবস্তীর কারুকার্য

শ্রাবস্তীর কারুকার্য

গল্পের নাম-শ্রাবস্তীর কারুকার্য

লেখক-ভিক্টর ব্যানার্জী

 

কাশী রাজ্যের রাজধানী বারানসীতে তখন চারিদিকে এক বিশৃঙ্খলাময় পরিস্হিতি। এমন সময় ব্রহ্মাদিত্য রাজকার্যের শাসনভার গ্রহন করলেন। কাশীর উত্তরদিকে শত্রুভাবাপন্ন কোশল রাজ্য বাঘের মতো ওত পেতে বসে আছে। একটু দুর্বলতা পেলেই তৎক্ষণাৎ আক্রমণ করতে প্রস্তুত। ঠিক এই সময় সন্তান প্রসব করল পাটরাণী বিম্ববতী।
রাজজ্যোতিষী দ্বারিকাকে ডেকে রাজা জিজ্ঞাসা করলেন—“এ সন্তানের কুষ্ঠি গণনা করে বলুন।”
দ্বারিকা বিলম্ব না করে ছোট্ট শিশুপুত্রটিকে নিরীক্ষণ করে বললেন—“এ সন্তান রাজপরিবারকে কলুষিত করবে। একে যত শীঘ্র সম্ভব ত্যাগ করুন মহারাজ।”
মহারাজ ব্রহ্মাদিত্য অমাত্যকে ডেকে বললেন—“বেশ তবে তাই হোক। কাল প্রভাতে এই সন্তানকে যেন গঙ্গার জলে বিসর্জন করে দেওয়া হয়।”
অমাত্য বললেন—“মহারাজের আদেশ শিরোধার্য। কালই এই সন্তানকে বিসর্জন করে দেবো মহারাজ।”

 




 

এই সংবাদ শুনে সেদিন পাটরাণী বিম্ববতী দুগ্ধপোষ্য শিশুপুত্রটিকে কোলে নিয়ে রাতের অন্ধকারে রাজপ্রাসাদ পরিত্যাগ করল।
বিপদসঙ্কুল পথে তিনি একা। কোলের শিশুটি তখন ঘুমন্ত অবস্থায়। সে অতি দ্রুতপদে গঙ্গার তীরে গেল। দেখলো নির্জন নদীর তীরে কেবল কয়েকটি ভেলা বাঁধা রয়েছে। এমন সময় শিশুটি ঘুম থেকে উঠে কাঁদতে শুরু করতেই বিম্ববতী তাকে থামানোর জন্য অন্তর্বাস খুলে স্তন্যপান করালো। শিশুর কান্না শুনে কতকগুলি শিয়াল তারস্বরে ডেকে উঠল। সে ভয় পেল না। তাঁর উদ্দেশ্য একটাই যেমন করেই হোক তার এই শিশুপুত্রটিকে রাজপ্রাসাদ থেকে অনেক দূরে নিয়ে চলে যেতে হবে। সে বিলম্ব না করে নিজের বস্ত্রের সাথে তার শিশুকে বুকের মধ্যে এমনভাবে বেঁধে নিল যেন স্তন্যপান করতে পারে। তারপর জলস্রোতে ভেলাটিকে ভাসিয়ে রাখার জন্য বিম্ববতী একটি বাঁশের কঞ্চি দিয়ে অনবরত দাঁড় বাইতে লাগল। একটা সময় ভেলাটি আপনা হতেই ভেসে চলল। প্রসব করার ফলে তার দেহের শক্তি ক্ষীণ হয়ে এসেছিল। ফলে ধীরে ধীরে সে ক্লান্ত হয়ে ভেলার মধ্যেই অচৈতন্য হয়ে গেল। এইভাবে দুদিন সে মূর্চ্ছিত অবস্থাতেই ভেসে চলল।

