সাপ লুডো

সাপ লুডো

অভিষেক দেবরায়

 

চিঠি হাতে ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ল বিপ্লব । হাত কাঁপছে । চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে । কষ্টের ? না লজ্জার ? হেরে যাওয়ার ? না হারিয়ে যাওয়ার ?
স্কুল থেকে বাড়ি ফিরতেই শোবার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে থমকে গেল বছর আটেকের বাচ্চাটি । খাটের ওপর শুয়ে আছে জয়ন্ত । এই অসময়ে ! বাচ্চাটি অবাক হল । কাছে গেল । তারপর আঁতকে উঠল ।
ও পাশের মেঝেটি রক্তে ভেসে গেছে । বিপ্লবের বাঁ হাতের কব্জি থেকে যেন সমুদ্রের ধারার মত রক্ত পড়ছে । বিপ্লবের নিথর শরীর কাগজের মত ফ্যাকাসে ।
ভয়ে, আতঙ্কে, কষ্টে চিৎকার করে কেঁদে উঠল ছেলেটি ।

(১)

রাত ১১টা । বাইপাসের ধারে রাস্তাটা একটু নির্জন । ক্যাব থেকে নেমে গলির দিকে পা বাড়াল মেয়েটি । কয়েকটা কুকুর তাঁকে দেখে ডাকতে শুরু করল । তারপর আস্তে আস্তে নিজেদের মতন সরে পড়ল । মেয়েটির কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই । নেশাটা একটু বেশি হয়েছে । গিয়ে ঘুমোতে হবে । সঞ্জুটা এমন করে না – Naughty chap ! আপনমনেই হাসি পেল ।
বাঁ দিকে ঘুরে সোজা গিয়ে শেষ বিল্ডিংটার টপ ফ্লোরে ফ্ল্যাট । আর কি কাণ্ড আজ, রাস্তাটা পুরো অন্ধকার । লাইট কি কেটে গেল ? নাকি কেউ জ্বালেনি ? নাকি অন্য কোনও সমস্যা ? অন্ধকারে কেমন যেন গা ছমছম করে উঠল । কোনোদিন তো এমন হয় না । তাহলে আজ……
হঠাৎ পেছনে ফিরল মেয়েটি । কার পায়ের শব্দ শোনা গেল না ? কই, পেছনে তো কেউ নেই । তাহলে ? কিন্তু যেন স্পষ্ট শুনল । নাহ, নেশাটা একটু বেশি হয়ে গেছে । Hallucination !
মেয়েটি আপনমনে হেসে নিজেকে হাল্কা করার চেষ্টা করল । তারপর দ্রুত পা চালাল অন্ধকারে ।
হঠাৎ –

 




 

 

(২)

রাস্তার ওপর উবু হয়ে বসে লাশটা ভাল করে পরীক্ষা করছে ডিউটি অফিসার খাস্তগীর । পাশে দাঁড়ানো গোয়েন্দা অফিসার কুণাল প্রধান । খুঁটিয়ে জরিপ করছে দেহটা । মেয়েটির বয়স বছর পঁচিশ হবে । সুন্দরী, লাস্যময়ী । যৌবন যেন শরীরের প্রতিটি ভাঁজ থেকে উপচে পড়ছে । পরনে স্লীভলেস টপ আর শর্ট স্কার্ট । ফর্সা । গলার নলি দু’ ভাগ করে কাটা । রক্তে ভিজে গেছিল রাস্তা বোঝা যায় । এখন শুকিয়ে কালচে হয়ে গেছে । খাস্তগীর উঠে দাঁড়াল । কুণালের দিকে তাকাল । কুণাল কোনও কথা বলল না । চুপচাপ গাড়িতে উঠে গেল ।
খাস্তগীর তাঁর কর্তব্য করতে শুরু করল ।

(৩)
খবরের কাগজের প্রথম পাতায় বড় বড় করে হেডলাইন –
“ রাতের কোলকাতায় আবার খুন তরুণী, এখনো অধরা ‘লেডি কিলার’ ”
চোখ চকচক করে উঠল প্রভাসের । ‘লেডি কিলার’ – নামটা খাসা দিয়েছে মিডিয়া । ভাগ্যিস রোমিও বলেনি । মিডিয়ার লোকেরা পারেনা এহেন কাজ নেই । নইলে –
খবরের কাগজ রেখে জানালার সামনে গিয়ে পর্দাটা সরিয়ে দিল । ঘরের ভেতর সূর্যের আলো এসে ঢুকল । প্রভাসের মাথায় এলোমেলো চুল, চোখ বসা – কোনও এককালে হয়তো খুব উজ্জ্বল ছিল, এখন তাতে প্রচ্ছন্ন রহস্য । চোখে চশমা । গালে না কামানো দাড়ি ।
কোলকাতার রাস্তার দিকে তাকিয়ে একটা বিড়ি ধরাল প্রভাস ।

(৪)

খাস্তগীর অত্যন্ত বিচলিত । মাথা যেন কাজ করছে না । কুণাল একটা চুরুট ধরাল । খাস্তগীরের পুরো নাম তরুণ খাস্তগীর । বয়স পয়তিরিশ হবে । টানটান চেহারা, ঢেউখেলানো চুল, নাকের নীচে গোঁফ । সিনেমার পর্দায় দেখা সুদর্শন পুলিশ অফিসারের সাথে মেলে । কুণালের ব্যাক ব্রাশ করা চুল । ক্লিন শেভড । চোখে সোনালী ফ্রেমের চশমা । চেহারা আন্দাজ মত । লম্বা জুলপিতে কয়েকটা করে চুলে পাক ধরেছে । চোখ যথেষ্ট শার্প । দেখলে গোয়েন্দা অফিসার কম কলেজের লেকচারার বেশি মনে হয় ।
চুরুটের ধোঁয়া ছেড়ে কুণাল একটা ফাইল খুলে বসল ।
খাস্তগীর অস্থির ভাবে বলল – “স্যার আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না । কে করছে এই কাজ ? এই সিরিয়াল কিলিংয়ের পেছনে কি উদ্দেশ্য থাকতে পারে ?”
কুণাল ব্যারিটোন ভয়েসে ফাইল থেকে চোখ না সরিয়ে বলল, “এই নিয়ে ক’টা কেস হল খাস্তগীর ?”
“আমার এলাকায় দুটো আর গোটা কোলকাতায় এই নিয়ে অলরেডি পাঁচটা । পুলিশ ডিপার্টমেন্টের তো মাথা খারাপ হয়ে যাওয়ার জোগাড় !”
“Victim সব ক্ষেত্রেই মহিলা । মূলতঃ কুড়ি থেকে পঁয়ত্রিশের মধ্যে বয়স । কখনো ম্যারেড, কখনো মেডেন । খুনের পদ্ধতি সেই এক – গলার নলি কেটে ফালা ফালা করে দেওয়া । তাই তো ?”
“রাইট স্যার । আর সবথেকে আশ্চর্য ব্যাপার কি জানেন স্যার – খুনি কোথাও একটা বারের জন্যেও কোনও ক্লু রাখছে না । একটা কোনও ক্লু পাওয়া যাচ্ছে না যার ওপর ভিত্তি করে আমরা investigate করতে পারি । এদিকে যে অবস্থা তাতে তো পাব্লিকের কাছে রীতিমত মুখ দেখানো দুষ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে !”
“দ্যাখো খাস্তগীর, পৃথিবীতে কোনও ক্রাইম ফুলপ্রুফ নয় । কারণ যখনই কোনও মানুষ নেগেটিভ কোনও instinct নিয়ে কোনও কাজ করে, তাঁর মধ্যে temptation কাজ করে । আর সেখানেই সে একটা না একটা ভুল করে বসে !”
“তাহলে এই ক্ষেত্রে কি খুনির মধ্যে কোনও instinct কোনও temptation কাজ করছে না ? এটা কীভাবে সম্ভব !”
“Partially possible…..যদি খুনি উত্তেজিত না হয়ে খুব ঠাণ্ডা মাথায় স্বভাবসিদ্ধ ভাবে – ঠিক যেভাবে তুমি মুরগির ঠ্যাং চেবাও ঠিক সেভাবেই – খুনগুলো করতে থাকে তাহলে temptation-এর সম্ভাবনা minimum থাকে । কারণ তখন তাঁর কাছে খুন করা আর দাঁত ব্রাশ করা দুটোই এক ।”
খাস্তগীরের চোখ প্রায় কপালে উঠে যাওয়ার জোগাড় ।
“বলেন কি স্যার ! এ তো সাংঘাতিক । সাইকো !”
“সুস্থ মস্তিষ্কে কখনো সিরিয়াল কিলিং হয়না খাস্তগীর । অবশ্য –”
“ অবশ্য ? কি ?”
কোনও একটা বিষয়ে ডুবে গেল কুণাল । খাস্তগীরের কথা যেন তাঁর কানেই ঢুকছে না । হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে পড়ল কুণাল ।
“খাস্তগীর !”
“স্যার –”
“Immediately সব ক’টা কেস ফাইলের একটা করে কপি আমার চেম্বারে পাঠাও । আর যারা যারা খুন হয়েছে তাঁদের সম্পর্কে ভাল করে খোঁজ নাও । তাঁদের background, তাঁদের foreground, তাঁদের lifestyle, life history সবকিছু । আমার মন বলছে তাঁদের সবার মধ্যে কোনও না কোনও একটা মিল আছে । আর সেখানেই হয়তো লুকিয়ে আছে খুনির motive !”
“আমি সব ফাইল আপনার কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করছি । আজ বিকেলের মধ্যেই ।”
খাস্তগীর স্যালুট করে বেরিয়ে গেল থানায় । আবার গভীর চিন্তায় ডুবে গেল কুণাল ।

 




 

 

(৫)

প্রিন্সেপ ঘাটের পার্কে একটা বেঞ্চে বসে আছে প্রভাস । পরনে সাদামাটা পাঞ্জাবী, পাজামা, কাঁধে ঝোলা ব্যাগ । চশমার ভেতর থেকে যেন গোটা পৃথিবীকে দেখছে । যেন টিভির পর্দার ভেতরে গোটা পৃথিবীটা, আর সে একমাত্র দর্শক । দূরে কয়েকটা ছেলেমেয়ে অন্তরঙ্গ ভাবে প্রেম করছে । কখনো কখনো বিপদসীমা অতিক্রম করছে । বয়সের দোষ । মুশকিল হল, frustrated governance, frustrated society-র শিকার কয়েকজন frustrated police officer সেসবের মধ্যেও নাক গলায় ।
একটা কবিতা মনে পড়ছে প্রভাসের । আপনমনে বিড়বিড় করে –
রোদ ঝলমলে মহানগরে মেক ইন ইন্ডিয়া বানাচ্ছ
আর রোজ এক একটা পোঁদে ঢুকে যাচ্ছে
বেয়াদপ হাম্পুর গোছা, শুধু গাঁড় মারবে বলে ।
তার চেয়ে বলো না চেয়ে নিই অবসর ;
রোজ রোজ চড়ুইভাতির থেকে অনেক ভাল
একদিনের শ্মশানের পোড়া চ্যালাকাঠ ।
একবারে শেষ হবে হোক
চুতিয়ারা গীতাপাঠ করে যায় আর
ভাল থাকার স্বপ্নগুলো ভেসে যায়
বীর্যপাতের ফ্ল্যাশট্যাঙ্কের জলে ।
একটা অদ্ভুত দৃষ্টি প্রভাসের চোখমুখে । একটা তাচ্ছিল্য, একটা রাগ, একটা অবহেলা………
পকেটের ফোন বেজে উঠল । একটা পাতি বারফোন বের করল প্রভাস । নাম্বারটা দেখে রিসিভ করে বলল – “হ্যালো –”

