হাহাকারের শেষ প্রহর

হাহাকারের শেষ প্রহর

গল্প—– হাকারের শেষ প্রহর

লেখক — কৃষ্ণ গুপ্ত

 

 

[ বিঃদ্রঃ — এটি কাল্পনিক ঘটনা। এর সঙ্গে স্থান, কাল, পাত্র এবং ঘটনাপ্রবাহের কোন রূপ মিল থাকলে তা কাকতালীয়।]

নির্মল দোতলার জানলা দিয়ে শূন্য দৃষ্টি তে বাইরের প্রধান রাস্তা টার দিকে তাকিয়ে ছিল। একটা বেসরকারী অফিসে মোটা বেতনে চাকরী করত ও। কয়েক মাস আগেও অফিস করেছে ও। বাড়ি থেকে গাড়ি নিয়ে যেত। আবার দিয়ে যেত। লক ডাউনের দীর্ঘ সময়েও যেত। খুব ব্যস্ত জীবন ছিল। সারাদিন যে কিভাবে কেটে যেত, নিজেও জানত না। জিসান কে সময় দিতে পারত না একদম।
জিসান, মানে ওর তিন বছরের ছেলে। ছেলের কথা মনে পড়তেই ডাইনিং এর দিকে ছলছল চোখে তাকাল। মায়ের কোলে সকালের ব্রেকফার্স্ট সারছে ও। সম্ভবত এটাই শেষ আহার ওর জীবনের। বেবি ফুড যা স্টকে ছিল, সবই শেষ হয়ে গেছে। ঘরে 3-4 বস্তা চাল মজুত রেখেছিল দুর্দিন আসছে বলে। গত পরশু পাপ্পু রা সব ডাকাতি করে নিয়ে গেছে।
পাপ্পু মানে ওর নিজস্ব গাড়ির ড্রাইভার। ও সব জানত যে নির্মল 3-4 মাসের চাল মজুত রেখেছিল। ও আর ওর বৌ সরমা অনেক হাতে পায়ে ধরেছিল, যে অন্তত জিসানের কথা ভেবে এক বস্তা যেন রেখে যায়। কিন্তু ওরা তা করেনি। শৈলেন ও ছিল দলে।
শৈলেন মানে কাজের মেয়ে জবার বর। জিসানের গলায় ধারাল ছুরি টা যেভাবে ধরেছিল, তাতে……..

নির্মল একটা সিগারেট ধরাল। সাধারণত কাজের চাপ না হলে ও কখনই স্মোক করে না। স্মোক করে দুঃখ ভোলা যায় না। দুঃখ ভুলতে মদ লাগে মদ। যদি পারত, তবে এই সীমা হীন কষ্টের মধ্যে তাকে ই আপন করত।
কিন্তু সিগারেটের ধোঁয়া টা ও যেন অসহ্য লাগছে। সরমার দিকে আর তাকানো যাচ্ছে না। ওও জানে যে আজ কে রান্না করার মত কোন দানাই আর ঘরে অবশিষ্ট নেই।

 




 

জবা দের জন্য কিছু মুরী থাকত ঘরে। তা ভিজিয়ে মিক্সি তে বেটে কোন মতে জিসান কে দেওয়া হয়েছে। আচ্ছা জিসান কি জানে আসন্ন ভবিতব্যের কথা?
না মনে হয়। তিন বছরে বাস্তব কে বোঝা অত সহজ না। এই বয়সে তো বড় দের কোলে-পিঠে আর বন্ধু দের সঙ্গে খেলে-ধূলে কাটানোর কথা। কিন্তু পারছে কই? সারাদিন ই তো মাস্ক সর্বস্ব জীবন। আর খেলবেই বা কার সাথে?
পাশের বাড়ির রিন্টু আর তার পাশের চিঙ্কাই, দু জনের তো আর কেই বেঁচে নেই! রিন্টু মহামারীর শিকার। যদিও ওর বাবা ব্যাঙ্ক অফিসার ছিল। তবে প্রচুর অর্থ ও ছেলে কে বাঁচাতে পারেনি। হাসপাতালে ভর্তি করলে তো ছেলে বাঁচবে! কিন্তু গাড়ি আছে তো ড্রাইভার নেই। হাসপাতাল আছে তো বেড নেই। বেড আছে তো চিকিৎসক নেই। চিকিৎসক আছে তো সরঞ্জাম নেই। সরঞ্জাম আছে তো, সব চিনের। বেশীর ভাগই কাজ করছে না।
চিঙ্কাই অবশ্য দুর্ভিক্ষের শিকার। চিঙ্কাই এর বাবা ও ড্রাইভার। গত প্রায় ন মাস বাড়িতে বসে। রোজগার নেই। সঞ্চিত সব অর্থ, বৌ এর গয়না সব শেষ। সরকার থেকে যে ফ্রি রেশন দিচ্ছিল, তার যোগ্যতা মান ওর ছিল না। তাও সে সব ফ্রির রাজত্ব তো গত তিন মাস আগেই শেষ হয়ে গেছে। সরকার ই বা কোথ্যেকে দেবে? দেশে গত ন মাসে চাষবাস ই বা হল কোথায়? আরে চাষী বাঁচলে তো চাষ! আর খাদ্য দ্রব্য আমদানি করার ও তো সুযোগ নেই। আশেপাশের সব দেশ ই নামে রয়ে গেছে!