হঠাৎ পাখির কলতানে বিম্ববতীর জ্ঞান ফিরতে,সে যখন চোখ মেলে দেখল, তখন সূর্য মাথার ওপর। কানের মধ্যে নদীর কুলু কুলু শব্দ শুনতেই উঠে পড়ে দেখল তার শিশুপুত্রটি কোলের মধ্যে বাঁধা অবস্থাতেই রয়েছে। সে বুঝল কাশী রাজ্য পেরিয়ে সে বহুযোজন দূরে সে ভেসে এসেছে। যাক্ আর চিন্তা নেই,রাজপ্রহরীরা আর চাইলেও তাকে খুঁজে পাবে না—এই সব ভাবতে ভাবতে অনতিদূরে সুবজ দিগন্তরেখা তার চোখে পড়ল। বিম্ববতী ভেলায় রাখা কঞ্চিটা নিতে গিয়ে দেখল সেটা নেই। জলস্রোতে কখন যে সেটা ভেসে গেছে তা সে জানেও না। অগত্যা নিজের হাতখানাকেই দাঁড়ের মতো করে ব্যবহার করল। তাতে ভেলার দিক পরিবর্তন হল বটে,কিন্তু গতি বাড়ল না। সে তার মন্থর গতিতেই টুক টুক করে পাড়ের দিকে এগিয়ে গেল। পাড়ে আসতেই সে সঙ্গে সঙ্গে শিশুপুত্রটিকে নিয়ে ভেলা থেকে নেমে গেল।
বিম্ববতীর ভেলা গঙ্গা পেরিয়ে এসে পড়েছিল যেখানে পড়েছিল সেটা ছিল উত্তর কোশলের সীমানা। সে সময় উত্তর কোশলের রাজধানী ছিল শ্রাবস্তী। বিম্ববতী চড়া রৌদ্রে হেঁটে চলল নগরের দিকে। এমন সময় পথে এক বৌদ্ধ ভিক্ষুককে সে বলল—“নিকটস্থ কোনো পান্থশালার সন্ধান দিতে পারেন?”
তিনি বিম্ববতীর দিকে দৃষ্টিপাত করে বললেন—“তোমার পোষাকতো কর্দমাক্ত! কোথা থেকে এসেছে মা?”
—“সে অনেক বৃত্তান্ত, সব কথা এখন বলার শক্তি আমার নেই। আমি ভীষণ ক্লান্ত। আর পথ চলতে পারছি না।”
—“বেশ আমার সাথে চলো মা। তোমার বিশ্রামের প্রয়োজন।”
বৌদ্ধ ভিক্ষুক আর কোনো প্রশ্ন না করে তাকে নিয়ে গেলেন বৌদ্ধমঠে। সেখানে সন্ন্যাসীনীদের বললেন—“অতিথির আহারাদি এবং বিশ্রামের ব্যবস্থা করো।”

 

 

এই বলে তিনি মঠের উপাসনাগৃহে চলে গেলেন।
বৌদ্ধমঠটি ছিলো সেকালের সুপ্রসিদ্ধ স্থান। সমগ্র শ্রাবস্তী নগরের মধ্যবর্তী স্থানে এটি অবস্থিত। এখানে কেবলমাত্র পূজার্চনাই হত না,রাজ্যের সকল প্রজাদিগের সন্তান সন্ততিরা এখানে শিক্ষালাভ করতে আসত। সে সময় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের সমান অধিকার ছিল শ্রাবস্তীতে। দেশ দেশান্তর থেকে প্রচুর শিষ্যরা আসতেন বৌদ্ধধর্মের দীক্ষা নিতে।
সে যাইহোক,বিম্ববতীকে সন্ন্যাসীনীরা যত্নসহকারে মঠের বাসগৃহে নিয়ে গেল। তাদের মধ্যে একজন একটি উজ্জ্বল শ্বেতবস্ত্র এনে বলল—“আপনি স্নান সেরে এটি পরে নিন। ততক্ষণ শিশুটিকে আমার কাছে দিন।”

 




 

