সমুদ্রের প্রতিদান

গল্পের নামসমুদ্রের প্রতিদান

লেখক—ভিক্টর ব্যানার্জী

 

 

মুদ্রের তীরে বসে ঢেউ গুনতে গুনতে মেঘা বলল—“জানো সৃজন সমুদ্রদেবতাকে তুমি যাই অর্পণ করো না কেন,তিনি নেবেন না। এতই উদার সব ফেরত দিয়ে দেবেন।”
সৃজন এক ঝলক মেঘার দিকে তাকিয়ে বলল—“রবীন্দ্রনাথের দেবতার গ্রাস পড়েছো?”
—“না।”
সৃজন তাচ্ছিল্য করে বলল—“যদি পড়তে তবে জানতে সমুদ্র কত উদার!”
—“কেন?”
—“মানত করার ব্যাপারটা জানো মেঘা? তোমার এই সমুদ্রদেবকে মানত করে,যদি তা দেওয়া না হয়,তিনি প্রচণ্ড রুষ্ঠ হন। তখন সেই তাণ্ডবলীলা দেখলে সমুদ্রকে আর উদার বলে মনে হবে না তোমার।”
মেঘা একমনে কথাগুলো শুনছিল। তারপর সৃজনের কুনইয়ে নিজের হাতখানা গলিয়ে ওর কাঁধে মাথা রেখে বলল—“বাদ দাও। আমাদের এত সুন্দর মুহূর্তটায় নাই বা শুনলাম এসব তাণ্ডবের কথা।”
সৃজন হাতঘড়িটা দেখে বলল—“চলো উঠি হোটেলে ফিরতে হবে।”
—“একটুখানি প্লিজ। আর তো এখন আসা হবে না বলো।”
সে মেঘার দিকে চেয়ে গেয়ে উঠল

 




 

—“এই বালুকাবেলায় আমি লিখেছিনু,
একটি সে নাম আমি লিখেছিনু,
আজ সাগরের ঢেউ দিয়ে তারে যেন মুছিয়া দিলাম।”

সমুদ্র মেঘার ভীষণ প্রিয়,ছোটবেলায় বাবা মায়ের সাথে ঘুরতে এসে সে একা একা পাড়ে বসে বালি নিয়ে কত আঁকিবুঁকি কেটেছে। বেশীরভাগ সময় সে নিজের নামটাই আঙুল দিয়ে লিখত। আর সমুদ্রের ছোট্ট ছোট্ট ঢেউ এসে সে গুলো মিলিয়ে দিয়ে যেত। এই খেলায় শুধু সে আর সমুদ্র। একদিকে ছোট্ট মেঘা অন্যদিকে অদৃশ্য দিগন্তের রাজাধিরাজ সমুদ্রদেব।
আজ সৃজনের কাঁধে মাথা রেখে ছোটবেলার সেই খেলাটা মনে পড়ে গেল তার।
কিছুক্ষণ পর মেঘা বলল—“চলো,হোটলে যাই।”
ওর হাত ধরে সী বিচের ধার দিয়ে হেঁটে চলল সৃজন। আজ থেকে পাঁচ বছর আগে মধুরিমার হাত ধরে এই একই পথে সে হেঁটে গেছে। তখন প্রেম ছিল না,ছিল শুধু অপমানের জ্বালা!ডিভোর্স পেপারে সই করে সমস্ত সম্পর্কের সুতো ছিঁড়ে চলে গেছে মধুরিমা। সৃজন সামান্য একজন গ্রাফিক্স ডিজাইনার। সর্বসাকুল্যে পনেরো হাজার টাকা মাইনে। মধুরিমার সখ আবদার মেটাতে গিয়ে সে হিমসিম খেয়ে যেত। তার ওপর রোজের ভর্ৎসনা। একবার তো রাগের মাথায় সৃজনকে কষিয়ে থাপ্পড় পর্যন্ত মেরেছিল। সৃজন মুখ বুজে সহ্য করেছে। কিচ্ছু বলেনি। শেষে সম্পর্কের জাল ছিন্ন করে মধুরিমা চলেই গেল বড়োলোক বাবার আশ্রয়ে। সৃজন অসহায় হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। মাসখানেক বাদে ডিভোর্স পেপার পাঠায়। সই করতে বাধ্য হয় সৃজন।
যখন শুনেছে, মধুরিমা আবার বিয়ে করেছে, তখন ভীষণ কষ্ট পেয়েছিল সে। তারপরই মেঘা তার জীবনে আসে। মধুরিমার বিপরীতে মেরুতে দাঁড়ানো একটা মেয়ে। শান্তস্বভাব,ঘন কালো চোখে অতলস্পর্শী দৃষ্টি। মেঘাকে না দেখলে সৃজন হয়তো জানতেই পারতো না দাম্পত্যসুখ কি !
হোটেলে ফিরে মেঘা বলল—“বাইরে থেকে কিছু খেয়ে নেব,কি বলো? এই হোটেলের খাবার ভীষণ কস্টলি।”
সৃজন বলল—“তাই ভালো। এখনই যাবে?”
—“খিদে পেয়েছে বুঝি?”
—“হুম সে তো একটু পেয়েইছে। তবে এ খিদে,সে খিদে নয়।”
—“তবে?”
সৃজন মেঘার হাতখানা ধরে কাছে টেনে নেয়। তারপর ওর চুলগুলো আলতো করে দুপাশে সরিয়ে দিয়ে বলে—“তোমার চোখে আমি নিজেকে দেখতে পাই মেঘা।”

