Bengali Detective Story

2020 Best Bengali Detective Story – এই বছরের সেরা গোয়েন্দা গল্প

Bengali Detective Story is a mysterious story. You can read here Bengali Detective Story. Today, we have gone a lot of distance from reading the storybooks. Because we don’t have sufficient time for going to the library and reading the storybooks At this age of the Internet. But, if we can read the story on this internet, then it is very interesting. So we have brought a few collections of Bengali story for you. Hope you will enjoy the stories in this busy lifestyle. In this post you will find the latest Detective Story in Bengali, download  Bengali Detective Story, Hare you found top Detective Story in Bengali.

 




 

Bengali Detective Story

 

 

কঠিন শাস্তি

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

 

দই বন্ধুই ক্লাস নাইনে পড়ে, কিন্তু আলাদা ইস্কুলে। ওদের মধ্যে টিটো খুব খেলাধুলাে
ভালবাঁসৈ। পড়ার বই ছাড়া বাইরের বই বিশেষ পড়ে না, বড়জোর দু-একটা ইংরেজি
কমিক্স। আর পাপান খেলার মাঠে বিশেষ যায় না, যখনই একটু সময় পায় অমনই
একটা গল্পের বই নিয়ে বসে। এমনকী একবার টিটোর সঙ্গে ক্রিকেট খেলা দেখাত
গিয়েও পাপান একটা ডিটেকটিভ বই পড়ে শেষ করে ফেলেছিল। পাপান ইংরেজি
বইও পড়ে। বাংলা বইও পড়ে।

এখন একটানা দশদিন স্কুল ছুটি। সকালবেলা পড়াশােনা শেষ করে টিটো যায়
ব্যাডমিন্টন খেলতে, আর পাপান বড় রাস্তার মােড়ে একটা বইয়ের দোকানে এসে
নতুন নতুন বই দেখে, একটা-দুটো কেনে। যাওয়া আসার পথে রােজই প্রায় এক জায়গায়
ওদের দুজনের দেখা হয়ে যায়। গল্প হয় খানিকক্ষণ। টিটো বলে আগের দিনের
ব্যাডমিন্টন ম্যাচে একজনকে হারিয়ে দেওয়ার কথা, আর পাপান বলে, “কাল রাত্তিরে
একটা দারুণ বই পড়লুম, জানিস!”




Bengali Detective Story

সকাল সাড়ে দশটায় ফুটপাথে দাঁড়িয়ে গল্প করছে টিটো আর পাপান। টিটোর হাতে
ব্যাডমিন্টনের র্যাকেট, পাপানের হাতে দু’খানা বই। পাশেই একটা ব্যাঙ্ক, সামনের
রাস্তায় তিন-চারখানা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।
গল্পে-গল্পে ওরা যখন মশগুল, তখন ব্যাঙ্ক থেকে বেরিয়ে এল একজন লােক। বেশ লম্বা-চওড়া চেহারা, সুট-টাই পরা, মাথায় আধখানা টাক। মুখে একটা কেউকেটা ভাব।

লােকটির হাতে একটা চাবি, সেই চাবি দিয়ে একটা গাড়ির দরজা খুলতে গিয়ে হঠাৎ
মুখ তুলে সে টিটো আর পাপানের দিকে চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে বলল, “অ্যাই, আমার
গাড়িতে ঠেসান দিয়েছিস কেন রে? সরে যা! সরে যা!”




কথা বলতে বলতে অন্যমনস্ক ভাবে পাপান একটা নীল রঙের গাড়িতে হেলান
দিয়ে দাঁড়িয়েছিল ঠিকই। তাতে কী হয়েছে, গাড়িটা ক্ষয়ে গেছে নাকি? একজন অচেনা
লােক তাদের তুই বলবে কেন?

পাপান সােজা হয়ে দাঁড়িয়ে গাড়িটা থেকে সরে গেল খানিকটা। লােকটির দিকে
তাকিয়ে বলল, “আপনার গাড়িটা ছুঁয়ে ফেলেছি, এজন্য দুঃখিত!”
লােকটি গাড়িতে ঢুকতে গিয়েও এদিকে চলে এল। গাড়িটা যেন একটা পােষা জন্তু,
এইভাবে এক জায়গায় হাত বুলােতে গিয়ে চমকে উঠল। গর্জন করে বলল, “আমার
গাড়িতে আঁচড় কেটেছিস? গাড়িটা নষ্ট করে দিয়েছিস!”।

 


Bengali Love Quotes – ১০০০+ মহান ব্যক্তিদের ভালোবাসার উক্তি


 

পাপান সেদিকে তাকাল, গাড়িটার গায়ে সে কোনও দাগ দেখতে পেল না। তা
ছাড়া গাড়ির গায়ে সে আঁচড় কাটতে যাবে কেন ? তাও অন্যের গাড়িতে? একটুখানি
পিঠটা ঠেকিয়েছিল শুধু।

লােকটি রাগে গরগর করতে-করতে বলল, “যত সব বিচ্ছু ছেলে! বদমাশ!’
এবার টিটো বলল, “আপনি গালাগাল দিচ্ছেন কেন? আপনার গাড়ির কোনও
ক্ষতি করা হয়নি!”

লােকটি প্রচণ্ড জোরে চেঁচিয়ে বলল, “চোপ!”
তারপর দুটো হাতের পাঞ্জা ঠিক থাবার মতন ওদের দুজনের মুখের ওপর রাখল।
এক ধাক্কায় ওদের দু’জনকেই ফেলে দিল মাটিতে। কঠিন ফুটপাথে মাথা ঠুকে গেল
টিটো আর পাপানের।

 




 

Bengali Detective Story

ওরা আবার উঠে দাঁড়াবার আগেই লােকটি গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে গেল।
টিটো আর পাপানের যত না ব্যথা লেগেছে, তার চেয়েও ওরা আহত হয়েছে বেশি।
বিনা দোষে একজন লােক ওদের গায়ে হাত দিল? এর আগে কেউ কোনওদিন ওদের
সঙ্গে এরকম খারাপ ব্যবহার করেনি। ওরা কোনওদিন মারই খায়নি।

কলকাতার রাস্তায় এরকম কত কী ঘটে, অন্য কেউ ভুক্ষেপও করে না। কত লােক
হেঁটে যাচ্ছে, পাশ দিয়ে গাড়ি চলে যাচ্ছে। একদম কাছাকাছি দু-চারজন লােক ওদের
ওরকম ভাবে পড়ে যেতে দেখে একটু ভুরু কুঁচকে তাকাল, তারপর চলে গেল যে-যার
নিজের কাজে।

কেউ সেই লােকটিকে একটু বাধাও দিল না, কিছু জিজ্ঞেসও করল না।
টিটো আর পাপান গায়ের ধুলাে ঝেড়ে হতবাক হয়ে একটুক্ষণ তাকিয়ে রইল
পরস্পরের দিকে। এটা কী হল? কেন লােকটা এরকম অসভ্যের মতন ব্যবহার করে
চলে গেল ? লােকটা কে?