সে ওই সন্ন্যাসীনীর হাতে তার সন্তানকে দিয়ে বস্ত্রটি নিয়ে স্নানাগারে চলে গেল। সে তার শিশুটিকে একটি পাথরের সুসজ্জিত দোলনায় শুইয়ে দিল। সেদিন মঠের ভোজনকক্ষে বিম্ববতী সকলের সাথে আহার করল। আহার শেষে বিশ্রামকক্ষে যেতেই শিশুপুত্রটিকে কোলে নিয়ে ঢুকলেন সেই বৌদ্ধভিক্ষুক।
তিনি বিম্ববতীর কোলে তাকে দিয়ে বললেন—“আমার নাম কেশবনাথ,আমি এই বৌদ্ধমঠের আচার্য। এবার বলো মা,কি তোমার পরিচয়?”
সে বললে—“আমি কাশীরাজ ব্রহ্মাদিত্যের পাটরাণী বিম্ববতী। আর এই হল আমার সদ্যজাত শিশু।”
তিনি চমকে উঠলেন। বললেন—“কাশীরাজ্য থেকে তুমি এতদূরে এসেছো! কি হয়েছে আমায় সবিস্তারে বলো।”
বিম্ববতী সমস্ত কাহিনী বলতে আচার্য বললেন—“ওনার রাজজ্যোতিষী দ্বারিকা কি দেখে এত বড় কথা বললেন! তা আমি একটিবার দেখতে চাই।”
এই বলে শিশুটির ললাটখানি অনেকক্ষণ ধরে নিরীক্ষা করে দেখে চুপ করে রইলেন।
বিম্ববতী উদ্গ্রীব হয়ে বলল—“কি দেখলেন আচার্য্য?”
তিনি দৃঢ়স্বরে বললেন—“রাজজ্যোতিষীর গণনা ভুল মা! এ সন্তানের ললাটে বুধাদিত্য যোগ রয়েছে! এই রকম শুভযোগ সচরাচর লক্ষ্য করা যায় না। এ জ্ঞানত কারো ক্ষতি করতে পারে না।”
বিম্ববতী আশ্চর্য হয়ে বলল—“কি বলছেন কি আচার্য্যদেব!”
—“আমার গণনা ভুল হতে পারে না। এই সন্তান হবে শান্ত,নম্র,ধীর-স্থির। তবে হ্যাঁ—”
এই বলে কেশবনাথ কিয়ৎক্ষণ চুপ করে রইলেন।
—“বলুন আচার্য্য,চুপ করে রইলেন কেন? বলুন!”
তিনি কোমলস্বরে বললেন—“এর শান্ত দৃষ্টিতেই রয়েছে রহস্যের ইঙ্গিত! এর মন ব্যথায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠলে এর ঠোটে স্মিতহাসি ফুটে উঠবে। আর সেটাই হবে অমঙ্গল! তবে ভয়ের কিছু নেই,এর কোনো ক্ষতি হবে না।”
বিম্ববতী বলল—“আমার একটি অনুরোধ রাখুন—দয়া করে এই পুত্রের পরিচয়টুকু সকলের কাছে গোপন রাখুন।”
কেশবনাথ বললেন—“বেশ তাই থাকবে। তবে তোমার আপত্তি না থাকলে আমি এর নামকরণ করে দিতে পারি মা।”
সে বলল—“অবশ্যই।”
তিনি বললেন—“আমি এর নাম রাখলাম—শ্রীজাত।”

 

 

বিম্ববতী আর ফিরলো না। শ্রাবস্তীর বৌদ্ধমঠেই সে রয়ে গেল। ধীরে ধীরে শ্রীজাত বেড়ে উঠল। মঠেই তার শিক্ষার ব্যবস্থা হল। কিন্তু ছোটথেকেই পড়াশোনার চেয়ে তার আগ্রহ ছিল স্থাপত্য শিল্পের প্রতি। নিজে নিজেই আপনমনে মাটির বিভিন্ন মূর্তি তৈরী করত। কখনো আবার পাথর কেটে খোদাই করে,তাকে জীবন্ত প্রতিমূর্তির মতো রূপ দিত সে।
কোশলরাজ প্রসেনজিতের ভ্রাতুষ্পুত্রী জাহ্নবী সেইসময় প্রতিদিন এই বৌদ্ধমঠে আসত।
একদিন শ্রীজাত শ্বেত পাথরের একটি মাঝারি উচ্চতার মূর্তি তৈরী করছে,এমন সময় জাহ্নবী তার পাশে এসে বসল। সে তার দিকে না তাকিয়েই বলল—“রাজকুমারী এলে বুঝি?”
সে বলল—“কি আশ্চর্য! কি করে বুঝলে যে আমিই এসেছি।”
—“তুমি এলেই একটা মিষ্টি সুগন্ধ পাই। ঠিক যেন গন্ধরাজ ফুলের মতো।”
—“মোটেই না। আর হ্যাঁ,তুমি সবসময় রাজকুমারী বলে ডাকো কেন গো? আমার বুঝি নাম নেই!”
—“রাজকুমারীদের নাম ধরে ডাকতে নেই।”
—“কেন ডাকলে কি হয়?”
জাহ্নবী হেসে বলল—“শোনো শিল্পী,রাজকুমারী জাহ্নবীর আদেশ,আজ থেকে তুমি আমায় নাম ধরে ডাকবে।”
—“আদেশ না মানলে?”

 




 