বারান্দা দিয়ে অনেক অনেক বছর পর হাওড়া ব্রিজ টা দেখতে পেল নির্মল। সেই ছোট বেলায় যখন বাবার হাত ধরে স্কুলে যেত, তখন রাস্তার বিশেষ কোন থেকে দেখা যেত। তার পর দূষণের গ্রাসে সব বন্ধ হয়ে গেছে। এখন বাড়ি দোতলা হওয়া তে সেই রাস্তার কোন টা আবার দেখা যাচ্ছে। এখন অবশ্য পরিস্কার নির্মল আকাশ। আর দূষণ নেই। শুধু দুর্ভিক্ষ আছে।

কতক্ষণ ও রাল্তার দিকে তাকিয়েছিল মনে নেই। পিঠে আলতো কোমল হাতের স্পর্শে ও পিছন ফিরল। — সরমা পিছনে দাঁড়িয়ে।
চোখ দুটো লাল। তবে জল নেই, পুরো শুকনো। আসলে কাঁদতে কাঁদতে শুকিয়ে গেছে।
বৌ কে পাগলের মতন জড়িয়ে ধরল নির্মল। একেবারে ভেঙে পড়ল ও। কিন্তু সরমা অনেক শক্ত মনের। চোয়াল দুটো শক্ত করে একটা শুকনো হাসির চেষ্টা করল।
আজকের দিনটা মনে আছে?
— নির্মল চোখ মুছতে মুছতে বলল, — সম্ভবত আজ 31 শে ডিসেম্বর, তাই না?
— ঠিক তাই, আগামী কাল আমাদের বিবাহবার্ষিকী। গত বছর ও আমরা পার্টি করে সেলিব্রেট করেছিলাম। — কথা বলতে বলতে সরমার গলা ধরে এল।
নির্মল ওর কপালে একটা চুমু খেয়ে মলিন মুখে বলল, — সে নয় আগামীকাল আবার সেলিব্রেট করা যাবে।
ওর কথার কোন জবাব দিল না সরমা। শুধু দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, — এগারোটা বাজে। টিভি তে নিউজ টা পারলে শোন। যদি আগামীকাল অবধি বেঁচে থাকার কোন রসদ থাকে।

 




 

বৌ এর কথায় সরকারী চ্যানেল টা খুলল ও। প্রায় তিন মাস হল লোক জনের অভাবে সব প্রাইভেট চ্যানেল গুলো বন্ধ হয়ে গেছে। একমাত্র সরকারী চ্যানেল ই ভরসা। প্রতিদিন সকাল এগারোটা টা আর বিকেল পাঁচ টা তে খবর পরিবেশিত হয়।
নির্মলের মনে আছে প্রায় এক মাস আগে শেষ মৃত্যুর খবরাখবর দেওয়া হয়েছিল। দেশে সংখ্যা টা প্রায় তিন কোটির বেশী! এর পর থেকে সব খবরাখবর বন্ধ। সাংবাদিক, চিত্র সাংবাদিকরা মৃত, ড্রাইভার মৃত, পুলিশ মৃত, ডাক্তার মৃত, নার্স মৃত, সবাই শুধু মৃত…… ও ভগবান কি ভয়ঙ্কর তম পরিস্থিতি! …
নির্মল চিৎকার করে উঠল।
— শেষ, শেষ, পুরো দুনিয়া শেষ সরমা। সব শেষ।
চাষী শেষ, শ্রমিক শেষ, ব্যবসায়ী শেষ, কেরানী শেষ, হিন্দু শেষ, মুসলিম শেষ, গরীব শেষ, মধ্যবিত্ত ও শেষ।

