স্বাগতমদার সঙ্গে

স্বাগতমদার সঙ্গে

স্বাগতমদার সঙ্গে

Pabitra Adhikary

 

স্বাগতদাকে  তোমরা চেনো কি না জানি না. যারা চেনে না, তাদের জন্যই এই গল্প লেখা. স্বাগতমদার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয় মালতি ভবনে. এখন নিশ্চয় বলবে-মালতি ভবন আবার কোথায়? তাই বলি, চুপচাপ বসে আগে পুরো গল্পটা শোনো.
ইসালমপুর হাইস্কুল তো চেনো. তার বিপরীত দিকে মানে হাইরোডের যে পাশে স্কুল আছে, তার উল্টোদিকের গলিতে সোজা চলে যেও. আরে, বেশিদূর যেও না. তবে মোমিতাদের বাড়ি পার হয়ে, তারপর সোনালিদের বাড়ি পার হয়ে সামনে রেল লাইন. তাই বলছি, সবচেয়ে সামনে যে গলিটা পাবে সেটাতে ঢুকে পড়বে. ডানদিকে দেখবে ধূসর রঙের একটা বাড়ি, সামনে ছোট একটু বাগান. এটা কিন্তু মালতি ভবন না. এটা মান্টিদের বাড়ি. এপাড়ায় মান্টির সুখ্যাতি ও কুখ্যাতি দুটোই আছে বল, যে কাউকে বললে দেখিয়ে দেবে, এটা মান্টিদের বাড়ি. মান্টিদের বাড়ির উল্টোদিকে যে হলুদ রঙের বাড়িটা আছে, সামনের গেটটা ও দেখতে ভারী সুন্দর, এক ঝলক দেখলে পুতুল পুতুল বাড়ি মনে হয়, সেটাই মালতি ভবন.
তবে আমার মনে হয়, এই বাড়িটাক নাম মালতি ভবন না হয়ে যদি পাগলা গারদ বা লাফিং ক্লাব রাখা হত, তবে উপযুক্ত নাম হতো.
স্বাগতমদা আমার এ গল্পের নায়ক-তাই স্বাগতমদাকে দিয়েই শুরু করছি.
স্বাগতমদাকে দেখতে শুনকে বেশ ভাল. স্বাগতমদাকে কোন মতেই বেঁটে বলা যাবে না. লম্বায় কমপক্ষে পাঁচ ফুট তো হবেই, বরং দু এক ইঞ্চি বেশি হতে পারে. স্বাগতমদার চেহারাটা মোটা-সোটা, নাদুস-নুদুস. দোষের মধ্যে দোষ, পেটের ভুড়িটা এখন বড্ড বেশি বেড়ে যাচ্ছে. তবে স্বাগতমদা নিজের শরীরটাকে এমনভাবে অভিযোজিত করেছে যে সব কিছু মানিয়ে যাচ্ছে.
স্বাগতমদার মুখটা সবসময় মিষ্টি. এখনও ঠিকমতো দাঁড়ি গজায়নি. তবে মুখে একখানি সরু গোঁফের রেখা দেখা যায়. ওটা নাকি পুরুষত্বের প্রতীক.
স্বগতমদা রুপে কার্তিক তো গুনে গনেশ. দু-একটা খুব বড় বড় কবিতা লেখে. ভাল ছবিও আঁকতে পারে. মাঝে মাঝে গুন গুন করে গান গায়. গানের গলাটা ও ভারি  মিষ্টি.

স্পেশাল বিরিয়ানী গল্পটি পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন।




স্বাগতমদার রান্নার হাত ও খুব ভালো. আমাকে কত দিন কত কিছু রান্না করে খাইয়েছে-সেই সব ভুলি কি করে?
স্বাগতমদা এবার সবে মাত্র টুয়েলভ পরীক্ষা দেবে. আমি ইলেভেন পরীক্ষা দিয়েছি.
এই স্বাগতমদার ওপর একদিন আমার খুব রাগ হয়েছিল. রাগের কারণটাও অদ্ভুত. ঠিক আছে, সেই গল্পটাও বলছি.
একদিন আমার মামাতো বোন এসেছে, আমার সাথে দেখা করতে. আমি ভাবছি, স্বাগতমদার সাথে পরিচয় করিয়ে দেব.
স্বাগতমদার ঘরে আমি দৌড়ে গেলাম. বললাম, “ স্বাগতমদা, চলো- আমার মামাতা বোন এসেছে,”
স্বাগতমদা আমাকে ধমক দিয়ে বলল, তোমার মামাতো বোন এসেছে তো আমি কি করব?”