ব্যাঙ্কের গেটে একজন বন্দুকধারী দরােয়ান থাকে। সে বন্দুকটা পাশে শুইয়ে রেখে
নিশ্চিন্ত মনে খৈনি খাচ্ছে। টিটো তার কাছে গিয়ে বলল, “এইমাত্র যে লােকটি বেরােল
ব্যাঙ্ক থেকে, তাকে আপনি চেনেন? এখানে প্রায়ই আসে?”
দরােয়ান ভুরু তুলে জিজ্ঞেস করল, “কোন লােক? কত লােক তাে যাচ্ছে আর
আসছে!”

 




টিটো বলল, “বেশ লম্বা, খয়েরি সুট পরা।” ।
দারােয়ান বলল, “সুট এখন সবাই পরে। শীত পড়েছে, সুট পরবে না!”
বােঝা গেল, এর কাছ থেকে কোনও সাহায্য পাওয়া যাবে না।।
পাপান বলল, “আমি গাড়ির নম্বরটা দেখেছি। 9837, তবে আগে কী ছিল? WMF,
না WMB ?
টিটো বলল, “আমি দেখিনি। আর ওকে ধরা যাবে না!”

 


Bengali Sad Story – পড়ে দেখুন কান্না চলে আসবে বলে দিলাম


পাপন চোয়াল শক্ত করে বলল, “ওকে খুঁজে বার করতেই হবে। অকারণে একটা
লােক অন্যায় করে যাবে? ওকে শাস্তি পেতেই হবে! অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে
সহে…’ তুই এই কবিতাটা পড়িসনি, টিটো?”
টিটো বলল, “কিন্তু ওকে খুঁজে পাব কী করে?”
পাপান বলল, “পৃথিবীর যেখানেই থাকুক, ওকে আমরা ঠিক খুঁজে বার করব। ওর
মুখটা যেন ভুলে যাস না। দাড়া, একটু চোখ বুজে ওর মুখের ছবিখানা মনে গেঁথে
রাখি।”

টিটো বলল, “ওর মুখটা আমার মনে না থাকলেও, দেখলেই চিনতে পারব।”
তারপর থেকে ওই ব্যাঙ্কের সামনেটায় নজর রাখে দু’ বন্ধুই। যদি সেই লােকটি বা
গাড়িটাকে দেখা যায়। ব্যাঙ্কটার সামনে দিয়ে মাঝে-মাঝে দু’জনেই হাঁটে। অন্য সময়েও
রাস্তার যে-কোনও গাড়ির নম্বরটা ওরা একবার দেখে নেয়। লম্বা-চওড়া, খয়েরি কোটপরা
একজন লােককে পেছন থেকে দেখে পাপান অনেকখানি ছুটে গেল তার মুখটা দেখার
জন্য। সে অন্য লােক।

 




লােকটি আর ব্যাঙ্কে আসে না। রােজ-রােজ কেই-বা ব্যাঙ্কে যায়। তবে পাঁচ দিন
পর অন্য একটি সুযােগ পাওয়া গেল।

পাপান টিকিট কাটতে গিয়েছিল গ্লোব সিনেমায়। হঠাৎ তার নজর পড়ল একটা
গাড়ির নম্বরের দিকে। 9837, তবে আগের অক্ষরগুলাে WMD। আগের অক্ষরগুলাে
মেলাটাই বেশি দরকার, একই নম্বরের অনেক গাড়ি থাকতে পারে। কিন্তু এ-গাড়ির
রংটাও নীল। গাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে নিউ মার্কেটের সামনে।

যদি এই গাড়িটাই সেই লােকটার হয়? কিন্তু পাপান একা-একা সেই লােকটাকে
দেখতে পেলেই বা কী করবে? কী করে শাস্তি দেবে? টিটোকে একটা খবর দেওয়া
দরকার। টিটোদেরবাড়িতে টেলিফোন আছে।

একটা দোকান থেকে ফোন করল পাপান। টিটো জিজ্ঞেস করল, “তুই ঠিক জানিস
ওটা সেই গাড়ি? নীল রঙের আমবাসাডর গাড়ি তাে কতই আছে!”
পাপান একটু দুর্বলভাবে বলল, “না, একেবারে ঠিক করতে পারছি না। অন্য গাড়িও
হতে পারে। কিন্তু যদি সেই গাড়িটাই হয় ? গাড়িটাকে ফলাে করলে সেই লােকটার
বাড়িটা চিনে আসা হবে।”

 


Bengali Jokes – ১০০০+ হাসির জোকস – হেসে পেট ব্যাথা হয়ে যাবে


 

টিটো বলল, “ঠিক আছে, তুই নজর রাখ। আমি আসছি!” ।
একটু দূরে, অন্য একটা গাড়ির আড়ালে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল পাপান। টিটোর
আসতে কুড়ি-পঁচিশ মিনিট লাগবেই। তার আগেই যদি লােকটা বেরিয়ে আসে নিউ
মার্কেট থেকে? অতবড় লােকটার সঙ্গে পাপান গায়ের জোরে পারবে না। তবে ছুটে
গিয়ে পেছন থেকে একটা ল্যাং মেরে আছাড় খাওয়াতে পারে। তাতেই অনেকটা প্রতিশােধ
নেওয়া হবে। কিন্তু ওর সঙ্গে যদি অন্য লােক থাকে?

ঠিক তাই। টিটো এসে পৌছবার আগেই নিউ মার্কেট থেকে বেরিয়ে এল সেই
লােকটি। হ্যা, কোনও ভুল নেই, সেই লােকটাই বটে। তার সঙ্গে রয়েছে আরও দু’জন।
লােক। তারা নীল গাড়িটার দিকেই এগিয়ে আসছে হাসতে-হাসতে। হাতে কয়েকটা
প্যাকেট। পাপানের মনটা দমে গেল। এখনই তাে ওরা গাড়িতে উঠে চলে যাবে, সে কী।
করবে?

