সেপারেশন

সেপারেশন

সেপারেশন

কলমে:- মোহনা মজুমদার

 

কিরে কাল তাহলে কখন মীট করবি বল না, পি.জি স‍্যারের ক্লাসটা করে পরের গুলো বাঙ্ক করবি তো?”
সামনের সিটে বসে থাকা দুজন কলেজ পড়ুয়ার ওই মিষ্টি প্রেমের গল্পগুলো কানে আসছিল বারবার ঈশিতার।
মনে পড়ে গেল কাল তো ফরটিন্থ ফেব্রুয়ারি, ভ্যালেন্টাইনস ডে,
বিয়ের আগে এই দিনটা নিয়ে কতকিছুই না প্ল্যান করত ওরা মানে ও আর অ‌ংশু…
“তোর মনে পড়ে অংশু” নিজের মনেই যেন বলে উঠলো ঈশিতা।কিন্তু না,অংশু তো নেই আজ আর ওর পাশে, সামনের সিটে বসে থাকা ওই কলেজপড়ূয়া ছেলে মেয়ে দুটোর মতো।ও তো আজ অনেক দূরে, এক শহরে থেকেও অনেক দূরে…
“ও আজ তো আবার এ্যডভোকেট মি:মুখার্জির কাছে এ্যপয়েনমেন্ট আছে,ইউনিভার্সিটি থেকে তাড়াতাড়ি বেড়োতে হবে।” মনে মনে বলেই হাতের ঘড়িটা দেখল ঈশিতা।

ওদের এখন সেপারেশন চলছে..মিনিমাম সিক্স মান্থ,তারপর দে উইল ডিসাইড মিউচুয়াল ডিভোর্স অর এনিথিং এলস্ …
এখন এই অফিস থেকে বাড়ি,বাড়ি থেকে অফিস ,এটাই যেন এখন ওর প্রেসেন্ট স্ট্যাটাস, নো মোর এনটারটেইনমেন্ট,জীবন টাকে কেমন যেন একটা খোলশের মধ্যে ঢুকিয়ে নিয়েছে ও।