আমি তোতা মুখ ভোতা করে বাইরে বেরিয়ে এলাম.
একটু পরে আমার বারান্দায় বসে আড্ডা মারছি. হঠাত স্বাগতমদার দরজায় একটা খট করে শব্দ. স্বাগতমদা বেরিয়ে এল. পরনে টাইট ফুল-প্যান্টটা আর গায়ে নতুন স্যান্ডো-গেঞ্জি.
গামছাটা নিয়ে দড়িতে মেলতে এসেছে আর আমার মামাতো বোনেক দিকে তাকাচ্ছে আর মিটমিট করে হাসছে.
স্বগতমদার এই স্টাইলটা আমার  ভালোই লাগে. কিন্তু কেন জানি সেদিন আমার খুব রাগ হয়েছিল.
আমি আবার কারো ওপর বেশিক্ষন রাগ করে থাকতে পারি না. চোখ বন্ধ করে দু-মিনিট ভাবি, এত বড় বিশ্ব-ব্রহ্মান্ডে আমি কত ক্ষুদ্র এক জীব.
তখন মনের সমস্ত রাগ কোথায় উধাও হয়ে যায়, কে জানে.
আবার যখন নিজেকে খুব ছোট মনে হয়, তখন একা একা মাঠে চলে যাই. আশে পাশে তাকিয়ে দেখি কেউ নেই. দু-একটা কৃষক হয়তো মাঠে কাজ করছে. ওরা কেউ আমাকে চেনে না. আমি তখন চিতকার করে বলি, তিন বার, “ আমার মনের সমস্ত সংকীর্ণতা দূর করে দেও”
তারপর নিজেকে খুব বড় মনে হয়. যেন ঐ আকাশের চেয়েও বড়.
উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার পর স্বাগতমদা চলে যাবে. আমরা সবাই তাই ভেবেছিলাম. কিন্তু তা হল না.
আমাদের সবাইকে অবাক করে স্বাগতমদা থেকে গেল. উদ্দেশ্য উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার পর কম্পিউটার শেখা.
আসল উদ্দেশ্যটা অবশ্য আমি জানি, সে সব কথা স্বাগতমদা আমাকে বারবার করে বলতে মানা করেছিল.
স্বাগতমদার আসল উদ্দেশ্যটা হল মেয়ে পটানো. এতদিন পড়াশুনার চাপ খুব বেশি থাকায় ইচ্ছে থাকলেও কোন উপায় হয় নি. এখন যেভাবেই হোক, প্রেম করতেই হবে.
স্বাগতমদার এই সব কান্ড কারখানা দেখে আশেপাশে যে একদমই ফিস-ফাস হতো না, তা নয়. তবে স্বাগতমদা এসব একদম গায়ে মাখতো না.
মেয়েরা দিনরাত সাজগোজ করলেও কোন দোষ নেই আর ছেলেরা একটু সাজলেই মহাভারত অশুদ্ধ, চারদিক ফিস-ফাস. এই বৈষম্য আর কত দিন চলবে?
তারপর শুরু হয়ে গেল OPERATION প্রেম. প্রথমেই খোঁজাখুঁজি পর্ব. আমি আর স্বাগতমদা দুজনে মিল টানা দশদিন ধরে এদিক-ওদিক খুঁজতে লাগলাম. কিন্তু সেখানেও বিপত্তি. কোন মেয়েই স্বাগতমদার পছন্দ হয় না. সব মেয়েকে দেখে আর স্বাগতমদা নাক সিটকোয়. ভাবটা এইরকম, এইরকম মেয়ে কি আমার মানায়? আমি কি রাস্তার ছেলে?
তারপর একদিন সেই দিন এল. স্বাগতমদার মেয়ে পছন্দ হল তাও আবার এক সাথে দু-জনকেই, একটা গানের অনুষ্ঠানে দুজনে মিলে গান গাইছিল. স্বাগতমদা তো প্রথম দেখাতেই কুপোকাত. আমাকে ডেকে বলল, “এরকম মেয়েই আমার চাই”.
খোঁজাখোঁজি পর্ব এখানেই শেষ হল.
স্বাগতমদার স্পাই চারদিকে ছড়ানো. দুদিনের মধ্যেই ঐ দুটো মেয়ের সমস্ত নাড়ি-নক্ষত্র আমাদের কাছে চলে এল.
এক জনের নাম রাই মুখার্জি, বাবা BANK এ চাকরি করে আর মা নেতা টাইপের অন্যজন অদিতি দাস,  বাবা PRIMARY SCHOOL- এর মাষ্টার আর মা নিপাট গৃহবধু.