—“শাস্তি পেতে হবে!”
শ্রীজাত এবার হো হো করে হেসে ফেলল। বলল—“তুমি দেবে শাস্তি তা হলেই হয়েছে।”
জাহ্নবী মুখখানা গোমড়া করে বলল—“কেন,আমি বুঝি শাস্তি দিতে পারি না?”
—“পারো নাই তো। যার এত কোমল হৃদয় সে দেবে শাস্তি!”
জাহ্নবী অসমাপ্ত মূর্তিটির দিকে চেয়ে বলল—“এটা কার মূর্তি হবে?”
—“আমার!”
—“নিজের মূর্তি নিজেই তৈরী করছো!”
—“হ্যাঁ করছি তোমায় উপহার দেবো বলে।”
—“খালি মিছে কথা। এই বলো না কার মূর্তি তৈরী করছ?”
—“হলেই দেখতে পাবে।”
জাহ্নবী বলে—“যাও বলতে হবে না।”
—“রাগ করলে বুঝি। সত্যি বলছি রাগলে তোমায় ভারি সুন্দরী দেখায়।”
এমন সময় আচার্য্য কেশবনাথ মঠের উপাসনাগৃহ থেকে বেরিয়ে আসতেই জাহ্নবী বলল—“আমি উঠি শ্রীজাত—আচার্য্য এ পথেই আসছেন।”
জাহ্নবী ধীরে ধীরে বিম্ববতীর গৃহের দিকে চলে গেল। শ্রীজাত মূর্তির কাজে মন দিল। এমন সময়
আচার্য্য এসে বললেন—“শ্রীজাত এখন থেকে তোমায় মূর্তি তৈরীর পাশাপাশি নগরের ভাস্করের দিকটাও হবে।”
—“যথা আজ্ঞা আচার্য্যদেব।”
—“কোশলরাজ আমায় জিজ্ঞাসা করছিলেন,কোনো গুনী শিল্পীর সন্ধান জানা আছে কিনা। আমি তোমার কথা তাঁকে বলেছি। তিনি তোমার শিল্পকলা দেখতে চেয়েছেন শ্রীজাত।”

 

 

কাশী রাজ্যের অবস্থা তখন ভালো নয়। একাধিকবার আক্রমণের ফলে শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। কাশীরাজ প্রৌঢ় ব্রহ্মাদিত্য একার হাতে রাজত্ব সামলাতে পারছেন না। এর ফলে সুযোগ বুঝে গন্ডক নদী পেরিয়ে কোশল রাজ্যের সৈন্যরা বারানসীতে প্রবেশ করে সমগ্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে।
রাজা ব্রহ্মাদিত্যের কোনো সুযোগ্য উত্তরসুরীও নেই, যে রাজকার্যের ভার নেবে। এমন সময় গুপ্তচর এসে জানালো—“মহারাজ কোশলরাজ্যে ভাস্কর্যের কাজ শুরু হতে চলেছে।”
মহারাজ অমাত্যের দিকে চেয়ে বললেন—“এই সংবাদের কি কোনো প্রয়োজন ছিল।”
অমাত্য গুপ্তচরকে ইশারায় চলে যেতে ইঙ্গিত করে বললেন—“মহারাজ এই সুযোগ। একবার কোশলরাজকে নগরের ভাস্কর্যের আরম্ভ করতে দিন।”
—“তাতে আমাদের লাভ কোথায়?”
—“লাভ আছে মহারাজ। ওদের রাজকোষের অধিকাংশই ব্যয় হবে এই ভাস্কর্যের কাজে। এই সময়টাকেই কাজে লাগিয়ে আমাদের সৈন্যদলকে বাড়িয়ে তুলতে হবে।”
—“তারপর?”
—“তারপর,সুযোগ বুঝে শ্রাবস্তীর ভাস্কর্যের কাজ শেষ হলেই গভীর রাতের অন্ধকারে সমস্ত নষ্ট করে দিতে হবে।”
—“ওদের সীমান্তবর্তী নিরাপত্তাকে লঙ্ঘন করা দুঃসাধ্য।”
—“কিছুই দুঃসাধ্য নয় মহারাজ। আপনি শুধু আমার ওপর ছেড়ে দিন।”

 




 

একদিকে যখন শ্রাবস্তী নগরীতে ভাস্কর্যের উদ্যোগ চলছে,অন্যদিকে কাশী তখন সৈন্যদল বৃদ্ধির জন্য রাজভান্ডার থেকে অর্থব্যয় করছে। সে সময় মল্লরাজ্যটি ছিল প্রজাতান্ত্রিক,মল্লরাজদের ব্যবসায়ীদের থেকে যুদ্ধের জন্য নৌ সামগ্রী ক্রয় করতে শুরু করল কাশী। এর সাথে অস্ত্র কারখানায় তৈরী হতে লাগল শ’য়ে শ’য়ে তরোয়াল,বল্লম,তীর-ধনুক,কুঠার আরো কত কি। এতে রাজকোষে টান পড়ল। তা হলেও ভেতরে ভেতরে যুদ্ধের প্রস্তুতি চলতে থাকল বারাণসীতে।
অমাত্য জানেন যে কোশলের নদী সীমানার প্রতিরক্ষাকে ছত্রভঙ্গ করা সহজ না। তাই একটা বুদ্ধি আঁটলেন। গুপ্তচরকে গোপনে ডেকে বললেন—“যেমন করেই কোশলরাজ্যের সমস্ত সংবাদ এনে দিতে হবে। প্রয়োজনে ছদ্মবেশে নগরের প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকো।”
সে বললে—“যথা আজ্ঞা।”
অমাত্য বললেন—“আর একটা কাজ চুপিসারে করতে হবে। সেটা হল নগরের ভাস্কর্য শেষ হলে তোমরা এক রাতের অন্ধকারে সেখানে লাক্ষা থেকে আরম্ভ করে যত দাহ্য পদার্থ আছে সব দিয়ে জ্বালিয়ে দেবে।”
—“এ বড় কঠিন কাজ মন্ত্রীমশাই।”
—“সেই জন্যই তো তোমাদের রাখা। এক সাথে জনা শ’য়েক লোক মিলে শ্রাবস্তীতে ছদ্মবেশে লুকিয়ে থাকবে। সুযোগ বুঝে এই দুঃসাধ্য কাজটা করতেই হবে।”
এই বলে একঝুলি স্বর্নমুদ্রা দিয়ে গুপ্তচরকে বিদায় দিলেন।

