স্যান্ডওয়াচ

স্যান্ডওয়াচ

স্যান্ডওয়াচ

পিয়াসা

 

না সার্থক প্লিজ ছেড়ে দাও আমাকে_ প্লিজ আমি বাঁচতে চাই,,, সৃজার কাতর আর্তি সার্থকের কানে  বিন্দু মাত্র পৌঁছালো_বলে, সৃজার মনে হল না।
তবুও ও নিজের হাত দিয়ে আপ্রাণ চেষ্টা চালাতে লাগলো  সাঁড়াশির মতো চেপে বসে থাকা সার্থকের শক্ত বলিষ্ঠ  আঙুলগুলো ওর গলা থেকে সরানোর। কিন্তু সার্থকের শক্ত আঙুলগুলো প্রচন্ড জোরে চেপে বসেছে সৃজার গলায়। সৃজা অসম্ভব চেষ্টা করছে সার্থককে সরানোর। সার্থকের শার্টটা খিঁমছে ধরে ওকে নিজের থেকে সরানোর চেষ্টা করছে। ওপরে পূর্ণিমার চাঁদ_ জ্বলজ্বল করছে। তবে আজ কি চাঁদ-টা একটু লালচে__?? সাগরের অপার ঢেউ ঘনঘন নিজের মহিমায় সৈকতে আছড়ে পড়ছে আবার সমুদ্র গহনে ফিরে যাচ্ছে। এই তটে একদম কোনো লোক আসে না। জনমানব শূণ্য এবং টুরিস্ট এলাকা থেকে অনেকটা দূরে। প্রায় এক দেড় ঘন্টার দূরত্বে। আর ঠিক এরকম একটা জায়গায় আজ সার্থক সৃজাকে এনেছে ওর সময় জীবন সবটা শেষ করতে। তটভূমির প্রায় শেষ এবং ঢেউয়ের শুরুর সীমারেখায় সৃজাকে টেনে ফেলে ওর ওপর চেপে বসে সার্থক। নিজের সাঁড়াশির মতো শক্ত আঙুলগুলো দিয়ে চেপে ধরে সৃজার গলা। প্রথমে ভীষণ ধস্তাধস্তি করলেও সৃজা একসময় তার দুর্বল হাতগুলো সার্থকের শার্ট ছেড়ে পাশে অনবরত আসা স্বল্প ঢেউয়ে থাবরাতে থাকে। সমুদ্রের জলতরঙ্গ তটভূমির অনেকটা ভেতরে এসে দুর্বল হয়ে ভেঙে যাচ্ছে।

আবারো সেই তরঙ্গ মৃদু গতিতে ফিরে যাচ্ছে সমুদ্রের অভ্যন্তরে। সেই স্বল্প ঢেউ শায়িত সৃজার ওপর দিয়ে খেলে যাওয়ার চেষ্টা করে ওকেও ভিজিয়ে দিচ্ছে,,,, ঢেউয়ের জলে ভিজছে সার্থক-ও। সৃজার ওপরে উঠে তখনো ওর শ্বাস-রোধের জিঘাংসা চরিতার্থ করে চলেছে। হাঁটু মুড়ে বসে,,,,তাই হাঁটুর সামান্য অংশ জলের অন্তর্দেশে চলে যাচ্ছে সার্থকের। ওর নিচে সৃজা নিজেকে বাঁচানোর জন্য কাতরাচ্ছে, ছটফট করছে। হাতের সাথে সাথে সমানতালে পা-ও ছুড়তে লাগলো। নির্জন সমুদ্রের ধারে সৃজার আর্তচাপা গোঙানি শোনার কেউ নেই। সৃজার হাত-পা গুলো জলে ঝাপটাতে ঝাপটাতে একসময় নিস্তেজ হয়ে গেল। ধীরে ধীরে হাত-পায়ের সাথে ওর দেহটাও নিথর হয়ে গেল সমুদ্রের অন্তরালে। পাশে সৃজার সার্থকের জন্য আনা উপহার হিসেবে বালিঘড়িটার অর্ধেক অংশ গেঁথে রয়েছে বালির গভীরে_ অর্ধেকটা বাইরে। প্রথম হাতাহাতিতে বালিঘড়িটা সৃজার হাত থেকে পড়ে যাওয়ার সময় সোজা হয়ে গেছিল। ওপরের সমস্ত বালি__ নিজের শূণ্যে পড়তে তখন ইতিমধ্যেই শুরু করে দিয়েছে। আকাশের উজ্বল চাঁদের অবস্থান রাত্রি বারোটার সময়কে চিহ্নিত করছে। সৃজার শরীরটা নিথর হওয়ার আগে সামনে বালিতে গেঁথে থাকা বালিঘড়িটাকে দেখলো।বালিঘড়িটাও যেন একভাবে ওকেই দেখছে। একটু বোধহয় চোখের কোণায় জল জমে দুদিক দিয়ে গড়িয়ে পড়ে। আজ-ই ওর আর সার্থকের তিন বছরের সম্পর্ক পূর্ণ হয়েছিল বলে এটা উপহার এনেছিল। অ্যান্টিক পিস সার্থক পছন্দ করে বলে অনেক খুঁজে এনেছিল এই প্রাচীন কারুকৃত কাঁচের  স্যান্ডওয়াচ-টা। শুধু সার্থকের জন্য।




