শ্রীমতি হে

শ্রীমতি হে

অভিষেক দেবরায়

 

 

[২২শে শ্রাবণ ১৩৪৮ । বেলা দ্বিপ্রহর । ১২-১০ । ঘুমের দেশে অস্ত গেল রবি । বাঙালির অহংকার, বাঙালির গৌরব, আমাদের সংস্কৃতির সবথেকে বড় ঐশ্বর্য – বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর । গুরুদেব । রাজর্ষি । স্বয়ং বাল্মীকি । আরও কত বিশেষণে আমরা তাঁকে শ্রদ্ধা জানাই । কিন্তু দিনের শেষে ঘুমের দেশে যাত্রা করার মুহূর্তে তিনি কি ছিলেন এক নিঃস্ব রিক্ত একাকী রবীন্দ্রনাথ ? তিনি কি বিলীন হতে চেয়েছিলেন এভাবেই তার অনন্ত জ্যোতিঃপুঞ্জের মাঝে যা আলো করে এতকাল অপেক্ষা করেছেন তাঁর নতুন বৌঠান – কাদম্বরী দেবী ? ধরে নেওয়া যাক সেই মুহূর্তে তিনি মনে মনে অনেক কথাই বলেছেন তাঁর নতুন বৌঠানকে, শেষবারের মত, কিংবা হয়তো মহামিলনের আগের স্বীকারোক্তি ? কে বলতে পারে, সেই একই সুতোয় গাঁথা হয়ে আছে পঁচিশে বৈশাখ আর বাইশে শ্রাবণ – থাকবে চিরকাল ?]

এই লেখার জন্যে আমি বিশেষ ভাবে কৃতজ্ঞ প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও সাংবাদিক শ্রী রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে, যিনি না থাকলে রবীন্দ্রনাথকে অন্য আলোয় কোনোদিন আবিষ্কার করতে পারতাম না ।

নতুন বৌঠান,

আমার খুব কষ্ট হচ্ছে । কষ্ট ? নাকি হাল্কা লাগছে আস্তে আস্তে ? জানি না । তবে বেশ বুঝতে পারছি আজ থেকে আশি বছর আগে যে যাত্রার সূচনা হয়েছিল তা এখন গোধূলিলগ্নে অবস্থিত । সন্ধ্যে হতে আর বেশি বাকি নেই । যবনিকা পতনের অপেক্ষায় স্টেজের মাঝে বসে আছি চুপচাপ । এই যাওয়াই কি যাওয়া ? কিছুই কি আর থাকবে না ? মানুষ কি ভুলে যাবে রবীন্দ্রনাথকে ? একেবারেই কি ফুরিয়ে যাবে সবকিছু আমার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই ?

আজ বড় ইচ্ছে করছে একটিবার তোমার হাতের ছোঁয়া পেতে । মনে আছে, কত রাতে আমি টের পেয়েছি তুমি আমার মাথার কাছে চুপটি করে এসে বসেছ – গায়ে চাদর টেনে দিয়ে গিয়েছ চুপিচুপি – তবু ধরা দাওনি । বারবার মনে হয়েছে তোমায় কেন আগের মত গান শোনাতে পারি না ? তুমি তো আছো, শুধু আড়াল পড়েছে – আর তাই কি সব অন্যরকম হয়ে যেতে হবে ?

 




 

 

আমার কাজের মাঝে মাঝে,
কান্নাধারার দোলা তুমি
থামতে দিলে না যে,
আমায় পরশ করে
প্রাণ শুধায় ভরে-
তুমি যাও যে সরে

বুঝি আমার ব্যথার আড়ালেতে
দাঁড়িয়ে থাকো-
ওগো দুখজাগানিয়া,
তোমায় গান শোনাব………..