লােকটিকে ভাল করে দেখবার জন্য পাপান অনেকটা কাছে এগিয়ে এল।
সেই আসল লােকটাই গাড়ি চালাবে। একটা ভিখিরি বুড়ি জানলা দিয়ে হাত বাড়িয়ে
দিল তার কাছে। লােকটা ধমকে উঠল, “এই যা! সরে যা!”
বুড়ি তবু সরে না। ঘ্যানঘ্যান করতে লাগল।

 

 Suspense story book in bengali

তারপরের ব্যাপারটা দেখে আঁতকে উঠল পাপান। লােকটা সাঁ করে কাচ তুলে দিল
গাড়ির জানলার। তাতে আটকে গেল ভিখিরি বুড়িটার হাত। বুড়িটা যন্ত্রণায় চিৎকার
করে, “ওরে বাবা রে, মরে গেলাম রে’ বলতে লাগল, আর ভেতরে সেই লােকগুলাে
খলখল করে হাসছে।

ঠিক এই সময় টিটো এসে ডাকল, “পাপান!”
কাছেই একটা ট্যাক্সি থেমেছে, তার মধ্যে বসে আছে টিটো। পাপান দৌড়ে এসে
ট্যাক্সিতে উঠে পড়ে বলল, “সেই গাড়ি, সেই লােক। ওকে ফলাে করে বাড়িটা দেখে
আসতে হবে।”

 




জানলার কাচ আবার নামিয়ে নীল গাড়িটা এবার স্টার্ট দিয়েছে।
পাপান উওেজিতভাবে বলল, “ওই লােকটা, ওই লােকটা, ওর মতন খারাপ লােক
আমি পৃথিবীতে আর দেখিনি। একটা ভিখিরিকে শুধু-শুধু কী কষ্ট দিল ! ওকে ছাড়া হবে
, ওকে শাস্তি দিতেই হবে!”

টিটো ট্যাক্সি ড্রাইভারকে বলল, “আপনি আবার চলুন, শিগগির!”
ড্রাইভার জিজ্ঞেস করল, “কোন দিকে যাব?”

টিটো আর কিছু বলবার আগেই পাপান বলল, “ডান দিকে ঘুরিয়ে নিন।
সে একটা গল্পের বইয়ে পড়েছে যে, অল্প বয়সী ছেলেরা কোনও ট্যাক্সিতে চেপে
অন্য কোনও গাড়ি ফলাে করতে বললে ট্যাক্সি-ড্রাইভাররা সন্দেহ করে। যেতে চায় না।
সেইজন্য পাপান শুধু আগের গাড়িটা দেখে-দেখে বলতে লাগল, “ডান দিকে, এবার
বাঁ দিকে।”

 


Rupkothar Golpo – ১০টি সেরা ছোটোদের মজার মজার রূপকথার গল্প


 

বেশ কয়েক মিনিট কেটে যাওয়ার পর টিটো ফিসফিস করে বলল, “গাড়িটা কত
দূর যাবে রে? ট্যাক্সিভাড়া অনেক হয়ে গেলে কী করে দেব? আমার কাছে বেশি পয়সা
নেই। তাের কাছে আছে?”

পাপান বলল, “আমার কাছে তাে পাঁচ টাকার বেশি নেই!”
টিটো বলল, “এর মধ্যেই পনেরাে টাকা উঠে গেল, আমার কাছে আছে মাত্র দশ
টাকা।”
পাপান বলল, “একটা কিছু ব্যবস্থা হয়ে যাবেই। এখন আর ওকে ছাড়লে চলবে না।

নীল গাড়িটা এসে থামল টালিগঞ্জে, বড় রাস্তা ছেড়ে একটা ছােট রাস্তায় ঢুকে
একটা পাঁচিল-ঘেরা বাড়ির সামনে। পাপান আর টিটো নেমে পড়ল একটু দূরে। ট্যাক্সি
ড্রাইভারকে একটু অপেক্ষা করতে বলে ওরা ঠিকানা খোঁজার ভান করে একটু-একটু
করে এগােতে লাগল।

সন্ধ্যে হয়ে এসেছে। এ-রাস্তাটা অন্ধকার অন্ধকার মতন। সেই বাড়িটার সামনে
একটা লােহার গেট, ভেতরে একজন দারােয়ান বসে আছে। লােক তিনটে ভেতরে
ঢুকে গেছে, ভেতরটায় কিছু দেখা যাচ্ছে না।

এ তাে বেশ বড়লােকের বাড়ি। এখন কী করা যায়?
পাপান ভাবল, লােকটা এমন বড়লােক হয়েও একটা বুড়ি ভিখিরিকে অমন কষ্ট
দেয় ? পাষণ্ড! ওকে শাস্তি দিতেই হবে!

 

 

_ বাডিটার সামনে এমনই ঘােরাঘুরি করা যায় না। ট্যাক্সি ড্রাইভার হর্ণ দিচ্ছে। পাপান
ঠিক করে ফেলেছে যে, ওই ট্যাক্সিতেই বাড়ি ফিরতে হবে, না হলে ভাড়া দেবে কী
করে? বাড়িতে গিয়ে দাদার কাছে টাকা চাইতে হবে। দাদা যদি এখন বাড়িতে না থাকে,
তা হলে মায়ের কাছে!

টিটো বলল, “এখন আর তাে কিছু করার নেই। বাড়িটা তবু চেনা হল।”
পাশ থেকে গায়ে চাদর জড়ানাে একটি লম্বামতন ছেলে জিজ্ঞেস করল, “তোমাদের
কী চাই ভাই? কাকে খুঁজছ?”

 




 

টিটো বলল, “কিছু চাই না। একটা ঠিকানা খুঁজছি। আমার এক বন্ধু থাকে পঁয়তাল্লিশ
নম্বর বাড়িতে, কিন্তু সে তাে ওরকম লােহার গেটওয়ালা বাড়ি বলেনি, এমনই সাধারণ
দোতলা বাড়ি। ওই বাড়িটা কার বলতে পারেন?
লম্বা ছেলেটি বিরক্ত ভাব করে বলল, “ওটা তাে রঘু চৌধুরীর বাড়ি। কেন, তার
সঙ্গে তােমাদের কী দরকার?”

পাপান বলল, “না, না, কোনও দরকার নেই। এমনই জিজ্ঞেস করছিলাম।”
ছেলেটি বলল, “মহা-পাজি লােক! লােককে ঠকিয়ে-ঠকিয়ে অত বড় বাড়ি করেছে।
এটা আগে ছিল একজন বিধবা ভদ্রমহিলার, তিনি হঠাৎ মারা গেলেন। তারপর বাড়িটা
রঘু চৌধুরীর হয়ে গেল। লােক বলে, ওই রঘু চৌধুরীই বিধবা মহিলাকে বিষ খাইয়ে
মেরে ফেলেছে!