সৃজার নিথর দেহটার ওপর থেকে প্রায় আধ-ভেজা হয়ে উঠে দু-পা পিছিয়ে এলো সার্থক। আরে_? সম্পর্ক রেখেছি বলে কি বিয়ে করতে হবে নাকি_? আর তাছাড়া একটা বার ডান্সার হয়ে আশা করেই বা কি করে__? হ্যাঁ মানছে সার্থক যে এই সৃজার বার ডান্সার হয়েও খুব নাক উঁচু ছিল। সার্থক প্রায়শই ওর সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করেছে,, কিন্তু নিজের কাজ ছাড়া সৃজা ঘুরেও তাকাতো না। সৌন্দর্যের এতটাই দেমাগ। সার্থক অন্তত এমনটাই মনে করতো। বারে পা ফেললেই সব মেয়েরা ওর গায়ে হামলিয়ে পড়তো__ অথচ এই মেয়ে ফিরেও তাকাতো না । একসময় যখন সার্থকের মনে হলো একে কোনো কিছুতেই দমানো সম্ভব নয়,,,ঠিক তখন-ই বন্ধুরা বাজি রাখে যে তিন মাসের মধ্যে যদি ওই মেয়েকে সার্থক নিজের কাছে আনতে পারে তাহলে ওদের কম্পানি শেয়ারের ফাইভ পার্সেন্ট করে শেয়ার ওর কম্পানির। এই সুযোগ কেউ ছাড়ে__? অনেক ভদ্রতা_ ভালোমানুষীর মুখোশে নিজেকে লুকিয়ে সৃজার কাছা-কাছি আসতে আর বেশি সময় লাগেনি সার্থকের। ওই যে বলে না, মেয়েরা অলওয়েজ জেন্টেল ম্যানের প্রতি দুর্বল হয়। যাই হোক তিন মাসের মধ্যে বাজি জিতে ওদের থেকে শেয়ার তো পেয়ে গেল_ কিন্তু সৃজা-কে ছাড়তে মন চাইলো না সার্থকের। কারণ ততদিনে সৃজা নিজেকে উজাড় করে দিয়েছে সার্থকের কাছে। নিজেকে এতটাই ভালত্বের আড়ালে রেখেছিল সার্থক যে মুখোশের চরিত্র আর বাস্তবের চরিত্র এক হয়ে গেছিল।

বোঝা যা অসম্ভব এবং কঠিন নিজের কাছের লোকের কাছে পর্যন্ত। তাই সহজ সরল এবং সততায় বিশ্বাসী সৃজা সার্থকের আসল রূপটা বুঝতেই পারে নি। সার্থকের তো সৃজাকে ছাড়ার প্রশ্নই ছিল না, বিকজ শি ইজ টু গুড ইন বেড। তাই ও সৃজাকে ধরে রাখলো নিজের কাজে। কিন্তু সমস্যা-টা হলো যখন রয় আঙ্কেলের মেয়ে আলিয়া-র সাথে সার্থকের বিয়ে ঠিক হলো তখন। ড্যাড এমনি এমনি রয় আঙ্কেলের মেয়ের সাথে সার্থকের বিয়ে দিতে রাজি হয় নি_ এক ওদের কোম্পানি প্রচুর প্রফিটে চলছে দুই উনি প্রস্তাব রেখেছে ড্যাডের কাছে দুটো কম্পানির শেয়ার পার্টনারশিপ। সুতরাং এত বড় সুযোগটা হাতছাড়া করা সার্থকের পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ ওদের কম্পানি অ্যাভারেজে দাঁড়িয়ে। এই বিয়েটা হলো একটা ডিল। যেটা সার্থকের কম্পানির জন্য অত্যন্ত জরুরী ছিল। সবটা ঠিক হতো কিন্তু এনগেজমেন্টের আগের দিন সৃজা বাগড়া দিল। হুমকি দিয়ে বসে সার্থককে যে যদি ও সৃজার আর ওর সম্পর্কের সত্যিটা সকলকে না জানায় তাহলে সৃজা নিজে সকলকে জানাবে। ব্যস! মাথায় রক্ত চড়ে যায় সার্থকের। দুপয়সার নাচনেওয়ালি সার্থকের মতো বিজনেস ম্যানকে হুমকি দেবে এটা তো সার্থকের মেনে নেওয়া চলে না। তাই প্ল্যান করে এনগেজমেন্টের তারিখ পিছিয়ে দেয়। আগে এই সৃজাকে রাস্তা থেকে সরাতে হবে,,,আর আজকের দিনটার মতো এত ভাল সুযোগ আর কবে পাবে সার্থক। আজ যে ওদের রিলেশনশিপের থার্ড অ্যানিভারসারি। লঙ ড্রাইভে যাওয়ার নাম করে নিয়ে আসে সৃজাকে এখানে,,,,,,,,,,
গাড়ি চালাতে চালাতে সার্থক এসব-ই ভাবছিল। এবার এনগেজমেন্টটা ঠিকঠাক ভাবে সম্পন্ন করা যাবে।
মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির মালিক হওয়ায় সার্থকের লোকেদের সৃজার বডিটার ব্যবস্থা করতে খুব বেশি বেগ পেতে হয় নি।

এক বছর পর :