— হায় ভগবান, যদি সামান্য হাত পাতার ক্ষমতা মধ্যবিত্তের থাকত।

সরমা ওকে শক্ত করে ধরে বসল। খবর শুরু হয়েছে। এখন আর অন্য কোন খবর থাকে না। শুধু কোথায় কোথায় কখন হেলিকপ্টার নামবে তার খবর। হ্যাঁ হেলিকপ্টার ই। কারণ বাতাশে বিষাক্ত জীবাণু। রাস্তা আর নিরাপদ না। যারা কোন মতে বেঁচে সরকারী ত্রাণ চালাচ্ছে, এই সতর্কতা তাদের জন্য।

সরমা হঠাৎ খুব উচ্ছ্বল হয়ে উঠল। — এই দত্ত দের মাঠে নামবে বলছে। যাবে গো সোনা? এক বার শেষ চেষ্টা করবে গো? দেখ না প্লিজ।

নির্মল ও মন দিয়ে শুনল সবটা। বেলা এক টাতে নামবে দত্ত দের মাঠে। যদিও হাতে প্রায় দু ঘণ্টা সময়। তবুও এই অভুক্ত দুর্বল শরীরে প্রায় তিন কিমি যেতেও সময় লাগবে।

মিনিট দুয়েকের মধ্যে ই নির্মল রেডি হয়ে গেল। তার পর বের হতে যেতেই সরমা পিছনে ডাকল, — মাস্ক টা ফেলে যাচ্ছ যে!
— ওটা মনে হয় আর লাগবে না সরমা। — কথাটা নির্মল এমন ভাবে বলল, যেন আগামী সব কিছু ও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে।

সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে ভাড়াটিয়া মিহির বাবুর ঘরের সামনে দাঁড়াল। পচা গন্ধ টা বেশ তীব্র। ঘরের চার জন বাসিন্দার মধ্যে একমাত্র মিহির বাবু কে তিন দিন আগেই (ডাকাতির পরে) ফোন করেছিলেন। একটা ক্ষীণ কণ্ঠস্বর শোনা গেছিল। মা, বাবা, অবিবাহিতা বোন কে শ্মশানে নিয়ে যাবার কেউ নেই। কেউ সাত দিন, কেউ চার দিন, কেউ দু দিন আগে মারা গেছে। মিহির বাবু কি আদৌ আছেন বেঁচে?

নির্মল রাস্তা দিয়ে দুর্বল শরীরে যত টা দ্রুত সম্ভব হাঁটা লাগাল। একটা লাঠি নিতে ভুলল না। চারদিকে কুকুর গুলো নরখাদক হয়ে গেছে। এক দিয়ে ভাল হয়েছে। না হলে যত্র তত্র লাশের ভিড়ে শহর টা একটা ডাস্টবিনে পরিণত হত। অবরুদ্ধ দূষণ হীন শহরের এই যে পরিস্কার ছবি টা তখন কিন্তু পাওয়া যেত না।