(৬)
পড়ার ঘরে বসে ফাইলে ডুবে আছে কুণাল । ঠোঁটে জ্বলছে চুরুট । চুরুটের ঝাঁঝালো ধোঁয়ায় গোটা ঘর ম’ ম’ করছে । একটা একটা করে সূত্র জুড়তে চাইছে । পারছে না । কোথায় যেন একটা ফাঁক থেকে যাচ্ছে । কখন যে ঊর্মিলা এসে পেছনে দাঁড়িয়েছে টের পায়নি । হুঁশ ফিরল ঊর্মিলার হাতের ছোঁয়ায় ।
“ঊর্মিলা – কখন এলে ?”
“এই তো এই মাত্র । তুমি ?”
“ঘণ্টা দেড়েক হল । আসলে আমি একমনে পড়ছিলাম – খেয়াল করিনি –”
“সে তো বুঝতেই পেরেছি । সেই লেডি কিলারের কেস তো ?”
হাসল কুণাল ।
“লেডি কিলার – হ্যাঁ মিডিয়া ওই নামটাই দিয়েছে যদিও । তবে ওই লেডি কিলার শুনলেই না কেমন একটা প্লে বয় প্লে বয় ব্যাপার মাথায় আসে । খুন খারাপির কথা মনেই হয় না !”
“তা কিছু বুঝলে ?”
“জীবনে এই প্রথম ফুলপ্রুফ ক্রাইম দেখছি ঊর্মিলা । কোনও ক্রাইম কি আদৌ ফুলপ্রুফ হয় ? হয় না । কিন্তু এই ক্ষেত্রে হচ্ছে । প্রশ্নটা হল – কেন । আর এই একটা কেনই সবকিছু ঘেঁটে দিচ্ছে । হিসেব মিলছে না !”
কুণালের মাথার চুল ঘেঁটে দিল ঊর্মিলা ।
“তা তোমার এত দেরী ?”
“কলেজের পর কিছু কেনাকাটা ছিল । সামনে পুজো আসছে না ? একটু একটু করে কেনাকাটা সেরে না রাখলে তো থই খুঁজে পাওয়া যাবে না ! আর শপিং করার ক্ষেত্রে তো তোমার হেল্প কোনোদিনই পাইনি আর তাই আজো আশা করি না !”
জোরে হেসে উঠল কুণাল ।
“তুমি তো জানোই ওসব শপিংয়ের কথা বললেই আমার agoraphobic লাগে । তার চেয়ে আমার এই – কি যেন বলে – লেডি কিলারের পেছনে ছুটলে বেশি comfortable লাগে !”
“রাত অনেক হল । আমি চেঞ্জ করে ফ্রেশ হয়ে নিই – তারপর খেতে দিচ্ছি !”
ঊর্মিলার হাত ধরে টান দিল কুণাল । ঊর্মিলা কুণালের বুকের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল । এলোমেলো লক গুলো ঊর্মিলার মুখটাকে সুন্দর করে ঢেকে রেখেছে । যেন রহস্য সৃষ্টি করছে । কুণাল লম্বা নিঃশ্বাস নিল ।
“কোন পারফিউম ?”
ঊর্মিলা হাসে । চোখ যেন কথা বলে ।
“দেরি হচ্ছে কিন্তু ! খিদে পায়নি ?”
“পেয়েছে তো !”
ঊর্মিলাকে জড়িয়ে ধরে ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিল কুণাল ।

 




 

 

(৭)

“অঞ্জলি শ্যাম – বয়স ৩২ – married, housewife – খুন হয়েছে 31st January – বাড়ি গোলপার্ক ।…..নেহা শর্মা – বয়স আটাশ – unmarried, committed – খুন হয়েছে 22nd February – বাড়ি সল্টলেক সেক্টর ওয়ান ।…..শ্রেয়া পাল – বয়স পঁয়ত্রিশ – married, IT এমপ্লয়ী – খুন হয়েছে 14th April, চৈত্র সংক্রান্তির রাতে – বাড়ি যাদবপুর ।…..সনিয়া কাপুর – বয়স ছাব্বিশ – unmarried, committed, bar singer – খুন হয়েছে 26th June – বাড়ি গোরাবাজার ।……..জয়িতা বাসু – বয়স পঁচিশ – unmarried, single, professional model…obviously struggler – খুন হয়েছে 7th August, অর্থাৎ পরশুদিন – বাড়ি কালিকাপুর………”
ফাইলটা রেখে দিল খাস্তগীর । কুণাল পুরোটা খুব মন দিয়ে শুনছিল ।
“আমি তো কোনও link up পেলাম না স্যার !”
কুণাল তাকাল খাস্তগীরের দিকে । তারপর ফাইলটা হাতে নিল । প্রত্যেকের ছবি আর মৃতদেহের ছবি ফাইলে অ্যাটাচ করা আছে । কুণাল ভাল করে দেখল ।
“প্রত্যেকেই যথেষ্ট সুন্দরী ছিল । সেক্সি, হর্নি, অ্যাপিলিং ।”
খাস্তগীরের দিকে তাকায় কুণাল । খাস্তগীর একটু অপ্রস্তুত হয় । কুণাল হাসে ।
“প্রত্যকেই ভীষণ স্বাধীনচেতা স্বভাবের ছিল সেটা তাঁদের পোশাক আশাক সাজসজ্জা দেখে বোঝা যায় । প্রত্যেকেই dashing beautiful and glamourous………আর প্রত্যেকের খুন হয় এক কায়দায়, গলা ফালা ফালা করে কেটে………”
খাস্তগীর একটু ঘাবড়ে গেল । একটু নার্ভাস । বলল, “বুঝলাম না…স্যার….”
“হয় চোখের ডাক্তার দেখাও আর নইলে ছুটিতে যাও । চোখ অথবা মাথা – কোনও একটার বিশ্রাম দরকার !”
“স্যরি স্যার । আমি আসলে….”
কিছুক্ষণ কিছু বলল না কুণাল । তারপর বলল, “যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওদের husband, boyfriend আর friend circle-এ খোঁজ নিতে হবে ওদের lifestyle, mindset, character সম্পর্কে । তারপর তাঁদের family circle-টাও খতিয়ে দেখতে হবে । খুনিকে ধরতে গেলে খুনের শিকড় অবধি আগে পৌঁছতে হবে । যত তাড়াতাড়ি সম্ভব । কারণ আমরা জানি না খুনি নেক্সট কবে আবার টার্গেট করবে । তাই….নষ্ট করার মত সময় কিন্তু আমাদের হাতে নেই…………”
“রাইট স্যার । তাহলে কি কাল থেকেই আমি –”
“কাল থেকে নয়, আজ থেকে । এখনই । আর তুমি নও, আমরা । আমি যাব । তুমি আমার সাথে যাবে । Any problem ?”
“No Sir…..”
“Let’s move !……”

(৮)

অন্ধকার হয়ে আসা পার্কের সামনের গেট থেকে ব্যাগ কাঁধে বেরিয়ে এল প্রভাস । একবার পেছন ফিরে দেখল । পেছনের গেটের সামনেটা ফাঁকা । যে এসেছিল সে এতক্ষণে চলে গিয়েছে । একবার ব্যাগের ভেতরে হাত দিল । একটা মাঝারি বহরের প্যাকেট হাতে লাগল । ভেতরে রাখা কাগজের নোটগুলোকে উপলব্ধি করল । হাসল আপনমনে । সন্ধ্যের আলোকমালায় চিকচিক করে উঠল ওর চোখ দুটো ।
রাস্তা পেরোনোর জন্যে দাঁড়াল প্রভাস । একের পর এক গাড়ি পেরোচ্ছে । সিগন্যাল গ্রীন । মনে মনে একটা কবিতা বিড়বিড় করছে –
They still are ranged along the roads
plagued by legionnaires
false windmills and demented roosters
They are the same people
only further from home
on freeways fifty lanes wide
on a concrete continent
spaced with bland billboards
illustrating imbecile illusions of happiness………
এক সময় একটা লাল গাড়ি রাস্তার বুক চিরে বেরিয়ে গেল সোজা । তারপরই লাল আলো জ্বলে উঠল । লাল আলো দেখে একটু হাসল প্রভাস । তারপর রাস্তা পেরিয়ে ওপারের ভিড়ে মিশে গেল ।
অন্যদিকে, গাড়ির ড্রাইভিং সীটে বসে সামনের রাস্তাটাকে জরিপ করছে কুণাল, মন শুধু রয়েছে – অন্য কোথাও !

(৯)

“কোনও সূত্র পেলে ?”
“আমার তো পুরো ব্যাপারটাই কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে স্যার । মাথা ব্যথা করছে জাস্ট !”
“পাতি চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, পলিটিকাল ভায়োলেন্স – এসব ডিল করে করে তোমাদের গ্রে ম্যাটার শুকিয়ে গেছে খাস্তগীর । তাই সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম ব্যাপারগুলো মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে !”
খাস্তগীর লজ্জা পেল একটু । হাসল । বলল, “একটা থার্ড ওয়ার্ল্ড কান্ট্রিতে ক্রাইম লেভেল গুলোও হয়তো থার্ড গ্রেডেড । মানুষ দু’ বেলা খেতে পায় না, বাধ্য হয়ে চুরি ছিনতাই খুন খারাপি করে…..tempted লোক বুদ্ধি খাটাবে কি করে ? ফলে আমাদেরও……….আর পলিটিকাল নেতাদের কথায় উঠতে বসতে হয় বলে মাথা খাটানোর অভ্যেসটাও চলে গেছে !”
“That’s the main problem…..আজকেই পুলিশকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিক ওই নেতা মন্ত্রীরা – দেখবে মন্ত্রীসভার অর্ধেক লোকই জেলে আছে !”
“Let’s go back to our root problem…………..আপনি কি কিছু locate করতে পেরেছেন ?”
“আলবাত ! দ্যাখো – বিষয়টা হয়তো তুমিও লক্ষ্য করেছ – যারা খুন হয়েছে তাঁরা প্রত্যেকেই ছিল ভীষণ flamboyant টাইপের । মানে কেউ এক কথায় নিজের পার্টনারের প্রতি loyal ছিল না । প্রত্যেকেই নানা রকম উত্তাপের আগুনে নিজেদের সেঁকে নিতে পছন্দ করত ।”
“হ্যাঁ স্যার, এটা কিন্তু আমিও লক্ষ্য করেছি । কেউ disciplined life lead করত না । ওরা ঠিক…..honest ছিল না !”
“বিয়ে করেছ ?”
“না স্যার । এমন চাকরি করি…নিজের জন্য সময় কোথায়….”
“প্রেম ?”
“না মানে –”
“বাবা, তোমায় নিয়ে তো তোমার বাবা মা একদম নিশ্চিন্ত খাস্তগীর !”
দুজনেই হেসে উঠল ।
“কেন স্যার ?”
“প্রেমে কিন্তু এই honesty আর dishonesty পুরোটাই এলোমেলো হয়ে যায় । তুমি যদি নিদেনপক্ষে একটা প্রেমও করতে তাহলে বুঝতে !”
খাস্তগীর হাসে ।
নিমেষে পাল্টে যায় কুণালের অভিব্যক্তি ।
“যদি এই dishonesty-টাকে ধরি, তাহলে কি এটা মেনে নেব যে এই কারণেই খুনি ওদের টার্গেট করেছিল ? পোয়েটিক জাস্টিস ?……কিন্তু কেন ? আর কে ? বেছে বেছে মেয়েদেরকেই টার্গেট করবে কেন ? সেক্সুয়াল জেলাসি ? নাকি Misogynist ? নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনও ইতিহাস ?”

 

 




 

 

(১০)

রাতের বিছানায় নরম আলোয় যেন দুটি শরীর স্বর্গের বাগানে খেলা করছে । ঊর্মিলার মখমলে শরীরে বারবার আছড়ে পড়ছে কুণাল । খাস্তগীরের কথা ভেবে একটু মায়া হল ওর । সত্যি, বেচারা এখনো ব্রহ্মচারী । নারী শরীর নারী হৃদয়ের স্পর্শ যে পায়নি সে হতভাগ্য । এই নারীই পারে সৃষ্টি করতে আবার এই নারীই পারে ধ্বংস করতে । হেলেন, ক্লিওপেট্রা, মড গন – তাঁরাও তো নারী ।
নগ্ন নারীদেহ যেন এক মহাকাব্য । এক চালচিত্র । এক আলপনা । নগ্ন হলে সব মেয়েদেরই কি একইরকম সুন্দর দেখায় ? ঊর্মিলাকে তো নগ্ন হলে আদি মাতা ইভের মতোই সুন্দর আর পবিত্র লাগে, মেডুসা আর মোনালিসার মত রহস্যময়ী মনে হয় । ঊর্মিলা কি বাকিদের চেয়ে বেশি সুন্দরী । এক মুহূর্তের জন্যে গলা কাটা মেয়েদের লাশের ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে, কেমন গা ঘিনঘিন করে ব্যথা করে কুণালের ।
ঊর্মিলার ফর্সা নরম বুকে মাথা রেখে শুয়ে আছে কুণাল । ঊর্মিলার সোনালী আভার মত স্তনবৃন্ত যেন স্বর্গের পারিজাত । কি শান্তি । কি আরাম ! ঊর্মিলার কাছে এলে একটা অদ্ভুত শান্তি একটা অদ্ভুত মনের জোর পায় কুণাল । মনে হয় এই ক্ষয় হতে থাকা পৃথিবীটা এখনো বেঁচে আছে । ঊর্মিলা পারে সমস্ত ঝড় ঝাপটা থেকে ওকে বাঁচাতে ।
দুঁদে গোয়েন্দা অফিসারও কেমন যেন ছেলেমানুষ হয়ে যায় ঊর্মিলার কাছে এলে ।

(১১)

রাত তখন অনেক । দেওয়ালে লাগানো চে গেভারা, লেনিন আর মার্ক্সের পোস্টারগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে একটা অদ্ভুত তৃপ্তি পায় প্রভাস । একটা শ্রদ্ধা চোখে ফুটে ওঠে । তারপর সেটা বদলে যায় ঘৃণায় । জানালার কাছে এসে নীচু গলায় বিড়বিড় করে –
নিয়নের বেশ্যাদের ফসফোরাস ছায়ার মধ্যে
আশ্চর্য ক্রেন ছিঁড়ে খাচ্ছে শহরের শিরা-উপশিরা
গল গল করে বয়ে যাচ্ছে, জমে থাকছে শহরের রক্ত
অলৌকিক ভিক্ষাপাত্রের মতো চাঁদ
দাঁতে কামড়ে ছুটে যাচ্ছের রাতের কুকুর