এই দ্যাখো বৌঠান কেমন ছেলেমানুষ আমি । তুমি যে চিরকাল আমার গানের ওপারেই দাঁড়িয়ে ছিলে । তুমি তো ছিলে আমার সব সৃষ্টির অন্তরালে । আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে….তবু দেখতে পাইনি । কিন্তু উপলব্ধি করেছি চিরকাল, প্রতি মুহূর্তে । তুমি তো আমার অনুপ্রেরণা, আমার জীবনের ধ্রুবতারা ।

মনে পড়ে যাচ্ছে সেই দিনটার কথা যেদিন তুমি প্রথম আমাদের বাড়িতে এসেছিলে । সেটা ছিল আষাঢ় মাস । খুব সম্ভবত পঁচিশ তারিখ…..নাকি তেইশ ? সালটা…..১২৭৫…..তাই না ? আসলে আজকাল সবকিছু মনে থাকে না । শরীর ক্ষয় হচ্ছে যে । আর তো বেশিক্ষণ নয় ।

সময় হয়ে এল এবার স্টেজের বাঁধন খুলে দেবার

নেবে আসছে আঁধার যবনিকা…….

তবু মনে আছে সেই মুহূর্তটি । বর্ষার মেঘমল্লারের মতোই যেন ছিল তোমার আবির্ভাব । আমার তখন মোটে সাড়ে সাত, তোমার দশ । বাড়ির প্রত্যেকে তোমায় বরণ করে নিয়েছিল মহা আড়ম্বরে । তোমার সলজ্জ চোখগুলো ছিল ঈষৎ ভয়ে কাতর । কেন বৌঠান ? সে কি শুধুই অপরিচিত এক জগতে তোমার প্রবেশ ঘটল বলে ? নাকি তুমি বুঝতে পেরেছিলে সেই কাঁচা বয়সেই যে এই ঠাকুরবাড়িই হবে তোমার সব হারানোর বধ্যভূমি ?

যেদিন চলে গেলে অন্তরালে, কাউকে কিছু না বলে, তারপর বাবামশাইয়ের কড়া আদেশে তোমার অভিমানের সব দাগ মুছে ফেলা হল রাতারাতি । তার সাথে মুছে গেল অনেক না বলা কথা, অনেক মন খারাপ, অনেক হাহাকার । মেজদাদা চেষ্টা করেও পারেননি বাবামশাইয়ের সামনে কিছু বলতে, নতুন দাদা যেন নিজের মধ্যেই ছিলেন না । অবশ্য আমি জানি, বলে লাভ হত না । প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের মতোই আরও একটি নাম ঝরে পড়ল ঠাকুরবাড়ির ইতিহাস থেকে, টুপ করে । দুই ক্ষেত্রেই নায়ক একজন – মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর । নিয়তির কি নির্মম পরিহাস !

কীভাবে যে কেটেছে এক একটি মুহূর্ত, জানিনা । বুকের মধ্যে এক সুতীব্র হাহাকার । ঠাকুরবাড়ির এক একটি ইঁট যেন দীর্ঘশ্বাস ফেলছে, কিন্তু এক থমথমে রক্তচক্ষুর কাছে অসহায় । আমি হয়ে উঠেছিলুম নিজের কাছে এক অপরাধী, এক তীব্র অপরাধবোধ আমায় ক্ষতবিক্ষত করছিল প্রতিনিয়ত । নতুন দাদাও কি আমারই মত অনুতাপের আগুনে দগ্ধ হচ্ছিলেন ? জানি না । কিন্তু বিশ্বাস করো বৌঠান, আমি চাইনি বিবাহ করতে । কিছুতেই চাইনি । আমি তো জানতাম অন্য কাউকে এই হৃদয়ে স্থান দিতে পারব না । তুমি যে ছিলে স্বর্গভ্রষ্টা অপ্সরা, আর আমি তেমনই এক গন্ধর্ব । তাই তো আমাদের কেউ কোনোদিনও ছিল না, শুধু আমরা দুজন ছাড়া ।

যেতে যেতে পথে পূর্ণিমারাতে চাঁদ উঠেছিল গগনে
দেখা হয়েছিল তোমাতে আমাতে কি জানি কি মহা লগনে
চাঁদ উঠেছিল গগনে

এখন আমার বেলা নাহি আর, বহিব একাকী বিরহের ভার
এখন আমার বেলা নাহি আর, বহিব একাকী বিরহের ভার
বাঁধিনু যে রাখী পরানে তোমার সে রাখী খুলো না, খুলো না
ভুলো না, ভুলো না, ভুলো না
সেদিন দুজনে দুলেছিনু বনে, ফুলডোরে বাঁধা ঝুলনা…….