 

 

শ্রাবস্তীতে তখন ভাস্কর্যের কাজ শুরু হয়ে গেছে। এক সাথে প্রায় এক সহস্র শিল্পী আর তিন সহস্র
কারিগরকে নিয়ে শ্রীজাত নগরের বৌদ্ধ মন্দিরগাত্রগুলোতে পাথরের খোদাই কার্য আরম্ভ করে দিয়েছে। কোশলরাজ প্রসেনজিৎ তার কারুকার্য মুগ্ধ হয়ে দেখে গেছেন। ফলে সমস্ত শিল্পীদের পরিচালনার দায়ভার শ্রীজাতের হাতে অর্পণ করা হয়েছে।
সেদিন কাজের সময় হঠাৎ বৃষ্টি নেমে এল। বৃষ্টির ছাঁট গায়ে লাগতেই শ্রীজাত একটা মন্দিরের ভেতরে একা দাঁড়িয়ে রইল। কারিগররা তখন দুপুরের আহার করতে মঠের দিকে চলে গেছে। এমন সময় একটা কোমল হাত শ্রীজাত’র হাত ধরে মন্দিরের অলিন্দের আড়ালে টেনে নিয়ে গেল। তাকিয়ে দেখল জাহ্নবী।
শ্রীজাত বলল—“তুমি এখানে?”
জাহ্নবী ওর মুখের দিকে চেয়ে বলল—“আসতে নেই বুঝি?”
—“বলো কি জন্য ডাকলে?”
—“বুঝে নাও।”
—“সেই তুমি হেঁয়ালি শুরু করলে তো?”
—“আমি কোনো হেঁয়ালি করছি না শিল্পী। আজ তোমার স্বপ্ন সফল। তুমি বলেছিলে না,একদিন শ্রাবস্তীকে কারুকার্যে ভরিয়ে তুলবে। দেখো তাই হতে চলেছে।”
—“সে তো বুঝলাম,কিন্তু আমার এই স্বপ্ন সত্যি হলে তোমার কি?”
—“সে যদি তুমি বুঝতে! মূর্তি তৈরী করতে করতে নিজেই মূর্তিমান হয়ে গেছো।”
এই বলে মুখখানা সরিয়ে নিল জাহ্নবী। শ্রীজাত দেখল বৃষ্টির জলে স্নাত জাহ্নবীর শরীরের প্রতিটা খাঁজ যেন নিটোল হয়ে ফুটে উঠেছে। তার উর্ধ্বাঙ্গের উত্তরীয় দিয়ে স্তনদুটো আবৃত। জলের ছোঁয়া লেগে সেটা ভিজে গেছে। ফলে স্তনবৃন্তগুলো ফুটে উঠেছে। জাহ্নবীর কোমরের খাঁজদুটো যেন নিখুঁতভাবে নিতম্বে এসে মিশেছে। রূপ তার শরীর থেকে ঝরে পড়ছে। গলার কাছে ছোট্ট একটা তিল শ্রীজাতের চোখে পড়ল। সে তর্জনী দিয়ে সেটা স্পর্শ করতেই জাহ্নবীর শরীর কেঁপে উঠল।
শ্রীজাত বলল—“একেবারে রতিমূর্তির প্রতিচ্ছবি।”
জাহ্নবী শ্রীজাতের বুকের কাছে মাথা রাখল। তারপর বলল—“আজ বুঝি আমায় দেখার সময় হলো!”
—“সত্যিই জাহ্নবী,শিল্পকর্মের ফাঁকে তোমার দিকে কখনো দেখাই হয়নি।”
বলতে বলতে জাহ্নবী তার অধরোষ্ঠ শ্রীজাতের অধরে মিলিয়ে দিল। তার ঠোঁটের চুম্বনে জাহ্নবীর হাতের রোঁয়া প্রস্ফুটিত হয়ে উঠল। বৃষ্টির ঝোড়ো হাওয়ায় তার ঘাড়ের কাছে উন্মুক্ত কেশরাশিতে শ্রীজাত স্পর্শ করিতেই তার শরীরে শিহরণ বয়ে গেল। মুখ দিয়ে শুধু অস্ফুটে বেরিয়ে এল—“শ্রীজাআআআত।”