আমি একটা ফাঁকা এম্বুলেন্স পাক খাচ্ছি উদ্ভট শহরে
আমার জন্যে সবুজ চোখ জ্বলো ভাগ্য বা নিয়তি
যাকে আমি নিয়ে যাব তাকে কেউ বাঁচাতে পারবে না
সারা দেহ হা করে দিয়েছে স্ট্যাবকেস
সাদা সাদা অজ্ঞান মোহিনী নাসের মতো বাড়ি
এই অসুস্থ শহরের প্রত্যেকটা ম্যানহোলে অন্ধকারে
ঝলসে উঠছে ছুরি
আমার সাহসের মাংস ফালি ফালি করে দেবে বলে
আমাকে হুকের থেকে ছাল ছাড়িয়ে টাঙিয়ে দেবে মহাবিশ্বে
গলাকাটা অবস্থায়

আমিও শান দিয়ে নিয়েছি আমার দুধৰ্দাত ও বাঘনখে
ভীষণ রোখ আমার এই রহস্যের ভাগ আমাকে দিতে হবে
সব ভাগাভাগির শেষে আমাকে থাকতে হবে ফাঁকা ঘরে
আমাকে আঁকড়ে থাকবে অনাথ আশ্রমের শেষ প্রার্থনা
মৃত বলে কেউ আমাকে ঘোষণা করলেও
জেগে থাকবে আমার চোখের হীরা
কিন্তু এখন নিয়নের বেশ্যাদের ফসফোরাস ছায়ার মধ্যে
আশ্চর্য ক্রেন ছিঁড়ে খাচ্ছে শহরের শিরা-উপশিরা
টেবিলের ওপর রাখা একটা বড় ছুরি । সেটা হাতে তুলে নিল প্রভাস । অদ্ভুত ভাবে চেয়ে আছে । ঠোঁটের ধরানো বিড়িটা ধোঁয়া উগড়ে যাচ্ছে, চোখ জ্বালা করছে ।
বিড়বিড় করে প্রভাস –
“বাদুড় বলে, ওরে ও ভাই সজারু,
আজকে রাতে দেখবে একটা মজারু !”
প্রভাসের চোখে একটা অদ্ভুত পাগলামি !

(১২)
গাড়ি করে এ.পি.সি ঘোষ রোডের ওপর মনামিকে ড্রপ করে দিল আদিত্য । সত্যি ছেলেটা বড় ভাল । কোথায় রূপকের মত একটা পেটি মিডল ক্লাস সেন্টিমেন্টের ছেলে আর কোথায় আদিত্যর মত খোলা মনের ছেলে । রূপক তো কখনো বাবা মা ভাই বোন ছাড়া কিছু ভাবতেই পারল না । শুধু liability-র বোঝা । তারপর একটা সামান্য প্রাইমারি স্কুলের টিচার । কোনও ambition নেই । মদ খায় না সিগারেট খায় না লেট নাইট পার্টি করে না – ওর সবেতেই সমস্যা – আনস্মার্ট, ব্যাকডেটেড একটা ছেলে । মনামি বড় হয়েছে অত্যন্ত সাধারণ ভাবে, এখন বাকি জীবনটাও যদি ওর এভাবেই কাটে তাহলে আর ভোগ করবে কবে ? ভাগ্যিস, সময়মত রূপককে ল্যাং মেরে বেরিয়ে এসেছে । রূপক অনেক ঘ্যানঘ্যান করে হাল ছেড়ে দিয়েছে । বেচারা ! আদিত্য স্মার্ট, হ্যান্ডসাম, বড়োলোক বাবার একমাত্র ছেলে – এরকম হীরের টুকরো ছেলে কেউ হাতছাড়া করে ? অত গান্ডু মনামি নয় ।
দেশবন্ধু পার্কের দিকের রাস্তাটা ধরেছে মনামি । রবিবার । রাতও হয়েছে ভালই । সন্ধ্যেবেলা বৃষ্টি হয়ে গেছে প্রচুর, তাই লোকজন এমনি কম । শীত শীত করছে মনামির । ঘড়ির দিকে দেখল – সাড়ে এগারোটা বাজে । বাবা মা আগে খুব হ্যাজাত এখন আর কিছু বলে না । মনামি চাকরি করে তাই ওর জীবন ও কীভাবে কাটাবে ওর ব্যাপার । অহেতুক আবেগকে ও কোনোদিন প্রশ্রয় দেয়নি ।
ডানদিকে ঘুরতে গিয়েই মনামির মনে হল পেছনে কেউ আছে । পেছন ফিরে তাকাল । না, কেউ নেই । তাহলে ? ছিনতাইবাজ নয় তো ? বা কোনও সেক্স ম্যানিয়াক ? একটু গা ছমছম করতে লাগল । কয়েক মাস ধরে একটা সিরিয়াল কিলার নাকি ঘুরে বেড়াচ্ছে শহরে – বেছে বেছে পঁচিশ থেকে পঁয়ত্রিশ বছরের মেয়েদের গলা কেটে খুন করছে । তাহলে কি –
এক অজানা আশঙ্কায় তাড়াতাড়ি পা চালাল মনামি । হঠাৎ সামনে কয়েকটা কুকুর ঘেউ ঘেউ করতে করতে এগিয়ে এল । মনামি ভয় পেল । কুকুরে ওর খুব ভয় । কেমন কুঁকড়ে গেল ।
পেছন থেকে একটা লোক এসে কুকুরগুলোকে ভয় দেখিয়ে তাড়াল । কুকুরগুলোও নাছোড়বান্দা, কিছুতেই যাবে না । তবে লোকটি শেষমেশ তাড়িয়ে ছাড়ল ।
লোকটি হাসল – “যান ম্যাডাম, আর ভয় নেই !”
মনামি লোকটিকে শুকনো ধন্যবাদ জানিয়ে এগিয়ে গেল । হঠাৎ একটা খটকা লাগল । লোকটা কোথা থেকে এল ? পেছনে তো কেউ ছিল না ! রাস্তা ফাঁকা ছিল ! তবে ? বুক কেঁপে উঠল মনামির, বৃষ্টিভেজা রাস্তায় কেমন যেন এক অজানা আতঙ্কের আভাস পেল । পেছন ফিরে লোকটিকে কিছু জিজ্ঞেস করবে বলে ঘুরল মনামি । সাথে সাথেই………..
মনামির গলাকাটা দেহটা রাস্তায় আছড়ে পড়ল । চিৎকার করার সুযোগটাই পেল না ।
এক জোড়া পা আস্তে আস্তে ভিজে রাস্তা দিয়ে হেঁটে অদৃশ্য হয়ে গেল ।

(১৩)
রাতের কোলকাতা । এক অন্য অনুভূতি । ফুটপাথ জুড়ে ভিখিরির দল । দেশ স্বাধীন হয়েছে । কিন্তু বড়োলোক আরও বড়োলোক হচ্ছে, গরীব হচ্ছে আরও গরীব । একদিকে যেমন ঝাঁ চকচকে শপিং মল গজিয়ে উঠেছে, অন্যদিকে তেমনই কত লোকের মাথার ওপর একটা ছেঁড়া ত্রিপল ছাড়া কিছু নেই । বালের উন্নয়ন, বালের প্রগতি । সবকিছুই শুধু তেলা মাথায় তেল দেওয়া ।
চার্লস ডিকেন্স রাতের লন্ডনে ঘুরে বেড়াতেন । সে এক অন্যরকম দৃশ্য, অন্য লন্ডন । কোলকাতাও ব্যতিক্রম নয় । সেটা বুঝতে পেরেছে প্রভাস । তাই রাতের কোলকাতায় একা একা ঘুরে বেড়ায় । রোজ নয় । যখন সে মনে করে, তখনই । এ এক অন্য অনুভূতি ।
কোলকাতার রাস্তায় কি রক্তের গন্ধ ? কোলকাতার রাস্তায় কি আতঙ্ক ? নাকি কোলকাতার রাস্তায় মিশে আছে চোখের জল ?
তাড়াতাড়ি পা চালাল প্রভাস । কেউ যেন না দেখতে পায় । যদিও আজ অবধি কোনও পুলিশের বাচ্চার ক্ষমতা হয়নি ওকে টাচ করার, তবু শালাদের বিশ্বাস নেই । সাবধানের মার নেই । বিপ্লবের মুহূর্তে এক অস্থিরতা এক ডামাডোলের সৃষ্টি হয় । তার মধ্যেই আসবে বিপ্লব, শয়তানের রক্তে স্নান করবে তিলোত্তমা !
প্রভাস জানে না গলিতে ঢোকার মুখে এক অনিদ্রার রোগী খোলা জানালার অন্ধকার দিয়ে ওকে দেখল । অবাক হল । বর্ষা বাদলার রাতে কেন বেরিয়েছে প্রভাস ?
প্রভাস শুধু ভাবে, কবে আসবে বিপ্লব ? কবে জাগবে দেশ ? মেহনতী মানুষগুলো কবে পাবে অধিকার ? লেনিন, স্তালিন, চে – কোথায় তোমরা ?
রাত তখন দেড়টা ।

 





 