প্রায় আধ ঘণ্টা পর যখন ও দত্ত দের মাঠের সামনে এল। দেখল আগে থেকে কাতারে কাতারে লাশ জড়ো হয়েছে। হ্যাঁ, ওরাও লাশই। জ্যান্ত লাশ! হাড় লিকে লিকে চেহারা গুলো কুকুর দের থেকে কম ক্ষুধার্ত নয়। কিন্তু এত গুলো মানুষের সঙ্গে লড়ে কি ভাবে সরকারী ত্রাণ নেবে ও? এরকম অভ্যাস তো আগে কোন দিন ছিল না ওর।
ভিড়ের মধ্যে ওটা শৈলেন না?
সেদিন কে যে ডাকাতি করে চাল নিয়ে গেল, সেটা কি করল? মুখোমুখি হতেই যেন বিরক্ত হল।
কি হল ডাকাতি করে পেট ভরে নি? এখানে এসেছ? — নির্মল কাঁপা কাঁপা গলায় প্রশ্ন করল।
— বাড়িতে আট টা পেট স্যার। দুঃখের বিষয় কেউ মরেনি এখনও! কুড়ি কেজি চাল ভাগে পড়েছিল। তা থেকে বাড়িতে আনার আগেই অন্য এক দলের হাতে লুঠ হয়ে গেল!
নির্মল কি বলবে ভেবে পেল না। পকেট থেকে চারটে পাঁচশো টাকার নোট শৈলেন এর দিকে কাঁপা হাতে এগিয়ে বলল, — যদি কিছু মনে না কর, তবে একটা সাহায্য করবে? আমরা ডাকাতির দিন থেকে অভুক্ত। এই টাকা টা নিয়ে আমাদের জন্য কি ত্রাণের কিছু জোগার করে দিতে পারবে?
আমাকে মাপ করবেন। — শৈলেন মাথা নিচু করে বলল, — আমি নিজের পরিবারের জন্য পাব নাকি তাও জানি না। আর টাকা টা রেখে দিন। ওটার কোন মূল্য নেই।

 




 

শৈলেন চলে যেতেই নির্মল ওকে ফলো করল।
বেশীদূর যেতে হল না। একটা হেলিকপ্টার আসছে। কিন্তু নামবে কোথায়? এদিকে তো মারা মারি বেঁধেছে!
যেন এক ভয়ঙ্কর যুদ্ধ! আর সঙ্গে ঘন ঘন আর্তনাদ। প্রত্যেকের হাতে ই অস্ত্র! মানুষের যন্ত্রণার চিৎকার, চিৎকার মানুষের হাহাকারের।
নির্মল ভিতরে ঢুকতে পারল না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁপতে লাগল।
বেশী ক্ষণ দাঁড়াতে হল না। কে জন পিছন থেকে মাথায় মারল। ও মুখ থুবরে সামনে পড়ল। মাথার উপর হেলিকপ্টার টা তখন ও ঘুরছে!

কতক্ষণ কেটেছে জানে না।
জ্ঞান ফিরতে বুঝল পরনের গেঞ্জি টা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। চারপাশ টা একদম শান্ত। এদিক ওদিক অনেকেই পড়ে আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে।
নির্মল উঠে দাঁড়াল। এখন প্রায় সন্ধ্যা। বাড়ি ফিরতে হবে। জিসান আর সরমা কি করছে কে জানে।
সরমা কে বাড়ি ফিরে কি জবাব দেবে ও? জিসান ই বা কি খাবে?
উদ্দেশ্য হীন ভাবে হাঁটতে হাঁটতে দেখল পাশের বাড়ির ভবেশ দা একটা পরিত্যক্ত পৌরসভার স্যানিটাইজার গাড়ি থেকে কি বার করে নিচ্ছে!
কিছু খাবার পেল নাকি?
কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করতেই দেখল ভবেশ বাবুর চোখ টা ঘোলাটে। একটা শিশি তে কোন তরল ভরে নিল। তারপর তা থেকে অবলীলায় মুখে ঢালল। তারপর রাস্তায় পরে ছটফট করতে লাগল।
নির্মল শিশিটা অতি যত্ন সহকারে তুলে নিয়ে বাড়ি ফিরল।
কলিং বেল মারতেই সরমা ফ্যাকাসে মুখে সামনে এসে দাঁড়াল। নির্মল অবাক হল, যখন দেখল, সরমা খাবার সংক্রান্ত কোন কথা জিজ্ঞাসা করছে না। এমন কি ওর রক্ত মাখা গেঞ্জি দেখে ও না।
জিসান কি করছে? — ওকে ডেকে দাও নি?
সরমা উদাসীন চোখে বাইরে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর নির্মলের হাত থেকে বিষের শিশি টা হাতে নিল।
— বলছি জিসান কোথায়?
নির্মল ভিতরে গুমড়াতে থাকা সন্দেহ টাকে আপ্রাণ চাপতে চেষ্টা করল।
সরমা বারান্দা থেকে ফিরে ওর দিকে তাকাল। তারপর বলল– ওকে ঘুম পাড়িয়েছি। গভীর ঘুম। ও আর কোন দিন উঠবে না। তুমি দেখতে চাইলে মুখের উপর থেকে বালিশ টা তুলে নিও।

—- সমাপ্ত। —-

 

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 0   Average: 0/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।