সুখের ঝড় ( প্রথম পর্ব )

।। সুখের ঝড়।।

। কলমে : দেবজিৎ ঘোষ ।

। প্রথম পর্ব।

 

এক

রাত সাড়ে আট কি নয়। তিলোত্তমা সারাদিনের ব্যস্ততার আবরণ ধীরে ধীরে ছেড়ে বিশ্রামের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফেব্রুয়ারি মাস, শীত ও বসন্তের সন্ধিক্ষণের এই সময়ে বৃষ্টি প্রায় অবাঞ্ছিত বললেই চলে, কিন্তু সেদিন মনে হয় আকাশের মুখ ভার। বিকেল থেকেই আবহাওয়াটা কেমন থম মেরে আছে, একটু আগে থেকে আবার শনশন শব্দে হাওয়া শুরু হয়েছে।

বিধান সরণি ধরে হেঁটে আসছিল রূপসা। টিউশনি করে বাড়ি ফিরছে সে। বাস থেকে নেমে মিনিট কুড়ির পথ সে হেঁটেই ফেরে। তাদের অভাবের সংসার । সেই কোন ছোটোবেলায় সে তার বাবাকে হারিয়েছে, তারপর মা,ছোটো ভাই আর সে এই তাদের পরিবার। রূপসা কয়েকটা টিউশনি করে নিজের পড়াশোনার খরচ নিজেই চালায়। হঠাৎই আচমকা ঝড় উঠতে সচকিত হয়ে হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেয় সে । ঘড়িতে দেখে নটা বেজে গেছে অনেকক্ষণ। একরাশ ধুলোর সাথে এক অজানা আশংকা ঝাপটা দিয়ে গেল রূপসার মলিন মুখটায়, এখনও প্রায় দশ মিনিটের রাস্তা। অকস্মাৎ বড় বড় ফোঁটায় চারিদিক ভিজে গেলো। ছাতা ছিল রূপসার কাছে কিন্তু এই তুমুল বৃষ্টি আর ঝোড়ো হাওয়ায় এগিয়ে চলা খুবই মুশকিল। কাছেই কোথাও একটা খুব জোরে বাজ পড়লো। সাথে সাথে ভয়ে রূপসা আশ্রয় নেয় পাশের বাস স্টপ টায়।




হঠাৎই একটি ছেলে দৌড়ে এসে ঢোকে সেই বাস স্ট্যান্ডে । মাথায় রুমাল, গায়ের জামাটা অল্প ভেজা। বসার সিটটায় ক্লান্ত সিক্ত শরীরটা এলিয়ে দিয়ে কাঁধের ব্যাগটা পাশের সিটে রাখতে গিয়ে তার নজর পড়ল একটি মেয়ে, এতোক্ষণ যেন তার দিকেই তাকিয়ে ছিল, এখন চোখে চোখ পড়াতে লজ্জায় মাথাটা নীচে নামিয়ে নেয়। ঐ একবার দেখাতেই সে লক্ষ্য করে মেয়েটি বেশ মিষ্টি দেখতে, কিন্তু তার চোখে মুখে এক বিষন্নতার ছাপ স্পষ্ট।

নিস্তব্ধতা ভেঙে ছেলেটি বলে ওঠে “আপনি কতদূর যাবেন? ”

চমকে ওঠে রূপসা, আরও একবার ছেলেটাকে ভালো করে দেখে নেয় সে। এই ছায়ান্ধকার বাস স্ট্যান্ডে এক অচেনা ছেলেকে কি বলবে ভেবে না পেয়ে নিরুত্তর থাকে সে।

ছেলেটা আবারো নিজের মতোই বলে ওঠে “দেখুন না হঠাৎ বৃষ্টি। অফিসে ওভারটাইম করে ফিরতে এতো দেরি তার ওপর এত বৃষ্টি। এদিকে ফোনেও চার্জ নেই, বাড়িতে মা হয়তো না খেয়ে বসে থাকবে। ” বলে একটা বিরক্তিসূচক শব্দ করে চুপ করে যায়।

