সুখের ঝড় ( দ্বিতীয় পর্ব )

।। সুখের ঝড়।।

। কলমে : দেবজিৎ ঘোষ ।

। দ্বিতীয় পর্ব ।

তিন

অ্যালার্মের শব্দে ঘুম ভেঙে যায় উজানের । নিত্য যোগব্যায়াম করা তার বরাবরের অভ্যেস। দৈনিক যোগাসনের ফলে গঠিত সুঠাম, মেদহীন শরীরটা আয়নায় দেখে ভালো লাগে তার। মাঝে মাঝে আপন মনেই বলে ওঠে, “আহ্, এসব চাকরি বাকরি না করে সিনেমায় নামলেই বেশ হত।” বলে নিজেই আবার হেসে ওঠে।

ছাদে উঠে পশ্চিমের রেলিং টায় গিয়ে দাঁড়ায় সে। নীচের পিচঢালা রাস্তাটা কিছুটা সামনে এগিয়ে বাঁদিকে বেঁকে গেছে। ইউনিফর্ম পরা দুটো ছোটো ছেলেমেয়ে ঘুমঘুম চোখে তাদের মায়ের হাত ধরে বাঁদিকের গলিটার থেকে বেরিয়ে সামনের বড় রাস্তার দিকে চলে যায়। একটা ছেলে সাইকেল চালিয়ে তাদের পাশ কাটিয়ে খবরের কাগজ ফেরি করতে করতে চলে গেলো। এসব রোজই দেখে উজান। সদ্য ঘুমভাঙ্গা শহরের ধীরে ধীরে কর্মব্যস্ত হয়ে ওঠা দেখতে ভালো লাগে তার। কিন্তু আজকে যেন সে কিছু খুঁজছে বলা ভালো কাউকে খুঁজছে। হ্যাঁ, কাল রাতে রূপসা তো ঐ গলিতেই অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। নিজের নির্বুদ্ধিতায় নিজেই হেসে বলে ওঠে,
“এতো সকালে আমি ভাবছি বলেই কি সব কাজবাজ ফেলে ঘুরতে চলে আসবে আমার সাথে দেখা করতে।”

তারপর একটু যেন লজ্জা পেয়েই বলে,
“আচ্ছা ও কি আমার কথা একবারো ভেবেছে?”

“কেন ভাববে! ভাবার মত কাজ কিছু করেছি কি আমি? ”

“কিন্তু আমাকে ওর ছাতায় ডাকলো কেন, একই ছাতায় বাড়ি অব্দি এলই বা কেন? আমার সুবিধে হবে বলেই তো। ”

পরক্ষণেই বলে ওঠে “না না এ আর এমনকী, কারোর বিপদ দেখলে যে কেউ এটাই করবে তাই না।”

“হুম তাই হবে, নাকি সত্যিই অন্য কিছু।”

এভাবেই একান্তে নিজের মনে প্রশ্নোত্তর পর্ব চলতে চলতে সূর্যদেব কখন যে অনেকটা পথ এগিয়ে গেছে খেয়ালই করেনি উজান।




তার হুঁশ ফেরে পিঠে কড়া রোদের স্পর্শে। হাতঘড়িতে নজর যেতেই চমকে ওঠে, আটের ঘর ছুঁইছুঁই। তার মানে বিগত একটি ঘন্টা এইসব উল্টোপাল্টা ভেবেছে সে। আজ আর যোগাসন করা হলো না তার। খুব দ্রুত কয়েকটা ডনবৈঠক দিয়ে দৌড়ে নেমে আসে নীচে। তাদের ফ্ল্যাটে গিয়ে দেখে বাবা কাগজ পড়ছে। একবার খেলার পাতায় চোখ বুলিয়ে নিয়ে চলে যায় স্নানে। আজ অফিসে একটা জরুরি মিটিং আছে, একেবারেই ভুলে গেছিল সে। স্নানখাওয়া সেরে ব্যাগ নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে পরে অফিসের উদ্দেশ্যে ।

ঘুম থেকে উঠে মায়ের হাতে হাতে কাজ করছিল রূপসা। মালতী দেবী কথায় কথায় বিয়ের কথা তোলেন, জানতে চেষ্টা করেন মেয়ের এই বিষয়ে কি মতামত। রূপসাও বুঝতে পারে তার মায়ের এই সম্বন্ধটা খুব মনে ধরেছে, তাকে রাজি করাতে চাইছেন। কলেজ যাওয়ার পূর্বে তাই সে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়,