(১৪)
কুণাল আজ বেশ উত্তেজিত । চুরুটের ধোঁয়া ছেড়ে চিৎকার করে উঠল – “আবার একটা মার্ডার । একই কায়দায় একই ভাবে । একইরকম flamboyant background…….পুলিশের নাকের ডগা দিয়ে লেডি কিলার নিজের কাজ নিজে করে যাচ্ছে – আমাদের ডিপার্টমেন্ট কি বাল ছিঁড়ে আঁটি বাঁধছে !”
সামনে বসা খাস্তগীর । তাঁর পাশে ইন্সপেক্টর সোমনাথ ভদ্র । তাঁর এলাকাতেই শেষ খুনটা হয়েছে, দেশবন্ধু পার্কের সামনে । সাথে হাজির রয়েছে যে যে এলাকায় খুনগুলো হয়েছে সেখানকার অফিসার-ইন-চার্জ আর সেইসঙ্গে আরও কিছু দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসার । সবাই চুপ । কুণাল প্রধানের সবচেয়ে বড় জিনিস হল, লোকটা এমনিতে রাগে না । যথেষ্ট ঠাণ্ডা মাথার । কিন্তু যদি কখনো উত্তেজিত হয় তাহলে সামলানো দুষ্কর হয়ে যায় ।
সোমনাথের দিকে ঝুঁকে চোখে চোখ রেখে বলল কুণাল –
“আপনার থানার অফিসাররা কি কাজকর্ম বাদ দিয়ে শুধু পার্কের couple-দের আর রাস্তাঘাট বাজার পার্কিং স্লট – এসব জায়গা থেকে তোলা তুলে যাচ্ছে আর ভুঁড়ি বাড়িয়ে যাচ্ছে ?”
সোমনাথের একটু গায়ে লাগল । ঘুষ সোমনাথ নিজেও খায়, সিনিয়র অফিসারদেরও বাধা দেয় না । আরে পুলিশে চাকরি করে যা মাইনে পাওয়া যায় তাতে চলে নাকি ? আছে অনেকরকম হুজ্জুতি । কেস দিতে না পারলে সরকার থেকে মাইনে কেটে রাখবে । তার মধ্যে উপরি পাওনা না হলে তো পেট ভরবে না ! অগত্যা আর কি !
একটু কঠিন গলাতেই বলার চেষ্টা করল সোমনাথ – “স্যার…..this is too offensive…….”
কুণাল গর্জে উঠল – “Go to hell with your offence ইন্সপেক্টর ভদ্র ! হেডকোয়ার্টারে যদি আমি রিপোর্ট করি তাহলে আপনার পিঠ বাঁচবে তো ? এমনিতেই কিন্তু হেডকোয়ার্টার আপনাদের প্রত্যেকের গতিবিধির ওপর নজর রাখছে এটা মাথায় রাখবেন !”
সোমনাথ একদম চুপসে গেল । খাস্তগীর সহ বাকিরাও রীতিমত ঘামতে আরম্ভ করল । কুণাল প্রত্যেককে জরিপ করল ভাল করে । সোমনাথের গলা শুকিয়ে যাচ্ছে । ঢোঁক গিলে বলল – “স্যরি স্যার !”
“কত সহজেই মিটে গেল তাই না ইন্সপেক্টর ভদ্র ? মনে মনে তো আমার চোদ্দ পুরুষ উদ্ধার করছেন !”
সোমনাথ কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল । সেই সুযোগ না দিয়ে কুণাল বলল, “কাল রাতে এলাকায় police patrolling হয়নি ?”
মাথা নীচু করে মিনমিন করে বলল সোমনাথ – “হয়েছে স্যার – আসলে – মানে – কাল সন্ধ্যে থেকে ঝড়বৃষ্টি হয়ে গেছে…লোকজন এমনি কম ছিল……তাই…..মানে……..”
“তাই গোটা থানা ভেতরে ঢুকে বসে তেলেভাজা আর মুড়ি খাচ্ছিল । তাই তো ?”
ঘরের মধ্যে নিশ্ছিদ্র নিস্তব্ধতা । চেম্বারের জানালার সামনে দাঁড়িয়ে চুরুট টানছে কুণাল । মাথার মধ্যে অনেক কিছু খেলা করছে । অনেক অনেক কিছু । কিন্তু সব জট পাকিয়ে যাচ্ছে । কোনও সমাধান সূত্র খুঁজে পাচ্ছে না । কিছুতেই পাচ্ছে না ।
ফোন বেজে উঠল সোমনাথের । ফোন হাতে নিয়ে কুণালের দিকে চেয়ে আছে, ধরতে সাহস পাচ্ছে না যেন । কুণাল ঘুরে তাকাল ।
“বৌ, প্রেমিকা অথবা পাওনাদারের ফোন না হলে ফোনটা ধরুন । কেটে যাবে !”
খাস্তগীরের হাসি পেয়ে গেল । সোমনাথ লোকটিকে সে নিজেও পছন্দ করে না । রিপোর্ট খুব খারাপ, শুধু হেডকোয়ার্টারে কিছু লোককে নিয়মিত তেল মেরে জায়গা ধরে রেখেছে । নিজেকে সামলে নিল । গলা ঝাড়ল ।
সোমনাথ ফোন ধরল –
“হ্যাঁ বলো – হ্যাঁ – কি বলছ কি ! – বেশ । ঠিক আছে তুমি নজর রাখো । আমি ফোন না করা পর্যন্ত এলাকা থেকে নড়বে না !”
ফোন রেখে দিল সোমনাথ । চোখে মুখে যেন একটা আশার আলো । গলা অনেক স্বাভাবিক । বলল, “স্যার – আমাদের একজন ইনফর্মার কল করেছিল । বীরেন্দ্র মঞ্চের কাছে একটা গলিতে নাকি একটা লোক থাকে । লোকটির গতিবিধি নাকি অত্যন্ত সন্দেহজনক !”
কুণালের গলার স্বর গম্ভীর হল – “কীরকম ?”
“দোতলা একটা বাড়িতে থাকে । বহু পুরনো বাড়ি একা একাই থাকে, কারো সাথে মেলামেশা করে না । কেউ অতটা খোঁজখবরও রাখে না । এটুকু জানা যায়, লোকটা ক্ষ্যাপাটে ধরনের । আলট্রা লেফট । এখনো ওই চারু মজুমদারের ideology আঁকড়ে পড়ে আছে । টুকটাক কবিতা লেখে । কাজকর্ম কি করে না করে কেউ জানে না । মালটা সাইকো বলেই মনে হয় !”
“আলট্রা লেফট হওয়া আর কবিতা লেখা কিংবা isolated থাকা কি অপরাধ যে সন্দেহ করব ?”
“না স্যার – আমি সেটা বলছি না । মানে – খুনের রাতে নাকি লোকটা বাইরে বেরিয়েছিল । অনেক রাতে নাকি লোকটা বাড়ি ঢোকে । পাড়ার একটা লোকের insomnia আছে, সেদিন রাত প্রায় দেড়টা নাগাদ নাকি জানালার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, এমন সময় লোকটিকে বাড়ি ফিরতে দ্যাখে । শুধু তাই নয়, আরও জানা গেছে যে লোকটি নাকি এরকম মাঝে মাঝেই রাতের বেলা বাইরে বেরোয় !”
কুণাল কিছু একটা ভাবল ।
“ধন্য আপনারা সবাই । রাতের বেলা একটা লোক বাইরে বেরোয় আর আপনারা কেউ তাঁর টিকিও ছুঁতে পারেন না । লোকটা সাইকো কীনা জানি না তবে অত্যন্ত চালাক সেটা আমার এটুকু শুনেই মনে হচ্ছে । অবশ্য আপনাদের গাফিলতিও তার জন্য দায়ী !”
কেউ কোনও কথা বলে না । কুণাল কিছুক্ষণ কি যেন ভাবে । তারপর ঘড়ি দ্যাখে । সকাল এগারোটা ।
“ইন্সপেক্টর ভদ্র –”
“স্যার !”
“এক্ষুনি চলুন, আপনার ইনফর্মারের সাথে কথা বলতে হবে । তারপর অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা । সময় হাতে খুব কম । খাস্তগীর, তুমিও আমার সাথে থাকবে । আর আপনাদের সবাইকে বলছি, এলাকায় নজরদারি আরও কড়া করুন । একটা মাছিও যেন চোখ এড়িয়ে যেতে না পারে । নইলে আপনাদের তরফ থেকে অসহযোগিতা আর শিথিলতার অভিযোগে আমায় রণে ভঙ্গ দিয়ে হেডকোয়ার্টারে সারেন্ডার করতে হবে, তারপর আপনারা কীভাবে নিজেদের সামলান দেখব !”
সবাই চুপচাপ বেরিয়ে গেল । এটা আশ্বস্ত করে গেল যে এবার থেকে এলাকা নিরাপত্তা বেষ্টনীতে মুড়ে ফেলা হবে । কোনোরকম সন্দেহ হলেই সাথে সাথে ব্যবস্থা নেওয়া হবে ।
খাস্তগীর আর সোমনাথকে নিয়ে গাড়িতে উঠল কুণাল । কুণাল নিজেই গাড়ি চালানো পছন্দ করে তাই ড্রাইভার রাখে না । গাড়ি স্টার্ট দিল, পেছনে খাস্তগীর আর সোমনাথ । সামনে একটা বিপন্ন শহর, আতঙ্কের শহর – অসুখ করেছে শহরটায় ।

(১৫)
ছেলেটির বয়স তিরিশের নীচে । একদম ক্যাজুয়াল আচরণ । গুটখা চিবোয় । চোখ দুটো খুব উজ্জ্বল । নাম আনোয়ার । খুব বুদ্ধিমান আর করিৎকর্মা ছেলে । একটা গ্যারেজে কাজ করে আর পাশাপাশি পুলিশের টিকটিকির কাজ করে কিছু উপরি রোজগার করে । বেশ গরীব ঘরের ছেলে ।
সোমনাথের কাছে শোনা কথাগুলো কুণাল আরেকবার মনোযোগ দিয়ে শুনল আনোয়ারের কাছ থেকে । একই জবানী । সবকিছু শুনে কুণাল বলল, “আচ্ছা আনোয়ার – লোকটার background, family life সম্পর্কে কিছু জানতে পারলে ?”
আনোয়ার একটু ভেবে বলল, “হ্যাঁ কিছুটা জেনেছি । সেটা আপনাদের কতটা কাজে লাগবে জানি না যদিও –”
সোমনাথ পাশ থেকে বলল, “যা জানো তাই বলো না ! আমাদের কোনটা কাজে লাগবে আর কোনটা লাগবে না সেসব নিয়ে তোমার না ভাবলেও চলবে !”
আনোয়ার বলল, “বেশ । যতদূর শুনলাম – লোকটার মা সম্পর্কে কিছু খুব একটা জানা গেল না । তবে লোকটার বাবা নাকি সুইসাইড করেছিল । প্রায় পঁচিশ বছর আগে !”
“সুইসাইড !” – কুণালের ভ্রু কুঁচকে গেল ।
“হ্যাঁ স্যার – অনেকে বলে মায়ের কিছু একটা ঘাপলা কেস ছিল তাই হয়তো…..। আবার অনেকে বলে বাবার ব্যবসা হঠাৎ ডুবে যায়, অনেক ধারদেনা হয়ে যায়….সঠিক কারণ জানা যায় না যদিও…..”
“লোকটির বয়স কত ?”
“কত আর হবে ? এই আপনাদের মতোই হবে !”
“তাহলে তো লোকটার বাবা যখন মারা যায় তখন সে দশ বারো বছরের বেশি হবে না । ওই বয়সে বাবা মারা যাওয়ার পর মানুষ হল কার কাছে ?”
“সেটা জানতে পারিনি স্যার । তবে আর একটা কথা জানতে পেরেছি – লোকটার নাকি একটা নাং আছে । প্রায়ই তার সাথে লোকটাকে এখানে ওখানে ঘুরতে দেখা যায় । তবে লোকটার মত হাভাতে টাইপ নয়, যথেষ্ট ভাল ঘরের মেয়ে – মানে – বৌ !”
“বৌ !”
সোমনাথ হেসে ফেলল – “পরকীয়া ! এখন তো লিগাল !”
কুণাল বলল, “আমার যা জানার ছিল জানা হয়ে গেছে । আর কিছু জানার নেই । তেমন বুঝলে আমি ইন্সপেক্টর ভদ্রর মাধ্যমে আনোয়ারের সাথে যোগাযোগ করে নেব !”
আনোয়ার কপালের কাছে হাত উঁচিয়ে বলল – “সেলাম স্যার !”
সোমনাথ একটা পাঁচশো টাকার নোট এগিয়ে দিল আনোয়ারের দিকে । আনোয়ার সেটা নিয়ে চলে যাচ্ছিল । কুণাল ডাকল । একটা দু’ হাজার টাকার নোট দিল ওকে । সবাই হতবাক, আনোয়ার নিজেও হতবাক । কুণাল হাসল – “রেখে দাও । কাজে লাগবে !”
আনোয়ার সেলাম করে বেরিয়ে গেল ।
সোমনাথ বলল – “স্যার এতগুলো টাকা……..”
“গরীব মানুষ । দুটো দিন ভাল খেয়ে পরে থাকুক ।………দেখলে খাস্তগীর, একটা ক্ষ্যাপাটে লোক নাং জুটিয়ে নিল । আর তুমি – এই উর্দি গায়ে চাপিয়েও এখনো পর্যন্ত ব্রহ্মচারীই থেকে গেলে । শেম অন ইউ !”
খাস্তগীর লাজুক হাসল ।
সোমনাথ বলল, “এখন আমার কি করনীয় স্যার ? লোকটিকে তুলে এনে রাম্পাট ক্যালালেই মনে হয় সব কথা বেরিয়ে যাবে !”
কুণাল সোমনাথের চোখে চোখ রাখল – “কোনও প্রমাণ নেই, শুধুমাত্র সন্দেহের বশে কাউকে তুলে আনবেন ! ইনফর্মার সঠিক রিপোর্ট দিল নাকি আমাদের মিসগাইড করল সেটা যাচাই করার দরকার নেই ?”
সোমনাথ থতমত খেয়ে গেল । কিছু বলতে পারল না ।
খাস্তগীর বলল – “তার মানে আনোয়ার – !”
“কিছুই বিচিত্র নয় খাস্তগীর ! চোখ কান খোলা রাখতে দোষ কি ?”
সোমনাথ একটু কেমন ঘেঁটে গেল । বলল, “যা সালা – তাহলে ওকে খামোখা আড়াই হাজার টাকা দেওয়ার কি মানে !…..এক্ষুনি মালটাকে থানায় নিয়ে গিয়ে –”
কুণাল কথা শেষ না করতে দিয়েই খেই ধরে নিল, “-রাম্পাট কেলাবেন । তাই তো ? এই পলিটিকাল নেতাদের muscle man-এর কাজটা করতে করতে না শান্তিবাহিনী থেকে অশান্তিবাহিনীতে পরিণত হয়েছেন আপনারা কেউ কেউ । আর আপনাদের জন্যেই ডিপার্টমেন্টের এত বদনাম ! আপনি এখন আসুন । আপনার কাজ আপনি করুন । আমার কাজ আমাকে করতে দিন । সময় হলে আমি আপনাকে ইনফর্ম করব !”
সোমনাথ চলে গেল । গাড়িতে হেলান দিয়ে কিছু একটা ভাবছে কুণাল । খাস্তগীর বলল, “লোকটা টপ টু বটম corrupted ! একদম সহ্য হয়না আমার !”
কুণাল হেসে বলল, “এরকম কত বোকাচোদা উর্দি গায়ে মাস্তানি, তোলাবাজি করে চলেছে আর নেতা মন্ত্রীদের তলা চাটছে রোজ – যে সিস্টেমের আগামাথা সবটাই corruption-এ ছেয়ে গেছে সেখানে এই রকম সোমনাথ ভদ্রের সংখ্যা তো বাড়বেই । এটা না তুমি আটকাতে পারবে না আমি । আমরা যেটা পারব সেটাই বরং করি ।……শোনো খাস্তগীর, আমি লোকটার বাড়ি যাচ্ছি । এখনই । তবে পায়ে হেঁটে । তুমি গাড়িটা নিয়ে ওদিকটায় গিয়ে দাঁড়াও ।”
চাবিটা খাস্তগীরের দিকে ছুঁড়ে দিল কুণাল । খাস্তগীর বলল, “আপনি একা একা – যদি কিছু বাওয়াল হয়…….”
একটু হেসে গাড়ির দরজা খুলে ড্যাশবোর্ড থেকে সার্ভিস রিভলভারটা বের করে পকেটে ঢুকিয়ে নিল কুণাল । খাস্তগীর একটু উত্তেজিত হল । একটু নার্ভাসও । আসলে ও বুঝতেই পারল না কি হতে চলেছে । কুণাল একটু হেসে এগিয়ে গেল সামনের দিকে ।

