হৃদয়ে মোহনা

হৃদয়ে মোহনা

*** “হৃদয়ে মোহনা” ***

—- তৃণাংকুর সাহা

 

ঠিক বিকেল সাড়ে পাঁচটায় স্টীল এক্সপ্রেস ছাড়লো ১৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে। এসি চেয়ার কারে জানালার ধারের সীটে বসে দেবর্ষি মনে করার চেষ্টা করলো, শেষ কবে ও জামশেদপুরে ছিল! পাকাপাকিভাবে জামশেদপুর ছাড়ার পর আর তো কোনোদিন যেতে হয় নি। কয়েকদিন আগে যখন ওর এম ডি নিজের চেম্বারে ডেকে জামশেদপুর যাওয়ার প্রস্তাব দেন, দেবর্ষি প্রথমে একটু চমকে উঠেছিল। ডিশিসন জানাবার জন্য একদিন সময় চেয়েছিল। টিসকোতে মিটিং সোমবার। কিন্তু রবিবারটা দেবর্ষি নিজের মতো করে পেতে চায় জামশেদপুরকে, সেজন্যই আজ শনিবারের টিকিট কাটিয়েছিল। শিল্পনগরী টাটানগর ওরফে জামশেদপুরের প্রতি দেবর্ষির তো একটা দুর্বলতা আছেই, জীবনে পাওয়া না পাওয়ার বেদনা। কিংবা বলা যায়, অনেক কিছু হারিয়েও জীবন যুদ্ধে টিকে থাকার যন্ত্রনা। সেই চৈত্র মাস, জামশেদপুর ছেড়ে চলে আসার পরে বারো বছর পর আজ চলেছে সেখানে অফিসের কাজে।

স্মৃতির স্মরণী বেয়ে চলতে থাকলো দেবর্ষি। ও যে বছর প্রথম জামশেদপুরে আসে, সেটা ১৯৯৮, বাইশ বছর আগে। ওদের দস্তুর কোম্পানীর প্রোজেক্ট চলছিল টিসকোতে। সেই বছরই জানুয়ারীতে আগের কোম্পানীর চাকরি ছেড়ে এম এন দস্তুরে যোগ দিয়েছিল দেবর্ষি। ততোদিনে অবশ্য ওর প্রায় তিন বছর চাকরি করা হয়ে গেছে কলকাতায়, বি ই কলেজ থেকে ইঞ্জিনীয়ারিং পাশ করার পর। চাকরি জীবনের অনেক স্মৃতিই দেবর্ষির মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকলো।
সওয়া সাতটায় ট্রেণ খড়গপুর ঢুকলো। দেবর্ষির মনে পড়ল, অতীতে এই খড়গপুর প্ল্যাটফর্মে নেমে অনেকবারই ও এখানে আলুর দম খেয়েছে। এখনও অনেককে দেখলো শালপাতার বাটিতে আলুর দম নিয়ে এসে নিজেদের সীটে গিয়ে বসতে। চা আগেই একবার খাওয়া হয়েছে। বেশ খিদে পেয়েছে। ব্রেড-বাটার, চিকেন পকোড়া আর কফি খেয়ে আবার ফিরে গেলো অতীতে।

 




 

দেবর্ষির মনে পড়লো, প্রথম যেবার ও টাটায় আসে, সেদিনটা ছিল ২৮শে ফেব্রুয়ারী, শনিবার। সেদিনও এই স্টীল এক্সপ্রেসেই এসেছিল। স্টেশন থেকে অফিসের গাড়ী নিয়ে গিয়েছিল সোনারীর গেস্ট হাউসে, এয়ারপোর্টের পাশে। দু সপ্তাহ ছিল ঐ গেস্ট হাউসে। তারপরে যেতে হয়েছিল আদর্শনগরে, কোম্পানীর দেওয়া ফ্ল্যাটে। ওরই সমবয়সী কলিগ শিবাজী থাকতো ওর সাথে। দেবর্ষির মনে আছে, ও যখন জামশেদপুরে এসেছিল, ঐ সময়টাতে এখানে চলছিল সাত দিন ব্যাপী উৎসব, জামশেদজী টাটার জন্মদিন উপলক্ষ্যে। প্রসঙ্গত, টাটা কোম্পানীর প্রতিষ্ঠাতা জামশেদজী টাটার জন্মদিন ৩রা মার্চ, ঐ দিন সমস্ত টাটা প্রতিষ্ঠানে ছুটি থাকে। এই সময়টায় জুবিলী পার্কের আলোকসজ্জার খ্যাতি অনেকেরই অজানা নয়। প্রায় বছর দশেক কেটেছে দেবর্ষির এই জামশেদপুরে। ওর মনের আয়নায় ভেসে উঠলো “দোমোহনী”, জামশেদপুরে ওর সবচেয়ে প্রিয় জায়গা, সোনারীর শেষ প্রান্তে, যেখানে খরকাই নদী এসে মিশেছে সুবর্ণরেখায়। এই দোমোহনী অনেকখানি জায়গা জুড়ে রয়েছে দেবর্ষির জীবনখাতায়। দোমোহনীর স্মৃতি ওকে অশান্ত করে তুললো, একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। ট্রেণ দাঁড়ালো ঘাটশিলায়, পাশের সীটের ভদ্রলোক নেমে গেলেন। ঘড়িতে আটটা চল্লিশ, একদম রাইট টাইম। আর ঘন্টাখানেকের মধ্যেই তো জামশেদপুর।

