সূর্যগ্রহণ (এক অপূর্ব প্রেমের আদ্যেপান্ত!)

সূর্যগ্রহণ (এক অপূর্ব প্রেমের আদ্যেপান্ত!)

সূর্যগ্রহণ (এক অপূর্ব প্রেমের আদ্যেপান্ত!)

পার্থ প্রতিম দে

 

পৃথ্বীসেনা আর রবিশংকর পুরান ঢাকার বংশালের বাসিন্দা। একই কলোণীতেই দু’জনের বেড়ে ওঠা। রবিদের কয়েক বিল্ডিং পরেই পৃথ্বীদের বিল্ডিং। বয়সে পৃথ্বী রবির চেয়ে চার বছরের ছোট। পৃথ্বী এককথায় রূপে লক্ষ্মী আর গুণে স্বরস্বতী! আর রবি রূপে কৃষ্ণ আর গুণে মহেশ্বর! রবি যখন ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে তখন পৃথ্বী সবে ক্লাস সিক্সে। প্লে-কেজি-নার্সারী পার করতেই বেশ সময় কেটে গেছে পৃথ্বীর। আর রবি শুরু করেছে সরাসরি ক্লাস ওয়ান দিয়ে তাই বেশ খানিকটা এগিয়ে গেছে। মেধাবী ছাত্র হিসেবে বেশ নামডাক আছে রবির। পাড়ার সব মা চান তার ছেলে-মেয়েকে রবি এসে প্রাইভেট পড়াক। কিন্তু রবির ঘর থেকে ভীষণ কড়া, কোন টিউশনি করা চলবে না এই বয়সে। অন্যদিকে রবির ক্লাসমেট চন্দ্রিমাও পড়ালেখায় বেশ ভাল। রবি আর চন্দ্রিমার মধ্যে বেশ হাড্ডাহাড্ডি কম্পিটিশন হয়। দু’জনে আবার ভাল বন্ধুও। চন্দ্রিমার টিউশনির কদর বেশ। বিশেষ করে মেয়েদের গাজিয়ানরা বেশ কদর করে তাকে। রবিদের বাসায় ছিল চন্দ্রিমার অবাধ যাতায়াত! রবির মা খুব স্নেহ করে মেয়েটাকে। একদিন চন্দ্রিমায় রবি’র মা’কে খুব করে চেপে ধরল রবিকে একটা টিউশনি করতে দিতে। চন্দ্রিমা’র দূর সম্পর্কের কাকার মেয়ে; বেশী দূরে নয় দুই বিল্ডিং পর সেন-ভবনে। মেয়ে ছাত্রী শুনেই রবি’র মা এককথায় না করে দিল। কি হতে আবার কি হয়ে যায়। কিন্তু চন্দ্রিমা এমনভাবে বলল শেষ পর্যন্ত তাকে রাজি হতেই হল। তবে সপ্তাহে শুধু দুই দিন। তাতেই খুশি হয়ে পৃথ্বীর মা’কে খবরটা দিল চন্দ্রিমা। দুইদিন পর রবি প্রথমবারের মত পৃথ্বীদের বাসায় গেল। পৃথ্বীর মা বেশ খাতির করল রবির। অনেক নাস্তা দিল খেতে, প্রায় আধাঘন্টা পর পৃথ্বী রবির সামনে এসে বসল। পৃথ্বীর মা রবির সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলল, ‘এই হচ্ছে তোমার ছাত্রী!’