রাত দশটা




সামুদ্রিক বালুচরের শেষে পাকা রাস্তা চলে গেছে। রাস্তার ওই পাশে জঙ্গল। রাস্তার একদিকে সমুদ্রের গর্জন আর এক দিকে জঙ্গলের নিস্তব্ধতা। পাকা রাস্তা ধরেই দুটো সাইকেল এগিয়ে চলছিল,, হঠাৎ একজনের সাইকেল থেমে যায়। দুটো ব্যক্তি-ই নিজের কাজ সেরে বাড়ি ফিরছিল। পেছনে অনেকটাই দূরে ফেলে এসেছে আসল টুরিস্ট স্পট। হোটেল_ মার্কেট_ রেসটুরেন্ট। এই রাস্তাটা শুধু যাতায়াতের যোগাযোগ মাধ্যম। এখানকার সমুদ্রের ধারে কেউ আসে না। এটা ঘোরার জায়গা না। আজ একটু বাড়ি ফিরতে দুজনের-ই দেরি হয়ে গেল। পূর্ণিমার গোলাকৃতির চাঁদ-কে আকাশে যেন ঝলসানো রুটি-র ন্যায় লাগছে। দাঁড়িয়ে পরে অপর সাইকেল-টিও।
– কি হল দেবু কাকা_? সাইকেল দাঁড় করালে যে,,_?
– আরে কি জানি,, নিজের থেকেই আটকে গেল_?
– চেন-টা দেখো তো__?
-দাঁড়া। নেমে লোকটি অন্ধকারেই দেখতে লাগে সাইকেলের সমস্যা-টা। এরকম কখনো হয় নি বলে টর্চ আনার প্রয়োজন পরে নি। তাছাড়া আজ চাঁদের যা আলোর জোর,,,,, সবদিক পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। সাইকেলটা ঠিক করতে গিয়ে দেবুর হাতটা দিয়ে একবার চাকাটা ধরলে হাতে একটু মাটি লেগে যায়।
– কি হল ঠিক_? অপর সঙ্গী উৎসুক হয়ে জানতে চায়
– হুম। সাইকেলটা স্ট্যান্ড করিয়ে বলে,
দাঁড়া আমি হাতটায় একটু জল দিয়ে আসি।
– ঠিক আছে যাও,,,,,,,,,
দেবু রাস্তা দিয়ে নেমে যায় বালিতে। আর একটু এগোলেই সমুদ্রের জল। রাত্রি বেশ হয়ে গেছে,,,,দশ-টা তাই এই নির্জনে আর নিস্তব্ধতায় সমুদ্রের গর্জন আরো বেশ দৃঢ়ভাবে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
দেবু এগিয়ে সমুদ্রের থেকে এগিয়ে আসা হালকা ভাঙা ঢেউ-য়ে নিজের হাতটা ধুতে গিয়ে দেখে একটু এগিয়ে একটা কিছু বালির ভেতর থেকে চিকচিক করছে। ভীষণ কৌতুহলবশত এগিয়ে যায় সে ধীর পায়ে। সামনে এসে দেখে একটা কাঁচের বোতলের মতো পড়ে আছে আড়াআড়ি করে,,খানিকটা বালিতে গেঁথে। হাত বাড়িয়ে দেবু হাতে নেয় সেটা,,,, কিন্তু ওর ধারণা ভুল প্রমাণিত হয় ।এটাতো বোতল নয়। কাঁচের ওপর নিচে ফানেলাকৃতি অংশ। মাঝখানটা সরু। একটু ময়লা আর বালিতে মাখামাখি হলেও নিচের অংশে বালি ভর্তি। দেবু এরকম জিনিস অনেক বছর আগে নিজের মেয়ের দিদিমণির ঘরের শোকেসে সাজানো দেখেছিল। ওটা অবশ্য অনেকটা ছোট ছিল। এটা মাঝারি আকৃতির। দেবু মনে মনে ভাবলো,, ‘ ধুর এগুলো নিয়ে ও কি করবে,, ভেবেছিল হিরে বা ওই জাতীয় কিছু। ওর নিয়ে কি লাভ ফেলে দেওয়া-ই ভাল’, এই ভেবে দেবু বালিঘড়িটাকে লম্বালম্বি বসিয়ে দেয় বালির মধ্যে। আর অজান্তেই একটা ভুল করে বসে দেবু। নিচের দিকে থাকা বালির সঞ্চয় ওপরে ওঠে। আর ঠিক তখন-ই সরু রেখার ন্যায় বালি ধীর গতিতে নিচের দিকে নামতে থাকে। অর্থাৎ সময় সীমা শুরু,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
– দেবু কাকাআআআআ,,,,,
– যাই,,,,,
দুটো সাইকেল-ই চলে যায়। বালিঘড়িটা একভাবে দেখছে সামনের নিকষ-কালো রাস্তা।

রাত এগারোটা




অন্ধকারের পর্দা ভেদ করে এগিয়ে যাচ্ছে বিরাজের গাড়ি। সামনে শুধু গাড়ির হলদে হেডলাইটে সামনের রাস্তাটা দৃশ্যমান।
– বিরাজ আমরা কোথায় যাচ্ছি __? মানে হোটেল থেকে টুরিস্ট এরিয়া থেকে এত দূরে আমাদের আসা-টা কি ঠিক হচ্ছে ______?? শ্রী একটু দ্বিধা স্বরে বলে।
– হুম। ঠিক হচ্ছে। চলো না, আই হ্যাভ আ সারপ্রাইজ ফর ইউ।,,,,,বিরাজ মুচকি হেসে সামনে তাকিয়েই গাড়ি চালাতে চালাতে বলে,
– বাট_______ শ্রী, বলতে পারে না,,
– শ্রী কিপ পেশেন্স____।। বিরাজ শান্তভাবে বলে।
এগিয়ে ঠিক নির্দিষ্ট স্থানেই আসে বিরাজ_ যেখান থেকে ওর কাজের সমাধান দেওয়া সহজ এবং সম্ভব।
গাড়ি থেকে নামে দুজনেই।
– বিরাজ_ এখানে এত রাতে তুমি আমাকে আনলে কেন__??
– বললাম না, সারপ্রাইজ _________
-ঠিক আছে,,,,,
– আসো। বিরাজ শ্রীর হাত-টা ধরে বালিতে পা রাখে। একটু হাঁটলেই সমুদ্রের উত্তলাতে পৌঁছে যাবে ওরা,,,,
একটু সবে হাঁটতে শুরু করেছে,,,শ্রী বলে ওঠে,,,
– এমা বিরাজ__ আমার ইনহেলার-টা তো গাড়িতেই রয়ে গেছে। ওটা ছাড়া,,, আমি নিয়ে আসি। তুমি এগাও,,
বিরাজ হালকা হেসে বলে,
– ঠিক আছে। যাও,,,,
শ্রী যেতেই বিরাজ এগাতে লাগে,,,,
মনে আজ ওর খুব খুশি। ওই ইনহেলারে-ই তো শ্রীর জীবনের শেষ নিঃশ্বাস রয়েছে। ওটাতে পয়জেন মেশানো। যেটা নিলেই শ্রীর নিঃশ্বাস গ্রহণ শেষ নিঃশ্বাস গ্রহণ হয়ে যাবে। সবটা বিরাজের প্ল্যান করা। বাহ! সবকিছু ওর পরিকল্পনা মতো হতে চলেছে,,, ভেতরটা পুলকিত হয়ে পরলো বিরাজের।
সমুদ্রের সামনে এসে দাঁড়ায় বিরাজ। পরম আয়েসে জিন্সের পকেটে হাত রাখে। চুলগুলো উড়ছে হাওয়ায়। রেমন্ডসের শার্টটাও হালকা উড়ছে। হাতে রোলেক্সের ঘড়িটা দেখে নিল। বারো-টা বাজতেই চললো,,,,,,,,,,,,