 

 




 

 

(১৬)
কুণালকে ভাল করে জরিপ করছে প্রভাস । ব্যাক ব্রাশ করা চুল, চোখে চশমা, জিন্স আর শার্ট পরনে । চোখে মুখে একটা অদ্ভুত শার্পনেস । তবে পুলিশ কম কলেজের প্রফেসর বেশি মনে হয় ।
এক ঝলকেই প্রভাস আর প্রভাসের বাড়িটা ভাল করে দেখে নিয়েছে কুণাল । ওর পুলিশি অভিজ্ঞতায় বেশিক্ষণ সময় লাগে না একটা আন্দাজ করে নিতে । প্রভাসের বাড়িটা বেশ পুরনো, সরু সিঁড়ি সরু প্যাসেজ । এখানে ওখানে পলেস্তারা খসে পড়েছে । দৈন্যের ছাপ স্পষ্ট । অথবা হয়তো টাকা আছে কিন্তু গাফিলতি । প্রভাসের নীচের তলায় দুটো ঘর আর রান্নাঘর । দোতলায় দুটো ঘর আর বাথরুম, একটা সরু বারান্দা । ঘরগুলো স্যাঁতস্যাঁতে এলোমেলো অবিন্যস্ত । এই ঘরটা ওর নিজের বোঝা যায় । দেওয়াল জুড়ে মার্ক্স, লেনিন, চে-র পোস্টার । ঘরে ইতি উতি ছড়ানো বই । সেখানে Communist Manifesto, Das Kapital, On Guerilla Warfare, On Protracted War, কি করিতে হইবে-র মত বইপত্র ছড়ানো । সত্তরের দশক হলে এই অভিযোগেই গ্রেফতার করা যেত প্রভাসকে । কিন্তু এখন সময় পাল্টেছে, পরিস্থিতি পাল্টেছে । চোখে পড়ল নবারুণ ভট্টাচার্য, বিনয় মজুমদার, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, দীনেশ দাশ, মলয় রায়চৌধুরী, অ্যালেন গিন্সবার্গের কবিতার বই । নকশালপন্থী frustration-এর ছাপ স্পষ্ট । এসব লোক একটা সংসদীয় গণতান্ত্রিক দেশে থাকবে খাবে আর সশস্ত্র আন্দোলনের জিগির তুলবে । সাগিনা মাহাতো ছবিতে অনিল চট্টোপাধ্যায় অভিনীত অনিরুদ্ধ চরিত্রটির কথা মনে পড়ল । এসব লোক হয় উন্মাদ নাহয় লোভী । এরা নৃশংস ।
ঘাড় ঘোরাতেই কুণালকে অবাক করে দিয়ে বইয়ের র্যানকের এক কোণে জ্বলজ্বল করে দেখা দিল এক খণ্ড রবীন্দ্র রচনাবলী !
“আর কিছু জিজ্ঞেস করার আছে ?”
কুণাল চোখে চোখ রাখল প্রভাসের ।
“আপনার একজন প্রেমিকা আছে শুনলাম ? পরকীয়া ?”
“আইনত তো সেটা অপরাধ নয় বলেই জানি ।”
কুণাল থমকে গেল । প্রভাস লোকটি যেন কেমন । কখনো কখনো এত সংযত, বুদ্ধিদীপ্ত আর যুক্তি দিয়ে কথা বলে যে মনে হয় লোকটি মোটেই উন্মাদ নয়, আবার কখনো কখনো এমন আচরণ করে মনে হয় এই লোকটি সুস্থ হতে পারে না । Split Personality ? নাকি পুরোটাই অভিনয় ? না, লোকটির ওপর সন্দেহ আরও বেড়ে গেল । কারণ এখনো পর্যন্ত কুণালের একটা ঝাপসা ধারণা হয়েছে মাত্র । কুয়াশা । কুয়াশার ও পারে কি আছে ?
কুণাল উঠে দাঁড়াল । এমন সময় বিছানায় রাখা ফোনটা বেজে উঠল । ছোট ডিসপ্লেতে একটা নাম ফুটে উঠল – Lily । কুণাল সেদিকে তাকাতেই সঙ্গে সঙ্গে ফোনটা তুলে কেটে দিল প্রভাস । মুহূর্তের মধ্যেই ঘটে গেল ঘটনাটা । প্রভাস কুণালের দিকে তাকায় । একটা চাপা ভয়, একটা উত্তেজনা, একটা চাপা রাগ । কুণাল মনে মনে হাসল ।
“লোকাল থানাতে না জানিয়ে শহরের বাইরে বেরোবেন না !”
“রাষ্ট্রের কোনও রাইট নেই ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার । যে রাষ্ট্র এরকম করে তার গাঁড় মারি সালা ! পুলিশ কোথাকার কোন বড় বাল রে !”
কুণাল বুঝল এর সাথে কথা বলে লাভ নেই । আবার পাগলামি করছে । বেরোতে যাবে এমন সময় একটা বড় ছুরি চোখে পড়ল । ভ্রু কুঁচকে গেল । চোখে ভেসে উঠল মেয়েগুলোর গলার ক্ষত । এরকমই একটা বড় ছুরি দিয়ে করা ক্ষত সম্ভবত । এই ছুরিটা এখানে কেন ? কোথাও কোনও ফলের ঝুড়ি বা সব্জির ঝুড়ি তো চোখে পড়ছে না । আর তাছাড়া ছুরিটা যদি রান্নার কাজে ব্যবহার হয়েই থাকে তাহলে এটা রান্নাঘর বা খাবার টেবিলে না থেকে এই শোবার ঘরে কেন ? কোন কাজে লাগে এখানে এই ছুরি ? কুণালের হাত ছুরিটার দিকে এগিয়ে গেল ।
তখনই ঘটল ঘটনাটা – বিদ্যুতের ঝলকের মত । গুলির বেগে এসে ছুরিটা তুলে নিল প্রভাস । তারপর সেটা উঁচিয়ে ধরল কুণালের দিকে । চোখ মুখ পুরো পাল্টে গেছে । একটা হিংস্রতা একটা রাগ একটা নৃশংসতা ফুটে বেরোচ্ছে চোখমুখ থেকে ।
“বিপ্লব আসবে অফিসার । বিপ্লব আসবেই । মহান কমরেড লেনিন, কমরেড চে, কমরেড মাও, কমরেড স্তালিনদের পথ ধরেই বিপ্লব আসবে । সেদিন সব ভেদাভেদ ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যাবে । মেহনতী মানুষ নিজের ভাগ্য নিজে তৈরি করবে । ওপরতলায় ঠাণ্ডা ঘরে বসে কিছু লোক কিছুতেই পারবে না সব ঠিক করে দিতে । কিছুতেই না । একদিন জনজোয়ারের মতোই আসবে বিপ্লব । যে বিপ্লবে ভেসে গিয়েছিল বাস্তিল দুর্গ, জারের শীতপ্রাসাদ, বাতিস্তার সেনাবাহিনী, দেন দিয়েমের সরকার……বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ………….
কিছু একটা পুড়ছে
আড়ালে, বেরেতে, তোষকের তলায়, শ্মশানে
কিছু একটা পুড়েছেই
আমি ধোঁয়ার গন্ধ পাচ্ছি
বিড়ি ধরিয়েছে কেউ
কেউ উবু হয়ে ফুঁ দিচ্ছে উনুনে
কেউ চিতায় তুলে দিয়েছে
আন্ত্রিক রোগে মৃত শীর্ণতম শিশু
ওলট পালট খাচ্ছে জ্বলন্ত পাখি

কোথাও গ্যাসের সিলিণ্ডার ফেটেছে
কোথাও কয়লাখনিতে, বাজির কারখানায় আগুন
কিছু একটা পুড়ছে
চার কোনা ধরে গেছে
জ্বলন্ত মশারি নেমে আসছে ঘুমের মধ্যে
কিছু একটা পুড়ছে
ক্ষুধায় পুড়ছে নাড়ি, অন্ত্রেরা
ভালোবাসায় পুড়ছে যুবক

পুড়ছে কামনার শরীর, তুষ, মবিলে ভেজানো তুলো
কিছু একটা পুড়ছেই
হল্কা এসে লাগছে আঁচের
ইমারত, মূল্যবোধ, টাঙানো বিশাল ছবি
প্রতিশ্রুতি, টেলিভিশন, দুপ্তপ্রাপ্য বই

কিছু একটা পুড়ছে
আমি হাতড়ে হাতড়ে দেখছি কী পুড়ছে
কিছু একটা পুড়ছে
কী ছুঁয়ে হাতে ফোস্কা পড়ছে
কিছু একটা পুড়ছে, গনগন করছে
চুপ করে পুড়ছে, মুখ বুজে পুড়ছে
ঝড় যদি ওঠে তাহলে কিন্তু দপ করে জ্বলে উঠবে

কিছু একটা পুড়ছে বলছি
দমকলের গাড়ি, নাভিকুণ্ডল, সূর্য
কিছু একটা পুড়ছে
প্রকাশ্যে, চোখের ওপর
মানুষের মধ্যে
স্বদেশ!
দরজা খুলে রাস্তায় নেমে এল কুণাল । প্রভাস এখনো কি সব চিৎকার করে যাচ্ছে আর খিস্তি দিয়ে যাচ্ছে । প্রভাস যে শিক্ষিত এটা নিয়ে কুণালের আর দ্বিমত নেই কোনও । কিন্তু…..ওই ছুরিটাই সব কেমন এলোমেলো করে দিচ্ছে…..
আর প্রভাসের সাহস । সাধারণত লাথখোর লোক হলে পুলিশ নাম শুনলেই কাপড়ে চোপড়ে হয়ে যায় । কিন্তু এই লোকটি সম্পূর্ণ অন্যরকম ।
প্রভাস আসলে কি……পাগল নাকি শয়তান ?