পৃথ্বীকে প্রথমবার দেখে রবি’র তেমন কোন অনুভুতি হল না। কিন্তু রবি সম্পর্কে পৃথ্বী এত বেশী শুনেছে তার বান্ধবীদের কাছে তাই প্রথম দেখাতেই যেন রবির চোখে হারিয়ে গেল পৃথ্বী! যদিও বয়সটা হারানোর ছিল না মোটেও। রবির গাইডেন্সে বেশ ভাল রেজাল্ট করতে থাকে পৃথ্বী, ক্লাস যত বাড়তে থাকে সপ্তাহে পড়ানোর দিনও তত বাড়তে থাকে। পৃথ্বী রবি’র প্রতিটি কথাকে বেদ বাক্য মনে করত। রবি ইন্টারমিডিয়েটে দারুণ রেজাল্ট করে অনুমেয় ভাবে বুয়েটে ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ভর্তি হয় আর চন্দ্রিমা ভর্তি হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এপ্লাইড ফিজিক্সে। একই সাথে পৃথ্বী সে বছর ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পায়। রবিও পাকাপাকি ভাবে পৃথ্বীর হোম টিউটর হয়ে যায়। এভাবে আরো কিছু বছর কেটে যায়। রবি এখন ফাইনাল ইয়ারে আর পৃথ্বী উচ্চ-মাধ্যমিকের পর মেডিকেলের কোচিং ক্লাস শুরু করেছে। এতোটা বছর কেটে গেলেও রবিকে প্রথম দেখায় যে পৃথ্বীর ভাল লেগেছিল সেটা বলা হয়ে উঠেনি তার। এতদিনে সেই ভাললাগাটা একচুল পরিমান তো কমেনি বরঞ্চ বেড়ে যে সেটা ভালোবাসায় পরিণত হয়েছে সেটা বেশ বুঝতে পারছিল পৃথ্বী। রবিও ইদানিং পৃথ্বীর জন্য বেশ টান অনুভব করছে। হয়ত সেটা বয়সের কারণে। তারা ছাত্রী-শিক্ষক থেকে বন্ধু হয়েছে অনেক আগেই। সব ব্যাপার ওরা শেয়ার করত। মন খারাপ থাকলে বা ভাল থাকলে তাদের দুজনেরই শেয়ার করার একমাত্র সঙ্গ ছিল ওরা দুজনেই। একদিন হঠাৎ খুব বেশী সাহস হয়ে গেল পৃথ্বীর! হুট করে শিল্পকলায় রবি’কে ডেকে এনে সোজাসাপ্টাভাবে প্রপোজ করে বসে পৃথ্বী!
দুচোখ বন্ধ করে হাতে এক গোছা গোলাপ ফুল রবি’র দিকে উঁচিয়ে ধরে বলল, “শোন ছেলে! আমি অনেক ভেবে দেখলাম, আমি তোমাকে অনেক অনেক ভালোবাসি! আই লাভ ইয়ু!”

শুনেই রবি অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল; কিন্তু পরক্ষণেই বুঝতে পারল পৃথ্বী একদম নাছোড়বান্দা হয়ে গেল যেন। হ্যাঁ, না বললে এখনই যেন সবার সামনে কেঁদেকেটে একসার করবে সে! রবি’র মনে মনে যে এই ইচ্ছাটা ছিল সেটা বুঝতে না দিয়েই, দুই হাতদিয়ে পৃথ্বীকে বুকে টেনে নিয়ে ভালোবাসার প্রত্যুত্তর দিল রবি। ব্যস, সেদিনের পর থেকে তাদের প্রেমকথা মহাকাব্যিক প্রেমকথাকেও হার মানাতে লাগল।

পৃথ্বী সেই বছরই ঢাকা মেডিকেলে চান্স পেয়ে গেলে তাদের ভালোবাসার নৌকা প্রবল বেগে ভাসতে থাকে। তাদের প্রেমের কাব্যকথায় শুধু জোয়ারই ছিল ভাটা ছিল না। পৃথ্বী কোন কিছু চাওয়ার আগেই যেন সেটা নিয়ে রবি হাজির হয়ে যায়। পৃথ্বীর ইদানিং মনে হতে লাগল রবি তাকে আষ্টে-পৃষ্টে গ্রাস করে ফেলছে। মান-অভিমানের কোন সুযোগই দেয় না রবি। কোন রোমাঞ্চকর কিছুই নেই তাদের প্রেম-ভালোবাসায় যা আছে তা শুধুই রোমান্স! একদম একঘেয়ে হয়ে লাগছিল পৃথ্বীর। কেন ছেলেটা এত ভালো! মাঝে মধ্যে তো ঝগড়া করবে, অভিমান করবে! তাহলেই তো মান ভাঙাতে পারবে আরো বেশী ভালোবাসা দিয়ে। কিন্তু নাহ্! পৃথ্বী নিজ থেকে কোন ছোট খাট বিষয় নিয়ে ঝগড়া করতে চাইলে রবি নিজ থেকেই চুপ হয়ে যায়, যেন কিছুই হয়নি! পৃথ্বী মনে মনে ঠিক করল যেভাবেই হোক সে রবির সাথে ঝগড়া করবে। তিক্ততা না থাকলে মিষ্টতার স্বাদ বোঝা যায় না।