কিন্তু এই দুটো মেয়ের মধ্যে কোন দিকে এগোনো ঠিক হবে. এই নিয়ে ভাবতে ভাবতে আমাদের দুজনের তিন দিন তিন রাত্রি কেটে গেল.
তারপর ঘটল অঘটন, যা আমাদের সমস্ত PLAN- কে ওলোট পালোট করে দিল.
মালতি ভবন ঢুকতেই যে ছোট্ট মতন খুপরিটা পড়ে, সেটাই স্বাগতমদার আশ্রয়-স্থল.
এই দিক দিয়ে পাশের বাড়ি মান্টি আর আরও অনেক মেয়ে যাতায়াত করে.
সেই দিন স্বাগতমদা তার স্বভাব সিদ্ধ ভঙ্গীতে জানলার ফুটোতে চোখ রেখে বসে আছে. বাইরে থেকে শুধুমাত্র স্বাগতমদার চোখ দেখা যায় আর কিছু না.
আমি স্বাগতমদার পাশেতে বসে আছি. এমন সময় দেখলাম একজন ভদ্রলোক, এক জন ভদ্রমহিলা আর একটা মোটা-সোটা নাদুস-নুদুস মেয়ে আসছে. এই বাড়িতে নতুন ভাড়াটিয়া পরিবার.
মেয়েটার নাম মামুন. সৌভাগ্যক্রমে না দুর্ভাগ্যক্রমে বলব, মেয়েটা রাই মুখার্জি আর অদিতি দার-দেরই সাথে একই স্কুলে পড়ে, একই ক্লাসেতে মানে এবার নাইনে পরীক্ষা দিয়ে টেন-এ উঠল.
পরের দিন সকাল ন-টা পর্যন্ত মেয়েটা ঘুমিয়ে আছে. দরজাটাও খোলা. আশে পাশে  কেউ নেই.
আমি ভাবছি, বাবা মায়ের একই মেয়ে-আদরে একদম বাদর হয়ে গেছে.
স্বাগতমদা আমাকে টেনে নিয়ে ঘরে গেল, তারপর বলল, “কেমন লাগছে শিবুদা”
আমি কিছু বুঝতে না পেরে বললাম, “কি?”
আমি বললাম, “ ভালো, কিন্তু,”
স্বাগতমদা আমাকে মাঝপথে থামিয়ে বলল, “ আমার সাথে কেমন মানাবে বলো তো”
আমি অবাক হয়ে বললাম. “ কিন্তু তোমার অদিতি দাস আর রাই মুখার্জি….”
স্বাগতমদা বলল, “ গুলি মারো ওদেরকে…”
আমি বললাম, “ কিন্তু বাড়িতে জানাজানি হয়ে গেল খারাপ হবে.”
স্বাগতমদা তাচ্ছিল্যের সাথে বলল, ( এমন ভাব যে প্যার কিয়া তো ডরনা ক্যায়া) “ভালো মাল”
আমি বললাম, “কিন্তু তোমাকে দিবে তো?”

জীবাশ্ম গল্পটি পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন।




স্বাগতমদা বলল, “দিবে না মানে, আলবাত দিবে, ক্যালি লাগে, বুঝলে”
স্বাগতমদার ক্যালি আছে মানতেই হবে. দু দিনের মধ্যেই মেয়েটার সাথে আমাদের দু-জনের খুব ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গেল.
তারপর একদিন ছাঁদে আমরা তিন জন দাঁড়িয়ে আছি. তখন সন্ধ্যা হয়ে আসছে. সূর্য্য ডুববে ডুববে. এসময় নাকি সবাইকে দেখতে ভালো লাগে.
ও একটা কথা তো বলাই হয়নি. ছাঁদে যাওয়াটা আমাদের কাছে খুব আনন্দের. সন্ধ্যেবেলায় যখন পড়তে বসি তথন বারবার ধ্যান করি আর ডাকি, যদি সর্বশক্তিমান বলে কেউ থেকে থাকে, তার কাছে প্রার্থনা করি, আর কিছু চাই না, শুধু চাই যেন লোডশেডিং হয় যায়.
তাহলেই ছাদে বসে একটা জম্পেস আড্ডা দেওয়া যাবে. সবসময় আমাদের প্রার্থনা বিফল হয় না.
তবে রবিবার দিন আমি রাজা. আমি ROUTINE-টা এভাবে বানিয়েছি যে রবিবার দিন  কোন পড়া থাকবে না.
তাই রবিবার, সারাদিন ধরে আড্ডা মারি. এইদিকে ছোড়দির তো আমার ওপর খুব রাগ. আমি আর ছোড়দি এখই সাথে থাকি. ছোড়দি কলেজে পড়ে.