অংশু ছিল ক্লাসের ফার্স্ট বয়,আর ঈশিতা হত সেকেন্ড।দুজনের মধ্যে ছিল পড়াশোনায় হাই কমপিটিশন,তবু স্কুল থেকে বেড়িয়ে রোজ ওরা একে ওপরের জন্য ওয়েট করত,তারপর অং‌শুর সাইকেলের পেছনে বসে রোজ গল্প করতে করতে বাড়ি ফিরতো।কি অকৃত্রিম টানই না ছিল দুজনের মধ্যে ওই বয়স টায়।তার পর দুজনেই  ভালো মার্কস পেয়ে প্রেসিতে চান্স পায় ফিসিক্স অনার্স নিয়ে।তখনকার দিনগুলো কত স্ট্রাগল ,কত ঝড় সামলেছে একে অপরের পাশে দাঁড়িয়ে।সকাল সাতটা ছাব্বিশের কৃষ্ননগর লোকাল ধরে শিয়ালদা আসতে লাগতো পাক্কা আরাই ঘন্টা।তখন অংশুর সা‌‌ংসারিক  আর্থিক পরিস্থিতিও ভালো ছিল না, কলেজের ক্লাস করে টিউশন পড়িয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত দশটা,তারপর রাত জেগে কলেজের পড়া।একেক দিন এমন হয়েছে ওর কাছে বাড়ি ফেরার পয়সা থাকতো না,ঈশিতা মান্থলি টিকিট কেটে রাখতো দুজনের,ঈশিতা যা টিফিন আনতো তা দিয়েই দুজনে ভাগ করে খেতো।এভাবেই সময় যেতে লাগলো।এক সময়ে গিয়ে অ‌ংশু রিয়ালাইজ করল ও ঈশিতা কে ভালো বেশে ফেলেছে, তখন ওরা যাস্ট সেকেন্ড ইয়ার কমপ্লিট করে থার্ড ইয়ারে উঠেছে,ওই বয়স টাই যে  প্রেমে পড়ার বয়স।ওই বছর ই ভ্যালেন্টাইনস ডের দিন ই অংশু প্রপোজড ঈশিতা,ঈশিতাও মনে মনে যে ওকেই ভালো বাসতো‌।তাই ওদের সরল বন্ধুত্ব টা প্রথম প্রেমে পরিনত হতে বেশি বিলম্ব ঘটলো না।কলেজ স্ট্রিটে বই কেনা হোক বা কফি হাউজে আড্ডা,ভিক্টোরিয়া, নন্দন,ওদিকে ঢাকুড়িয়া লেক থেকে শুরু করে গড়িয়াহাট পুরো কলকাতা টাই ঈশিতার চষে ফেলা ওই অংশুর হাত ধরেই।প্রথম প্রেম তো,বড়ই আবেগের হয়,ছোট খাটো ভুল ত্রুটি গুলোও তখন চোখে পড়ে না ।সে এক ছাতায় বৃষ্টি স্নান হোক বা হাতে হাত রাখা,বা চোখে চোখ রেখে সাত জন্ম একসাথে পথ চলার শপথ করা হোক বা ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়া,সব অনুভূতি গুলোই ভীষন প্রথম,ভীষন আবেগ জড়ানো এক পাগলামী,এক উন্মাদনা, এক ভরসা।শত অভাবের মধ্যেও তখন ওই দিনগুলো ছিল ভীষণ রঙিন।আস্তে আস্তে সময় গেল, ওরাও কলেজের গন্ডি পেরিয়ে দুজনের গন্তব্য দুদিকে হলো।ঈশিতা এম.ফিল করছে,ওর ইচ্ছে এরপর পি.এইচ. ডি করবে।আর অ‍ংশুর ইচ্ছে বি.সি.এস বা ইউ.পি.এস.সি দিয়ে সরকারি অফিসার হবে,আফটার গ্রাজুয়েশন ও তারই প্রিপারেশন নিতে লাগল।গোটা দু বছর প্রচণ্ড স্ট্রাগল করে ও ক্র‍্যাক্ করল এ্যডমিনিস্টেটিভ অফিসার।ওদের সা‌‍ংসারিক পরিস্থিতি ও এখন আর আগের মত নেই,সব দিক দিয়ে ওয়েল সেটল্ড।ওদের সম্পর্কের কথা দুই বাড়ি থেকেই জানতো,অমত করার ও কোনো জায়গা ছিল না।তাই অংশুর চাকরিটা পাওয়ার পর দু বাড়ি থেকেই ইনিসিয়েটিভ নিয়ে বিয়ের কথা শুরু হলো।ওদের চোখে তখন নতুন স্বপ্ন,একসাথে পথ চলার স্বপ্ন।
-“এ্যই ঈশু আমরা হানিমুনে কোথায় যাবো,সমুদ্র না পাহাড়?”
অংশুর কাধে মাথা রেখে ওর হাত টা জড়িয়ে উত্তর দেয় ঈশিতা “সমুদ্র”
– “থাইল্যান্ড না মালদ্বীপ?”
– “না না ফরেন ট্রিপ করার দরকার নেই, অনেক খরচ।”
-“তোকে অতো ভাবতে হবেনা, তুই শুধু তোর ইচ্ছেটা বল” ঈশিতার হাতটা নিজের হাতের মূঠোয় ধরে আশ্বাস দেয় অংশু।
ঈশিতা ও গদোগদো মুখে উত্তর দেয়,”তাহলে মালদ্বীপ যাবি?”
ঈশিতার আজকাল এসব কথা মনে পোড়লে বুকের ভেতর টা টনটন করে, খুব কষ্ট হয়,আর বাচতে ইচ্ছে করে না।নিজেকে শেষ করে ফেলতে ইচ্ছে হয়।
আজো ওর ওই বিয়ের লাল বেনারসী টা যত্ন করে জড়িয়ে ধরে চোখের জল ফেলে, কতো স্মৃতি আছে ওটার সাথে,অংশু নিজে পছন্দ করে ওকে ওই শাড়ি টা কিনে দিয়েছিল।
সেই বিয়ের দিন সকাল থেকে খুব নিষ্ঠা ভরে সমস্ত রিচুয়াল মেনে ছিল অংশু আর ফোনে মিনিটে মিনিটে
আপডেট দিয়ে যাচ্ছিল ঈশিতা কে।

