স্পেশাল বিরিয়ানী

স্পেশাল বিরিয়ানী

#গল্প:-
#স্পেশাল_বিরিয়ানী
✍#ঝিলিক_মুখার্জী_গোস্বামী
_________________________________________

#ভূমিকা:-
সারাদিনের ব্যস্ততার পর রাতের বিছানায় শরীরটাকে এলিয়ে দিয়ে মুঠোফোনে সবে মাত্র মুখবই টা খুলেছি। টুং টাং শব্দের ঝংকার তুলে একের পর এক নোটিফিকেশনের ভিড়। স্ক্রল আপ- ডাউন করছি। আমার নাম মেনশন করা একটা নোটিফিকেশন চোখে পড়ল। গেলাম সেই পোস্টে। দেখেই চক্ষু চড়ক গাছ। এখানেও নেপোটিজম! একটু মায়া নেইগো শরীরে। নিজের ভালোবাসার লোকজন কে বাদ দিয়ে আমার নামে সমন জারি করা হয়েছে। তালিকাভুক্ত অনেকেই। আমার নাম দেখে ভাবতে বসলাম, ভার্চুয়াল জগতে কিছু না করেও কত কি ঘটে যায়! শেষে এই তকমা? নেওয়া যায় না জাস্ট। ”বিশ্বাসী হোন। ঘাতক নয়”। মনে মনে ভাবলাম, এ জগতে কেউ কারোর নয় রে পাগলা। কে কখন পেঁপে দিয়ে চেপে চলে যাবে, আপনি ধরতেও পারবেন না।

সকালে চোখ খোলার সাথে সাথে ইয়ে চেপে আগে মুঠোফোনের সাথে মুলাকাত করা আবশ্যক। রোজকার রোজনামচার মধ্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এই কাজ। স্বভাব যায় না ম’লে। স্বভাব বলুন বা অভ্যাসের দাস বলুন, মুঠোফোনে চোখ রাখতেই…… আবার ট্যাগ পোস্ট। সরাসরি সেই পোস্টে চলে গেলাম আঙুল ট্যাক্সি সঙ্গে করে। পোস্ট দেখে নিজের মনেই হেসে উঠলাম। এই ছিল আপনার মনে! এইভাবে……. চ্যালেঞ্জ এক্সেপ্টেড।
__________________________________________




#মূল_গল্প:-

উফফ। আজ সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি গেল। বাজারে লেবু কিনতে গিয়ে আমার নিজেরই জুস বেরিয়ে গেল, স্বেদগ্রন্থি দিয়ে। এত দাম দিয়ে ছোটো লেবু খাওয়ার থেকে জল খেয়ে থাকা ভাল। সব বিশ্বাস ঘাতকের দল। গাছের লেবুকে একটু বড়ো হতে দিলে নাকো। শিশু লেবু গুলোকে নিয়ে ব্যবসা চালাচ্ছে। ঝুড়ির লেবুগুলোর দিকে তাকিয়ে কেমন যেন স্নেহ জন্মাল। স্বগতোক্তি করলাম, ‘ইস’ বলে। তোদেরকেও শিশু অবস্থায় এইভাবে নির্যাতন করল রে। না! মানুষ রূপে সব এক একটা রাক্ষস।

–“ও দিদি। লেবু নেবেন কি”?
–“নইলে দোকানের সামনে টা ক্লিয়ার করুন। অন্য কাস্টমার আসবে”।