 




 

মেঘার মুখের মধ্যে একটা অন্যরকম মিষ্টতা আছে। গায়ের রং যদি একটু ফর্সা হত তবে খানিকটা সাদাকালো ছবির সন্ধ্যা রায়ের মতো দেখতে লাগত তাকে। মেঘাকে দেখলে মনের সমস্ত কষ্ট জুড়িয়ে যায় সৃজনের।
মেঘা লজ্জা লজ্জা মুখে বলে—“এই,এখন দুষ্টুমি না।”
সৃজন হাতটা ছেড়ে দিয়ে বলে—“বেশ,তবে কালই ফিরে যাব।”
—“ওমা,আমি বুঝি তাই বলেছি।”
—“আমরা এখানে কি করতে এসেছি?”
মেঘা এবার একটু দুষ্টুমি করে বলে—“বেড়াতে। আবার কি করতে!”
—“তাই বুঝি? তবে ঠিক আছে,কাল থেকে তুমি একা একা বেড়াবে।”
—“এই রাগ করলে?”
—“না।”
—“বলোনা,বলোনা রাগ করলে?”
তারপর সৃজনের সুতীক্ষ্ণ নাকের ডগাটা আলতো করে ছুঁয়ে দিয়ে বলে—“গোঁসা দেখো,একেবারে বাচ্ছাছেলের মতো!”
সৃজন ফিসফিস করে বলে—“আমায় তোমার সবটুকু আজ উজাড় করে দাও মেঘা।”
মেঘা সৃজনের বুকে লাল নেলপালিশ পরা নখের আঁচড় কেটে বলে—“শুধু আমিই দেবো বুঝি? আর তুমি?”
সৃজন আলতো করে মেঘার ঘাড়ের কাছে মুখখানা নিয়ে গিয়ে ঠোঁটের উষ্ণছোঁয়া দিতেই মেঘা সিউরে উঠে জাপটে ধরে সৃজনকে।
তার বুকের স্পন্দনে মেঘার সারা দেহ রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠে। সৃজন আস্তে আস্তে মেঘার চিবুকটা তুলে ধরে বলে—“তুমি আমার সকালবেলার ফুল।”
মেঘার সীমন্তে সিঁদুর জ্বলজ্বল করছে। যেন নতুন বিয়ে করা বউ। লাজুক চোখদুটোয় তার কত না বলা কথা লুকিয়ে রয়েছে। সে আস্তে আস্তে মেঘাকে পাঁজাকোলা করে দু হাতে কোলে তুলে নিল।
মেঘা বলে—“এই সৃজন দুষ্টুমি করে না,পরে যাবো তো।”
সে হেসে বলে—“তোমার ভার নিতে পারব না!এত দুর্বল আমায় ভেবো না মেঘা।”
এই বলে তার কপালে আলতো করে চুমু দিয়ে কানে কানে বলে—“আজ শুধু তুমি আর আমি।”
তারা যে হোটেলে আছে সেখান থেকে খাবারের দোকান বেশী দূরে নয়। মেঘা স্নান সেরে সৃজনের হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে সেদিকেই গেল। হঠাৎ যেতে যেতে সৃজন দূর থেকে দেখতে পেল ঠিক মধুরিমার মতোই একজন তাদের দিকে আসছে। কাছে আসতে দেখল, মধুরিমার মতো নয়,মধুরিমাই !
সৃজন মেঘাকে বলল—“চলো মেঘা অন্য দোকানে যাই।”