কথায় আছে না, মন থেকে চাইলে ঈশ্বর তা দিয়ে দেন! পৃথ্বীর ক্ষেত্রেও সেটা হল; কিছুদিনের মধ্যেই সে রবিকে ঘায়েল করার একটা সুযোগ পেয়ে গেল। সেদিন পৃথ্বীর জন্মদিন ছিল; তাই রবি তাকে সারপ্রাইজ দেবে বলে, শাহবাগের মোড় থেকে একগোছা তাজা গোলাপ আর দোকান থেকে প্রচুর ডেইরীমিল্কের চকলেট নিয়ে রিক্সায় রওনা হল ঢাকা মেডিকেল কলেজের উদ্দেশ্যে। পৃথ্বী বান্ধবীদের নিয়ে নিউমার্কেটের দিকে যাবে বলে দাঁড়িয়েছিল মেডিকেলের গেইটের সামান্য দূরে। তখনই রবি এসে রিক্সা থেকে নামল আর নামতেই পিছন থেকে চন্দ্রিমা কাঁধে হাত রাখল। ব্যাপারটা খুব অপ্রত্যাশিত ছিল! অনেকদিন ধরেই চন্দ্রিমার সাথে রবি’র দেখা সাক্ষাত হয়না। হাতে ফুল দেখে বলল, “কিরে! কার জন্য!”; পৃথ্বীর সাথে রবি’র রিলেশনের কথা চন্দ্রিমা’কে কখনো বলা হয়েছে কিনা মনে করতে না পেরে রবি হেসে উত্তরটা এড়িয়ে গেল। তারপর চন্দ্রিমা’কে নিয়ে জগন্নাথ হলের দিকে পা বাড়াল।
দূর থেকে পুরো ব্যাপারটা পৃথ্বী আর ওর বান্ধবীরা দেখার পর। বান্ধবীরা খুব ক্ষেপাতে লাগল পৃথ্বীকে; পৃথ্বী যদিও জানে রবি আর চন্দ্রিমা খুব ভাল বন্ধু তারপরেও ঝগড়া করার মত এরকম একটা সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইল না পৃথ্বী! জন্মদিন একটা নষ্ট হলে হোক, প্রতিবছর তো জন্মদিন আসবে কিন্তু রবি যে টাইপের ছেলে ঝগড়া করার সুযোগ আর নাও আসতে পারে।

আরো প্রায় ঘন্টা দুয়েক পর রবি আবার মেডিকেল কলেজের গেইটের সামনে এসে পৃথ্বীকে কল দিল। পৃথ্বী বেশ গম্ভীর হয়ে কল রিসিভ করল। রবি যতই তার সাথে দেখা করার কথা বলে ততই পৃথ্বী রবিকে বলে আমার সাথে দেখা করার কি আছে যার সাথে ঘুরছিলে তার সাথেই থাক! বলেই কল কেটে দেয়। রবি যতবার কল দেয় প্রতিবারই একই উত্তর। পৃথ্বী কিছুতেই দেখা করল না রবির সাথে। রবি ফুলের তোড়া নিয়ে মেডিকেলের গেইটে অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে একসময় সত্যি সত্যি খুব রেগে গেল পৃথ্বীর উপর। সবকিছু জানার পরও পৃথ্বী কেন এরকম করছে বুঝতে পারল না রবি। শেষবার যখন কল দিল, তখন পৃথ্বীর বদলে রবিই বেশ কিছু কড়া কথা শুনিয়ে বাসায় চলে গেল। রবি যতই রেগে গর্জন করছে পৃথ্বীর ততই পেট ফেটে হাসি পাচ্ছিল! তবুও অনেক কষ্টে রবিকে কিছুই বুঝতে দিল না। পৃথ্বীর কথা শুনে রবির মনে হতে লাগল পৃথ্বী নয় রবি’র পুরো মন জুড়েই চন্দ্রিমা অবস্থান করছে! একি হয় নাকি সম্ভব!