(১৭)
“Schizophrenia……আমার তো সেটাই ধারণা মিঃ প্রধান । Split personality জিনিসটাও আসলে তার একটা পার্ট । একটা হ্যালুসিনেশনে থাকা…..নিজের একটা আলাদা জগত তৈরি করে রাখা যা কীনা বাস্তবের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা । আসলে ওই জগতটা হল সেই মানুষটার একটা refuge, একটা shelter । ধরে নেওয়া যায় সিজফ্রিনিক একজন মানুষের জন্ম হয় অতীতে তার সাথে ঘটে যাওয়া কোনও এক দুর্ঘটনা অথবা একের পর এক দুর্ঘটনা । এমন কোনও ঘটনা যা তাঁকে মারাত্মক ভাবে নাড়া দিয়েছে । যে ঘটনার জন্য বাস্তবের প্রতি তৈরি হয়েছে একটা তিক্ততা । বাস্তব থেকে পালিয়ে বেড়ানোর প্রবণতা তৈরি হয়েছে ।……নকশাল জমানা একটা অন্যরকম রোম্যান্টিক জমানা । এই ধরনের উগ্র romanticism একটা sublimity তৈরি করে । যে কোনও বিপ্লব আসলে একটা উচ্চাঙ্গ রোম্যান্টিক ধারণা । আর এই ধরনের রোম্যান্টিক একটা জগৎ ভীষণ make believe, superficial, illusionary, provocative, fasntasy…….অতীতে ঘটে যাওয়া তার সাথে কোনও অন্যায় কোনও অবিচার, যার সুরাহা সে বাস্তব জগতে থেকে করতে পারেনা…সেই জগতে গিয়ে সে সেটি করে । চরম শাস্তি দেয় তার প্রতি অন্যায় করা লোকটিকে ।…..এরকম একজন মানুষ সিরিয়াল কিলার হতেই পারে । সিরিয়াল কিলিংয়ের সময় তার পুরনো রাগ, প্রতিশোধস্পৃহা, killer instinct জেগে উঠতে পারে । সে তখন সম্পূর্ণ অন্য একটি মানুষ । একই দেহে দুটো সম্পূর্ণ আলাদা পরস্পরবিরোধী মানুষ বাস করছে, একই সঙ্গে । একজন আরেকজন সম্পর্কে কিছু জানে না, এমনকি একে অপরের অস্তিত্বের কথাই জানে না ।…..এই ক্ষেত্রে হাতে নাতে কাউকে না ধরতে পারলে বা অকাট্য কোনও প্রমাণ না পেলে কাউকে কিছুতেই সিরিয়াল কিলার হিসেবে প্রমাণ করা যাবে না ।………ব্যক্তির অতীত জানতে হবে মিঃ প্রধান । আমাদের অতীতই আমাদের তৈরি করে । আমাদের অতীত ঠিক করে দেয় ভবিষ্যৎ আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে । একজন হত্যাকারীর অতীতেই লুকিয়ে থাকে তার অপরাধের বীজ ।……..সময় কম মিঃ প্রধান । এই ধরনের মানসিক রোগীরা যে কোনও সময় বদ্ধ উন্মাদ হয়ে যেতে পারে । একবার উন্মাদ হয়ে গেলে কিন্তু আর কোনোভাবেই কিছু recover বা discover কিছুই করা যাবে না !……”
সাইকোলজিস্ট ডাঃ প্রসেঞ্জিৎ সিনহার কথাগুলো বারবার কানে বাজছিল কুণালের । প্রভাসও কি তাহলে সত্যি সত্যি সাইকো ? নাকি পুরোটাই ওর অভিনয় ? কীভাবে জানবে কুণাল ? কীভাবে বুঝবে ? হাতে নাতেই বা ধরবে কীভাবে ? এখনো তো সিরিয়াল কিলারের লাইন অফ অ্যাকশন-টাই ট্রেস করতে পারেনি সে । সন্দেহের ওপর ভর করে যদি কিন্তুর ওপর নির্ভর করে সবটা ভাবতে হচ্ছে । এখনো সামনে অনেক প্রশ্ন…..অনেক………..
প্রভাস কি সত্যি পাগল ? প্রভাস কি সত্যি সত্যি খুনি ? শ্যামবাজারে মনামি বলে শেষ যে মেয়েটি খুন হয়েছে তাঁকে নাহয় খুন করাটা প্রভাসের পক্ষে সহজ ছিল, কারণ সে ছিল এলাকার মেয়ে । কিন্তু অত রাতে গোলপার্ক, সল্টলেক, গোরাবাজার, যাদবপুর, কালিকাপুর….এসব জায়গায় সে যাবে কীভাবে ? কীভাবে সম্ভব ? অত রাতে গাড়ি ঘোড়া চলে না । ওর নিজের একটা সাইকেলও নেই । তাহলে ?….তাহলে কি অন্য কেউ যুক্ত আছে প্রভাসের সাথে ? নাকি খুনের সাথে প্রভাস কোনোভাবেই জড়িয়ে নেই ?….নাকি অন্য কিছু রহস্য লুকিয়ে আছে যা কুণাল কিছুতেই আঁচ করতে পারছে না ! আচ্ছা প্রভাস যদি সত্যিই উন্মাদ হত তাহলে কি একজন মহিলা তার সাথে সম্পর্ক রাখত ? সেই মহিলা যেই হোক যেমনই হোক, পাগল তো আর নয় যে একজন উন্মাদের সাথে যোগাযোগ রাখবে ! তাহলে কি প্রভাস উন্মাদ নয় ? আচ্ছা, প্রভাস কি মাওবাদী ? নিছকই Urban Naxal নাকি সে আসলে কোনও নিষিদ্ধ সংগঠনের সাথে যুক্ত ? কিন্তু বাড়িতে লেনিন, মার্ক্স বা মাওয়ের বই থাকা মানেই তো আর উগ্রপন্থী হবে তার কোনও মানে নেই । নকশালপন্থী মানসিকতা থাকা আর মাওবাদী হওয়ার মধ্যে তফাৎ আছে । একটা মাত্র ছুরি….হ্যাঁ…স্রেফ একটা ছুরি……সেটাই সব কেমন এলোমেলো করে দিচ্ছে…..আর এলোমেলো করে দিচ্ছে……………..
ঊর্মিলা ঘরে ঢুকল । কুণাল থার্ড পেগ রেডি করছিল । ঊর্মিলা বলল, “তুমি কিন্তু আজ বেশি খাচ্ছ কুণাল !”
কুণাল হাসল ।
“থার্ড পেগ অনলি !”
“বয়সটা বাড়ছে ভুলে যেও না !”
“রাতটাও যে বাড়ছে ঊর্মিলা । রাত বাড়া মানেই যে একটা আতঙ্ক, একটা ভয়……একটা ত্রাস ঘুরে বেড়াচ্ছে শহরে, রাতের অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে, যার ছায়া পড়ে না, যার শব্দ নেই, যার শরীর নেই…..কিন্তু সে আছে…..আমাদের মধ্যেই আছে……………………..”
“সিরিয়াল কিলার করে করে মাথাটা গেছে । এই শোনো, এই পেগটা খেয়ে ডাইনিং টেবিলে এসো । ডিনার রেডি করছি ।”
ঊর্মিলা চলে গেল । থার্ড পেগে চুমুক দিল কুণাল । এক টুকরো সালামি ফ্রাই মুখে দিতে যাবে এমন সময় একটা জিনিস হঠাৎ মাথার মধ্যে খেলে গেল । মাথার মাঝখানে যেন বাজ পড়ল । চোখ বড় বড় হয়ে গেল কুণালের ।
পাশে রাখা ফোন তুলে ডায়াল করল খাস্তগীরকে ।
“হ্যালো খাস্তগীর…..Yes it’s urgent………….শোনো আমার মনে হচ্ছে আগামী এক সপ্তাহ আমাদের খুব সাবধানে থাকতে হবে……আমার sixth sense বলছে এর মধ্যেই আরও একটা খুন হতে চলেছে ।……..Right ! দ্যাখো prevention is better than cure…….Right…….যেভাবেই হোক খুনিকে হাতে নাতে ধরতে হবে । That’s final !”
ফোনটা রেখে দিল কুণাল । ওর চোখের তারা চিকচিক করে উঠল । চোখের পাতা ঈষৎ কাঁপছে । চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল !…….

 

 




 

 

(১৮)
হোটেলের রুমটা বেশ ঝাঁ চকচকে । নরম গদির দামী বিছানা । বাইরে যতই গরম পড়ুক, এসি ভেতরটাকে একদম ঠাণ্ডা করে রেখেছে । ঠাণ্ডা নরম বাতাসে কেমন যেন আরাম লেগে আছে, আদর লেগে আছে, ভালোবাসা লেগে আছে ।
প্রভাসের পিঠে লিলির নখ বসে যাচ্ছে । লিলির শীৎকার প্রভাসের উত্তেজনাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে । প্রভাসের মধ্যে যেন একটা পাগল ভর করেছে । উন্মাদ ঢেউয়ের মতোই বারবার আছড়ে পড়ছে লিলির বেলাভূমিতে, লিলিকে ক্ষতবিক্ষত করেই তার সুখ । লিলি নিজেকে ছেড়ে দিয়েছে পুরোপুরি । লিলি কি মিষ্টি ! লিলি কি সুন্দর ! লিলির বুকে কি সুন্দর ভিজে গোলাপের গন্ধ ! লিলির কাছে প্রভাস যেন এক আগ্নেয়গিরি, যার উষ্ণ লাভার প্রস্রবণ লিলির নারীত্বকে শান্ত করে প্রশমিত করে । শরীরের প্রতিটি কোষ থেকে যেন আগুন ঝরে পড়ছে । সব হিসেব নিকেশ ঠিক ভুল – সবকিছু আজ এই মুহূর্তে এসে এলোমেলো হয়ে যাক ।
প্রভাস ক্লান্ত হয়ে আসে । লিলিও তৃপ্ত । যা সে এতদিন ধরে কামনা করে এসেছে, প্রভাস আজ দু’ হাত ভরে দিয়েছে । এলোমেলো চুলে ঢেকে থাকা লিলির মুখ, লিলির ঠোঁট কামড়ে ধরল প্রভাস । আবার একবার বিদ্যুতের ঝিলিক খেলে গেল লিলির শরীরে ।
ঘণ্টা কয়েক পর জামাকাপড় পরে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে লিলি বলল, “এটা রাখো !”
দুটো পাঁচশো টাকার নোট এগিয়ে দিল প্রভাসের দিকে । প্রভাস হাসল । বলল, “আমি জিগোলো নই লিলি । আমি তোমায় ভালোবাসি । টাকাটা রাখো, অন্য কোনও সময় চেয়ে নেব । আগেরদিন যে টাকা দিলে সেটা এখনো আছে ।”
লিলি প্রভাসের গালে হাত রাখল । চোখ ছলছল করছে । ধরা গলায় বলল, “আমি আর তুমি আলাদা নই প্রভাস । আর কেউ তোমায় বুঝুক না বুঝুক, আমি বুঝি । যে কোনও সময় যে কোনও দরকারে আমায় একটা বার বোলো প্রভাস । প্লীজ !”
প্রভাস হাসল –
যদি সারাদিন তাঁকে কাছে পাওয়া যেতো
শুনেছি ছিলেন তিনি গাছের বাকলে গা এলিয়ে
যতটুকু ছায়া তাঁর প্রয়োজন, ছিলো ততটুকু
দক্ষিণ হাওয়ায় উড়ে শুকনো পাতা আসে তাঁর কাছে
যেন নিবেদন, যেন মন্ত্র ভাষা ছিন্নভিন্ন মালা
তাঁর জন্য ঐ দূর মাঠের রোদ্দুরেও ছিলো জ্বালা
কিছুটা রোদ্দুরে হেঁটে, খালি পায়ে পড়েছেন শুয়ে –
নিদ্রা নয়, ধ্যান নয়, বেদনার ব্যথার ভিতরে
মনোকষ্ট বুকে নিয়ে শুয়ে রয়েছেন একা একা ।

যদি সারাদিন তাঁকে কাছে পাওয়া যেতো
কাছে পেতে গেলে কাছে যেতে হয়, এভাবে চলে না
হাতের সমস্ত সেরে, ধুয়ে-মুছে সংসার, সমাধি –
গুছিয়ে-গাছিয়ে রেখে, সাধে ঢেকে – তবে যদি যাও
দেখবে, দাঁড়িয়ে আছে গাছ একা দৃষ্টি ক’রে নিচু
যেতেও হয়নি তাঁকে, এসেছিলেন তিনি সময়ে
গেছেন সময়ে চলে, সেই পথে, যে-পথে যাবার ।
প্রভাসের চোখে একটা অদ্ভুত দৃষ্টি । এক রহস্যময় দৃষ্টি ।

(১৯)

কুণাল আজ একটা চাপা উত্তেজনায় কাঁপছে । আনোয়ার জানিয়েছে দিনকয়েক ধরেই কেমন একটা অদ্ভুত আচরণ করছে প্রভাস । মাঝে মাঝে রাতে একা ঘরে চিৎকার করে । কেমন যেন একটু হিংস্র হয়ে গেছে । এরই মাঝে একদিন নাকি ওই লিলি নামের মহিলাটির সাথে প্রভাসকে একটা হোটেলে ঢুকতে দেখা গেছে । কেন সেটা বুঝতে কষ্ট হয় না । খুব সম্ভবত এই মহিলার প্রচুর টাকা । ডিভোর্সি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি । আর সেই টাকাতেই প্রভাসের চলে । বিনিময়ে ভদ্রমহিলার শরীরের দাবী মেটাতে হয় তাঁকে । অথবা অন্য কোনও গল্প অথবা কোনও ব্ল্যাকমেইল থাকতে পারে এই গল্পে ।
গত কয়েকদিন ধরেই নানারকম নানা কিছু মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে । কখনো মনে হচ্ছে ‘লেডি কিলার’-কে ধরার একদম ব্রাহ্মমুহূর্তে এসে দাঁড়িয়েছে সে, আবার কখনো মনে হচ্ছে দিল্লী এখনো অনেক দূর । একটা দোলাচলের মধ্যে আছে সে । তার সিক্সথ সেন্স বলছে আজ রাতে কিছু একটা ঘটবে । বারবার মনে হচ্ছে ।
ঊর্মিলা লক্ষ্য করেছে কুণালের এই পরিবর্তন । একটা উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা ওকে ঘিরে ধরে । কুণালের জন্যে ভয় হয় ঊর্মিলার । ঊর্মিলা জানে, সে ছাড়া কুণালের এই পৃথিবীতে কেউ নেই । কুণালও তাঁকে বুক দিয়ে আগলে রেখেছে । দুজন মানুষ ছাড়া দুজনের কেউ নেই । কুণালের জন্যে বুক কেঁপে ওঠে এক অজানা আশঙ্কায় ।
রাত তখন অনেক । ভাল লাগছে না । ছাদে কুণাল পায়চারী করছে একা একা । ঊর্মিলা স্বামীর প্রকৃতি জানে, তাই কোনও কেস নিয়ে ব্যস্ত থাকলে খুব বেশি বিরক্ত করে না । মাথার ওপর ঝকঝকে কালো আকাশ, অসংখ্য তারা ঝিকমিক করছে । চুরুট খাচ্ছে কুণাল । চেয়ে আছে বড় রাস্তার দিকে ।………….