ছোড়দির ধারনা, আমার দ্বারা আর পড়াশুনা হবে না, ছেলেটা একদম বখে গেছে. SCIENCE নিয়ে পড়ে এত কম পড়ে কি কোনদিন পাশ করা যায়?
এই পড়াশুনা নিয়ে ছোড়দির সাথে আমার কম ঝগড়া হতোনা. সেইসব কথা না বললেই ভালো.
তার চেয়ে বরং ভালো. আমি এই বাড়ির অন্যদের গল্প একটু করে শোনাই.
এই বাড়িতে প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু PECULIAR বৈশিষ্ট্য আছে.
রুপকদার কথা বলি. রুপকদা TRANSPORT-এ চাকরি করে আর শখের মধ্যে গান গায় আর তবলা বাজায়. গান-পাগল ছেলে.
আশে পাশের সবাই রূপকদাকে খুব ভালোবাসে.
আমি তো একদিন বোকার মতো বলেই ফেললাম, “রুপকদা-সবাই তোমাকে এত ভালোবাসে কেন?”
রূপকদার সলজ্জ জবাব, “ফজলি আম তো ভালো লাগবেই”.
এই ফজলি আমি প্রসঙ্গটা আমি ঝুমাদির কাছে গিয়ে পাড়লাম. ঝুমাদি তো সেই কথা শুনে হেসে লাল, বলল, “কেন? আমার তো ফজলি আমি লাবো লাগে না”
ঝুমাদির সাথে রুপকদার একটা রেশারেশি চলছে. রূপকদা একবার ঝুমাদিকে একটা ভুটিয়া কুত্তা ধরিয়ে দিয়েছিল. সেই থেকে ঝুমাদি রূপকদার নাম রেখেছে ভুটিয়া কুত্তা.
তারপর একবার রূপকদাকে আর ঝুমাদিকে একসাথে তাস খেলতে রাজি করিয়েছিলাম. কিন্তু সেবারও শেষ রক্ষা হল না.রূপকদা যখন ঝুমাদিকে তুই তুই করে সম্বোধন করল, তখন ঝুমাদির চোখ মুখ লাল হয়ে গেল.
তারপর থেকে রূপকদার ওপর ঝুমাদির রাগ. ঝুমাদি HEALTH-এ চাকরি করে. কিন্তু কোন রোগা-টোগা মানুষ দেখলে ঝুমাদি দূরে দূরে থাকতে পছন্দ করে.
আবার নিজে থেকেই বলে, “ আমার ভাই IMMUNITY POWER খুব কম, রোগা-টোগা থেকে দূরে থাকাই ভালো”
অন্যদিকে দিনরাত বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা. বলে, “MULTIPURPOSE এ চাকরি করি. আমাদের তো PUBLIC-এর সাথে মিশতেই হবে”
ঝুমাদির এতসব কথা বুঝিনা.
এই দিক দিয়ে দেখতে জয়দা খুব ভালো রুপকদা যদি শিল্পী হয়, তবে জয়দা খুব ভালো গল্পি. আমার সাথে এসব দেখে খুব মজা পায়.
জয়দা রাত্রির পর রাত্রি ভাত না খেয়ে শুধুমাত্র দইচিরা খেয়ে থেকে যায়. তাই জয়দার নাম রাখা হয়েছে দইচিরা. এই সব নাম ঝুমাদি রেখেছে. খেয়ে দেয়ে আর কাজ নেই.
বাড়িওয়ালার মেয়ে গুড্ডি NINTH CLASS-এ পড়ে. তার মাষ্টার মশাই বিরু (কলেজে পড়ে)  আর আমাদের পাশএর ঘরের জয় যখন একসাথএ মিলে যায়, তখন বাড়ির মধ্যে যেন শোলে ফিল্ম শুরু হয়ে যায়.
স্বাগতমদা এসব বিষয়ে নিয়ে চর্চা করে. আমি ASSISTANT.
স্বাগতমদা এখন অবশ্য অন্য খেলায় ব্যাস্ত. ছাদে আমরা তিনজন দাঁড়িয়ে আছি. স্বাগতমদা আর মামুন দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে আছে. আমি মধ্যে কাবাব মে হাড্ডি.
স্বাগতমদার মুখটা লজ্জায় কিসমিসের মতো শুকিয়ে কাচুমুচো হয়ে গেছে. স্বাগতমদা একটা চিঠি লিখে নিয়ে এসেছে. প্রেম-পত্র.
I LOVE U MAMON (9 12-15-22-5 21 13 13-1514)
নিচে CODE অক্ষরে এসব লেখার যে কি মানে, বুঝি না.