রাত বারোটা




ঠিক তখন-ই ওর পাশে এসে দাঁড়ায় শ্রী।ঘুরে দাঁড়ায় বিরাজ ওর দিকে। স্থির দৃষ্টিতে দেখে বিরাজ শ্রী-কে। মুখে স্নিগ্ধতার অভিব্যক্তি অথচ চোখগুলো শ্রীর ভীষণ তীক্ষ্ম এবং জোরালো লাগছে বিরাজের।
নির্ধারিত জায়গায় শ্রী-কে আনতে পেরে বিরাজের মুখে একটা চওড়া হাসি খেলে যায়। শ্রীর কাহিনী আজ-ই শেষ করে দেবে এমনটাই প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছিল মোনালী-কে। তিন মাস হল উঠতি নায়িকা মোনালীর সাথে তার প্রেম।একটা ইভেন্টে সাক্ষাৎ হয় ওদের তারপর প্রেম। কিন্তু ওদের পথের বাধা একমাত্র শ্রী। বিরাজ ভালভাবেই জানে শ্রী ওকে ডিভোর্স দেবে না। কারণ এমনিতেই একটু পতিব্রত_ রক্ষণশীল গোছের। কেমন যেন ঘরোয়া টাইপের_ যেটা বিরাজের অপছন্দ। পারিবারিক চাপে পড়ে শ্রীকে বাধ্য হয়েছিল একবছর আগে বিয়ে-টা করতে__
ডিভোর্স ভাল-ই হয়েছে দেবে না যখন,, ভাল-ই। তাছাড়া এসবে সমাজে বিরাজের রেপুটেশনটাও নষ্ট হতো,, তার চেয়ে বরং এখানেই শ্রীর কাহিনী শেষ করে মোনালী-কে আপন করে নেবে ও। এমনিতেও একজন ডি-জি-পি(ডাইরেক্টর জেনারেল অফ পুলিশ) হিসেবে ওর পাওয়ার কম নয়। তো শ্রী-র মৃত্যুটাকে নর্মাল ডেথ কেস দেখাতে ওর বিশেষ বেগ পেতে হবে না।
শ্রী-র কাছে এসে নেশাতুর চোখ এবং হাসি হেসে ওকে জড়িয়ে ধরলো বিরাজ। আবিষ্ট হয়ে ওকে জড়িয়ে ধরেই ধীর পায়ে সমুদ্রের গভীরে এগাতে লাগে বিরাজ।
এগাতে এগাতেই শ্রী-র মৃত্যুর পরবর্তী জঘন্য ছক মনে মনে কষে ফেলতে লাগলো। জল এখন ওদের কোমর অব্দি,,,, দাঁড়ায় দুজনে দুজনের মুখোমুখি। শ্রী-র দুহাত ধীরে ধীরে উঠে আসে বিরাজের বুকে_ আর বিরাজের হাত শ্রী-র কোমরে। জড়িয়ে ধরে বিরাজ শ্রী-র কোমর। জোরে চেপে এগিয়ে নেয় শ্রী-কে বিরাজ নিজের কাছে।
কিন্তু এ-কি? শ্রীর হাত চলে যাচ্ছে বিরাজের গলায়। শক্ত করে চেপে বসে ওর আঙুলগুলো বিরাজের গলায়। এতটাই শক্তি সেই হাতে যে বিরাজের হাত ছাড়াতে পারছে না ওই আঙুলগুলো। ঘড়িতে তখন বাজে বারোটা। অসাড় হয়ে আসছে বিরাজের শরীর যে বিন্দুমাত্র নড়ার ক্ষমতা নেই ওর। নিজেকে ছাড়ানোর মতো বল পাচ্ছে না বিরাজ। হাত দুটো দুপাশে নেমে আসে। গলার কাছটায় অসম্ভব চাপে দম আটকে আসছে প্রায় অথচ ও কিচ্ছু করতে পারছে না। ধীরে ধীরে শ্রীর মুখ-টা পাল্টে যাচ্ছে,,,,, ধীরে ধীরে বিরাজ-ও জ্ঞান হারাচ্ছে। অবচেতনার অতল গহ্বরে হারিয়ে যেতে যেতে ও একঝলক শ্রীর দিকে তাকাতেই ওর মুখে দ্রুত কঙ্কালরূপী পরিবর্তন দেখতে পেল,,,,,,,,,,,
আর শুনতে পেল একটা হিসহিসে চাপা কিন্তু তীক্ষ্ম গলায় নারী কন্ঠস্বরে কয়েকটি কথা,,,
– ‘ আমিও বাঁচতে চেয়েছিলাম সার্থক। দিস নি। এখন বোঝ মৃত্যুর আর্তি কতটা যন্ত্রণার।কতটা বেদনার’।
বিরাজের আর কিচ্ছু তখন শোনার অবকাশ ছিল না। মনে প্রবল ভয় আর চোখের সামনে কালো পর্দা দেখতে পাচ্ছিল ব্যস!।