“মা আমার কলেজের দেরি হয়ে যাচ্ছে, আমি আসছি। আর তুমি তো ভালোভাবেই জানো মা আমি এখন বিয়ে করতে পারবো না । আমি একটা ভালো চাকরি করতে চাই আর সেই চেষ্টাই তো করছি বলো।একটু কটাদিন সহ্য করে নাও দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে। ”

মালতী দেবী মেয়ের মনের কথা বোঝেন। বাপমরা মেয়েটার কোনো সখই তিনি পূরণ করতে পারেননি। নিজেই কষ্ট করে টিউশনি পড়িয়ে পড়ার খরচ যোগার করে রূপসা, তাকে বাধা দেন কি করে। তাও মায়ের মন, চিন্তা তো হবেই। আমতা আমতা করে বলেন,
“এতো ভালো ছেলে ; তোর চাকরি করার কি দরকার বলতো, দেখবি তোকে খুব ভালো রাখবে। ”

রূপসা আর কি বলে, মুখ কালো করে বেরিয়ে পরে। একটা দলা পাকানো কান্না তার বুকে চেপে বসতে থাকে ক্রমশঃ, নিজের ঘরেই সে বোঝা হয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত। সেই বাস স্টপের সামনে এসে একবার থমকে দাঁড়িয়ে পরে সে। এখন সেটা স্কুল পড়ুয়া, অফিস যাত্রীদের ভিড়ে গমগম করছে। সে ভাবে তার জীবনটাও তো এরকম ভালো, সহজ হতে পারতো, একটু সুখী সেও হত ঐ স্কুলের বাচ্চাদুটোর মত। না, তার এসব ভাবলে চলবে না, অদৃষ্টকে অস্বীকার করবে কীকরে। জোরে পা চালায় ও।




মিটিং সেরে বেরোতে বেরোতে সাতটা বেজে গেলো উজানের। বাড়ির পথ ধরে সে। বাড়ির রাস্তায় এসে রূপসার চিন্তা আবারো ভিড় করে আসে তার। সে ভাবতে থাকে “আজও কি ওর পড়ানো আছে, আসবে কি এখনি!” এসব সাতপাঁচ ভেবে বাস স্ট্যান্ডটায় গিয়ে বসে পড়ে। একটু অপেক্ষা করেই ফিরবে বলে স্থির করে। আধঘণ্টা কেটে গেলো, রূপসা এলো না। একটু নিরাশ হয়ে উঠতে যাবে তখনি এক চেনা কণ্ঠে আবারও বসে পরে,

“আজকেও ওভার টাইম নাকি? ”

বসে থেকে থেকে উজানের একটু তন্দ্রা মত এসেছিলো, সে যে রুপসার অপেক্ষাতেই ছিল তা গোপন করে কোনোরকমে হাসিমুখে বলে,
“ওই আর কি! তা আপনি পড়িয়ে ফিরছেন বুঝি।”

“কীভাবে বুঝলেন?” পাশের সিটটায় বসতে বসতে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় সে উজানের দিকে।

“কাল আপনিই তো বললেন তাই। আচ্ছা আপনি যদি কিছু মনে না করেন আমি আপনাকে ‘তুমি’ করে বলি আর আপনিও আমায় তাই বলুন। বইতে পড়েছিলাম বন্ধুদেরকে ‘আপনি’ বললে পাপ হয়।” বলে জোরে হেসে ওঠে উজান ।

তার হাসিতে নিজ হাসি মিলিয়ে রূপসা জানায়,
“কোন বইতে লেখা থাকে এরকম, আমি তো পড়িনি। তবে আমিও তুমি তেই বেশি সাচ্ছন্দ বোধ করবো। ”

“তুমি আমার বন্ধু হবে, জানো আমার এখানে তেমন কোন বন্ধু নেই।” মিনতি ঝরে পড়ে উজানের কণ্ঠে ।

লাল হয়ে ওঠে রূপসার ক্লান্ত গালদুটি, শান্ত কন্ঠে বলে,”চেষ্টা করব।”