এই প্রথম দেখলাম, স্বাগতমদাকে ইতঃস্তত বোধ করতে. স্বাগতমদা কিছুতেই চিঠিটা মামুনের হাতে তুলে দিতে পারেছে না.
আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, স্বাগতমদা বোধহয় সত্যি সত্যি প্রেমে পড়ে গেল. এত সুন্দর ছেলেটা, হাসতো-খেলতো, এখন কি হবে?
হঠাত দেখলাম, স্বাগতমদা আমাকে ছাদের এক কোনায় টেনে নিয়ে গেল. তারপর ফিসফিস করে কি যে বলল আর সেই চিঠিটা আমার হাতে ধরিয়ে দিল.
আমি হাতে চিঠিটা শক্ত করে ধরে বললাম, “ স্বাগতমদা, আমি কি পারব?”
স্বাগতমদা বলল, “কেন পারবে না? শুধুমাত্র RESULTটা একটু ভালো ভাবে জেনে নেবে PLEASE.”
স্বাগতমদা চলে গেল. যাওয়ার আগে চিতকার করে বলে গেল, “ আমার COMPUTER CLASS দেরি হয়ে যাচ্ছে”
স্বাগতমদা আমাকে কমকম আর মামুনক্ বেশি বেশি টাটা বাই করে চলে গেল.
আমরা দুজন ছাদে দাঁড়িয়ে রইলাম.
স্বাগতমদা নিচে নেমে গেল. সাইকেলটা বের করার সময় খট করে একটা শব্দ হল. সাইকেলে ওঠার আগে আমাদের দিকে একটু তাকাল, একটু মুচকি হাসল. তারপর সাইকেলে উঠে চলে গেল. এখন বুঝি COMPUTER CLASS দেরি হচ্ছে না, আমার হাতে শক্ত করে চিঠিটা ধরা. মামুনকে দেখে মনে হচ্ছে ওর বয়স কম হলে কি হবে সব বুঝে. হয়তো অনেক অভিঞ্জতা আছে. এদিক থেকে দেখতে গেলে স্বাগতমদাটা হাবা-গোবা, আমিও.
মামুন আমাকে জিঞ্জেস করল, “এটা কি?”
আমি আর কি বলব, সত্যি সত্যি বলে ফেললাম, “চিঠি”
এবার ও আমাকে বলল,  “কাকে?”

তারপর দুজনেই চুপ. দেখলাম, ও মিটমিট হাসছে. আমার কাছে, কেন জানি অসহ্য মনে হচ্ছে.
আমি প্রসঙ্গ তাড়াতাড়ি পাল্টালাম, “আচ্ছা, তুমি রাই মুখার্জি-অদিতি দাস, এদের চেনো.”
ও বলল, “কেনে চিনব না? আমাদের সাথেই তো গার্লসে পড়ে.”
আমি বললাম, “কেমন মেয়ে গো ওরা?”
ও বলল, “রাইট একটু অহংকারী টাইপের, অদিতি ঠিক আছে”
আমি এবার মাথা নিচু করে বললাম, “স্বাগতমদা ওদের দুজনকে না খুব পছন্দ করে”.
দেখলাম, যেন মনে হল মামুনের মাথায় বাজ পড়ল. আমি বললাম,
“তোমাকে একটা কাজ করে দিতে হবে. চিঠিটা পৌঁছে দিতে হবে”
মামুন রেগে গেল, বলল, “কাকে?”
আমি বললাম, “দুজনের মধ্যে যে কোন এক জনকেই দিতে পারলেই হল”
মামুনের তপ্ত শরীরে যেন গরম কড়াইয়ের ছ্যাকা লাগল. বলল, “আমি পারব না. বাবা-মা শুনলে খুব রাগ করবে,”
আমি বললাম, “চিঠিটা তাহলে কি করব? ছিঁড়ে ফেলব?”
মামুন সন্মতিসূচকভাবে মাথা নাড়ল.

অন্য বিচার গল্পটি পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন।




আমি চিঠিটা কুটিকুটি করে ছিড়ে ফেললাম.
তারপর বললাম, “স্বাগতমদাকে তুমি একথাগুলো বলতে পারবে তো?”
মামুন বুক ফুলিয়ে বলল, “কেন পারব না? যা করতে পারব না, তা পারব না, কেন বলতে পারব না?”
আমি বললাম, “ঠিক আছে, স্বাগতমদা যদি তোমাকে কিছু জিঞ্জেস করে, তবে তুমি বলে দিও, যে আমি পারব না, বাবা-মা শুনলে খুব রাগ করবে.”