রূপসার মায়া হয় । সে নিজের ফোনটা এগিয়ে দিযে বলে “নিন আমার টা থেকে একটা কল করে দিন।”

ছেলেটা এই বৃষ্টিতেও হাতে চাঁদ পায়। সে বাড়িতে ফোন করে কৃতজ্ঞতার সুরে বলে “ধন্যবাদ, আপনি আমার অনেক বড় উপকার করলেন। আপনার নামটাই তো জানা হল না। ”

“হুম রূপসা, আপনার? ”

“উজান সেনগুপ্ত । তা আপনি কি সামনেই থাকেন? আমিও ওদিকেই যাবো। ”

“হুম”, সংক্ষিপ্ত উত্তর রূপসার ।

” আপনি কি করেন? কে কে আছেন বাড়িতে? ”




উজানের প্রানবন্ত স্বভাব আর অনর্গল কথা শুনতে শুনতে রূপসার মনে হচ্ছিলো এই সদ্য পরিচিত ছেলেটা খারাপ নয়। তাই সেও উজানের কথার উত্তর দিতে শুরু করে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ভাব জমে যায় গল্পপাগল এই দুটি ছেলে মেয়ের।

কথায় কথায় বৃষ্টি টা একটু কমে আসে। রাত দশটা পেরিয়ে গেছে, এবার রূপসাকে যে করেই হোক বাড়ি ফিরতে হবে। সে উঠে দাঁড়িয়ে ব্যাগ থেকে ছাতা বের করতে করতে উজনকে উদ্দেশ্য করে বলে,
“আপনি বাড়ি যাবেন না। এবার কিন্তু আমাকে বেরোতে হবে। মা খুব চিন্তা করছেন ।”

“আমার যে ছাতা নেই”, উজানের উত্তর ।

রাস্তায় নেমে অন্ধকার বৃষ্টিস্নাত নির্জন পথটা দেখে বুকটা ধ্বক করে ওঠে রূপসার। এতো রাতে একা ফিরতে গিয়ে যদি কোনো বিপদ হয়, এক অজানা আতংকে শিউরে ওঠে সে । আবার বাস স্টপে উঠে এসে আবেদনের সুরে বলে,

” আমার ছাতাটা একটু বড়ই, আপনি চাইলে আসতে পারেন আমার সাথে ।”

উজান প্রথমটা একটু অবাক হয়ে যায়। এই স্বল্প সময়ের পরিচয়ে এই মেয়েটাকে তার ভালো লেগেছে! মেয়েটির নিস্পাপ সুন্দর মুখটা তাকে তার অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো, মনে করে দিয়েছিলো অন্য আরেক জনের কথা। সে আর কালবিলম্ব না করে ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে নেমে আসে রাস্তায়। রূপসার হাত থেকে ছাতাটা নিয়ে তাদের মাথার উপর ধরে। হাঁটতে থাকে দুজনে পাশাপাশি, এক ছাতার নীচে, ইলশে গুঁড়ি বৃষ্টি গায়ে মেখে । কোথা থেকে যেন রেডিও তে একটা গান ভেসে আসে,

“এলো মেঘ যে এলো ঘিরে
বৃষ্টি সুরে সুরে সোনায় রাগিনী,
মনে স্বপ্ন এলোমেলো
এই কি শুরু হলো প্রেমের কাহিনী” ।

দুই

প্রাত্যহিক জীবনে কত নতুন নতুন মানুষের সাথে আমাদের দেখা হয়,তাদের মধ্যে কিছু মানুষকে আমরা বন্ধুত্বের বাঁধনে বেঁধে ফেলি আবার অনেককে মনেও রাখি না। কিন্তু কিছু মানুষ দখিণা বাতাসের মতো আমাদের মনটাকে হঠাৎই দোলা দিয়ে উড়ে যায়। অন্তরের গভীরে যে দাগ তারা কেটে যায়, হাজার চেষ্টাতেও তা আর মুছে ফেলা যায় না।