জ্ঞান ফেরার পর শ্রী-কে হসপিটালের রুমে দেখতে পেয়ে ভীষণ চমকে যায় বিরাজ। অবাক হওয়ার থেকে বেশি ভয় পায়। হোটেলের ম্যানেজার তখন বক্তব্য রাখে,,
– স্যার ঠিক সময় ম্যাডাম আমাদের ফোন করে না ডাকলে আজকে আপনাকে বাঁচানো সম্ভব হতো না।ম্যানেজার চলে যেতেই কোনো রকম ভ্রণিতা না করেই বিরাজ ওর পাশে বসা শ্রী-কে জিজ্ঞেস করে,,
– শ্রী_ তুমি কাল আমার সাথে সমুদ্রের ছিলে না__?
শ্রী অবাক হয়ে বলে,
– আমি_? তোমাকে বলেই তো আমার ইনহেলার-টা আনতে গেছিলাম। তারপর মামণি কল করেছিলো তাই একটু কথা বলছিলাম। তুমি কি সারপ্রাইজ দেবে সেটাই জানাচ্ছিলাম। কিন্তু যখন ওখানে গেলাম দেখি তুমি সমুদ্রের ধারে অচৈতন্য হয়ে পড়ে রয়েছো। মুখ দিয়ে কিসব আওয়াজ বের করছো,,,,, নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছিল।
আমি তাড়াতাড়ি আমাদের হোটেলের ম্যানেজার-কে কল করে ডাকি। তোমাকে জলের থেকে আরো বালির দিকে নিয়ে আসি। এত ডাকছি অথচ তোমার কোনো জ্ঞান-ই ছিল না।
বিরাজ বিস্ফারিত চোখে দেখছে শ্রী- কে  শ্রী তো ওর সাথে ছিল-ই না। তাহলে ওর সাথে ছিল-টা কে কাল _?
– বিরাজ___? তুমি আজকাল ভীষণ টেনশনে থাকো। এই যে কেস-টা তোমার আন্ডারে ছিল সেটার প্রপার ইনভেস্টিগেশন করতে পারো নি ,, তাই হয়তো চিন্তায় তোমার শরীর দুর্বল হয়ে পরছে,,।
শ্রী বিরাজের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।
বিরাজের মুখে কোনো কথা আসে না। নিজের কান-কে বিশ্বাস করতে পারছে না। তবে মৃত্যুর বিভীষিকা যে কতটা যন্ত্রণার আর কষ্টের তা মৃত্যুর সামনাসামনি সাক্ষাৎ-এই ও তার প্রমাণ পেয়ে গেছে। চট করে শ্রী-র দিকে তাকালো। শ্রী তখন বিরাজের জন্য ফল কাটছিল আর আপন মনে অনেক কথাই বলে চলছিল কিন্তু বিরাজের সেসব কিছুই কানে যাচ্ছিল না। মনে মনে ভাবলো,,,
‘ নিজের ঘৃণাকে ও মৃত্যুর পথে ঠেলে দিতে চেয়েছিল_ অথচ সেই ঘৃণা ওকে ভালবেসে জীবনের পথে ফিরিয়ে নিয়ে এল।’ এই ভালবাসাকে নিজের হাতে ও শেষ করতে চেয়েছিল _? ছি! ,,,
তবে আর না। ও শ্রী-কে নিয়েই সুখে থাকবে। জীবনের বাস্তবতাকে ক্ষণিকের দুর্বলতার সাথে পার্থক্য করেই ও প্রথম বোকামির কাজ করেছিল। কিন্তু না, সব সত্যিটা ও শ্রী-কে জানিয়ে ক্ষমা চাইবে। ওর ভুল পথে_অপরাধের পথে হাঁটার শাস্তি ও পেয়েছে। সত্যিটা বলার পর ও জানে শ্রী ওকে শেষ সুযোগ দেবে শুধরানোর। জানে, এটা বিরাজ। কিন্তু বিরাজ যে কাল-ই সম্পূর্ণ রূপে পাল্টে গেছিল। তবে আর যাই হোক এরপর শ্রী-কে সাহস করে ছোঁয়ার দুঃসাহস আর জীবনেও করবে না। কিন্তু কালকের সেই মূর্তিটা ভ্রণিতা নাকি সত্যিই ___??
চমক ভাঙে শ্রীর ডাকে,,,,
– জানো বিরাজ আমরা যেদিকটা গেছিলাম, হোটেলের ম্যানেজার বলছিল অনেক আগে একটা কাপল গেছিল ওখানে। কিন্তু রহস্যজনক ভাবে মেয়েটা নিঁখোজ হয়ে যায়। কিন্তু মেয়েটি নাকি ভাল ঘরের ছিল না, তাই হয়তো অন্য কোথাও চলে গেছে এই বলে,, ওর বয়ফ্রেন্ড প্রমাণ দেয়। এবং পুলিশ কেস ক্লোজ করে দেয়। তবে ব্যাপারটা নিউজে ওঠে নি কোনো।
স্তম্ভিত হয়ে শুনছে বিরাজ শ্রীর কথা-টা। ভয়ে ওর প্রাণ ওষ্ঠাগত।
– আর জানো আমার ইনহেলারটাও পাচ্ছি না,, হয়তো তাড়াতাড়িতে কোথাও ফেলে দিয়েছি,,
বিরাজ কাঠ হয়ে বসে,,,
ঠিক তখন-ই একজন নার্স চাকা-ওয়ালা টেবিলে লাঞ্চ নিয়ে ঢোকে,,,,, খাবারের প্লেটের পাশে নিউজ পেপার রাখা। শ্রী প্লেটটা হাতে নিয়ে নিজের হাতে খাবার মুখের সামনে এনে বিরাজের। খেতে গিয়েই ওর সামনের খবরের কাগজের একটুখানি লেখা দেখতে পায়। অবাক হয়ে হাতে নেয় নিউজ পেপারটা।
খুলে দেখে ফ্রন্ট পেজে বড় বড় করে লেখা
‘ মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির মালিক সার্থক সিংঘর হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু। গতকাল সকলের সাথে হেসে খেলে কথা বলে শুতে যান। তারপর মাঝরাতে হার্ট ফেল। ঘুমের মধ্যেই মৃত্যু। ওনার এই অকাল মৃত্যুতে পরিবারের সকলেই শোকস্তব্ধ’।
আবারো বিরাজের চোখ দুটো ঠিকরে বেরিয়ে আসতে থাকে,,,,,, গলা শুকিয়ে কাঠ।