মামুন বলল, “ঠিক আছে, আমি বলে দেব,”
তারপর দুজন গল্প করছি. এমন সময় নিচে থেকে ওর বাবা ডাক দিল, “বেটা, আয়, দুধ কলা খেয়ে যা.”
স্বাগতমদা*********************** থেকে এখনই ফিরে এসেছে. দৌড়ে আমার ঘরে চলে এল. তারপর স্বাগতমদা আমাকে টেনে নিয়ে গিয়ে বলল, “ কি হল, শিবুদা”
আমি আর কি বলব, বললাম, “নেগেটিভ গো, বলল পারবে না, বাবা-মা শুনলে রাগ করবে”
স্বাগতমদা চিতকার করে উঠল, “ওর কোন আপত্তি নেই. বাবা-মার জন্যই না করে দিয়েছে”
আমি সাহস করে মিথ্যা কথা বললাম, “কিন্তু তোমার চিঠিটা যে কুটিকুটি করে ছিড়ে ফেল, তার বেলায়.”
স্বাগতমদা বলল, “ চল দেখে আসি”
তারপর চিঠিটা কুড়িয়ে নিয়ে এসে কয়েকবার চুমু খেল. তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল,  “মেয়েটা খুব ভালো, বিয়ে করবার জন্য ঠিক আছে.
আমার থেকে তিন বছরের ছোট. আমার জন্য একেবার আদর্শ.”
আমি বললাম, “তুমি আবার সত্যি সত্য প্রেমে পড়ে গেল নাকি. বিয়ে করবে নাকি প্রেম করে?”
স্বাগতমদা বলল, “ভালোবাসার মর্ম তুমি কি বুঝবে? এত বড় হয়ে গেলে, এখনও কাউকে ভালোবাসলে না? সবচেয়ে সুন্দর দুটো জিনিসের মধ্যে একটা হল ভালোবাসা”
আমি বললাম, “তাই নাকি? আরেকটা কি গো স্বাগতমদা ?
স্বাগতমদাও হেসে ফেলল, “তাও জানো না, গান”
আমার এই দোষ, স্বাগতমদা কয়েকদিন আগেই বলল, সবচেয়ে সুন্দর শিল্প হল সঙ্গীত, সবচেয়ে খাঁটি শিল্প হল আর্ট আর সবচেয়ে মহান শিল্প হল সাহিত্য. আমি সব ভূলে যাই.
তারপর একদিন লুডু খেলতে বসেছি ছাঁদে. স্বাগতমদা আমি আর মামুন.
মামুনর ব্যবহারের মধ্যে কোন অস্বাভাবিকতা নেই. আগে যেমন আমাদের সাথে মিশতো-হাসতো, তেমন-ই আছে.  বেচারা তো কিছুই জানে না.
এইদিকে স্বাগতমদা একেবারে মুষড়ে গেছে. মাঝে মাঝে আমাকে ডেকে বলছে, “আমার মনে হচ্ছে পজেটিভ. নয়তো এত ঘটনার পরেও এভাবে আমাদের সাথে কথা বলত.”
আমি কিছু বলতে গেলাম. কিন্তু কথাটা গলায় মাছের কাঁটার মত বিঁধে গেল.
লুডু খেলতে খেলতে স্বাগতমদার কিছু বলতে যাওয়া-আমি লক্ষ্য করছিলাম. আমি তো সব বুঝি. নিজে ইচ্ছে করে হেরে যাচ্ছে-যদি তাতে কোন লাভ হয়
কিন্তু মামুনকে যতবারই বোঝানোর চেষ্টা করছে, মামুন মাঝপথে থামিয়ে বলছে, “না স্বাগতমদা, আমি পারব না, বাবা-মা শুনলে খুব রাগ করবে”
আমি পাশে পাশেই আছি. যদি আসল সত্যটা সামনে আসে, তবে ফাঁসবো আমি. ম্যানেজ করতে হবে.
তারপর দিন. সন্ধ্যা হয়ে গেছে. মামুন স্বাগতমদা আর আমি ছাঁদে দাঁড়িয়ে.
স্বাগতমদা আমাকে ইশারা করল. প্রথমে বুঝতে পারানি, পরে বুঝলাম আমাকে দূরে সরে যেতে বলছে.
আরে, বুঝলাম কাজের বেলায় কাজি, আর কাজ ফুরলে পাজি. এখন মনে হচ্ছে-আমি ঠিকই করেছি.

আমি একটু দূরে সরে গেলাম ঠিকই. কিন্তু এমন একটা জায়গা বেছে নিলাম, যেখান থেকে ওদের ন্যাকা ন্যাকা আলাপ স্পষ্টভাবে শোনা যাচ্ছিল.