তখন প্রায় মাঝরাত্রি। বৃষ্টি আর নেই ।একটানা ক্রন্দনের পর মন যেমন শান্ত হয়ে যায়, রাতের পরিবেশটাও তেমনি স্নিগ্ধ, সমাহিত। সিক্ত মহানগরী ঘুমের অতলস্পর্শে ডুবে গেলেও শহরের উত্তর প্রান্তের এক ঝাঁ চকচকে আবাসনের তিনতলার অন্ধকার ঘরে বিনিদ্র রাত্রিযাপন করছিল এক যুবক। হ্যাঁ, যুবকটি আমাদের উজান। বাইরের আকাশ মেঘমুক্ত হলেও তার মনের গুমোট ভাব ক্রমশঃ পুঞ্জীভূত হচ্ছে । তার অন্তর আজ অনেক দিন পর এক অদৃশ্য সুধারসের তরঙ্গে আলোড়িত, আর সেই সুধারসের আবহে বুঁদ হয়ে মেঘের পিছনে উঁকি দিতে থাকা সদ্য উদিত চাঁদটিকে দেখছিল উজান। তার শরীর ঘুমের জন্য বিদ্রোহ করলেও মন কিন্তু পরে ছিল সেই বাস স্টপে। চোখ বন্ধ করলেই সেই হলুদ চুরিদার পরিহিতা মেয়েটির মুখশ্রী বারবার ভেসে উঠছে তার মানসপটে।

জলপাইগুড়ির এক মফস্বল এলাকার ছেলে উজান। পাহাড়ি হাওয়া গায়ে মেখে বড়ো হওয়ায় তার মন ছোটো থেকেই ঐ তিস্তা নদীর মত প্রাণবন্ত, বাঁধনহারা। কিন্তু তার এই সরল, গতিময় জীবন হঠাৎই অবরূদ্ধ হয়ে যায় পাহাড় থেকে সমতলে নেমে আসার ডাক পেয়ে। একটা বেসরকারি কোম্পানির ব্রাঞ্চ ম্যানেজার হিসেবে নিযুক্ত হয় সে। বাবা মাকে সাথে নিয়ে উঠে আসে উত্তর কলকাতার এই আবাসনে, শুরু হয় তার নাগরিক জীবন। সকালে মায়ের হাতে খেয়ে অফিসে চলে যায়, রাতে ফিরে সকলের সাথে গল্প করতে করতেই ঘুম নেমে আসে তার দুচোখে। সদ্য কলকাতায় আসা উজানের বন্ধু ভাগ্য ভালো নয় অতোটা। তাই প্রকৃত বন্ধু বলতে যা বোঝায় এই এক বছরে তা থেকে বঞ্চিতই ছিল সে। আজকের বৃষ্টি মুখর সন্ধ্যায় অচেনা মেয়েটির সাময়িক সঙ্গলাভ ও সাহচর্যে এক অনন্য প্রাপ্তির স্বাদ পেয়েছে সে। এসব ভাবতে ভাবতে শেষ রাতের দিকে দু চোখের পাতা এক হয়ে যায় আর এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। বাইরের কদম গাছে একটা লক্ষীপেঁচা উড়ে এসে বসে, এই শহরের অন্দরমহলের কোনো কথাই তার অজানা নয়।

কিছু দূরের একটি বাড়িতে আর একজনের চোখেও ঘুম আসেনি আজ। রূপসা। তার আজ সকাল থেকেই মনটা ভালো ছিল না। গতকাল সন্ধেবেলা পাশের বাড়ির চৌধুরী কাকিমা রূপসার মায়ের কাছে এসেছিলো তার বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে। বলেছিলো,
” দিদি, মেয়ের বিয়ের বয়স তো হল, কিছু কি ভেবেছো? ”

মালতী দেবী তাকে বসতে দিয়ে দুপাশে মাথা নেড়ে না জানিয়েছিলেন। দ্বিগুণ উৎসাহে চৌধুরী গিন্নি বলে চলে,
” আমার এক দূর সম্পর্কের ভাই মেয়ে দেখছে বিয়ের জন্য। তুমি বলো তো রূপসার সাথে সম্বন্ধ লাগিয়ে দি। বয়স একটু বেশি কিন্তু ছেলের কাপড়ের ব্যবসা পাটনাতে। তোমার মেয়েকে রাজরানী করে রাখবে………..”

দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে সবটাই শুনছিল রূপসা। চোখের পাতা ভিজে আসে তার।

সেই দশ বছর বয়সেই রূপসা তার বাবাকে হারায়। সেদিনও আজকের মতোই আকাশ মেঘলা ছিলো। সরকারী হাসপাতালের বাইরে বাবার নিথর দেহটা নিয়ে যখন তিনটি অসহায় মানুষ এসে দাঁড়ায়, প্রকৃতিও সেই দুঃখ সহ্য করতে না পেরে কেঁদে উঠেছিল, প্রবল বর্ষনে ভেসে গেছিল ভূভাগ। রূপসাদের অশ্রু মুছিয়ে দিয়েছিল বৃষ্টির করুণ জলধারা। তারপরে অতিকষ্টে সংসারটা দাঁড় করেছিলেন রূপসার মা মালতী দেবী, আধাপেট খেয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বড়ো করে তুলেছেন রূপসা ও তার ভাই রূপককে। এহেন পরিস্থিতিতে মালতী দেবীর মেয়ের বিয়ে নিয়ে চিন্তার অন্ত ছিল না। চৌধুরী কাকিমার প্রস্তাব যেন ঘৃতাহুতি দিল। রূপসা বোঝে তার মায়ের অবস্থা, অনুভব করে দারিদ্র্যের অভিঘাতে সমস্ত সখ আহ্লাদ ভূলুণ্ঠিত হয়ে যায়। কিন্তু ছোটো থেকে সেও যে স্বপ্ন দেখে পড়াশোনা শেষ করে একটা ভালো চাকরি করে খুব সুন্দর জীবন উপহার দেবে তার ভাই ও মাকে, খুব ভালো থাকবে তখন তারা। নাহ, বিয়ে সে এখন কিছুতেই করতে পারবে না।




এসব ভাবনার মধ্যেই হঠাৎই একটা দমকা বাতাস তার অবিন্যস্ত চুলগুলো উড়িয়ে দিয়ে যায়, একরাশ মন খারাপের মধ্যেও একটা লাজুক হাসি তার শুকনো ওষ্ঠ ভিজিয়ে দেয়। কিছু প্রহর পূর্বের সেই যুবকটির সঙ্গ মনে পড়ে যায়, রাঙা হয়ে ওঠে তার শুভ্র গাল দুখানি। ছুটে গিয়ে বিছানায় শুয়ে বালিশে মুখ গুজে দেয় সে । ভালোবাসা গরিবের বিলাসিতা । কিন্তু আজ রূপসারও ভালোবাসতে ইচ্ছে করে, সাধ হয় স্বপ্ন দেখতে, কাউকে খুব নিজের করে পেতে। আস্তে আস্তে সেও তলিয়ে যায় স্বপ্নের জগতে।

পৃথিবীতে এমন অনেক কিছু ঘটে, যার ব্যাখ্যা দেওয়া কঠিন, বিজ্ঞান যা অতিপ্রাকৃত বলে দায় সেড়ে নেয়, অনেকে যা হেসে উড়িয়ে দেয়, কিন্তু সেই ঘটনাগুলো সত্যিই ঘটে। তেমনি সেই রাতে উজান ও রূপসা দুজনেই কাকতালীয়ভাবে একই স্বপ্ন দেখে। তারা দেখতে পায় মেঘের দেশ। সেখানে শুধুই খুশির আলো। সবাই মেঘের ওপর ভেসে চলেছে, কোথাও দুঃখের লেশমাত্র নেই। সবাই হাসছে,আনন্দ করছে। আর সেই দেশের নন্দন কাননে সেখানকার রাজা আর রানী হাত ধরাধরি করে গান গাইছে,

“ভালোবেসে সখী, নিভৃতে যতনে
আমার নামটি লিখো তোমার
মনের মন্দিরে।
আমার পরানে যে গান বাজিছে
তাহার তালটি শিখো তোমার
চরণ মঞ্জীরে।।”

।। ক্রমশঃ।।

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 6   Average: 4.5/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।