–“না দাদা। ও লেবুর মধ্যে পরিপক্কতা আসে নি এখনও “।
–“পরিপক্ক লেবু এলে আসবখন”।

বড়ো বড়ো চোখের সাথে শার্কের মতো দাঁত বের করা একটা ইয়া বড়ো হাঁ করে দু’জোড়া চোখ আমার দিকে অবুঝের মতো তাকিয়ে আছে। সময় নষ্ট না করে সেখান থেকে অন্য একটা দোকানে পা বাড়ালাম। একের পর এক ফল দোকানে ঘুরছি। ঠিক মনের মতো জুটছে না। সূর্যদেব তখন মাথার উপরে ঝাঁ ঝাঁ করছে। বোধহয় এখুনি জ্বালিয়ে দেবে। ও ব্যাটাকে টক্কর দেবার সাধ্য আমার নেই। খাঁ খাঁ রোদে অনেকক্ষণ ঘুরে বিরক্ত হয়ে বাড়ি ফেরার পথ ধরলাম। সেদিনের মতো লেবু অভিযান শেষ। সারা বাজারে তন্ন তন্ন করে, ‘অ্যামাজন অভিযান ‘ এর মতো অভিযান চালিয়ে ব্যর্থ হয়ে; বিষাদ মনে বাড়ি ফিরলাম। মনে মনে সব কটা ফলওয়ালাকে গাল দিলাম, ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে।

বাজার থেকে বাড়ি এসে ধপ করে সোফায় বসে ঢকঢক করে এক বোতল ঠান্ডা জল পাণ করে ধড়ে প্রাণ আর মনে একটু শান্তি ফিরে এল। মান্ধাতার আমলের ফ্যানের হওয়া খেয়ে সোজা ওয়াশ রুমে। নিজেকে এবার একটু পরিস্কার করা দরকার। শাওয়ারটা চালিয়েছি, কয়েক ফোঁটা জল গা-মাথা স্পর্শ করেছে কি করেনি। গরম ছ্যাঁকা খেয়ে ছিটকে এলাম। সূর্যদেব দয়ালু হয়ে আমার জন্য গরম জলের ব্যবস্থা করেছেন। মনে হ’ল গরম তাওয়ায় কেউ জোর করে বসিয়ে দিয়েছে। ওইভাবেই এদিক ওদিক কত্থক, ওড়িশি; কথাকলি নাচতে নাচতে স্নান সেরে বেরোলাম।

দুপুরের স্নান -খাওয়া সেরে একরাশ ক্লান্তিদের সঙ্গী করে বাবার বানিয়ে দেওয়া নারকেল ছোবড়ার শক্ত গদিতে এদিক ওদিক নাগিন ডান্স করতে করতে ঘুমিয়ে পড়লাম। টানা কতক্ষণ ঘুমিয়েছি খেয়াল করতে পারিনে। ঘুম ভাঙল, পাশের বাড়ির কাকিমার সন্ধ্যা শাঁখ আর কাঁসা বাজানোর আওয়াজে।

সকালের লেবু অভিযানে ব্যর্থ হয়ে বিষন্ন মনটাকে চাঙ্গা করার জন্য ঠিক করলাম, রাতে মশলা মাখা ভাত খাব। সাদা-হলুদ রঙের ভাত। ওটি আমার সব মন খারাপ দূর করে দেয়। সাথে একটা ফিরনি নিলে মন্দ হয় না। ভেবেই দিল পুরো গার্ডেন গার্ডেন হয়ে গেল। বারবার ঘড়ির তিনটে কাঁটার দিকে দেখছি। নয় ঘরে পৌঁছনো মাত্র নব্বই ডিগ্রি কোণ অঙ্কিত হওয়া মাত্র…… জমাটো। টমাটো নয় কিন্তু। অ্যাপটা ওপেন করেই, পছন্দের রেস্টুরেন্ট আর্সালানে হানা দিলাম।




মেনু কার্ড ওপেন করে ক্রমশ নীচের দিকে নামছি। রঙিন ভাতের তালিকায় পৌঁছালাম। প্রায় সবই খেয়েছি। ‘স্পেশাল’ টা খাইনি তো! অর্ডার করে দিলাম। সঙ্গে সঙ্গে নোটিফিকেশন, অর্ডার গ্রহণ করা হয়ে গেছে। অর্ডার আসার সময়টুকু হাতে নিয়ে আয়তকার ঠান্ডা ঘরের হ্যান্ডেল ধরে হেঁচকা টান মেরে….খুলে যেতেই দেখি সেখানে লাল-সবুজ-গেরুয়া সব রঙের একটি মিলিত সম্মেলন চলছে। অবাক হলাম সে দৃশ্য দেখে। অবাক হওয়ার ই কথা।