তবু পারলুম না । আমি জানতুম এক আকাশে একটাই সূর্য থাকে, কিন্তু তবু আমায় পরাজয় স্বীকার করতে হল । কারণ সেই এক – বাবামশাই । তাই তো বিপুল অভিমানে সব উপাচার উল্টে দিয়েছিলুম । বলেছিলুম আজ সব উল্টোপাল্টা হয়ে গেল তাই সব উল্টে দিলুম । আমার চোখ লাল হয়ে গিয়েছিল, তা কি তোমার চোখে ধরা পড়েনি ? নিশ্চয়ই পড়েছে । তুমি যে আমার জীবনের ধ্রুবতারা নতুন বৌঠান, আকাশে অন্য তারকার অনুপ্রবেশ তুমি পারবে না বুঝতে ? আকাশের অসহায়তা আর একাকীত্ব বুঝতে পেরেছিলে নতুন বৌঠান ?

 




 

 

নাম ছিল ভবতারিণী । কেমন নাম ও ? একেবারে সেকেলে রসকষহীন । কোনও কবিত্ব ছিল না তাতে । নাম দিয়েছিলুম মৃণালিনী । কিন্তু তাতেও কাব্যের ছোঁয়া লাগল না জীবনে । টানা আট বছর আঁতুড় ঘরে কাটিয়েছে সে । কিন্তু তবু আট প্রহরের জন্যেও তাঁকে ভালবেসে উঠতে পারিনি । আমি তাঁর স্বামীই রয়ে গেলুম, প্রেমিক হতে পারলুম না । এই নিয়ে তাঁর মনে খেদ ছিল জানি আমি, আর সেটাই তো স্বাভাবিক । কিন্তু আমি অভিনয় করতে পারতুম না । তাই যতবার তাঁকে দিয়েছি আঘাত সে আঘাত আমার বুকেই বেজেছে, তবু তাঁকে আজীবন আঘাত অবহেলা আর লাঞ্ছনা ছাড়া দিতে পারিনি কিছুই । নিশ্চয়ই সে তোমার কাছে গিয়ে আমার নামে ভুরি ভুরি অভিযোগ জানিয়েছে – তাই না বৌঠান ? নাকি – সে তোমায় কোনোদিন ক্ষমা করতে পারেনি ?……..কাকে – তোমায় ? না আমায় ?

মনে আছে ছাদের সেই আসর ? নতুন দাদা বেহালা বাজাতেন, আমি ধরতুম গান । আর তুমি ছিলে আমাদের মধ্যমণি ? বাজার সরকার শ্যাম গাঙ্গুলির মেয়েটি ছিল সবার কাছে হেলাফেলার পাত্রী – এমন এক পরিবারে যে পরিবার ছিল বেঙ্গল রেনেসাঁর সঙ্গে যুক্ত – কিন্তু আমার কাছে যে সেই মেয়েটি ছিল আমার কৃষ্ণকলি, আমার শ্যামা, আমার হেকেটি ঠাকরুন । সে এক একটি সন্ধ্যে ছিল । ফুলের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ত চারপাশে । বাতাস তার হাত বুলিয়ে যেত আমাদের শরীরে ।

বয়স তখন ছিল কাঁচা; হালকা দেহখানা

ছিল পাখির মতো, শুধু ছিল না তার ডানা।

উড়ত পাশের ছাদের থেকে পায়রাগুলোর ঝাঁক,

বারান্দাটার রেলিং-‘পরে ডাকত এসে কাক।

ফেরিওয়ালা হেঁকে যেত গলির ওপার থেকে,

তপসিমাছের ঝুড়ি নিত গামছা দিয়ে ঢেকে।

বেহালাটা হেলিয়ে কাঁধে ছাদের ‘পরে দাদা,

সন্ধ্যাতারার সুরে যেন সুর হত তাঁর সাধা।

জুটেছি বৌদিদির কাছে ইংরেজি পাঠ ছেড়ে,

মুখখানিতে-ঘের-দেওয়া তাঁর শাড়িটি লালপেড়ে………..