(২০)
নিউ আলিপুর । গোটা শহরের মত এই এলাকাতেও পাহারার কড়াকড়ি আছে । তার মধ্যেই অলিগলি দিয়ে আর কিছু পুলিশ কর্মীর গাফিলতিকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত হেঁটে চলে গেল প্রভাস । হেঁটে চেতলার কাছে ব্রিজটা ধরল । একটু গিয়েই ব্রিজ থেকে নীচে নেমে গেল । আর একটু সামনে গেলেই রেল লাইন । রেল লাইন থেকে আর কিছুটা দূরে আছে প্রভাস । পেছনে তাকিয়ে দেখল কেউ কোথাও নেই । যে ছিল, চলে গেছে সে-ও । একটা বন্য উন্মাদনা, হিংস্র প্রতিহিংসা যেন মাথা চাড়া দিয়ে উঠল ।
কাছেই একটা রাস্তার কাছে একটা ক্যাব থেকে একটি মেয়ে নামল । IT-তে চাকরি করে । ড্রপ করে দিল কোম্পানির ক্যাব । রাত এখন প্রায় তিনটে । শুনশান চারপাশ । এমনিতেই ‘লেডি কিলার’-এর তাণ্ডব শুরু হওয়ার পর রাতের বেলা লোকজনের আনাগোনা কমে গেছে, বিশেষ করে মেয়েদের । কিন্তু অহনার মত মেয়েদের কিছু করার নেই । চাকরি বলে কথা ।
দ্রুত পা ফেলে হাঁটছে অহনা । গাড়িটা অন্যদিন ওকে বাড়ির সামনেই নামিয়ে দেয়, কিন্তু গত সপ্তাহ থেকে রাস্তার কাজ চলছে তাই গাড়ি বড় রাস্তা থেকে ভেতরে ঢুকতে পারবে না । তাই এই বিপত্তি ।
এমন সময়…….
এক কানফাটানো বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল চারপাশ । আর…….অহনা চমকে উঠল । কাছ থেকেই শব্দটা এল না ? ওই রেল লাইনের ওদিক থেকে ? কে করল এই কাজ ? কোনও লোকাল গ্যাং ? নাকি কোনও জঙ্গি সংগঠন ? অহনার ভয়ে বুক কাঁপতে থাকল । চারপাশে একটা কেমন হইহই পড়ে গেল । অনেকে এদিক ওদিক থেকে ছুটে বেরিয়ে গেল, কারো দিকে কারো দেখার সময় নেই । অহনা যেন কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল । আচমকা এ পাশের কারেন্ট চলে গেল । অহনার কাঁধে কেউ হাত রাখল । আর কিছু বুঝে ওঠার আগেই……..
……অহনার গলা কাটা মৃতদেহটা কাটা কলাগাছের মত রাস্তায় পড়ে গেল । চোখ যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসছে ।
অহনা সেনগুপ্ত….বয়স একত্রিশ…..সামনের মাসেই বিয়ে হওয়ার কথা ছিল……বাড়ি নিউ আলিপুর…….Victim Number Seven……….

 




 

 

(২১)
খাস্তগীর দরজায় দাঁড়িয়ে বলল, “May I come in Sir ?”
কুণাল ফাইলের পাতা ওলটাচ্ছিল । তাকাল । ইশারা করল ভেতরে আসতে ।
খাস্তগীর এল । কুণাল বসতে ইশারা করল ।
“স্যার – আপনি যা যা বলেছিলেন সেভাবেই অপারেশন চালানো হয়েছে !”
“কোনও কথা স্বীকার করেছে ?”
“বিস্ফোরণের কথা স্বীকার করেছে, কিন্তু খুনের কথা স্বীকার করেনি । আমার মনে হচ্ছে এখানে দ্বিতীয় কোনও লোকও জড়িত আছে !”
“হতে পারে । আবার নাও হতে পারে । ঘটনাস্থলে ওর ছুরিটা পাওয়া গেছে । তাই তো ?”
“ফরেন্সিক এক্সপার্ট কনফার্ম করেছে যে ছুরিতে পাওয়া হাতের ছাপ প্রভাসেরই !”
“তার মানে খুনটা নিজের হাতে সে করেছে এটা নিশ্চিত । নইলে ছুরি ওখানে আসার কথা নয় আর ওর হাতের ছাপ পাওয়ার কথাও নয় । কিন্তু তাহলে বিস্ফোরণের স্পটে ও কি করছিল ? পালাল না কেন ?”
“সেটাই তো বুঝতে পারছি না স্যার । স্যার, এতদিন ধরে যে খুনগুলো হচ্ছিল এটা কিন্তু তার চেয়ে আলাদা । দুটো দিক থেকে !”
“কীরকম ?”
“প্রথম হল victim-এর background । এই মেয়েটি কিন্তু অন্যান্যদের মত স্বভাবের নয় । যথেষ্ট নম্র স্বভাবের । গত পাঁচ বছর ধরে যে ছেলেটির সাথে সম্পর্ক তার সাথেই আগামী মাসে বিয়ে ছিল । কোনও দিক থেকেই মেয়েটির কোনও বদনাম নেই । আর দ্বিতীয় কারণ, নিঃশব্দে খুন করে পালিয়ে যায় যে খুনি সে আচমকা বিস্ফোরণ করে সবাইকে জানানই বা দিতে গেল কেন ?”
“হয়তো খুনি শেষ মুহূর্তে তার স্টাইল পাল্টাতে চেয়েছে । একজন সিজফ্রিনিক পেশেন্ট বলেই মনে হয় ওকে । আর বিস্ফোরণ ? তার দুটো কারণ হতে পারে । এক, সে সরাসরি পুলিশকে চ্যালেঞ্জ দিতে চেয়েছিল…..”
“কিন্তু তাহলে ধরা দিতে যাবে কেন ?”
“রাইট । রাইট ইউ আর । আমার মনে হয় এই ক্ষেত্রে প্রভাসের বিপ্লব নিয়ে ফ্যান্টাসিটা কাজ করেছে । ওর একটা সেলফ ছিল এই জগতে, আর একটা সেলফ ছিল অন্য জগতে ।”
ডাঃ সিনহার কথাগুলো বারবার কানে বাজছে কুণালের ।
“প্রভাস is behaving like an insane…..কিছু কথা বোঝা যাচ্ছে আর কিছু কথার কোনও মাথামুণ্ডু নেই । ওকে নাকি কেউ একটা গাড়িতে করে ছেড়ে দিয়ে গেছিল ওই স্পটে, সেই লোকটিই নাকি হ্যান্ড গ্রেনেড দিয়েছিল । ওকে নাকি বলেছিল আজ রাতেই আসবে কাঙ্খিত বিপ্লব । প্রভাসের হাত ধরেই আসবে পরিবর্তন ।…..এইসব…….”
“What ! তার মানে কি ওকে সামনে থেকে রেখে পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ছিল কোনও নিষিদ্ধ সংগঠন ? সিমি, আল কায়েদা, ইন্ডিয়ান মুজাহিদিন অথবা ধরো মাওবাদীরা ! হয়তো ওরা ভেবেছিল প্রভাসের মতন একটা সাইকো কিলারকে কাজে লাগালে কেউ সন্দেহ করবে না । কারণ প্রভাসের মত ক্ষ্যাপাটে কারো দিকে নজর থাকবে না কারো ।…..খাস্তগীর সেরকম কিছু হলে তো মারাত্মক কাণ্ড ঘটবে ! না না, আমায় এই মুহূর্তে দিল্লীতে ইনফর্ম করতে হবে । তুমি এক কাজ করো –”
খাস্তগীরের ফোন বেজে উঠল । ফোন ধরল ।
“হ্যাঁ বলুন – কি !…..এক্ষুনি একবার ডাঃ সান্যালকে খবর দিন । অথরিটিকে বলুন যোগাযোগ করতে । আমি আসছি । আমি না যাওয়া পর্যন্ত কোনও রকম থার্ড ডিগ্রি নয় ।”
ফোন রেখে দিল খাস্তগীর ।
“স্যার….প্রভাস বদ্ধ উন্মাদের মত আচরণ করছে । অসংলগ্ন কথা বলছে । He has grown violent ! আমি বললাম সাইকিয়াট্রিস্টকে খবর দিতে । সেরকম হলে asylum-এ শিফট করতে হবে !”

(২২)
“বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক কমরেডস ! আমরা আজ এইখান থেকে আহ্বান করি এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের । বন্ধুরা, আর আমরা এই শোষণ মানব না । মানব না এই বৈষম্য । চারু মজুমদার, কিষেণজিদের রক্তের ঋণ শোধ করতে হবে আমাদের । দিনের পর দিন এই দেশকে শোষণ করে চলেছে এইসব ধোপদুরস্ত পোশাক পরে থাকা মঞ্চ গরম করা নেতারা । সব্বাইকে আজ দেখে নেব । বাস্তিল দুর্গ গুঁড়িয়ে গিয়েছিল, মারি আন্তনায়েত শেষ হয়ে গেছিল, জারের শীতপ্রাসাদ রক্ষা করতে পারেনি নিকোলাস । মেহনতী মানুষের সংগ্রামের রাস্তা কেউ আটকাতে পারে না । কেউ না ।
সব সালা ভদ্রলোক সেজে ভদ্রতা মারায় । কারো গাঁড়ে অত দম নেই যে রাস্তায় দাঁড়িয়ে সত্যি কথা বলে । সব সালা বোকাচোদা । সব সালা চুতিয়া । আমি বলছি, কমরেড প্রভাস বিশ্বাস, আমি বলছি বন্ধুরা – হাতে হাতে অস্ত্র তুলে নাও, চালিয়ে দাও শত্রুর বুকে । রক্ত ছাড়া বিপ্লব হয় না । বিপ্লব ছাড়া আসে না পরিবর্তন । বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস ! ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায় ! ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায় !
তফাৎ যাও তফাৎ যাও….সব ঝুট হ্যায় ! সব ঝুট হ্যায় !…..বাবাকে নিয়ে চলে গেল লাশকাটা ঘরে । ওই ছাদের কড়িকাঠ, ওই ঝুলপড়া বারান্দা, ওই যে সব ক’টা ঘর – খাঁ খাঁ করে । ফাঁকা । ফাঁকা চারপাশ । বাবাকে চলে যেতে হল – কেন ? এর জবাব কি কেউ দেবে না ! কি অপরাধ করেছিল সেই লোকটা ! তার তো কোনও অপরাধ ছিল না ! একদিন স্কুল থেকে আর পাঁচটা ছেলের মত বাড়ি এসে দেখলাম………….”
চিৎকার আর কান্নায় ভেঙে পড়ল প্রভাস । চেয়ারে হাত পা বাঁধা রয়েছে । দূর থেকে দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল কুণাল । খাস্তগীরের এবার মায়া হচ্ছে ।
“আনোয়ার বলেছিল না যে ওর বাবা আত্মহত্যা করেছিল ? আমার মনে হয় স্যার, কোনও লটঘট কেসে ওর মা ওর বাবাকে হয়তো ঠকিয়েছিল । সেই ধাক্কা সহ্য করতে না পেরেই ওর বাবা সুইসাইড করে । হয়তো তাই লুজ ক্যারেক্টারের মেয়েদের প্রতি ওর এত রাগ । তবে কেন লাস্ট মার্ডারটা…আর কেনই বা শুধু পঁচিশ থেকে পঁয়ত্রিশ…..আর মেয়েগুলোর খোঁজ পেত কীভাবে….কীভাবে গোটা কোলকাতা চষে বেড়াত….কেউ যদি ওর সাথে থেকে থাকে তাহলে সেটা কে……..এই প্রশ্নগুলো প্রশ্নই রয়ে গেল !”
“সব প্রশ্নের উত্তর বোধহয় পাওয়া যায় না খাস্তগীর । যদি আর কোনও খুন না হয় তাহলে ধরে নিতে হবে এটা একটা সল্ভড কেস । লেডি কিলার ইজ আ ক্লোজড চ্যাপ্টার ।”
“আর যদি আবার নতুন করে –”
“- তখন আবার নতুন করে হিসেব কষতে হবে । ভবিষ্যতে কি হবে তার ওপর না তোমার হাত আছে না আমার ।”
কুণালের চোখের কোণটাও কেমন চিকচিক করে উঠল । সেলের ভেতর প্রভাস তখনো কেঁদে চলেছে ।

 




 

 