ফোনের সাথে সাথে কলিং বেল বেজে উঠল কিছুক্ষণের মধ্যেই। লাল টিশার্ট -লাল ব্যাকপ্যাক-লাল বাইক। লালে লালেশ্বরী। থুড়ি, জোমাটো ডেলিভারী বয়, মুখে একটি নিষ্পাপ হাসি নিয়ে আমার জন্য বয়ে আনা ‘স্পেশাল বিরিয়ানী ‘ আমার দিকে বাড়িয়ে দিল। ”ছোঁ মেরে ওই ঝপাস করে, ঈগল পাখি শিকার ধরে” ঠিক ওই লাইনটাই প্রযোজ্য ছিল, আমার বিরিয়ানী নেওয়ার ধরনটায়।

সব কিছু সাজিয়ে গুছিয়ে বেশ পরিপাটি করে বসেছি। প্যাকেটের ভিতর থেকে সুন্দর একটা গন্ধ আসছে। যা আমাকে অভিভূত করছে। খুব যত্নে পাঠানো রঙিন ভাতের পসরাটা খুলে থালার মধ্যে ঢালতেই চমকে উঠলাম। এ কি! এ যে আমি কস্মিনকালেও ছুঁই নি। খাওয়াতো অনেক দূরের কথা। দেখেই ঘেন্নায় সারা শরীর কেঁপে উঠল। চোখ দুটো বিস্ফারিত হ’ল। মনের মধ্যে আর একটা মন প্রচন্ড রাগে রাগান্বিত হ’ল। সকালের পর আবারও। আজকের দিনটাই খারাপ। বিশ্বাসঘাতকতা।

–“হ্যালো আর্সালান”?
–“এ কি পাঠিয়েছেন আপনারা”?
–“কেন উল্লেখ করেন নি”?
–“বিশ্বাসঘাতক”।




ওপ্রান্ত নির্লিপ্ত গলায়,
–“বড্ড ভুল হয়ে গেছে ম্যাডাম”।
–“দুঃখিত”।

একপ্রকার রেগে আগুন, তেলে বেগুনের মতো বলে উঠলাম, আপনার সরি তে আমার পেট ভরবে না। খাবার রিপ্লেস করুন নয় টাকা ফেরত দিন। এই আপনার ‘স্পেশাল বিরিয়ানী’? মর্টন দিয়ে বানানো। যা আমি খাই না। বিশ্বাসঘাতকতার জন্য আমি ক্রেতা সুরক্ষা দপ্তরে অভিযোগ জানাতে পারি জানেন? এবার ওপ্রান্ত কাঁচুমাচু হয়ে,

–“ম্যাডাম, খাবার তো রিপ্লেস হবে না। টাকা রিফান্ড করছি।”

হ্যাঁ। হ্যাঁ তাই করে কৃতার্থ করুন। এরপর থেকে খাবারের জায়গায় বিবরণ মূলক বিবৃতি দেবেন। মনে থাকে যেন। নইলে……

–“ঠিক আছে ম্যাডাম”।
–“দুঃখিত আরও একবার “।

সে রাতে লাল-গেরুয়া-সবুজের মিলন মেলা ভঙ্গ করে তাদেরকে আমার রাতের খাবারের সঙ্গী হিসাবে নিয়েছিলাম। একটা সারাদিন সাক্ষী ছিল বিশ্বাসঘাতকতার। নিকষ কালো অন্ধকারময় ঘরে মধ্যপ্রদেশ হাল্কা ভর্তি করে অবসন্ন মনের সাথে ডুব দিয়েছিলাম চিন্তাদের ভিড়ে। গোটা দুনিয়া টা অবিশ্বাস্য ভাবে অবিশ্বাসে ভরে গেছে। মুখের মধ্যে মুখোশ পরে নিজেদের আসল চেহারা লুকিয়ে রেখে জীবনের রঙ্গ মঞ্চে অভিনয় করে চলেছে সবাই। মুখোশধারী মানুষ সবাই। একটু সুযোগ বুঝলেই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে আপনাকে এমন জায়গায় নিয়ে গিয়ে নামাবে, তা কল্পনাতীত।
____________________________________

#বিশেষ_টিপ্পনী:-

অবিশ্বাসী, বিশ্বাসঘাতক নয়!
বিশ্বাসী বন্ধু হোন।
_______________________________________

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 3   Average: 5/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।