পরিশেষে

শ্রী-র চঞ্চলতার ফলে ওর হাতেই ধাক্কা খেয়ে স্যান্ডওয়াচটা আবারো পড়ে যায়। এখনো বালির মধ্যে আড়াআড়ি ভাবে গেঁথে আছে বালিঘড়িটা। তাই ওর পাশে বসে থাকা সৃজার এখন আর কিছু করার নেই। আবারো যদি কেউ আসে__ আবারো যদি কেউ এই বালিঘড়ি দাঁড় করায় __ আবারো যদি বালির রেখা ওপর থেকে নিচে পড়ে তখন সৃজার অতৃপ্ত আত্মা আবারো সক্রিয় হয়ে উঠবে। তবে কি সেদিনের একটা ভয়াবহ  দুর্ঘটনার রাতের ফলে সৃষ্ট সৃজার এই নতুন রূপ আর কোনো রাতকেই এখানে দুর্ঘটনার রাত হতে দেবে না তার প্রতিশ্রুতি নেয়। হ্যাঁ আজ ও পরিতৃপ্ত,,,, ওর প্রতিশোধ পূর্ণ হয়েছে। সার্থক সিংঘর মৃত্যু ঘটেছে। সমুদ্রের কিনারায় বসে অপার সমুদ্রের উত্তাল উপভোগ করতে করতে পূর্ণিমার জোৎস্না মাখা আলোর বিস্তীর্নতায় একভাবে চেয়ে থাকে সামনে সৃজা। একবার পাশে শুয়ে থাকা স্যান্ডওয়াচ-টায় হাত বোলায়।