 

 

দিন যায়,মাস যায়,শ্রীজাতের পরিচালনায় সেজে ওঠে শ্রাবস্তী নগরীর পথের ধারের বিভিন্ন মন্দির, বৌদ্ধমঠ,বৌদ্ধস্তূপ। কোনোটায় দ্রাবিড় শৈলীর কারুকার্য,কোনোটায় আবার নগর শৈলীর নিপুনতা। কেবল নগরের মধ্যভাগের প্রস্তরমূর্তিটিকে নিজের মতো করে সৃষ্টি করছে সে। তাতে তার নিজস্ব কলাকুশলী ফুটে উঠছে। মূর্তিটির চারিপাশে বাঁশ পুঁতে সাদা আবরণ দিয়ে ঘিরে রেখে দিয়েছে। শ্রীজাতের নির্দেশে শ্রাবস্তীর কেউ সে দিকে যায় না। শ্রীজাত সকল কারিগরকে নির্দেশ দিয়েছে কারুকার্যগুলি ঢেকে রাখতে। মহারাজের নগরভ্রমনের দিন সমস্তকিছু উন্মোচিত হবে।
রাজকারিগর দেববর্মা সেদিন মন্দির প্রাঙ্গনে রাজকুমারী জাহ্নবীর সাথে শ্রীজাতকে দেখে নেয়। এমনিই শ্রীজাতের প্রতি তার আক্রোশ ছিল। নগর ভাস্কর্যের কাজের দ্বায়িত্ব তার হাতে না দিয়ে শ্রীজাতকে অর্পণ করায় সে অসন্তুষ্ট হয়েছিল। তার ওপর এই দৃশ্য দেখার পর সেই সংবাদ পৌঁছে দিল কোশলরাজ প্রসেনজিতের কানে। মহারাজ শ্রীজাতকে তার অন্দরমহলে ডেকে পাঠালেন। সে আসতেই তিনি রক্তচক্ষু হয়ে বললেন—“তোমার এত বড় দুঃসাহস তুমি আমার কন্যাসম জাহ্নবীর সাথে—ছিঃ ছিঃ ছিঃ তোমায় আমি কি ভেবেছিলাম!”
শ্রীজাত বরাবর সত্যি কথা সোজা করে বলতে শিখেছে। সে বলল—“মহারাজ আমরা পরস্পরকে ভালোবাসি।”
—“আমার সামনে দাঁড়িয়ে এ কথা বলতে তোমার লজ্জা হচ্ছে না। তাহলে তো দেববর্মা ঠিক সংবাদই এনেছে। তুমি কল্পনা করতে পারছো,তোমায় আমি কি শাস্তি দিতে পারি!”
শ্রীজাত তাঁর চোখে চোখ রেখে বলল—“মহারাজ,এই ভাস্কর্যের কার্য শেষ হয়ে গেলে যা শাস্তি দেবেন মাথা পেতে নেব।”

 




 