 




 

সে ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারল না। বলল—“কেন! খাবারের হোটেলগুলোতো সব ওই দিকে!”
এমন সময় মধুরিমা সৃজনের সামনে এসে দাঁড়ালো। তারপর হাততালি দিয়ে বলল—“বাঃ,ফ্যান্টাস্টিক। সুন্দরী মেয়ে দেখে বিয়ে করে নিয়েছো।”
মেঘা বলল—“মুখ সামলে কথা বলুন।”
মধুরিমা অবজ্ঞার সুরে বলল—“হে ইউ। এই রাবিশ ক্যাটাগরির ছেলেটাকে বিয়ে করে তুমি কিচ্ছু পাবে না। মিলিয়ে নিও।”
সৃজন বলল—“চলো মেঘা ওর সাথে মুখ না লাগানোই ভালো।”
মেঘা একটু দৃঢ়স্বরে বলল—“দাঁড়াও সৃজন।”
তারপর মধুরিমার দিকে চেয়ে সে বলল—“আগের জন্মে বোধ করি আপনার কোনো উপকারে লেগেছিলাম। তাই এ জন্মে ঈশ্বর হিসেবটা মিলিয়ে দিলেন!”
মেঘার কথা মুধুরিমা বোধগম্য হল না।
সে বলল—“মানে?”
মেঘা হেসে বলল—“আপনি সৃজনকে শুধু যন্ত্রনাই উপহার দিয়েছেন,ভালোবাসেননি। ওকে ছেড়ে দিলেন বলেই হয়তো আমি ওর মতো একজন স্বামী পেলাম।”
মধুরিমা কটমট করে চেয়ে বলল—“দ্যাখো কতদিন টেকে?”
মেঘার ঠোটের কোণে মৃদু হাসি। সে বলল—“এই জন্যই ও আপনার পাশে বেমানান।”
সৃজন চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। মধুরিমা ওর দিকে চেয়ে বলল—“ইউ স্কাউন্ড্রেল! তোমার সামনে একটা দু দিনের মেয়ে আমায় এ ভাবে অপমান করল।”
মধুরিমার এ হেন অশ্লীল আচরণে মেঘা বিন্দুমাত্র বিচলিত হল না।
সে বলল—“এই সব নোংরা অকথ্য গালাগাল আপনার মুখেই মানায়! ও সব আমাদের ভদ্র সমাজের মানুষজন গায়ে মাখে না।”
মধুরিমা রাগে দাঁত কড়মড় করে বলল—“এতবড় অপমান!”
মেঘা এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে বলল—“চলো সৃজন।”
তারপর দুজনে মধুরিমাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল।
খাওয়া দাওয়ার পর সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে সৃজন মেঘাকে বলল—“জানো মেঘা বছর পাঁচেক আগে এই সমুদ্রের তীরে মধু আমায় বলেছিল—আমার মতো ছেলে নাকি দাম দিয়ে কেনা যায়।”
মেঘা ওর দিকে তাকিয়ে বলল—“বলেছিলাম না, সমুদ্রদেব সব ফিরিয়ে দেয়। দ্যাখো সেদিনের তোমার সেই অপমানটা আজ ওকে আমার মাধ্যমে ফিরিয়ে দিল।”

—————–

১৪ই বৈশাখ ১৪২৭
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ©ভিক্টর ব্যানার্জী




গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total:    Average: /5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।