বৌঠান, সময় কম, কিন্তু বারবার গলার কাছটা ব্যথা করে উঠছে কেন বলতে পারো ? মনে পড়ে যাচ্ছে কত কথা । কত দুপুর তোমার কাছে সময় কাটানো । একসঙ্গে । দুজনে । কত গ্রীষ্মের একাকী দুপুর, কত বর্ষার সন্ধ্যে, কত বসন্তের রাত……..তুমি বারবার উস্কে দিতে আমায় বিহারীলাল চক্রবর্তীর সাথে এক অসম অদৃশ্য যুদ্ধক্ষেত্রে…….আজ বুঝি…..তুমি আসলে সেই তখন থেকেই আমার সম্ভাবনার মশালে আগুন জ্বেলেছিলে নিঃশব্দে । সেই আগুন আমার উত্তাল করেছে উত্তেজিত করেছে একইসঙ্গে পুড়িয়ে করেছে ছারখার । মনে আছে বৌঠান সেই দুপুরে, যখন সকলের লোকচক্ষুর অন্তরালে দোতলার ঘরে তোমায় করেছিলাম নিষিদ্ধ চুম্বন ? তোমার নিটোল স্তনে স্পর্শ করেছিলাম তারুণ্যের সূচনার উত্তেজনায় ? আবার…..সেই রাতে…..হঠাৎ উড়ে গেল জানালার পর্দা, দেখলুম তোমায় আর নতুন দাদাকে….যেন সাইকি আর কিউপিড……যেন বাৎস্যায়নের রতিশাস্ত্র……….জ্ঞান হারালুম । তুমি জানতেও পারলে না হৃদয়ে কত বড় আঘাত এসে হানল । চূর্ণ বিচূর্ণ হয়েছিল সেই রাতে । অথচ তোমার কোনও দোষ ছিল না তাতে । আর আমার…………….

সংসারে যত দিন পেরোচ্ছিল, ততই প্রাপ্তির ঝুলি শূন্য থেকে শুন্যতর হচ্ছিল তোমার । নতুন দাদার সেই সম্পর্কের কথা আমি যখন জানতে পারলুম…..না । কোনোদিনই কিছু বলার অভ্যাস নেই আমার । চিরকাল চুপ করে সব মেনে নিয়েছি । না মানতে পারলেও চুপ করে রয়েছি । ছিলাম সেদিনও । শুধু খুব কষ্ট হচ্ছিল তোমার কথা ভেবে । যে মানুষটি তোমায় করেছেন আধুনিকা, যে মানুষটি ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল আর বাইরের মহলের দেওয়াল ঘুচিয়ে দিয়েছিলেন, যিনি সকলের কটাক্ষ অগ্রাহ্য করে তোমায় নিয়ে বিকেলে বেড়াতে যেতেন ইডেন গার্ডেনসে……সেই মানুষটিও করলেন প্রবঞ্চনা ! আর ঠিক তখনই আমায় পাঠানো হল বিলেতে, তারপর বলপূর্বক বিবাহ । দেবেন্দ্রনাথের সন্তান, সত্যেন্দ্রনাথের অনুজ….এত ভারী ভারী নামের পাশে আমার ‘আমি’ ছিলাম অত্যন্ত গৌণ । তুমি একা হয়েছ বারবার । আর তাই শেষমেশ সব অভিমানকে বিদায় দিয়ে তুমি……হয়তো কিছু বলতে চেয়েছিলে আমায় । লিখেছিল কোনও চিঠি । না, সেসবও পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে সব । তুমি যেন রাতারাতি ‘নেই’ হয়ে গেলে ও বাড়িতে, কিন্তু আমার কাছে তুমি চিরকাল অমলিন ।

 





 

জীবনে এসেছে কত নারী । আনা, বিজয়া, রানু, হেমন্তবালা – আরও কত । প্রেমে পড়েছি …..আঁকড়ে ধরেছি…..সেঁকে নিয়েছি নিজেকে তাঁদের উত্তাপে………..কিন্তু তোমায় ছাড়া অন্য কাউকে ভালো আর বাসতে পারলাম কোথায় ? পারিনি । কোনোদিন পারিনি । তাই তো আমার সব সৃষ্টি সব রচনা সবকিছু শুধু তোমায় উদ্দেশ্য করেই । আমার সব কবিতায় সব গানে তুমি ছিলে অন্তরাল জুড়ে প্রচ্ছন্ন ছায়া আবৃত হয়ে । কখনো ‘স্ত্রীর পত্র’-র মৃণাল, কখনো ‘নষ্টনীড়’-এর চারুলতা, কখনো ‘ঘরে বাইরে’-র বিমলা….তুমি ছিলে সবটুকু জুড়ে । আমি কেবলই অমলের দলে, যারা ভূপতির অধিকার আর শক্তির কাছে পরাজিত হয়ে চলে যায়, হারিয়ে যায় ।