(২৩)
নভেম্বর মাস । একটু ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা ভাব । শান্তিনিকেতনে একটা সেমিনার ছিল তাই ফিরতে দেরি হচ্ছে ঊর্মিলার । আসলে খুব শিগগিরই মেটারনিটি লিভ নিতে হবে ওকে । তাই সব কাজকর্ম গুছিয়ে রাখতে হচ্ছে । একটা কলেজের প্রফেসর হওয়া কি সহজ ব্যাপার ? তার ওপর সংসারটাও ওকে দেখতে হয়, কারণ কুণালের যা চাকরি তাতে কুণালের পক্ষে ঘরের কোনও কাজ করাই সম্ভব হয় না ।
অনেক রাত হয়ে গেছে । আজ হয়তো না ফিরলেই ভাল হত । অনেকেই থেকে গেছে হোটেলে । কিন্তু মন বসল না । আসলে ঊর্মিলা জানে, কুণাল ওকে চোখে হারায় । কুণাল একা একা হয়তো থাকতে পারবে কিন্তু ছটফট করবে । বেচারা ! ঊর্মিলার যে কতখানি গুরুত্ব কুণালের জীবনে, সেটা সে জানে । আর তাই বেশি টাকা দিয়ে একটা গাড়ি ঠিক করে কোলকাতায় ফিরেছে ।
সমস্যাটা হল ডানলপে নামিয়েই ফিরে যাবে গাড়িটা । বাড়ি পর্যন্ত যাবে না কারণ গাড়িটাকে এখন আবার পানাগড় ফিরতে হবে । সকালে ওটা বোলপুর গিয়ে বাকিদের পিক আপ করবে । অগত্যা কিছু করার নেই । কুণাল বলেছে ঊর্মিলাকে রিসিভ করতে আসবে । শুধু বালি ব্রীজে উঠলে ওকে একবার ফোন করে দিতে হবে, ব্যস ।
সেইমত ঊর্মিলা জানিয়ে দিয়েছে কুণালকে । এখন অপেক্ষা । ডানলপের মোড়টা ভীষণ জ্যামজটের । এত হইচই ভাল লাগে না ঊর্মিলার । ও বরাবরই একটু introvert ! একটু এগিয়ে একটা ফাঁকা জায়গা দেখে দাঁড়াল, রেলব্রিজের নীচে । কুণালের আসতে বেশি সময় লাগার কথা নয় ।
রাত এগারোটা প্রায় । রাস্তা দিয়ে বড় বড় গাড়ি যাচ্ছে আওয়াজ করে । আজেবাজে লোকজন এদিক ওদিক ঘুরঘুর করে । রাতের বেলা একজন যুবতীকে দেখলে অনেকেরই সুড়সুড় করে ওঠে । তবে ঊর্মিলা ভয় পায় না । এক দুজনকে ট্যাকল করার ক্ষমতা ওর আছে । কিন্তু যদি তেমন কোনও –
ব্যাগে হাত ঢুকিয়ে ফোন বের করল ঊর্মিলা । বেশ ক্লান্ত লাগছে । শরীরের এই অবস্থায় বেশি ধকল নেওয়াটাই হয়তো ভুল হয়েছে । তবু শীতকাল বলে বাঁচোয়া । নাম্বার ডায়াল করে কুণালকে ফোন করল ঊর্মিলা ।
আচমকা চোখের সামনে অন্ধকার নেমে এল ঊর্মিলার । এমন এক অন্ধকার যা কোনোদিনও আর কাটবে না ।
ডানলপ রেলব্রিজের নীচে অন্ধকারে পড়ে রইল ঊর্মিলার গলাকাটা দেহ !

(২৪)
শীতের রাত । বেশ ঠাণ্ডা আছে বাইরে । তবু ছাদে এসে দাঁড়িয়েছে কুণাল । চুরুট জ্বলছে ঠোঁটে । হাতে একটা হুইস্কির গ্লাস । ঘরের ভেতর যেন আজকাল দম বন্ধ হয়ে আসে । ভাল লাগে না । কিছুদিনের ছুটি নিয়েছে অফিস থেকে । এই শহর ছেড়ে কিছুদিনের জন্যে বাইরে যেতে ইচ্ছে করছে ওর । এই শহর ওর সবকিছু কেড়েছে । নিঃস্ব করেছে । একা করেছে । এই চোর পুলিশ খেলা, এই এলোমেলো জীবন – আর ভাল লাগছে না । সেরকম বুঝলে চাকরি ছেড়ে দেবে । চলে যাবে অনেক অনেক দূরে । অচেনা অজানা কোনও জায়গায় ।
চোখে জল কুণালের । আজ সবকিছু শেষ । হারিয়ে গিয়েছে । হেরে গিয়েছে । সব গল্পই একরকম ভাবে শেষ হয়না কেন ? কেন শেষ হয়ে যায় সব রূপকথা…..মাঝপথে ? চোখের সামনে একটার পর একটা দৃশ্য যেন সিনেমার মত চলছে । এর যেন শেষ নেই কোনও ।
খটকা লেগেছিল কুণালের । প্রভাসের বাড়িতে রবীন্দ্র রচনাবলী দেখে প্রথম খটকা লেগেছিল । এক খণ্ড মাত্র ! একে তো প্রভাসের চরিত্রের সঙ্গে রবীন্দ্র রচনাবলী যায় না, তার ওপর শুধু এক খণ্ড রবীন্দ্র রচনাবলী কেউ বাড়িতে সাজিয়ে রাখে না । তার ওপর….বইটা খুব চেনা চেনা লাগছিল । কোথায় যেন দেখেছে !
দ্বিতীয় খটকা লাগল ঊর্মিলার আয় ব্যয়ের হিসেব দেখতে গিয়ে, মাসে মাসে এত টাকা কোথায় খরচ করছে সে ? আর একটা জিনিস মনে পড়ে গেল, ঊর্মিলার মাসি ঊর্মিলার নাম দিয়েছিল না ‘লিলি’ ?
তৃতীয় খটকা লাগল যখন কুণাল একটা টেস্ট করিয়ে জানতে পারল ওর পক্ষে কোনোদিনই বাবা হওয়া সম্ভব নয় । কারণ ওর sperm count ভীষণ ভাবে কম । অথচ ঊর্মিলা…..তিন মাসের প্রেগন্যান্ট ছিল ।
একের পর এক ঘটনা ভেসে উঠল কুণালের চোখের সামনে ।
ঊর্মিলার ফোন হ্যাক করে ক্লোন করে একের পর এক মেসেজ আর কল রেকর্ড চেক করেছে কুণাল, আর ততই ক্ষতবিক্ষত হয়েছে । প্রভাস কি জানত ওর লিলি-র স্বামী এই কুণাল ? ও কি তবে ইচ্ছে করে…..কিন্তু ঊর্মিলা….কেন ?
সেদিন রাতে প্রভাসের বাড়ি গিয়ে প্রভাসকে ডেকে নিয়ে এসেছিল একটা লোক । মুখ ছিল ঢাকা । হাতে ছিল গ্লাভস । সেই লোকটি প্রভাসকে বুঝিয়েছিল আজ রাতে এই গ্রেনেড ফাটালেই আসবে বিপ্লব । সেই লোকটিই প্রভাসের ছুরি কায়দা করে সরিয়ে নিয়েছিল । প্রভাস জানতই না । গ্লাভস পরা হাতে লাগেনি কোনও হাতের ছাপ । সেই লোকটিই প্রভাসকে একদিকে ব্যস্ত রেখে অন্যদিকে……উদ্দেশ্য একটাই……প্রভাসের নামটা এই খেলা থেকে কেটে বাদ দেওয়া…..তাই যেভাবেই হোক দরকার ছিল একটি মেয়েকে……মেয়েটি যদিও নিষ্পাপ ছিল কিন্তু….মেয়ে তো মেয়েই………..
“And all night long we have not stirred,
And yet God has not said a word!”

আজ যে নিষ্পাপ, নিষ্কলঙ্ক – তার মানে তো এটা নয় যে কাল সে পা ফস্কাবে না । এই যুক্তিতেই তো পরফিরিয়াকে হত্যা করেছিল তাঁর প্রেমিক (কিংবা প্রেমিকা), ডেসডিমোনাকে হত্যা করেছিল ওথেলো……মেয়েদের জড়িয়ে থাকে একটা ঘেন্না । একটা রাগ । একটা অবিশ্বাস । আজ যে মেয়েটি ফুটফুটে, সেই মেয়েটিও হয়তো বড় হয়ে কত ছেলের সর্বনাশের কারণ হবে । কিন্তু….সবাই কি এক ? সবাই কি এক হতে পারে ?

“Yet she must die, else she’ll betray more men….”

কি করবে ? কি করার আছে ? যখনই চোখ বন্ধ করে লোকটা তখনই চোখের সামনে ভেসে ওঠে জয়ন্তর মুখ । জয়ন্ত । লোকটির বাবা । সেদিন স্কুল থেকে ফিরে এসে দেখেছিল জয়ন্ত নিজেই নিজেকে ছুটি দিয়েছে । হাতের কাছে ছিল একটা চিঠি যেখানে সুস্মিতা লিখেছিল যে জয়ন্তকে ছেড়ে সে চলে গেছে সুমিতের সাথে । জয়ন্তর বন্ধু সুমিত । জয়ন্তর থেকে অনেক বেশি রোজগার করা সুমিত । সুস্মিতা – জয়ন্তর স্ত্রী । লোকটির মা । অনাথ হয়ে হয়তো শেষ হয়েই যেত, যদি জয়ন্তরই এক বন্ধু আর বন্ধুর স্ত্রী তাঁকে মানুষ না করত । তারপর একদিন তাঁদেরই মেয়েকে বিয়ে করার সৌভাগ্য হল । আর আজ সেই মেয়েকেই – যাকে সে আঁকড়ে ধরেছিল – সেই ঊর্মিলাকেই – নিজের হাতে শাস্তি দিতে হল কুণালের………….কেন করেছিল ঊর্মিলা এই বিশ্বাসঘাতকতা ? জানে না । জানতে পারেনি । পারবেও না কোনোদিন…………..
ফোন আর সোশাল নেটওয়ার্ক ট্র্যাক করে বারোভাতারি মেয়েদের খুঁজে বের করাটা কঠিন ছিল না গোয়েন্দা অফিসার কুণাল প্রধানের পক্ষে । তারপর ঠাণ্ডা মাথায় একের পর এক ফুলপ্রুফ মার্ডার করতে একমাত্র ওর মতন কোনও পুলিশ অফিসারই পারে । পেরেছে সে । আর যখন খোঁজ পেল প্রভাসের, বুঝতে পারল এত ভাল সুযোগ পাবে না আর । আর কি আশ্চর্য, প্রভাসের বাবাও নাকি সুইসাইড করেছে । তাই তো আনোয়ারকে খুশি হয়ে দু’ হাজার টাকা দিয়েছিল সেদিন । আনোয়ার বেচারা জানেই না কতবড় কাজ সে করেছে । তাই তো খাস্তগীর আর সোমনাথকে ছাড়া একাই গিয়েছিল প্রভাসের বাড়িতে । ভাল করে জরিপ করতে । আর এক ফাঁকে বাইরের দরজার তালার ছাপটা সাবানে তুলে আনতে । যখন ওপরে চিৎকার করছে প্রভাস, তখনই বেরোনোর সময় চটজলদি সেটা করেছে কুণাল । তারপর প্রভাসের অবর্তমানে এক ফাঁকে এসে ভেতরে ঢুকে ছুরিটা হস্তগত করেছে । প্রভাস জানতেই পারেনি । সেইদিন করেছে….যেদিন হোটেলে প্রভাস ঊর্মিলার সাথে……..ওর লিলির সাথে………………….
চোখ থেকে টপটপ করে জল পড়ছে কুণালের । বুকের ভেতর ভাঙছে পৃথিবী । মায়ের প্রতি তীব্র ঘৃণা কুণালকে করে তুলেছে তীব্র নারী বিদ্বেষী । তবুও ভালবেসেছিল ঊর্মিলাকে । বিয়েও করে । আঁকড়ে ধরেছিল । জীবনে ঊর্মিলা ছাড়া আর কেউ ছিল না । কিন্তু মাঝে মাঝে মাথার মধ্যে কেমন যেন একটা করত……..
ডাঃ প্রসেঞ্জিৎ সিনহার কথাগুলো যে আসলে তার নিজের জন্যেই সেটা সে ছাড়া পৃথিবীতে আর কেউ জানত না । প্রভাস যেভাবে একটা কল্পনার জগতে বিপ্লব করত, কুণাল সেভাবে একটা কল্পনার জগতে শাস্তি দিত মেয়েদের । যেসব মেয়েরা ঠকিয়েছে কোনও না কোনও ছেলেকে তাদেরকেই শাস্তি দিত । পঁচিশ থেকে পঁয়ত্রিশ বছরের মেয়েদের বেছে নিয়েছে কারণ এটি যৌবনের উত্তুঙ্গ সময় । আর এই সময়েই সবাই অন্যায় করে । মানুষ মারার জন্যে শাস্তি আছে, হৃদয় ভাঙ্গার শাস্তি কে দেবে ? কুণালের ভেতর থেকে আরও একটা কুণাল তাঁকে করে তুলত হিংস্র, পাশবিক, প্রতিহিংসাপরায়ণ ।
শাস্তি পাবে কুণাল । পাচ্ছে অবিরত । একটা রক্তপাত একটা আগুন বুকের মধ্যে জ্বলছে প্রতিনিয়ত । একা একা নিঃসঙ্গ হয়ে……হয়তো উন্মাদ হয়ে………………
সামনে রাতের কোলকাতা । কুণাল দেখছে । একটা শহরে লুকিয়ে থাকে কত গল্প……কত ইতিহাস…..কত খানাখন্দের খোঁজ রাখে না কেউ……..
…….জেকিল আর হাইডের এই খেলা খেলতে খেলতে ক্লান্ত কুণাল । সে জানে ‘লেডি কিলার মিস্ট্রি’ আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে । আবার মিডিয়ার হইচই । কিন্তু এবারো ধরা পড়বে না কেউ ।
এই কেস চিরকাল Unsolved Mystery হিসেবেই থেকে যাবে গোয়েন্দা বিভাগের ইতিহাসে ।……হয়তো !……

 




গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 2   Average: 4.5/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।