এক বছর পর




বড় সুমো-টা অন্ধকার কাটিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। সামনে ড্রাইভিং সিটে বসে অস্মিত_ আর ওর পাশে বসে গোলাপ। ওর বউ। পরনে রিপড জিন্স_ আর ক্রপ টপ। আজকের দুনিয়ায় দাঁড়িয়ে ওকে যদি কেউ বলে এগুলো একজন বউকে মানায় না,, তবে ও তাকে ঘুরিয়ে দু-কথা বলতে ছাড়ে না। গোলাপের কাছে সবার প্রথম একটা মেয়ের পরিচয় সে একজন স্বাধীন নারী। যা খুশি পরতেই পারে। তার ইচ্ছে হতেই পারে তার রুচি অনুযায়ী পোশাক পরার। গোলাপ ব্যক্তিস্বাধীনতায় বিশ্বাসী। ও রক্ত মাংসের মানুষ। নিজের পছন্দ অপছন্দ থাকতেই পারে,,,, নিজের পরিধেয় পোশাক সম্পর্কে ও কাউকে জবাবদিহি করতে বাধ্য নয়। এমনকি অস্মিত-কেও নয়। কোলে আছে ক্যামেরা। ফটোগ্রাফির বিরাট শখ গোলাপের। রাতের শান্ত পরিবেশে সমুদ্রের উত্তাল কতটা অপরূপ_ সেই সৌন্দর্যের ক্যানভাসকে নিজের ক্যামেরায় বন্দি করতে আসা এই সি-বিচটায় গোলাপের। কারণ টুরিস্ট স্পটের বিচ এখন ফাঁকা থাকলেও ,,,, বিভিন্ন ছোট বন্ধ দোকানের জমায়েত রয়েছে। জায়গা-টা খুব একটা পরিষ্কার-ও নয়। ওর চাই পুরো প্রপার পরিষ্কার জায়গা। যেখান থেকে ছবি তোলা খুব সহজ হবে। আর পেছনে বসে একভাবে চেয়ে রয়েছে গোলাপের দিকে ইমন, অস্মিতের প্রিয় বন্ধু সাথে অস্মিতের বস। বহুদিন ধরেই গোলাপের ওপর নজর ছিল আজ সেটা পরিপূর্ণ হবে। অস্মিত-ই সেই রাস্তা দেখিয়ে দেয়। ইমনের চাই গোলাপ-কে আর অস্মিতের চাই টাকা_ প্রমোশন। সুতরাং দুজনের স্বার্থ-ই আজ সিদ্ধি হবে,,,, প্রমোশনটা করেই দিয়েছে ইমন শুধু টাকা-টা গোলাপ-কে কাছে পাওয়ার পর ইমন অস্মিতের হাতে তুলে দেবে।
গাড়ি থেকে নেমে সমুদ্রের দিকে ছুটে এগিয়ে আসে গোলাপ। গলায় ডি-এস-এলার ক্যামেরাটা ঝোলানো। ইমন আর অস্মিত পিছনে আসছে। এসেছিল গোলাপ আর অস্মিত একা। কিন্তু হঠাৎ ইমনের সাথে হয় দেখা এটা গোলাপ জানে কিন্তু এটা পুরোটাই অস্মিতের-ই প্ল্যান।
গোলাপ ততক্ষণে নিজের ক্যামেরাতে বিভিন্ন ভঙ্গির চিত্রানুগ দৃশ্য সামুদ্রিক সৌন্দর্যের ,,, বন্দি করে চলেছে। হঠাৎ পেছন থেকে ইমন গোলাপের কাঁধ-টা ধরে। চমকে ওঠে গোলাপ,,
– ইমন___? কি হল__?
ইমন ফট করে ওর কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের ঠোঁটটা ওর দিকে এগিয়ে দেয়।
– অনেক দিন ধরে তোমার ওপর নজর ছিল বেবি,,, কামন__ লেটস__ এনজয় দিস নাইট,,,,
– স্টপিড__!! লিভ মি ইমন__ অস্মিত ____
গোলাপ বিস্মিত চোখে দেখে দূরে দাঁড়িয়ে অস্মিত হাসছে,,,,,,,
বুঝতে বাকি রইলো না গোলাপের,,, বলে,,
– ওকে ওকে,, তুমি যেটা চাও সেটাই হবে,, তার আগে আমি অস্মিতের সাথে কথা বলতে চাই,,,,
ইমন ছেড়ে দিয়ে স্বাভাবিকভাবে মাথা নাড়িয়ে অস্মিতকে ইশারায় ডাকে,,,,
– গোলাপ-কে আমাদের ডিল-টা একটু এক্সপ্লেন করে দে,,,,
বলে ইমন দূরে সরে যায়। একটা বেশ মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছে একটু সামনের দিক থেকে। অসম্ভব সুঘ্রাণ। একটু আকর্ষিত হয়ে ইমন এগিয়ে যায় সেই সুঘ্রাণের উৎসের দিকে,,,,,,,,
– কি__? তুমি_? আমাকে নিয়ে ডিল করেছো_? নিজের সাকসেসের জন্য _?
– হ্যাঁ __ স্ত্রী হিসেবে তুমি কি করছো আমার জন্য _?
– আমার দরকার নেই কিছু করার। তোমার মতো স্বামীর আমি মুখ-ও দর্শন করতে চাই না। আগে যদি জানতাম তোমার পরিকল্পনা কখনোই আসতাম না,,,
– এসব বেফালতু কথা বলে ইমনের টাইম নষ্ট করো না,,
ইমন এগিয়ে যায় গন্ধের উৎসের কাছে। হঠাৎ পায়ে কিছু আটকে হোঁচট খায়। নিচে তাকিয়ে দেখে কিছু একটা পড়ে,, বালির অভ্যন্তর থেকে সামান্য চকচক করছে। কৌতুক হয়ে তুলে নেয় হাত বাড়িয়ে জিনিসটা। চমকে ওঠে ইমন___ আরে_? এটা তো একটা স্যান্ডওয়াচ। হাঁটু মুড়ে বসে বালিঘড়িটা উল্টে দেয়। চলে আসে সঞ্চিত বালি ওপরে। নিচটা ফাঁকা। সূক্ষ্ম রেখার ন্যায় বালি নিচে দিকে পড়ে নিচটা ভরাট করবে,,, ইমন কব্জি উল্টে ঘড়ি দেখে।সাড়ে এগারোটা। সময় সীমা শুরু,,,,,,,,,,,,,,,,,,

সাড়ে এগারোটা




– ছি! ছি! আমি স্বপ্নেও ভাবিনি অস্মিত তুমি এরকম চরিত্রের। ছি!। এত উচ্চাকাঙ্ক্ষা যখন তখন সেটা নিজের চেষ্টায় পূরণ করো। আমি এসব করতে পারবো না,,
– তোকে করতেই হবে______ এখান থেকে পালাতে পারবি না,,,
– আমি পুলিশে যাবো,,,,,, গোলাপ কথাটা বলতেই একটা ঠাস করে চড় বসিয়ে দেয় অস্মিত।হাতে ধরা গোলাপের ক্যামেরাটা ছিটকে পড়ে যায় বালিতে।
– বেশি ফেমিনিসম দেখানো না_____
চুপচাপ যেটা বলছি করবি। এমনিতেও তোকে ইমন ছাড়বে না, রেপ না হওয়ার থেকে এটা ভাল স্বেচ্ছায় মেনে নে,,,,,,,
তাছাড়া আমার শ্বশুর শ্বাশুড়ি জানলে বেচারা অসুস্থ মানুষ__ মেয়ে রেপড___
গোলাপ একটু দমে যায়,, মাথায় রাগ থাকলেও চোখের কোনে জল আসে। একবার দিদির সাথে ওরকম দুর্ঘটনায় শেষ মেষ ওর দিদি আত্মহত্যা করেছিল, বাবা মা ভেঙে পরেছিল_ ওর অবস্থা জানলে,,, মরেই যাবে হয়তো,,,, অস্মিত এরকম,,,,,
– চল চল বারোটা বাজতে যায়,,, দেরি করলে চলবে না,,
ইমন একভাবে ধৈর্য নিয়ে শুনছিল,, আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারলো না,, এত নখরা আজ পর্যন্ত ওর সামনে কোনো মেয়ে করেনি। দরকার পরে নি। কারণ ও এতটাই স্মার্ট আর হ্যান্ডসাম। অথচ এই মেয়ে,,,,,,,বালিঘড়িটার সামনে দিয়ে উঠে এগিয়ে আসে ও গোলাপের দিকে,,, অস্মিত তখন গোলাপ-কে শক্তহাতে ধরে রেখেছে,,,,,
ঘড়িতে বারোটা বাজলো।।