উজান এতেই খুশি। তারপর নিজের কথা, পাহাড়ের কথা, তার কলকাতায় আসার কথা বলতে থাকে উজান। এক মনে শুনতে থাকে রূপসা, এক অজানা প্রাপ্তির মেঘ ঘনীভূত হতে থাকে তার মনের আকাশে। বেশ কিছুক্ষণ গল্পের পর উঠে পড়ে ওরা।




“কাল আবার আসবে তো?” রূপসার বাড়ির কিছুটা দূরে ওকে বিদায় জানিয়ে প্রশ্ন করে উজান।

“আসবো”, বলে একটু মিষ্টি হেসে বাড়ির দিকে পা বাড়ায় রূপসা। সেই হাসির মোহে উজান কিছুক্ষণ চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে থাকে একদৃষ্টে। অতঃপর ধীরপায়ে বাড়ি ফিরে আসে সে।

উজান জানে না কেন এই দুদিনের পরিচিত মেয়েটিকে তার এতো আপন মনে হয়। প্রায় রোজই দেখা হয় ওদের। উজানের অফিসে ওভার টাইম তো লেগেই থাকে, সন্ধ্যের প্রতীক্ষায় কেটে যায় দিনটা, আর পড়ানো সেরে ফেরার পথে উজানের উপস্থিতিও একান্তভাবে কামনা করে রূপসা। দুজনেই দুজনের সারা দিনের কাজ, সুখ-দুঃখ, সাধ-আহ্লাদ নিয়ে মশগুল হয়ে থাকে কিছুটা সময়। উজান তার নিঃসঙ্গ শহুরে জীবনে একজন প্রকৃত বন্ধুর সন্ধান পেয়েছে আর রূপসা পেয়েছে একটা ভরসার কাঁধ, যাতে মাথা রেখে সব কষ্ট ভুলে থাকতে পারে সে, তার জীবনের অন্ধকার আস্তে আস্তে যেন দূরীভূত হতে থাকে। ছোট থেকেই তেমন কোনো ইচ্ছা পূরণ না হওয়ায় বেশি কিছু আশা করতে তার ভয় হয়, কিন্তু তাও উজান যে তাকে বোঝে, বিশ্বাস করে এতেই পরম তৃপ্তি পায় সে।

ক্রমে কালের নিয়মে বসন্ত পেরিয়ে আসে গ্রীষ্ম আর তার পরে বর্ষা, এই দুইটি তাজা হৃদয়ের সাক্ষাতের কিন্তু কোনো ব্যতিক্রম হয় না। এই কয় মাসে তাদের মধ্যে এক নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, বন্ধুত্বের থেকেও একটু বেশি গভীর সেটা। ওরা কিন্তু এসব কিছুই বোঝেনা, শুধু এটুকু বোঝে একদিনও ওরা কেউ কাউকে না দেখে থাকতে পারবে না। এখন তারা ছুটির দিনে ঘুরতে যায়, রূপসা উজানকে কলকাতা ঘুরিয়ে দেখায় আর উজান ওর হাতে হাত রেখে চোখ ভরে দেখে চিড়িয়াখানা, ক্যাথিড্রাল গীর্জা, প্রিন্সেপ ঘাট, রবীন্দ্র সরোবর। তার মনে হয় রূপসা আছে বলেই কলকাতা এতো সুন্দর, ঠিক ওই ভিক্টোরিয়ার পরিটার মতো। গড়ের মাঠে বসে দুজনে আইসক্রিম, ঝালমুড়ি খায়, উজান সাবান জলের বুদবুদ ওড়ায় আর তা রূপসার সারা শরীরে ভালোবাসার ছোঁয়া এঁকে দেয়। রূপসা উজানের কাঁধে মাথা রেখে ঐ দূরের দিগন্তে হারিয়ে যায়। অস্তগামী সূর্যের রক্তিমাভায় একাকার হয়ে যাওয়া এই যুগলকে দেখে বাসায় ফেরা পাখিরাও গেয়ে ওঠে,

” হিয়া টুপটাপ জিয়া নস্টাল,
মিঠে কুয়াশায় ভেজা আস্তিন
আমি ভুলে যাই কাকে চাইতাম,
আর তুই কাকে ভালোবাসতিস। ”

।। ক্রমশঃ ।।

 

সুখের ঝড় ( প্রথম পর্ব )

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 4   Average: 5/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।