টিটো চোখ বড়-বড় করে বলল, “খুন? ওকে পুলিশে ধরেনি?”
ছেলেটি বলল, ‘ওর সব বড়-বড় লােকের সঙ্গে চেনা আছে। কী সব কলকাঠি
নেড়েছে, কেউ ওকে ছুঁতেও পারেনি!”
টিটো আবার জিজ্ঞেস করল, “আপনারা পাড়ার লোেক কিছু করতে পারেননি ?
ওকে শাস্তি দেওয়া উচিত ছিল না?”

ছেলেটি বলল, “ওকে ধরা-ছোঁওয়া অত সহজ নয়। আমরা কিছু করতে গেলে
আমাদেরই পুলিশে ধরিয়ে দেবে। জানাে, আমি ওর কাছে একবার চাকরি চাইতে
গিয়েছিলাম। আমার কথা ভাল করে শুনলই না, দূর-দূর করে তাড়িয়ে দিল, কুকুর
লেলিয়ে দিল!”

ট্যাক্সিওয়ালা অধৈৰ্য্য হয়ে গেছে, ওদের উঠে পড়তে হল। ফেরার পথে আগাগােড়া
গম্ভীর হয়ে রইল পাপান।

এর পর দু-তিনদিন দুই বন্ধু দেখা হলেই ওই রঘু চৌধুরীকে নিয়ে আলােচনা করে।
লােকটা অসভ্য, নিষ্ঠুর, খুনি, অথচ তাকে কেউ শাস্তি দিতে পারে না! একটা খারাপ
লােক মানুষের ক্ষতি করে ঘুরে বেড়াবে, এত বড় বাড়িতে থাকবে, অথচ কেউ জানতে
পারবে না তার আসল রূপটা? একটা কিছু করতেই হবে, কিন্তু কী করা যায় ?
ওরা দু’জন মাঝে-মাঝে চলে আসে টালিগঞ্জে।

সেই বাড়িটার সামনে ঘােরাঘুরি
করে। দু-একবার রঘু চৌধুরীকে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যেতেও দেখেছে। একবার রঘু
চৌধুরীর সঙ্গে পাপানের চোখাচোখিও হয়ে গেল। কিন্তু রঘু চৌধুরী তাকে চিনতেও
পারল না। ও নিশ্চয়ই অনেক, অনেক লােকের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছে, তাদের
মুখ মনে রাখতে পারে না।

 




Bengali Goyenda Golpo 

 

ওরা খবর জোগাড় করল যে, রঘু চৌধুরী এ-পাড়ার দুর্গাপূজো, কালীপুজোর সময়
অনেক টাকা চাদা দেয়। তাই কেউ তাকে ঘাঁটায় না। তবে একটা চায়ের দোকানের
সামনে দাঁড়িয়ে দুটি ছেলে বলছিল, রঘু চৌধুরী আসলে স্মাগলার, তাই ওর এত টাকা !
একদিন সকালবেলা ওই বাড়ির লােহার গেটের পাশ দিয়ে যেতে-যেতে ওরা দেখল,
ভেতরে একটা সুন্দর সবুজ লন।

সেখানে দুটি ফুটফুটে ছেলে, পাপানদের চেয়ে অনেক
ছােট। মনে হয় ক্লাস ফোর আর ফাইভে পড়ে, একটা বল নিয়ে খেলছে, আর তাদের
সঙ্গে খেলায় যােগ দিয়েছে রঘু চৌধুরী আর একটা কুকুর। বাবা ছেলেদের সঙ্গে খেলছে
আর সবাই মজা করে হাসছে। এক-একবার ছােট ছেলেটাকে কাধে তুলে নিচ্ছে রঘু।
চৌধুরী। কুকুরটা লাফাচ্ছে পাশে।

কী সুন্দর দৃশ্য ! মনে হয় কী আনন্দময় এই বাড়ি। রঘু চৌধুরী তার ছেলেদের সঙ্গে
এত ভাল ব্যবহার করে, আর খুব খারাপ ব্যবহার করে বাইরের লােকদের সঙ্গে।
সেদিন ফেরার পথে টিটো বলল, “আর টালিগঞ্জে এসে কী হবে রে পাপান? কিছুই
তাে করা যাবে না!”

 


Bengali Jokes – ১০০০+ হাসির জোকস – হেসে পেট ব্যাথা হয়ে যাবে


পাপান বলল, “আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে।”
টিটো সঙ্গে-সঙ্গে উৎসুকভাবে বলল, “কী?”
পাপান বলল, “ওকে বেনামী চিঠি লিখব! ওপরে একটা মানুষের মাথার খুলি
এঁকে লিখব, সাবধান রঘু চৌধুরী! তুমি যদি পাপ কাজ বন্ধ না করাে, তা হলে তােমার
মুণ্ডু উড়ে যাবে! ইতি মেঘনাদ! মেঘনাদের তলায় একটা জ্বলন্ত তীর আঁকা থাকবে!”
টিটো বলল, “এই চিঠি পেলে ও হাসতে-হাসতে ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটে ফেলে
দেবে! মােটেই ভয় পাবে না।”

পাপান বলল, “কেন ভয় পাবে না? তুই কী করে জানলি ওদের বাড়িতে ওয়েস্ট
পেপার বাস্কেট আছে?”
টিটো বলল, “সব বাড়িতেই থাকে। শুধু চিঠি পড়ে ভয় পাবে কেন? মুণ্ডু ওড়াবার।
ক্ষমতা যে তাের আছে, তার কোনও প্রমাণ দিতে পারবি?”
পাপান বলল, “আরও বেশি ভয় দেখিয়ে চিঠি লিখব!”
টিটো বলল, ‘দ্যুৎ ! ওতে কিছু হবে না। অন্য রাস্তা ভাব।”

পরদিন বিকেলে ব্যাডমিন্টন খেলতে না গিয়ে টিটো দৌডে-দৌড়ে চলে এল পাপানের
বাড়িতে। ছাদে টেনে নিয়ে গেল। তারপর দারুণ উত্তেজিত ভাবে বলল, “আজ ইস্কলে
কী দেখলাম জানিস! ওই ছেলে দুটো আমাদের ইস্কুলেই পড়ে!”
“ওই ছেলে দুটো মানে?”

“রঘু চৌধুরীর দুই ছেলে। ওদের নাম অজয় আর সুজয়। আমাদের জয়দেবের ভাই
গােগাে ওই সুজয়ের সঙ্গে এক ক্লাসে পড়ে। গােগাে বলল, ওরা দুই ভাই-ই খুব ভাল।
পড়াশােনায় ভাল, ব্যবহারও খুব ভদ্র! ওই নীল গাড়িটা ছুটির পর ওদের নিতে আসে।”
“তা হলে তাে খুব কাছাকাছি এসে গেল রে!”