সেদিন সেই বেলজিয়ান কাচের আয়না ভাঙোনি তুমি বৌঠান, আসলে ভেঙেছিলে আমার আত্মাকে । ভেঙেছিলে আমার সব স্বপ্নকে, করেছিলে চুরমার । আমি যে ছিলুম কতখানি অসহায় কতখানি হৃত কতখানি বিক্ষত – বোঝোনি কি কোনোদিন ? অবশ্য আমিই বা কেন ছেলেমানুষের মত করছি ! ছেলেমানুষ – তোমার রবি আর কিছুক্ষণের মধ্যেই অস্ত যাবে, তবু সেই একরত্তি ছেলেমানুষই রয়ে গেলুম চিরকাল । তাই তো নিশুতি রাতে ছাদে পায়চারী করতে করতে মাথার ওপর তারায় ঢাকা আকাশ দেখতে দেখতে গেয়ে উঠেছিলুম –

সে যেতে যেতে চেয়ে গেল কী যেন গেয়ে গেল—

তাই আপন-মনে বসে আছি কুসুমবনেতে ।

সে ঢেউয়ের মতন ভেসে গেছে,

চাঁদের আলোর দেশে গেছে,

যেখান দিয়ে হেসে গেছে, হাসি তার রেখে গেছে রে………

চিকচিক করে উঠেছে চোখ, সবার অলক্ষ্যে গড়িয়ে পড়েছে জল, একটা সুতীব্র হাহাকার হৃদয়ের গুহাদেশে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরেছে…বারবার মনে হয়েছে কেন তুমি সব আড়াল ছিন্ন করে আমার সামনে এসে দাঁড়াচ্ছ না সেই আগের মত…কেন আমার ওপর অভিমান করে এভাবে চলে গেলে ! এত অভিমান তোমার নতুন বৌঠান ! আর তোমার রবির অভিমান, অসহায়তা, নিঃসঙ্গতা – এসব বুঝি কিছুই নয় তোমার কাছে ! যদি উপায় থাকত তাহলে সবকিছু পরিত্যাগ করে তোমার কাছে চলে যেতুম চিরকালের মতন……….বহুবছর আগে….রথী তখন সবে বিবাহ করেছে, নোবেল পেয়েছে তোমার সেই আদরের রবি….মনে হচ্ছিল সবকিছু অন্ধকার । এক মোহাবিষ্ট মহাশূন্যে হারিয়ে যাচ্ছিলাম । মনে হচ্ছিল তোমার মতোই খুঁজে নিই নিজের জগৎ, থাকুক পড়ে যেখানে যা আছে…..কিন্তু পারিনি । তুমি সাহসী ছিলে, আমি সংসারী না হয়েও ছিলাম সংসারী কাপুরুষ । তাই তুমি পেরেছ ছিন্ন করতে, আমি পারিনি । জিতে গিয়েছ তুমি, আমি আজীবন শুধু হেরেই গেলুম । বিয়োগের ঘরে অঙ্ক কষতে শুরু করেছিলুম সেই কবে । কেন তখন অমন মৃত্যুর নেশা, আত্মহননের নেশা আমায় পেয়ে বসেছিল ? সে কি শুধুই ওষুধের বিপরীত ক্রিয়া…নাকি আসলে তোমাতে বিলীন হওয়ার উন্মাদনা !

আমার চারপাশে এখন অনেক মানুষের সমাহার । সবাই শঙ্কিত, ব্যথিত । দেশের এই দুর্দিনে আমায় তাঁরা ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর । কিন্তু আমি যে ক্লান্ত । আমি বেশ বুঝতে পারছি সময় ফুরিয়েছে । চারপাশে যেন এক মেঘ । সেই মেঘ কাটলেই হয়তো ফুটবে আলো । হয়তো তোমার দেখা পাব । ইহজগতে ছিল আমাদের মাঝে অনেক প্রতিবন্ধকতা, ছিল অনেক প্রাচীর, ছিল এক সমুদ্দুর অভিমান আর কলঙ্ক……শান্তিপারাবারের ওপারে কিছু নেই জানি । তাই তো আজ তোমার রবি তোমাতে বিলীন হতে চায় । ছিন্ন করতে চায় সব বন্ধন ।