স্বাগতমদা মামুনের পাশে দাঁড়িয়ে একটু দরদ দিয়ে বলল, “বাবা-মা ই তোমার কাছে সব. আমি তোমার কাছে কিছু না,”
মামুন একটু ভেবে উত্তর দিল, “স্বাগতমদা, অন্য কোন ব্যাপার হলে আমি তোমাকে সাহায্য করতাম. কিন্তু এব্যাপারে পারব না. বাবা-মা শুনলে খুব রাগ করবে,”
নিচে থেকে মামুনের মা তখনই (অসময়ে) ডাক দিল, “শোন, আয়, আম-মুড়ি খেয়ে যা”
তারপর আরেকটা বড়সড় অপ্রত্যাশিত অঘটনা ঘটে গেল. জয়দা আমাদের সবাইকে ছেড়ে চলে গেল. নানা কান্না-কাটির কিছু হয়নি. জয়দা মারা যায় নি তো.
জয়দা একটা প্রাইভেট ফার্মে সেলসের কাজ করত আদৌ কোন কাজ করত. আদৌ কোন কাজ করত কি না কে জানে. সব সময় তো দেখতাম- এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াত আর আমাদের ঘন্টার পর ঘন্টা মজার মজা গল্প শোনাত.
সেই জয়দা আমাদের ছেড়ে চলে গেল. মানে ইসলামপুর থেকে বদলি হয়ে রায়গঞ্জে চলে গেল.
সেদিন সবাই মিলে দুঃখ ভুলতে গিয়ে হাসির ডোজটা বারোটা থেকে বাড়িয়ে অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত (যদিও দুটোর সময় শেষ করা হয়) করা হল.
জ্যাঠিমা (বাড়ির মালকিন) শুরু করল, “আমার শুধু একটা দুঃখ, চারশো বিশ টাকা গেল. মাসে মাসে পেতাম.. ভালো চাকরি করতো”
ঝুমাদি এবার বলল, “চাকরি করে না ছাই, আমার তো মনে হয় জঙ্গী-টঙ্গী হবে. নয়তো এত ভন্ডামি কেন? ব্যাচেলার ছেলে লক্ষী-গনেশের মূর্তি নিয়ে ঘুরাফেরা করবে. রামায়ন-মহাভারত পড়বে. বিবেকানন্দের বই খোঁজ করবে, এসব ভন্ডামী ছাড়া আর কী?”
আমি ঝুমাদির সন্দেহের মাত্রাটা বাড়ানোর জন্য বললাম, “হ্যা গো, ঝুমাদি আমারও সন্দেহ হয়েছিল.”
রাত্রির আলোচনা এভাবেই বাড়তে লাগল.
জয়দা চলে গেছে. বেশ কয়েকদিন হয়ে গেল. সবকিছু ঠিকঠাক চলছে.
হঠাত জয়দার একটা ফোন, বাড়ি ফিরে যাওয়ার পখে এখান থেকে দেখা করে যাবে, সবকিছু বদলে দিল.
সবাই খুব খুশি. বাড়িতে ছোটখাটো উতসব লেগে গেল. সকাল থেকে সবাই ব্যস্ত.
এবাড়িতে যে অনেকেই জয়দার প্রতি দূর্বলতায় ভূগছে, তা সবারই জানা.
সেইসব পুরোনো কাসুন্দি ঘেটে লাভ নেই. কিন্তু আজকে সবচেয়ে অদ্ভুত অথচ সাহসী কাজটা করল মামুন. একটা বড় কাগজে সুন্দর করে WELCOME লিখে জয়দা যে ঘরে থাকতো, সেই ঘরের দরজার সামনে টাঙিয়ে দিল.
হঠাত দেখি স্বাগতমদা আমাকে পরম উতসাহে টেনে নিয়ে গেল ওর ছোট খুপরিতে. তারপর বলল, ‘বুঝলে কিছু?”
স্বাগতমদা বলল, “তুমি যে কিনা? কিছু বোঝো না?
ঐ যে দেখছো জয়দার ঘরের সামনে WELCOME লেখা, ওটা কার জন্য?”