 




 

“রঘু চৌধুরীও হয়তাে কোনওদিন স্কুলে আসবে। তারপর ওকে পেছন থেকে ল্যাং।
মারব?” “তার চেয়ে অনেক কঠিন শাস্তি দেওয়ার কথা আমার মাথায় এসে গেছে। শােন
টিটো, মনে কর, তুই একদিন জানতে পারলি যে, তাের বাবা একজন চোর কিংবা
খুনি-

“অ্যাই, কী হচ্ছে কী? আমার বাবা কীরকম লােক, সবাই জানে।”
“আহা, সত্যি-সত্যি বলছি না! ধর, যদি এমন হত! তাের কিংবা আমার বাবাকে
সবাই খুব ভাল লোেক বলেই জানে, হঠাৎ একদিন প্রমাণ বেরিয়ে গেল বাবা একজন
খুনি, তা হলে তাের মনের অবস্থা কী হত?”
“বাবাকে আমি ঘেন্না করতাম।”

“ঠিক তাই। রঘু চৌধুরী লােকটা তাে সত্যিই খারাপ! ওর ছেলে অজয় আর সুজয়
তা জানে না। ওরা বাবাকে ভালবাসে। ওদের আমরা সব কথা জানিয়ে দেব। প্রমাণ
দেব। তখন ওরা বাবাকে ঘেন্না করতে শুরু করবে। সেটাই হবে রঘু চৌধুরীর শাস্তি।”

“গুড আইডিয়া, কিন্তু…”
এর মধ্যে আবার কিন্তু কী ?”

‘অজয় আর সুজয় অত ছােট… বাবা সম্পর্কে হঠাৎ ওইসব জানতে পারলে ওদের।
মনে খুব আঘাত লাগবে না ? ওদের তাে কোনও দোষ নেই! অন্য কিছু করা যায় না,
পাপান ?”

“অন্য আর কী?”
টিটো পাপানের কাছে মাথাটা নিয়ে এসে বলল, “তুই যে সেই চিঠির কথাটা
বলেছিলি?’

‘ দু’জনে বুদ্ধি আঁটল অনেকক্ষণ ধরে।
পরদিনই রঘু চৌধুরী তার বাড়ির লেটার-বক্সে একটা চিঠি পেল। সাদা খাম। ভেতরে
একটা সাদা পাতায় গােটা-গােটা অক্ষরে লেখা :

“রঘু চৌধুরী, সাবধান!
তােমার পাপের কথা,
কুকীর্তির কথা সব বলে দেব
তােমার দুই ছেলেকে!
ইতি মেঘনাদ”

চিঠিটা পড়ে রঘু চৌধুরীর ভুরু কুঁচকে গেল। কুচি কুচি করে ছিড়ে ফেলল বটে,
কিন্তু সারাদিন তার মনটা খচখচ করতে লাগল।
পরদিন আর-একটা চিঠি :

“রঘু চৌধুরী, সাবধান!
তােমার ছেলে অজয় সুজয়।
কোন ইস্কুলে যায়, আমরা জানি
তােমার বহু পাপের প্রমাণ আছে
আমাদের হাতে
অজয় আর সুজয়কে জানিয়ে দেব
সব কথা, সব কথা
লজ্জায় তাদের মাথা হেট হয়ে যাবে!
ইতি মেঘনাদ”

এবারে চিঠিটা ছিড়তে গিয়েও ছিডল না রঘু চৌধুরী। ভাজ করে পকেটে রেখে
দিল। সারাদিন কাজের ফাকে-ফাকে চিঠিটা পড়তে লাগল বারবার। তার বুক ঢিপঢিপ
করছে। জীবনে সে কখনও এত ভয় পায়নি। নিজের ছেলে দুটিকে সে সত্যিই খুব
ভালবাসে।
এবার এল তিন নম্বর চিঠি :
“রঘু চৌধুরী, সাবধান!

আর সময় নেই
তুমি চাও তােমার ছেলেরা তােমায়
ঘেন্না করুক?
সব বলে দেব, সব!
এখনও যদি বাঁচতে চাও
কাল সকাল সাতটায় দেখা করাে
বিবেকানন্দ পার্কে বড় ছাতিম গাছের তলায়
ইতি মেঘনাদ
পুঃ : একা আসবে!”

 




Bengali Detective Story

এবারে রঘু চৌধুরী ধরে নিল, যে তাকে ভয় দেখাচ্ছে, সে টাকা চায়। ব্ল্যাকমেইল!
তার মুখখানা হিংস্র হয়ে উঠল, চিঠিখানা টুকরাে-টুকরাে করে পা দিয়ে মাড়িয়ে সে
ড্রয়ার খুলে বার করল একটা রিভলভার!

পরদিন ঠিক সকাল সাতটায় রঘু চৌধুরী বিবেকানন্দ পার্কে এসে হাজির। বড়
ছাতিম গাছটার কাছে এসে সে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। সেখানে বসে আছে একটা
তেরাে-চোদ্দ বছরের হাফপ্যান্ট-পরা রােগা ছেলে, তাকে সে পাত্তা দিচ্ছে না। তার
ধারণা, কোনও বিকট চেহারার গুণ্ডা লুকিয়ে আছে কাছেই। পকেটে হাত দিয়ে সে
চেপে ধরে আছে রিভলভারটা।

পাপান হাতছানি দিয়ে ডেকে বলল, “এই যে চৌধুরীমশাই, এদিকে আসুন! আমিই
মেঘনাদ!”

রঘু চৌধুরীর মাথায় যেন আগুন জ্বলে গেল। দাঁত কিড়মিড় করে বলল, “হতভাগা
ছেলে! আমার সঙ্গে ইয়ার্কি? মেরে তাের মুখের সব ক’টা দাঁত ফেলে দেব!”
একটুও ভয় না পেয়ে পাপান বলল, “আমাকে ওরকম শাসাবেন না, কোনও লাভ
নেই। একটু দূরেই দাঁড়িয়ে আছে আমার বন্ধুরা। আপনি আমার ওপর আক্রমণ করতে
এলেই তারা এসে ঝাপিয়ে পড়বে! একজন পুলিশে খবর দেবে। তাতেই তােমার দুই
ছেলে সব জেনে যাবে!”

থমকে গিয়ে রঘু চৌধুরী বলল, “তুই কী চাস? কত টাকা?”
পাপান হা-হা করে হেসে উঠল।

রঘু চৌধুরী বলল, “শােন, আমি তােকে এক হাজার টাকা দেব। তারপর খবরদার
আমার ছেলেদের কাছে ঘেঁষবি না। যদি ওদের কিছু বলতে যাস, তোকে খুন করে
ফেলব। নির্ঘাত খুন করে ফেলব!”