 




 

সন্ধ্যা আটটা কুড়ি তে ছিল লগ্ন,তসরের ধুতি পান্জাবীতে কি সুন্দর ই না লাগছিলো অংশুকে ,চোখ ফেরানো যাচ্ছিলো না।কত নিমন্ত্রিত ,কত ধুমধাম করে বিয়েটা হলো ওদের। হানিমুন ও গেল মালদ্বীপে ই। এতদিন ওবধি সবটুকুই বেশ ভালোই কাটছিল। হানিমুন থেকে ফিরে প্রথম ছ’মাস বেশ ভালো ই কাটলো।ঈশিতা ও তখন সবে পি.এইচ.ডি তে ঢুকেছে,জে.ইউ থেকে করছে। ওর ও পড়ার চাপটা অনেক টাই বেড়েছে, স্বভাবতই আর পাঁচটা টিপিক্যাল সংসারী ওয়াইফ দের থেকে যা যা এক্সপেকটেড,ও ওই এক্সপেকটেসন লেভেল টা টাচ আপ করতে পারছিল না।অংশুও ছেলেবেলার বন্ধুত্ব,প্রেম,কমিটমেন্ট সব অতিক্রম করে আস্তে আস্তে টিপিক্যাল হাসব‍্যান্ড মেটেরিয়াল হয়ে উঠছে।যে অংশু দিনের পর দিন ঈশিতার জন্য কোচিং সেন্টারের বাইরে অপেক্ষা করেছে,রোদ,ঝড়,জল তোয়াক্কা না করে, আজ সে এক্সপেক্ট করে সারাদিন অফিস করে ফেরার পর ঈশিতা ওকে চা করে দেবে,অফিসে বেরোনোর সময় রুমাল,মোজা,আন্ডার ওয়‍্যার,শার্ট প‍্যান্ট এগিয়ে দেবে, টিফিন করে দেবে।প্রথম প্রথম যে ও চেষ্টা করেনি তা নয়, তবে এক্সপেকটেশন জিনিস টা এমন যতই করো,কিছুতেই মন শান্তি হয়না,আরও করো,আরও করো মনের ভেতর চলতেই থাকে।শুরু হলো তুলনা, ওমুক এর বৌ ওটা করে দেয়, তোমুক এর বৌ ওটা করে দেয়।আস্তে আস্তে শুরু হল তক্কাতক্কি, ইগোর লড়াই,ও বলছে আমি কেন বলবো না,আমি কেন চুপচাপ মেনে নেবো, কেউ কারোর থেকে কোনো অংশে কম নয়,একজন শুরু করলে অন‍্যজন ও সমান তালে ঝগড়া চালিয়ে যায়।আবার মিল ও হয়।দু একদিন খুব মিল,যেন একে অপরকে চোখে হারায়,বিয়ের আগের মতো, দুদিন যেতে না যেতে ই আবার শুরু।
“তোর কি ক্লাস ছিল যে এত দেরি হলো।ওই ছেলে টাই বা কে।”
“কোন ছেলে,তুই জানলি কি করে।”
“আজ অফিসের চাপ টা কম ছিল, ভেবে ছিলাম তোকে না জানিয়ে তোর ইউনিভার্সিটি তে গিয়ে তোকে সারপ্রাইজ দেবো আর তোকে নিয়ে একটু সাউথ সিটি ঢু মেরে আসবো।কিন্তু …”
“কিন্তু কি বল,থামলি কেন।”
“কিন্তু গিয়ে যা দেখলাম নিজেই সারপ্রাইজড হয়ে গেলাম।তুই বলেছিলি এক্সট্রা ক্লাস আছে, দেরি হবে ফিরতে।আর গিয়ে তুই দিব‍্যি ওই ছেলে টার সাথে আড্ডা দিচ্ছিস,গা ঢলাঢলি করছিস।”
“মাইন্ড ইওর ল‍্যাঙ্গুয়েজ অংশু,নাও আই সি,তুই সারপ্রাইজ দিতে না, গোয়েন্দা গিরি করতে গেছিলিস আমার পেছনে, নাহলে ক্লাস আছে,দেরী হবে এসব জেনেও গেলি কি করতে ।”
