সেল্ফি তুলতে ফ্যাসাদে

সেল্ফি তুলতে ফ্যাসাদে

গল্পের নাম: সেল্ফি তুলতে ফ্যাসাদে

কলমে- অভিজিৎ ঘোষ

 

জ অফিসের কাজের ঝুট ঝামেলা কম ছিল। তাই রতন বাবু আগে আগেই বেরিয়ে পড়লেন অফিস থেকে। ভাগ্যও সদয় ছিল। ফলে বাসটাও পেয়ে গেলেন সঙ্গে সঙ্গে। সাড়ে পাঁচটার মধ্যে বাড়ি পৌঁছে যাবেন। অন্যদিন বাড়ি ফিরতে আটটা বেজে যায়। অনেকদিন পর এত তাড়াতাড়ি ফিরছেন। মনে মনে বেশ আনন্দিত হলেন। তাই ঠিক করলেন ফেরার সময় ভজুর দোকান থেকে সিঙ্গারা কিনে নেবেন। সন্ধ্যা বেলায় আম-তেল, কুঁচানো পেঁয়াজ, চানাচুর দিয়ে মুড়ি মাখা আর সিঙ্গারা খেতে খেতে আড্ডা দেবেন বউ,মেয়ের সাথে।

একেই উৎপিরিক্ষে গরম, তার উপর প্রচন্ড ভিড় বাস। তিল ধারনেরও জায়গা নেই। অফিস টাইমে কলকাতার বাসের যা হাল হয় আর কি! গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর মত দুহাত তুলে দাঁড়িয়ে গরমে হাঁসফাঁস করছিলেন রতন বাবু। এমন সময় একটি চ্যাংড়া ছোকরা তাঁর দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো, ‘ও কাকু! ডান হাতটা নামান, বগলের সেন্টে অঞ্জান হয়ে যাবো তো!’
খানিক অপমানিত বোধ করে ভিড় ঠেলে শরীরটাকে হেলে সাপের মত এদিক ওদিক বাঁকিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেলেন তিনি। তারপর একটি সিটের পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়ালেন।

 




 

সামনের টু-সিটারে দুজন তরুণ তরুণী বসে। রতন বাবুর বয়স পঞ্চাশের ওদিকে। অধিকাংশ চুলেই পাক ধরেছে। একবার খুঁক খুঁক করে কাশলেন তিনি। ভাবলেন, যদি বয়স্ক মানুষ দেখে বসতে দেয়। কিন্তু তারা ভ্রুক্ষেপই করলো না। বরং তরুণ-তরুণী দুজনেই সেলফি তুলতে ব্যস্ত। বেশ ঘনিষ্ঠ ভঙ্গিতে উঠছে সেলফি। কখনো ‘পাউট’, কখনো ‘কিসি-ফেস’, কখনো বা মুখ ভেংচিয়ে— নানান পোজে উঠছে সেলফি। সেই সব ছবি আবার সোশ্যাল মিডিয়াতে পোস্ট হচ্ছে সাথে সাথে। মেয়েটি এই কাজে বেশি তৎপর। ছেলেটি তার সহযোগিতা করছে মাত্র।
রতন বাবু তাদের সিটের পিছনে আড়াআড়ি ভাবে দাঁড়িয়ে আছেন। তাই এসবের কিছুই তিনি দেখতে পাচ্ছেন না। শুধু দেখছেন, তরুণ-তরুণী দুজন একে অপরের গায়ে ঢলে পড়ছে, আর মোবাইল নিয়ে হাত উঁচিয়ে সেলফি তুলছে।
চিরকালই রতন বাবু বাক্য-বাগীশ প্রকৃতির। ঘরে বাইরে যেখানেই সুযোগ পান গল্প জুড়ে দেন। যেকোন বিষয়েই তাঁর অসামান্য জ্ঞান। পাশের একজন মাঝ বয়সী ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে তরুণ-তরুণীর দিকে ইশারা করে বললেন, ‘দেখছেন, এদের কান্ডটা। বয়স্ক মানুষটা দাঁড়িয়ে আছে আর বসে বসে এরা নোংরামি করছে। কোন ম্যানার্স নেই।’

ভদ্রলোকটি তাঁর কথায় সায় দিয়ে এক হাত ঘাড় কাত করে বললেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, যা বলেছেন আর কি!’
‘আমার ছেলে মেয়ে হলে ঝাঁটা পিটা করতাম।’
‘কাকে, আর কি বলবেন বলুন! আজ-কালকার সব ছেলেমেয়েরাই তো একইরকম।’

 




 

সৌভাগ্যক্রমে তাঁর ছেলে মেয়ে দুজনেই খুবই সংস্কৃতিসম্পন্ন। গুরুজনদের যথোচিত সম্মান প্রদর্শন করে। রতন বাবুর বড় ছেলে সান্তনু ব্যাঙ্গালোরে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। অত বড় কোম্পানিতে চাকরি করে, তবুও একেবারে মাটির মানুষ! দেবতুল্য ছেলে! আর ছোটমেয়ে রিমির তো কোনো তুলনাই হয় না। গায়ের রং শ্যামলা হলেও মুখটা যেন একেবারে লক্ষ্মী প্রতিমার মত। কলেজে উঠে গেছে এখনও শাড়ি ছাড়া সালোয়ার কামিজও পড়ে না; মডার্ন পোশাক তো দূরেই থাক। সত্যিই শ্রীলেখা রত্নগর্ভা মা! নিজের ছেলে মেয়ের জন্য গর্ববোধ হয় তাঁর। তাই বুক ফুলিয়ে মাথা নেড়ে বললেন, ‘উহুঁ, সবাই এক হয় না, বুঝলেন! বাপ-মায়ের শিক্ষার অভাবেই এমন অকাল কুষ্মাণ্ড তৈরি হয়।’

তরুণ-তরুণীদ্বয়ের স্টপ এসে গিয়েছিল বোধ হয়। তারা উঠে দাঁড়ালো। এতক্ষণ তাদের সম্পর্কে আলোচনার সবটাই তাদের কানে পৌঁছেছে। তরুণীটির মনে হচ্ছিল তাদের মধ্যে একজনের গলার স্বর তার খুবই পরিচিত। রতন বাবু তখনও তার ছেলে মেয়ের প্রশংসা করে চলেছেন। কৌতূহলবশত তরুণীটি মুখ ফেরাতেই রতন বাবু ভূত দেখার মত চমকে গিয়ে বড় বড় চোখ করে বলে উঠলেন, ‘একি! রিমি তুই!’

স্টপ আসতেই তরুণটি চোরের মত কেটে পড়লো। অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে রইলো রিমি। শরতের ফাজিল মেঘের মতো রতন বাবুর মুখের হাসি খুশি ভাবটা ইতিমধ্যেই কোথায় হারিয়ে গেছে। মাঝবয়সী ভদ্রলোকটি বিস্ময়-বিস্ফারিত চোখে একবার রিমির মুখের দিকে, একবার রতন বাবুর মুখের দিকে তাকাতে লাগলেন।

সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © অভিজিৎ ঘোষ

 




গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 0   Average: 0/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।