পাপান বলল, “আমাকে খুন করলেও আমার অন্য বন্ধুরা থাকবে। তারা তােমার
ছেলেদের বলে দেবে, তুমি খুনি, তুমি স্মাগলার, তুমি বিনা কারণে অন্য ছেলেদের ধাক্কা
মেরে মাটিতে ফেলে দাও! এইসব শুনে তােমার ছেলেরা তােমাকে ঘেন্না করবে। তােমাকে
বাবা বলে মানতে চাইবে না।”

রঘু চৌধুরী এক পা এগিয়ে এসে বলল, “তুই কত টাকা চাস?”
পাপান বলল, “এক পয়সাও চাই না। তােমাকে ক্ষমা চাইতে হবে। যদি ক্ষমা না
চাও…”

রঘু চৌধুরীর শরীরটা কেঁপে উঠল। সমস্ত মুখটা কুঁচকে গেল। হঠাৎ সে মাটিতে
হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে বলল, “ক্ষমা চাইছি! আর কক্ষনাে এসব করব না! কাউকে
ঠকাব না, কারও সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করব না। তুমি আমার ছেলেদের কিছু বােলাে
না। ওরা আমাকে এত ভালবাসে, বলাে না, প্লিজ, কিছু জানিয়ে দিয়াে না ওদের, আমি
এখন থেকে আর কোনও অন্যায় করব না।”
বলতে-বলতে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল রঘু চৌধুরী।

সমাপ্ত


 




 

আমিই গােয়েন্দা 

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

Detective Story in Bengali
Detective Story in Bengali

 

অনেকদিনের সাধ, ওই কলমটা কিনব, যেটা আমি মােক্তারবাবুর পকেটে দেখেছি।
কী একটা কাজে গিয়েছিলুম। তিনি আমাকে দেখিয়েছিলেন। ভদ্রলােকের খুব কলমের
শখ। আমারও কিছু কম নয়। তবে মােক্তারবাবুর প্রচুর পয়সা, আর আমি সামান্য কাজ
করি। কলমটা নেড়েচেড়ে দেখেছিলুম লােভীর মতাে। জাপানি কলম। টানলে বড় হয়।

চেপে দিলে ছােট্ট এতটুকু। সােনার নিব। কোল্যাপসিবল কলম। কলমটা দেখার পর
তিন রাত ঘুমােতে পারিনি। ওইরকম কলম আমার চাই। যতক্ষণ না পাচ্ছি, শান্তি নেই।
লােভের মতাে বিশ্রী অসুখ আর দুটো নেই।

মােক্তারবাবুকে জিজ্ঞেস করলুম, “কোথায় পাওয়া যায় এমন কলম ?”
“এসব বিদেশি জিনিস, সহজে পাওয়া যায় না বাবা। খবর রাখতে হয়। তােমাকে।
আমি কয়েকটা ঠিকানা দিচ্ছি।”

তিনটে দোকানের ঠিকানা দিলেন। যা টাকা-পয়সা ছিল, সব পকেটে ভরে কলমের
সন্ধানে বেরিয়ে পড়লুম। কলমটা আমার চাই-ই চাই। অ্যাট এনি কস্ট। প্রয়ােজন হলে
হাতঘড়িটা বেচে দেব। কলমটার জন্য খেপে গেলুম। কলম ছােট হয়, কলম বড় হয়।
সরু চুলের মতাে রেখা পড়ে । ছাই রং। স্টেনলেস স্টিলের ব্যান্ড লাগানাে। কী জিনিস
তৈরি করেছে জাপান!

প্রথম দোকানের মালিক বললেন, “দু পিস এসেছিল, বিক্রি হয়ে গেছে। পরে
আর আসবে কি না বলতে পারছেন না। দ্বিতীয় দোকান বললে, ওরকম কলম তারা
জীবনে দেখেননি। শোর আছে, পার্কার আছে, সবই জাতের কলম, নিতে হয় নিন।

কলম ছোট হয়, কলম বড় হয়, তাতে আপনার কি লিখবেন, না ম্যাজিক দেখাবেন!”
বেরসিক মানুষটিকে বােঝাই কী করে, সব কলমই তাে লেখে, কিন্তু কোন কলম
ছােট বড় হয় ! তৃতীয় দোকানের মালিক বললেন, একটা আছে, তবে তার কাছে নেই,
আনিয়ে দিতে পারেন। “অপেক্ষা করতে হবে। ঘন্টাখানেক পরে কলমটা পাওয়া যেতে
পারে। আপনি নেবেন তাে, না দেখে ছেড়ে দেবেন।”

 

Bangla Rohosso Golpo

“আরে মশাই, আমি নেব। টাকাটা না হয় আপনি আগেই নিয়ে নিন।
সহকারীকে কী একটা বললেন গুজরাতি ভাষায়, তিনি বেরিয়ে গেলেন। আমার
অপেক্ষার পালা। সেই কলম আসছে। ছাই ছাই রং। স্টিলের ব্যান্ড। ছােট্ট, সােনার
নিব। এই ছােট, তাে টানলে বড়। সেই মুহূর্তে আমার মতাে সুখী সারা কলকাতা শহরে
আর একজনও কেউ ছিল কী! এক ঘন্টা পরেই একটা কলমের মালিক হব আমি।

ব্যবসায়ীদের তল্লাট। কিছু দূরেই স্টক এক্সচেঞ্জ। শেয়ার মার্কেট। কলকাতার যত
পয়সাঅলা লােক চারপাশে ব্যস্ত, গণ্ডারের মতাে ঘুরছেন। তারা টাকা ছাড়া আর কিছু
বােঝেন না। পাশেই চিনাবাজার। লরি, ঠেলা আর মােটরবাইকের গুঁতােগুতি। উত্তাল।
কলকাতা তিড়িংবিড়িং লাফাচ্ছে। তার মাঝে আমি এক পাগল। কলমপাগল।




সময়টা কাটাতে হবে। কী করি! রাস্তায় দাঁড়ানাে যাচ্ছে না। লােকের পর লােক
গুতিয়ে চলে যাচ্ছে। এ-পাড়ায় কলকাতার সেই বিখ্যাত শিঙাড়ার দোকান। এক একটার
জামদানি চেহারা। পুরােটাই ঘিয়ে ভাজা। ভাবলুম, ওই গরম শিঙাড়া নিয়ে বসলে
সহজেই অনেকটা সময় কেটে যাবে। একটু করে ভাঙব, ফুস করে গরম বাতাস বেরােবে,
মুখে পুরে হু-হা করব। এ-পাড়ার সামােস্য মরিচের ঝালে উগ্র। একটাকে কাবু করতেই
একঘন্টা কাবার।