ব‍্যাস,আবার শুরু হয়ে গেল তক্কাতক্কি।বছর ঘুরতে না ঘুরতে ই সম্পর্ক তিক্ততায় এসে ঠেকলো।
“হাও কুড ইউ এক্সপেক্ট অংশু আমি এতদুর পড়াশোনা করেছি,এখনও করছি ,তোর বাড়িতে এসে মেইড এর কাজ করবো বলে।শুনে নে ওই রান্না করা, কাপড় কাচা,ঘর মোছা এসব আমি করতে পারবো না সব একা হাতে।কতবার তোকে বলেছি একটা রান্না র লোক রাখি, আমিও তো এখন কিছু আর্ন করছি,তুই না চাইলে আমি এ্যফোর্ড করছি,কিন্তু না ওনার নাকি বাইরের লোকের হাতে র রান্না মুখে রোচে না।সব সময়  উনি যা চাইবেন সেটাই আমাকে মেনে নিতে হবে লক্ষী বৌটি হয়ে, আমার মতামতের কোনো দাম দেওয়া হবে না।আমি আর এভাবে থাকতে পারছি না অংশু।”
“তাহলে থাকিস না,কেন আছিস,চলে যা।”
সকাল হতে না হতেই কিছু জামাকাপড়, বইপত্র যথাসম্ভব গুছিয়ে ও বেড়িয়ে এলো,অংশু একবারে র জন্য ও আটকালো না।
কিন্তু যাবে কোথায়, বাপের বাড়ি, শ্বশুর বাড়ি দুইই তো ওই কৃষ্নগর।বাঁশদ্রোনীর এই ফ্ল্যাট টায় ওরা দুজনই রেন্টে থাকতো, ভেবেছিল এবার আস্তে আস্তে হোমলোন এর জন্য এ্যপ্লাই করবে।
“শ্বেতা আমাকে দুদিন এর জন্যে একটু থাকতে দিবি,আমি দুদিনের মধ্যে একটা ঘর খুঁজে শিফট হয়ে যাবো।”
“আরে কাম,কাম,আগে আয় বস,কি হয়েছে বলতো, আরে হাসব‍্যান্ড ওয়াইফের মধ্যে এরকম হয়েই থাকে, তা নিয়ে এতো সিরিয়াস হওয়ার কি আছে, তুই থাকনা আমার কাছে যতদিন ইচ্ছে এত হেসিটেট করিসনা,দেখবি তোর বর বাবাজী বেশীদিন তোকে ছেড়ে থাকতে পারবে না” ওর কাধেঁ হাত রেখে আশ্বাস দিল শ্বেতা।
একদিন যায় ,দুদিন যায়,ঈশিতা পথ চেয়ে বসে থাকে, অংশুর ফোন আর আসে না।
ওদিকে অংশু ও ভাবে আজ না হোক কাল ঈশু কে তো সেই এখানেই আসতে হবে, কোথায় আর যাবে, পি.এইচ. ডি করছেন বলে মহারানীর আজকাল বড্ড দেমাক হয়েছে,থাকুক ও ওর দেমাক নিয়ে।
ও যদি আমাকে ছেড়ে ভালো থাকতে পারে, তবে আমি ও পারবো,একটা বারও ফিরেও তাকালো না বেরোনোর সময়, একবার ও ভাবলোনা আমি কি করে থাকবো ওকে ছেড়ে, এই ঈশুকে আমি চিনি না ,এ আমার ঈশু না,ও পাল্টে গেছে।
অভিমানের পাহাড় বাড়তে বাড়তে আকাশ ছোঁয়া হতে থাকে, ইগোর লড়াই নাকি সত্যি তার কেটে গেছে ওদের দুজনের ভালোবাসায়?এর উওর ওরাও খুঁজতে থাকে।

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 2   Average: 5/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।