তিনি বললেন—“বেশ তোমার ইচ্ছাই রইল,এই শিল্পকলার কর্ম শেষ হলে তোমায় কারাগারে নিক্ষেপ করা হবে। প্রস্তুত থেকো। পলায়নের প্রচেষ্টা করো না। তাহলে আমার প্রহরীদের কাছে অনায়সে ধরা পড়ে যাবে। এখন যাও,আমার চোখের সামনে থেকে এক্ষুণি চলে যাও।”
শ্রীজাত’র মন ব্যথায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠল। তার ঠোঁটের কোণে একটা স্মিতহাসি ফুটে উঠল। মহারাজ সেটা লক্ষ্য করতেই অগ্নিশর্মা হয়ে উঠলেন,বললেন—“তোমার এই হাসি কারাগারের অন্ধকারে বিলীন করে দেব।”
শ্রীজাত উত্তর দিল না। ধীরপদে বেরিয়ে এল। এরপর নগরের মধ্যভাগে অবস্থিত অসমাপ্ত প্রস্তর মূর্তিটিকে ধীরে ধীরে খোদাই করতে শুরু করল।
অন্যদিকে জাহ্নবীর প্রাসাদের বাইরে বেরোনো বন্ধ করা হল। গৃহের বাইরে প্রহরী বসানো হল। জাহ্নবীর হৃদয়ে কেবল শ্রীজাতের মায়াভরা মুখমন্ডলখানি ভেসে উঠছে। দুচোখ বেয়ে অশ্রুধারা বইতে লাগল তার। শ্রীজাতের শোকে সে অসুস্থ হয়ে পড়ল। ফলে রাজবৈদ্যকে ডেকে আনা হল।
তিনি দেখে বললেন—“শোকে অত্যন্ত ক্ষীণ হয়ে গেছে।”
মহারাজ বললেন—“তাহলে উপায়!”
রাজবৈদ্য জানতে চাইলেন শোকের কারণ কি! তাঁকে সমস্ত বলতে তিনি বললেন—“শ্রীজাতের সাথে বিবাহে আপত্তি কোথায়?”
মহারাজ বললেন—“একটা সামান্য শিল্পীর সাথে রাজকুমারী জাহ্নবীর বিবাহ দিতে পারি না।”
তিনি বললেন—“এ ভুল করবেন না। শোকে মানসিক ভারসাম্য হারালে তখন কিছুই করার থাকবে না।”
মহারাজ কোনো উত্তর না দিয়ে রাজদরবারে চলে গেলেন।

 

 

নগর পরিভ্রমনের আর একদিন মাত্র বাকি। শিল্পী,কারিগিররা নিদ্রামগ্ন। গভীর রাত্রে মশাল জ্বেলে অসমাপ্ত মূর্তিটিকে কুঁদে কুঁদে তৈরী করছিল শ্রীজাত। কালই তাকে কারাগারের চির অন্ধকারে নিক্ষেপ করা হবে। মনে শুধু জাহ্নবীকে না দেখার ব্যথা পরিপূর্ণ হয়ে উঠছিল। মুখের মধ্যে তখন স্নিগ্ধহাসি,দেখা বোঝার উপায় নেই যে ব্যথায় সে মর্মাহত।
এমন সময় হঠাৎ একটা অদ্ভূত বিশ্রী গন্ধ তার নাকে এল। সঙ্গে সঙ্গে কাজ থামিয়ে সে বেরিয়ে এসে ঘ্রাণশক্তিতে বুঝতে পারল—নগরের বৌদ্ধমন্দিরের দেওয়াল থেকে এই গন্ধটা আসছে। সে ছুটে গিয়ে দেখল সারা মন্দিরগাত্রে জবজবে করে লাক্ষা ঢালা হয়েছে। হঠাৎ তার কানে এল কারা যেন ফিসফিস করে কিছু বলাবলি করছে।
সে স্পষ্ট শুনতে পেল একজন বলছে—“আর কিছুক্ষণের মধ্যেই মন্দির অার স্তূপগুলোয় অাগুন জ্বালিয়ে দিস।”
অন্যজন বলছে—“তাতো দিতেই হবে। ওদিকে কাল নৌকাগুলোও গন্ডকের তীরে এসে ভিড়বে। শ্রাবস্তী ধ্বংস হয়ে যাবে।”
তৎক্ষনাৎ শ্রীজাত দৌড়ে গেল রাজপ্রাসাদে। দ্বাররক্ষীকে বলল—“মহারাজের সাথে বিশেষ প্রয়োজন দ্বার খোলো।”
সে শ্রীজাতকে চেনে তাই বলল—“বেশ আপনি এখানে অপেক্ষা করুন,আমি মহারাজকে সংবাদ পাঠাচ্ছি।”

 




 