 

 

দোকানটা তেমন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন নয়; কিন্তু খাবার উত্তম। উঁচু জায়গায় বসে
ভীমের মতাে এক ভদ্রলােক শিঙাড়া ভাজছেন। বিশাল কড়া, বিশাল তাওয়া। ভাল
ঘিয়ের গন্ধে বাতাস আকুল। একটা নয়, দুটো শিঙাড়ার অর্ডার দিলুম। যা ভেবেছিলুম
তাই, আগুন দিয়ে তৈরি। পাতার ওপর খেলাতে-খেলাতেই সময় কেটে গেল।

গরমে আর ঝালে জ্বলেপুড়ে কলমের দোকানে হাজির হলুম। কলম এসে গেছে, আমার স্বপ্নের
কলম । পাতলা প্লাস্টিকের খাপে । দাম দিয়ে কলম পকেটস্থ করে কলকাতার ভিড়ে ঝাপ
মারলুম। ব্রাবাের্ন রােড ধরে হাঁটছি আর ভাবছি, কেউ জানে না, আমার কত সুখ! এই
কলমটা পাওয়ার জন্যই আমি যেন জন্মেছিলুম। মিনিট দশেক হাঁটার পর মনে হল,

 




 

কলমটা পাশপকেটে রাখার চেয়ে বুকপকেটে আটকে রাখাই ভাল। পাশপকেট থেকে
যদি পড়ে যায়! ট্রামে-বাসে উঠছি না যখন, তখন পকেটমারের ভয় নেই। বুকপকেটে
হৃদয়ের কাছাকাছিই থাক না। খাপ খুলে কলমটা বুকপকেটে রেখে হাঁটছি। একটু-একটু।
গান গাইছি। ভাবছি, প্রথম লেখাটা কী লিখব! আমার জামশেদপুরের বন্ধুকে একটা
চিঠি! না, একটা কবিতা!

নিজের চিন্তায় মশগুল হয়ে পথ হাঁটছি। বুকপকেটে সেই আহামরি কলম। বেন্টিঙ্ক
স্ট্রিটে পড়লুম। যাব ভিক্টোরিয়া হাউসের দিকে। বাঁ দিকের ফুটপাথ। তেমন একটা ভিড়
নেই। ভিক্টোরিয়া হাউসের বাক্সে ইলেকট্রিক বিলের চেক ফেলব। গেটের কাছ বরাবর
গিয়ে বুকপকেটের দিকে তাকিয়ে দেখি পেনটা নেই।
মাথা ঘুরে গেল।

 


Bengali Horror Story ( ভূতের সঙ্গে গল্পসল্প )


পাশপকেটে নেই, বুকপকেটে নেই। কোথাও নেই। মাথা ঘুরে গেল। পেন পকেটমার।
বাসে-ট্রামে উঠলুম না। ফাঁকা রাস্তা দিয়ে এলুম। পকেটমার এল কোথা থেকে! এ কি
ইটালিয়ান পকেটমার! শুনেছি ইটালির পকেটমাররা অসাধ্য সাধন করতে পারে! সামনে,
পেছনে যত দূর দৃষ্টি যায়, তাকালুম। পকেটমারের মতাে কাউকেউ দেখলুম না। সব
নিরীহ, শান্ত ভদ্রলােক নিজেদের কাজে আসা-যাওয়া করছেন।

চোখে জল এসে গেল। ভগবান! কলমটা তুমি দিয়েও নিয়ে নিলে! এ কোনও
মানুষের কাজ নয় ভগবান, এ তােমারই খেলা। তবু মন মানতে চাইছে না। কলমটা
এইভাবে ভ্যানিশ হয়ে যাবে? এইভাবে আমি বােকা বনে যাব?

অনেকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলুম। এতটাই বােকা আমি! পকেট থেকে পড়ে
যায়নি। যেতে পারে না। ক্লিপের গ্রিপটা যথেষ্ট ভালই ছিল। আমি একবারও সামনে
ঝুঁকিনি। সেই কখন থেকে খাড়া হেঁটে আসছি। অদৃশ্য কোনও হাত কলমটা তুলে
নিয়েছে। আমার ধারে কাছে কেউ আসেনি। কোনও ভিড় ছিল না। কেউ গা ঘেষাঘেষি
করেনি। তা হলে হাতটা এল কোথা থেকে!

 


100 Best Bengali Shayari


 

ভাবতে-ভাবতে নিজেই একজন গােয়েন্দা হয়ে গেলুম। ফেলে আসা পথের দিকে
তাকালুম। বােম্বে সুইটস-এর দোকানটা যেখানে, সেখানে আমি একবার পকেটে হাত
চেপে দেখেছিলুম পেনটা আছে। বােম্বে সুইটস থেকে ভিক্টোরিয়া হাউস, এর মাঝেই
ঘটনাটা ঘটে গেছে। যখন আসছিলুম, তখন আমার বাঁ দিকে সার-সার দোকান। পরিষ্কার
ফুটপাথ ধরে হাঁটছি। ডানপাশে রাস্তা। এই তাে ঘটনা। আমার ত্রিসীমানায় কেউ আসেনি।
বলাে গােয়েন্দা, কে আমার কলম নিয়েছে! ভূতে!

ফেলে-আসা ফুটপাথের মাঝামাঝি জায়গায়, একপাশে দাঁড়িয়ে একটা লােক গামছা
বিক্রি করছে। একটা গামছার পাঠ খুলে দু হাতে ধরে দোলাচ্ছে এ-পাশে ও-পাশে আর হাঁকছে, “গামছা, গামছা।”

গামছার ঝাপটা কোনও-কোনও পথচারীর গায়ে লাগছে।

এইরকম একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে লােকটা গামছা বিক্রি করছে কেন! আবার গামছাটা
বিছিয়ে এ-পাশ, ও-পাশ দোলাচ্ছে! মাথায় একটা ঝলক খেলে গেল।
লােকটার দিকে এগিয়ে গেলুম।
ভেবেছে, খদ্দের!

ঝপ করে গামছার কোনাটা চেপে ধরলুম। তলার দুটো কোণ একসঙ্গে। শক্ত।
শক্তমতাে একটা কী ঝুলছে! লােকটা অবাক হয়ে বললে, “কেয়া বাবু?”
“মেরা কলম।
“কলম?”