অজ্ঞানরত গোলাপ যখন ধীরে ধীরে নিজের চেতনায় ফিরছে দেখে ওকে ঘিরে গুটি কয়েক লোক আর পুলিশ। আস্তে আস্তে ওঠে ও,,,,
একজন অফিসার এগিয়ে আসে ওর দিকে,,
– ম্যাডাম আপনি ঠিক আছেন তো___??
আস্তে জড়ানো গলায় বলে গোলাপ,,
– ইয়া! আম ওকে। বাট মাই হাজবেন্ড,,,,,,,,,
– সরি ম্যাডাম,,, এখানে যে দুজন পুরুষ ব্যক্তি ছিলেন দুজনের-ই ডেথ হয়ে গেছে।
বুকটা ধক করে উঠলো গোলাপের। কি_? ডেথ_? কিন্তু কখন_? কাল তো অস্মিত ওকে চেপে ধরেছিল__ আর ইমন ওর কাছে আসছিল,, তারপর কি হল ওর নিজের-ই মনে নেই। তাহলে ডেথ কি করে হল_?
– ম্যাডাম আপনার নামটা,,,,,,,
– গোলাপ।
– হ্যাঁ মিসেস গোলাপ আপনার হাজবেন্ডের নাম_?
– অস্মিত।
– আর ওনার সাথে যে ছিল_?
– ওর কম্পানির সিনিয়র,,, ইমন শেট্টি।
– এই আই কার্ডটা ওদের-ই একজনের পকেট থেকে আমি পাই,,, ইনি কে দেখুন তো-,,
গোলাপ চোখের জল মুছে আই কার্ডটা দেখে,,, চমকে ওঠে,, অপরিষ্কার স্বরে বলে ওঠে,,
– অস্মিত,,,,,
– ওকে মিসেস গোলাপ,, এটা একটা ওপেন-এন্ড কেস। দুজন দুজনের গলা টিপে ধরে খুন করেছে,,,,,
– মানে__? গোলাপ অবাক।
– আমরা এই ক্যামেরাতে সম্পূর্ণ ঘটনা-টার প্রমাণ পেয়েছি। মানে ক্যামেরাটা পড়ে ছিল ঠিকই কিন্তু সোজা করে চালু ছিল তাই সবটা রেকর্ড হয়ে গেছে। যে কিভাবে ওই ইমনের হাত থেকে বাঁচতে আপনার স্বামীর সাথে ওর লড়াই হয়,,,,,
গোলাপ বিস্ফারিত চোখে দেখে ইমন আর অস্মিত দুজন দুজনের গলা টিপে ধরেছে। আর নিচে বালিতে গোলাপ পড়ে। বোধহয় ভয়ে ও অজ্ঞান হয়ে গেছিল।
– কি ম্যাডাম তাই তো_? আপনার স্বামী আপনাকে ,,,,
ইন্সপেক্টরের কথা শেষ হয় না গোলাপ কিছুটা ভয় কিছুটা সংশয় কিছুটা আতঙ্কে ঘাড় নাড়িয়ে হ্যাঁবাচক সম্মতি জানায়।
– ওকে। আসুন আপনাকে একবার মর্গে আসতে হবে আমাদের সাথে,,,,,
গোলাপ ভয়ার্ত চোখে তাকায় ইন্সপেক্টরের দিকে। একজন মহিলা কনস্টেবল এগিয়ে আসে গোলাপ-কে সামলানোর জন্য।
– আসুন ম্যাডাম,, ওপেন-এন্ড কেস হলেও কিছু ফর্মালিটিস আছে,,,,,
পুলিশ জিপে ওঠার আগে গোলাপ একবার ঘুরে তাকায় ওই স্থানে,,,, একটা কথা ও বার বার ভাবছে,,,
‘ কাল ও অজ্ঞানটা হলো কি করে_? আর ক্যামেরাটা তো উল্টো ছিল ঠিকঠাক করে সোজাই বা কে করলো_?’
কিন্তু কেন জানে না গোলাপের অস্মিতের মৃত্যুতে একদিকে যেমন খারাপ লাগছে ঠিক তেমনি মনটা শান্তিতে ভরে যাচ্ছে,,,, কাল রাতের পর ও অস্মিতকে ঘৃণা করতে শুরু করেছিল।

অদূরে সকালের মিঠে রোদে বালিমাখা স্যান্ডওয়াচটা চকচক করে ওঠে।কোনো এক পুলিশ কর্মীর পা লেগে বালিঘড়িটা আবারো পড়ে যায়।সে ঠিক আছে। পাশে সমুদ্রের ধার দিয়ে হেঁটে চলেছে সৃজা। হ্যাঁ ও এভাবেই প্রতিটা দুর্ঘটনার রাতকে যোগ্য উচিত শিক্ষার রাতে পরিণত করে ছাড়বে। আর যদি কেউ না ওই স্যান্ডওয়াচ তুলে সোজা করে দাঁড় করায় তাহলে__? তাহলে তো ও কিছুই করতে পারবে না,,,,,
একটু মুচকি হাসে সৃজা। করবে না মানে__? ওর আহ্বানে আজ অব্দি কেউ সাড়া না দিয়ে পেরেছে_? সাড়া দিতেই হবে। আবারো দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয় সৃজা__ যে-ই এখানে আসবে নিজের দুষ্কর্মকে নিষ্কৃতি দিতে সে-ই প্রাণে যাবে। যেতেই হবে।

( সমাপ্ত ) 

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 2   Average: 4.5/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।