আমি বললাম, “কার দন্য আবার জয়দার জন্য”
স্বাগতমদা বলল, “দূর পাগলা, ওটা আমার জন্য. (আত্মপ্রসাদের হাসি) আমার নাম স্বাগতম, সেটাকে ইংরেজি করে লিখেছেWELCOME.ওর মনে আমার নামে কি হলচল চলছে, তা জানলো. আমাকেও এবার একটা সংকেত পাঠাতে হবে”
আমি সচেতন হয়ে বললাম, “কিন্তু আমাকে  না করে দিল যে, বলল যে পারবো না,”
আমি সচেতন হয়ে বললাম, “ কিন্তু আমাকে না করে দিল যে , বলল যে পারবে না,”
স্বাগতমদার মুখে আবার হাসি, মুক্তোর মতো দাঁতগুলো যেন খুশিতে ঝিলিক মারল, “ওরে বোকা, না মানেই তো হ্যা,”
আমি স্বাগতমদাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, “তুমি ভুল করছো না তো”
স্বাগতমদা বলল, না, না আমি 100% নিশ্চত, 100% কেন, 200% নিশ্চিত”
স্বাগতমদা তারপর ঐ WELCOME-এর মধ্যে লিখে দিল, 9 12-15-22-5 21 13 13-15-14.
এই লেখাটা একে একে সবার নজর কাড়ল. কিন্তু কেউ বুঝতে পারল না. কিন্তু শেষ পর্যন্ত জয়ী মানে পাঠোদ্ধার করল  গুড্ডির মাষ্টার মশাই বিরুমশাই. উদ্ধার করল, এর অর্থ. I LOVE U MAMON. যে যার ক্যালি দেখাতে ব্যাস্ত.
ঐ দিকে মামুনের চোখ তো কপালে উঠেছে.
আমি আর স্বাগতমদা দরজা বন্ধ করে বসে আছি. এদিকে জয়দাও আসেনি. এমন সময় জানালা দিয়ে গুড্ডি বলে গেল, “ আয়ি হেটু.”
স্বাগতমদা বলল, “কি বলে গেল”
আমি বললাম, “বলল আয়ি হেটু মানে নিশ্চয়ই I HATE U, নিশ্চয়ই মামুন ওকে শিখিয়ে দিয়েছে.”
স্বাগতমদা পরের দিন গুড্ডিকে জোর করে ঘরে নিয়ে গিয়ে  বলল, “পৃথিবীতে কি  একটা মামুন আছে না কি? কত মামুন আছে. আমি যাকে ভালোবাসি, সেটা মাড়োর মেয়ে. ওদের চা-বাগান আছে. এইরকম হা-ভাতা মামুন নাকি, নিজেদের একটা ঘর পর্যন্ত নাই”
স্বাগতমদার কথা গুড্ডি বিশ্বাস করল কিনা, বোঝা গেল না. কিন্তু আশে-পাশে চারদিক ফিস ফিস বন্ধ হল না.
শেষ পর্যন্ত স্বাগতমদা ঘর ছাড়া হল. বাড়ি চলে গেল.
জ্যাঠিমার আরও দুইশো টাকা চলে গেল.
স্বাগতমদা চলে যাওয়ার সময় আমার মন সত্যিই খারাপ লাগছিল.
এতদিন একসাথে ছিলাম.
স্বাগতমদা আমাকে যাওয়ার সময় বলল, “ ভালোই হল, তাই না”
আমি আর কি বলব, তবু বললাম, “হ্যা, ভালোই হল, কি সুন্দর বিনে পয়সায় অল্প সময়ের মধ্যে এত পাবলিসিটি পেয়ে গেলে. এখন এ বাড়িতে সবাই তোমাকে নিয়ে ফিসফাস. এমনকি পাশের বাড়ির মান্টিও শুনলাম, তোমার কথাই বলছে”
স্বাগতমদা বলল, “মুখরোচক খবর পেলে তো সবাই ইন্টারেস্ট পাবেই. আমি তা বলছি না. একটা ভালো শিক্ষা হয়ে গেল. বলতে পারো অভিঞ্জাতা. এরপর তো কলেজে যাবো. এটুকু অভিঞ্জতা না থাকলে মুশকিলে পড়তাম. কলেজে তো গোল্লাায় যাওয়ার ভয় আরও বেশি.”
আমি বললাম, “হ্যা, তাই.”
তবে সব কথা সত্যি সত্যি জানতে পারিনি. চোখে জল আসছিলো.
স্বাগতমদাকে কোন দিন ভুলতে পারবোনা.
আমার মনে একটা ছাপ রেখে গেছে.
স্বাগতমদার একটা কথা এখনও আমার জীবনের মূল মন্ত্র, “ আমাদের মনের মধ্যে দুটো মানুষ আছে. একটা সৈনিক আর একটা প্রেমিক. সৈনিকের লক্ষ্য হল প্রতিষ্ঠা আর প্রেমিকের লক্ষ্য আনন্দ”
স্বাগতমদার সথে অনেকদিন দেখা হয় না. দেখা হলে ভাবছি, সব কথা সত্যি সত্যি জানাবো.

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 0   Average: 0/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।