—“যা করার শীঘ্র করো। ভীষণ বিপদ।”
সে বিলম্ব না করে মহারাজের শয়নকক্ষে দৌড়ে গেল। কিছুক্ষণ পরে তিনি শ্রীজাতকে ডেকে পাঠালেন। সে দ্রুতপদে গিয়ে মহারাজকে সমস্তটা জানালো। শুনে তিনি বললেন—“তোমার কথা যদি মিথ্যা হয়,তাহলে তোমার জন্য গুরুদন্ড অপেক্ষা করছে।”
—“আমি তো কারাগারে বন্দী হয়েই যাবো। কিন্তু আপনি বিলম্ব করলে শ্রাবস্তী মুহূর্তের মধ্যে ঝলসে যাবে।”
মহারাজ সঙ্গে সঙ্গে সেনাপতি,অমাত্যদের ডেকে শ্রীজাতের সাথে বেরিয়ে পড়লেন।
অন্দরমহল থেকে সমস্তটা শুনতে পেল জাহ্নবী। সে একমনে হাতজোড় করে ইন্দ্রদেবকে ডাকতে লাগল।
মহারাজ এসে দেখলেন ততক্ষণে শ্রাবস্তীর একদিকে অগ্নিশিখা জ্বলছে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি আদেশ করলেন—“এক্ষুণি সরোবর থেকে জল নিয়ে অগ্নি নির্বাপনের ব্যবস্থা করো।”
অস্ত্রশালার পিছন থেকে বিশাল বিশাল পিপে নিয়ে হাজির হল প্রহরীরা। তাতে সরোবরের জল ভর্তি করে আগুন নেভানোর চেষ্টা করল। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হল না। আগুন তখন দাউদাউ করে ছড়িয়ে পড়ছে। শ্রীজাত দাঁড়িয়ে দেখছে,তার চোখের সামনে মন্দির গাত্রগুলোয় আগুন ধরে গেছে। শিল্পীদের সৃষ্টিকলা ঝলসে যাবার উপক্রম। তার চোখ থেকে দু ফোটা অশ্রু ঝরে পড়ল।
হঠাৎই আশ্চর্যভাবে টুপ টুপ করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করল। দেখতে দেখতে ধীরে ধীরে মুষুলধারে বজ্রবিদ্যুত সহ বৃষ্টি নেমে এল। সমগ্র শ্রাবস্তীর বুকে ঝরঝর করে ঝরে পড়ল বারিধারা। মহারাজ দেখলেন আগুনের শিখা সব নিভে যাচ্ছে। কোথাও আর আগুন নেই। সৈন্যরা মহানন্দে চিৎকার করে উঠল। শ্রীজাত একপাশে চুপটি করে বর্ষার জলে ভিজতে লাগল।

 

 

মহারাজ প্রসেনজিতের নির্দেশে কোশলের নদী তীরবর্তী সীমানায় সৈন্যদল মোতায়েন করা হল। গুপ্তচরের সংবাদ পেয়ে কাশী অমাত্যের আক্রমণের পরিকল্পনা গেল ভেস্তে।
এই ঘটনার ঠিক দু দিন পরে জাহ্নবীসহ সমগ্র রাজপরিবারের সকলকে সাথে নিয়ে নগরভ্রমন করতে বেরিয়ে পড়লেন কোশলরাজ। তিনি দেখলেন শুধুমাত্র কয়েকটা মন্দিরের কিছুটা অংশ অগ্নিদগ্ধ হয়েছে। বাকী সমস্ত অক্ষতই আছে। অপূর্ব শিল্পকলায় পরিমন্ডিত শ্রাবস্তীকে দেখে তার হৃদয় পরিপূর্ণ হয়ে উঠল। হঠাৎ নগরের মধ্যভাগে এসে একটি মূর্তির দিকে তাকিয়ে তারা প্রত্যেকে অবাক হয়ে গেল।
অসাধারণ শিল্পকলায় মন্ডিত এই মূর্তিটির দিকে বিস্ময়ে সকলে তাকিয়ে রইল। মূর্তির মধ্যে দিয়ে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে জাহ্নবীর প্রতিকৃতি। এমন সময় বৌদ্ধমঠ থেকে আচার্য্য কেশবনাথের সাথে এল বিম্ববতী। পুত্রের শিল্পপ্রতিভায় তার চোখে জল চলে এল।
মহারাজ বিম্ববতীর কাছে গিয়ে বললেন—“আপনার এই শিল্পী পুত্রের হাতে আমার ভ্রাতুষ্পুত্রী জাহ্নবীকে তুলে দিতে চাই।”
বিম্ববতী বলল—“এতো পরম সৌভাগ্য হবে আমার!”
জাহ্নবীর মুখ লজ্জা লজ্জা হাসিতে পরিপূর্ণ হয়ে উঠল। অদূরে দাঁড়িয়ে ছিল শ্রীজাত,মহারাজ তাকে হাত ধরে ডেকে এনে জাহ্নবীর হাতখানা তার হাতে তুলে দিয়ে বললেন—“আশীর্বাদ করি,চিরসুখী হও।”
দুজনেই মহারাজের পদযুগল স্পর্শ করে আশীর্বাদ নিল। এরপর বিম্ববতীর পায়ে হাত দিতেই তিনি তাদের বুকে জড়িয়ে ধরলেন। সকলের অগোচরে শ্রীজাতকে বললেন—“তোমার জন্ম সার্থক।”
আচার্য্য কেশবনাথের মুখে হাসি ফুটে উঠল।
শ্রাবস্তীর এই কারুকার্য ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরণীয় হয়ে রইল।

——————-

১৫ই বৈশাখ ১৪২৭
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ©ভিক্টর ব্যানার্জী

 




গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 0   Average: 0/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।