সেদিন সন্ধ্যায় রবি নিজের ঘরে বসে পড়ছিল! দুপুর থেকেই মেজাজটা বেশ খিটখিটে হয়ে আছে পৃথ্বীর উপর। তখনই রবি’র মা ওর ঘরে এসে বলল, “বাবু পৃথ্বীর বাবা-মা এসেছেন! তুই একটু ফ্রেস হয়ে আয়।”
হঠাৎ পৃথ্বীর বাবা-মা! বেশ চমকে গেল রবি। তাড়াতাড়ি হ্যাঙ্গার থেকে টি-শার্ট আর ট্রাউজার পড়ে ড্রয়িং রুমে আসল রবি। দেখল শুধু পৃথ্বীর বাবা-মা নন; পৃথ্বীও এসেছে। আর তার দিকে চোখ পড়া মাত্রই সবার চোখ এড়িয়ে রবি’কে চোখ মারল। এমনিতেই মন বিগড়ে ছিল তার উপর পৃথ্বীর এরকম ছেলেমানুষি রবির রাগটাকে আরো বাড়িয়ে দিল। তারপরেও রবি ভদ্রতার খাতিরে পৃথ্বীর বাবা-মা হাত জোর করে নমষ্কার করে এক পাশে বসে পড়ল। এরমধ্যেই রবির মা মেহমানদের জন্য চা-নাস্তা নিয়ে আসল। কিছুক্ষণ বসার পর রবি’র মা বলল, “যা না বাবু, পৃথ্বীকে তোর ঘরটা দেখিয়ে নিয়ে আয়।”

অনেকটা তড়িঘড়ি করেই রবি উঠে পড়ল। পৃথ্বীও তাকে অনুসরণ করল।ওরা চলে যাওয়ার পর, পৃথ্বীর মা’ই প্রথম কথা বলল; রবির মা’কে উদ্দেশ্য করে বলল, “দিদি আপনি তো চন্দ্রিমা’কে চেনেন। সম্পর্কে আমার ভাসুরের মেয়ে। সে আজকে বিকেলে বাসায় এসে বলল রবি আর পৃথ্বীর সম্পর্কের কথা। রবিকে তো আমরা ছোটবেলা থেকেই চিনি; এখন আপনার আপত্তি না থাকলে আমরা চার হাতকে এক করতে পারি!”

সব শুনে রবি’র মা’ও খুব খুশি হল, কিন্তু সমস্যা একটাই। রবির পড়ালেখা এখনো শেষ হয়নি। ফাইনাল ইয়ারের রেজাল্ট এখনো হয়নি। সেটা জানাতেই পৃথ্বীর বাবা বলল, “আমরাও সেটা ভেবেছি; আপনি যদি চান আমরা এখন ছোটখাট একটা অনুষ্ঠান করে আর্শীবাদটা সেরে রাখতে পারি। পরে সময় সুযোগ বুঝে বিয়ের অনুষ্ঠানটা করা যাবে।”

প্রস্তাবটা মন্দ লাগেনি রবি’র মা’র কাছে। খুশি হয়ে নিজের হাতেই পৃথ্বীর বাবা-মা’র মুখে মিষ্টি তুলে দিলেন। আর রবি পৃথ্বীকে নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে নিজেই একটা চেয়ারে অন্যদিকে মুখ করে বসে রইল। পৃথ্বী বুঝল বাবুর রাগ এখনো কমেনি তাইতো দরজাটা সামান্য বন্ধ করে পিছন থেকে রবি’কে জড়িয়ে ধরে বলল, “দুপুরে চন্দ্রিমাদি’কে যেটা বলেছ সেটা বলতেই বাবা-মা এসেছেন!” সাথে সাথেই যেন বার’শ ভোল্টের কারেন্টের শক্ খেল রবি, “মানে!”

পৃথ্বীসেনা এক চিলতে মিষ্টি হাসি দিয়ে বলল, “মানে আবার কি! আজতো বলয় গ্রাস সূর্যগ্রহণ ছিল, পৃথিবীর কাছ থেকে চাঁদ ক্ষণিকের জন্য সূর্যকে গ্রাস করেছিল, যাতে সূর্য আরো তেজে পৃথিবীকে আলোকিত করতে পারে! বুঝলেন জনাব!”

এবার রবি উঠে দাঁড়িয়ে পৃথ্বীর কাঁধে হাত রেখে বলল, “হুম, বুঝতে পারলাম!”

পৃথ্বী হেসে বলল, “কি বুঝলেন?”

রবি পৃথ্বীর গালদুটো টেনে বলল, “বুঝলাম পৃথিবী আর সূর্যকে এক করতে এক বলয় গ্রাসের সাক্ষী হল মহাকাল!”

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 0   Average: 0/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।