 




 

ফুলের বার নাইকো আর,
ফসল যার ফলল না—
চোখের জল ফেলতে হাসি পায়—
দিনের আলো যার ফুরালো, সাঁজের আলো জ্বলল না,
সেই বসেছে ঘাটের কিনারায়………

ছেলেবেলাকে ফিরে পেলে নোবেল পুরস্কার থেকে শুরু করে যাবতীয় যশ হেলায় ছুঁড়ে দিতে চেয়েছিলুম একদিন । সেই ছেলেবেলা যার সূচনা হয়েছিল সেকালের কলকাতায় । যখন সারি বাঁধা গ্যাসবাতি রাতের রাস্তা আলো করে দাঁড়াত, পাল্কিতে করে বাবুরা আপিসে যেত ধীরে সুস্থে পান চিবোতে চিবোতে, ফেরিওয়ালা হরেক জিনিসের পসরা সাজিয়ে আনত, পাহারাওয়ালা রাতে হেঁকে যেত….গোলাপি রেউড়ি চিটচিটে করে ভিজিয়ে দিত জামার পকেট…….যখন ছাদের ওপর দুটি ফুলের টবের মাঝের অন্ধকারে খুঁজে বেড়াতুম রাজার বাড়ি……সেই তারুণ্যে ভরা দিনগুলি যার সবটুকু জুড়ে ছিলে তুমি………….আজ এই ভারাক্রান্ত জীবনের বিনিময়ে খুঁজে পেতে চাই তোমায় নতুন বৌঠান…..তুমি আমার সকল রসের ধারা, আমার জীবনের ধ্রুবতারা, যার ছবির সামনে বসে বারবার উপলব্ধি করেছি ‘নও ছবি নও ছবি নও শুধু ছবি’…..তুমি আমার জীবনের চালিকাশক্তি, আমার অনুপ্রেরণা, আমার ভালোবাসা, আমার আশ্রয়……শ্রীমতি হে……………………………

ব্যক্ত হোক জীবনের জয়,
ব্যক্ত হোক তোমামাঝে অসীমের চিরবিস্ময় ।
উদয়দিগন্তে শঙ্খ বাজে, মোর চিত্তমাঝে
চিরনূতনেরে দিল ডাক
পঁচিশে বৈশাখ………..

বাইশে শ্রাবণ লেখা থাক ইতিহাসে, মিশে যাক আর এক পঁচিশে বৈশাখে । মৃত্যুর জানালার মধ্য দিয়ে না দেখলে জীবনের আসল স্বরূপ বোঝা যায় না । বাবামশাই, মৃণালিনী, বেলা, রেণু, শমি…..কত মৃত্যু যে পরপর জীবনকে বিদ্ধ করেছে, ততই পেয়েছি জীবনের আসল প্রকাশের পরিচয় । কিন্তু তোমার চলে যাওয়া মেনে নিতে পারিনি কোনোদিন । কেন এমন হয় বলো তো ? মায়ের মৃত্যুতেও তো এমনভাবে কেঁপে ওঠেনি বুক – সেই তো ছিল প্রথম মৃত্যু…..তবে জীবনে হয়তো…..মৃত্যু আসে বহুবার, মৃত্যুশোক একবারই আসে । তাই না ?

মেঘ ধীরে ধীরে কাটছে । হয়তো তারপরই চারপাশ আলো করে ফুটবে নতুন সূর্য । তার অন্তরাল থেকেই হয়তো ধরা দেবে তুমি – আবার সেই আগের মত – একগাল হাসি নিয়ে….আর সব অভিমান কেটে যাবে একেবারে……………..চিরকালের মত………….

এ ভরা বাদর মাহ ভাদর
শূন্য মন্দির মোর…….

মিলব দোঁহে দোঁহের সনে । আর কি মন্দির শূন্য থাকতে পারে বৌঠান ? জীবনের নাট্যাঙ্কের সমাপ্তিতে তোমার রবিকে বুকে টেনে নেবে তো নতুন বৌঠান ? ফিরিয়ে দেবে না তো ?

তোমার রবি ।।

 




গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total:    Average: /5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।