দেবর্ষি একবার জামশেদপুর থেকে ঘাটশিলায় বেড়াতে এসেছিল অফিসের কয়েকজন মিলে। এখানে ওরা এক রাত থেকেছিল বিভূতিভূষণের বাড়ির কাছাকাছি মালঞ্চ লজে, সুবর্ণরেখার ধারেই। তবে, ঘাটশিলার সুবর্ণরেখার থেকে দোমোহনীর সুবর্ণরেখাকে যেন বেশী ভালো লাগতো দেবর্ষির। ও তো আগেই ভেবে রেখেছে, কাল সকালে ঘুম থেকে উঠেই হোটেল থেকে বেরিয়ে সোজা চলে যাবে দোমোহনীতে। দোমোহনী কি এখনও আগের মতোই সুন্দর আছে? নৌকা করে কি যাওয়া যাবে মোহনার ওপারের শিব মন্দিরটায়? এখনও কি আগের মতোই ভালো লাগবে দোমোহনীকে? হয়ত অনেক পরিবর্তন হয়েছে জায়গাটার! এরকমই এক গ্রীষ্মের পড়ন্ত বিকেলে ঐ শিব মন্দিরে যাওয়ার সময়েই তো নৌকার মধ্যে “মোহনা”র সঙ্গে আলাপ হয়েছিল দেবর্ষির।
ততোদিনে জামশেদপুরে বছর তিনেক কেটে গেছে দেবর্ষির। সেদিনটা ছিল রবিবার, ১লা বৈশাখ, ইং ২০০১।

 




 

দেবর্ষি আর শিবাজী বিকেলে এসেছিল দোমোহনীতে, মাঝে মাঝেই যেমন আসে বেড়াতে। হঠাৎ ইচ্ছে হলো ওপারের শিব মন্দিরে যাওয়ার। নদীর পাড়ে স্কুটার রেখে ওরা উঠে পড়লো অনেকের সাথে নৌকায়। নৌকায় ওঠার আগেই দেবর্ষিরা মোহনাকে নদীর ঘাটে দেখতে পেয়েছিল ওর মা-বাবার সাথে। মোহনার বাবা, মি়. বারীন মুখার্জির সাথে দেবর্ষিদের আগে থেকেই পরিচয় ছিল টিসকোতে প্রোজেক্টের কাজের সূ্ত্রে। সেদিন ওনাদের সবার সঙ্গেই দেবর্ষিদের ভালো মতো আলাপ পরিচয় হলো। প্রথম দেখাতেই মোহনাকে খুব ভালো লেগেছিল দেবর্ষির, মনে মনে মোহনাকে ভালোবেসে ফেলেছিল দেবর্ষি। মোহনা তখন জামশেদপুরেই এন এম এলে (National Metallurgical Laboratory) রিসার্চ এ্যানালিস্ট, আগের বছরই ট্রেনিং-এ ঢুকেছে। মোহনারা থাকতো সাকচীতে টিসকোর অভিজাত কোয়ার্টার্সে। দেবর্ষি ও মোহনার প্রেম ভালোবাসা ভালোই চলছিল।

‘সেদিন চৈত্র মাস, তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ’, এটা যে ওর জীবনে কোনোদিন সত্যি হয়ে উঠবে, কল্পনা করেনি দেবর্ষি। নাটকের যবনিকা পড়লো পরের চৈত্র মাসেই, যখন চৈত্র সেল চলছে অনেক জায়গাতেই। খরকাই নদীর ওপারে সূর্য অস্ত যাওয়ার সময় এই দোমোহনীতেই নদীর ঘাটে বসে মোহনা বলেছিল, ওর অফিসের টীম লিডার ওকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে, যা ওর পক্ষে মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। কারণ, ও চাকরি ছাড়বে না। দেবর্ষি প্রচণ্ড দুঃখ পেয়েছিল সেদিন, মোহনাকে বোঝাবার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু দেবর্ষির ভালোবাসা হেরে গিয়েছিল মোহনার উচ্চশার কাছে। সুবর্ণরেখার তীর ধরে মোহনা স্কুটি চালিয়ে চলে যাওয়ার পর আরো কিছুক্ষন দোমোহনীর ঘাটে একা বসেছিল দেবর্ষি, বাসায় ফিরেছিল সূর্যাস্তের কিছু পরে। তারপর থেকে সেই একাই, বিয়ে করল না জীবনে।
ঠিক নটা চল্লিশে স্টীল এক্সপ্রেস জামশেদপুর ঢুকলো ।

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 1   Average: 5/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।