 




Bengali Detective Story

আমি ততক্ষণে ঝুলন্ত কলমটা গামছার জালি-জালি আঁচল থেকে উদ্ধার করে
ফেলেছি। আমার সেই ছাই-ছাই রঙের সুন্দর জাপানি কলম।
লােকটা হতভম্ব। বলছে, “মেরা কুছ কসুর নেহি।”

কলম পেয়ে গেছি। সেই আনন্দেই আমি বিভাের। লােকটাকে আর বলব কী! পরে
এক পুলিশ-অফিসার আমাকে বলেছিলেন, ওই গামছাঅলা খুব ইনােসেন্ট ছিল না।
ওটাও একটা কায়দা।

, তা নয়, লােকটা নিরপরাধ! কারণ, লােকটাকে ধরার আগে আমি অনেকক্ষণ
তাকে চোখে-চোখে রেখেছিলাম। লােকটা, আপন মনে গামছা দোলাচ্ছে। দুলিয়েই
যাচ্ছে। অসৎ উদ্দেশ্য থাকলে, বঁড়শি থেকে মাছ খুলে নেওয়ার মতাে গামছা থেকে
পেনটা খুলে নিত। তা করেনি।
আবার এও হতে পারে, লােকটা আমাকে নজরে রেখেছিল।
কি জানি কী!

সমাপ্ত


 




2020 Best Bengali Detective Story - এই বছরের সেরা গোয়েন্দা গল্প

গ্রাম—ঘুরঘুটিয়া  পােঃ—পলাশী 

জেলা—নদীয়া ৩রা নভেম্বর ১৯৭৪ 

শ্রীপ্রদোষচন্দ্র মিত্র মহাশয় সমীপেষু 

সবিনয় নিবেদন, 

আপনার কীর্তিকলাপের বিষয় অবগত হইয়া আপনার সহিত একটিবার সাক্ষাতের বাসনা জাগিয়াছে। ইহার একটি বিশেষ উদ্দেশ্যও আছে অবশ্যই। সেটি আপনি আসিলে জানিতে পারিবেন। আপনি যদি তিয়াত্তর বৎসরের বৃদ্ধের এই অনুরােধ রক্ষা করিতে সক্ষম হন, তবে অবিলম্বে পত্র মারফত জানাইলে বাধিত হইব। 

ঘুরঘুটিয়া আসিতে হইলে পলাশী স্টেশনে নামিয়া সাড়ে পাঁচ মাইল দক্ষিণে যাইতে হয়। শিয়ালদহ হইতে একাধিক ট্রেন আছে ; তন্মধ্যে ৩৬৫ আপ লালগােলা প্যাসেঞ্জার দুপুর একটা আটান্ন মিনিটে ছাড়িয়া সন্ধ্যা ছ’টা এগারাে মিনিটে পলাশী পৌঁছায়। স্টেশনে আমার গাড়ি থাকিবে। আপনি রাত্রে আমারই গৃহে অবস্থান করিয়া পরদিন সকালে সাড়ে দশটায় একই ট্রেন ধরিয়া কলিকাতায় ফিরিতে পারিবেন । 

ইতি আশীবাদক

শ্রীকালীকিঙ্কর মজুমদার।

চিঠিটা পড়ে ফেলুদাকে ফেরত দিয়ে বললাম, ‘পলাশী মানে কি সেই যুদ্ধের পলাশী ?

 

Feludar Golpo 

 

আর কটা পলাশী আছে ভাবছিস বাংলাদেশে ?‘ বলল ফেলুদা। তবে তুই যদি ভাবিস যে সেখানে এখনও অনেক ঐতিহাসিক চিহ্ন ছড়িয়ে রয়েছে, তা হলে খুব ভুল করবি । কিস্যু নেই। এমন কী সিরাজদ্দৌল্লার আমলে যে পলাশবন থেকে পলাশীর নাম হয়েছিল, তার একটি গাছও এখন নেই।’ 

তুমি কি যাবে ? 

ফেলুদা চিঠিটার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বলল, বুড়াে মানুষ ডাকছে এভাবে!—তা ছাড়া উদ্দেশ্যটা কী সেটা জানারও একটা কৌতূহল হচ্ছে। আর সবচেয়ে বড় কথা—পাড়াগাঁয়ে শীতকালের সকাল-সন্ধেতে মাঠের উপর কেমন ধোঁয়া জমে থাকে দেখেছিস ? গাছগুলাের গুঁড়ি আর মাথার উপরটা খালি দেখা যায়। আর সন্ধেটা নামে ঝপ করে, আর তারপরেই ককনে ঠাণ্ডা, আর নাঃ, এ সব কতকাল দেখিনি। তােপসে, দে 

তাে একটা পােস্টকার্ড।’

 

চিঠি পৌছাতে তিন-চার দিন লেগে যেতে পারে হিসেব করেই ফেলুদা যাবার তারিখটা জানিয়েছিল কালীকিঙ্কর মজুমদারকে। আমরা সেই অনুযায়ী ৩৬৫. আপ লালগােলা প্যাসেঞ্জারে চেপে পলাশী পৌছলাম বারােই নভেম্বর রবিবার সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টায়। ট্রেনের কামরা থেকেই ধান ক্ষেতের উপর ঝপ করে সন্ধে নামা দেখছি। স্টেশনে যখন পৌছলাম তখন চারিদিকে বাতিটাতি জ্বলে গেছে, যদিও আকাশ পুরােপুরি অন্ধকার হয়নি। কালেক্টরবাবুর কাছে টিকিট দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যে গাড়িটা চোখে পড়ল সেটাই যে মজুমদার মশাইয়ের গাড়ি তাতে কোনও সন্দেহ নেই ।

 




 

এরকম গাড়ি আমি কখনও দেখিনি ; ফেলুদা বলল ছেলেবেলায় এক-আধটা দেখে থাকতে পারে, তবে নামটা শােনা এটুকু বলতে পারে । কাপড়ের হুডওয়ালা, অ্যাম্বাসাডরের চেয়ে দেড় লম্বা আমেরিকান গাড়ি, নাম হাপমােবিল। গায়ের গাঢ় লাল রং এখানে ওখানে চটে গেছে, হুডের কাপড়ে তিন জায়গায় তাপ্পি, তাও কেন জানি গাড়িটাকে দেখলে বেশ সমীহ হয়। 

এমন গাড়ির সঙ্গে উর্দিরা ড্রাইভার থাকলে মানাত ভাল ; যিনি রয়েছেন তিনি পরে আছেন সাধারণ ধুতি আর সাদা শার্ট। তিনি গাড়িতে হেলান দিয়ে সিগারেট খাচ্ছিলেন, আমাদের এগিয়ে আসতে দেখে সেটা ফেলে দিয়ে সােজা হয়ে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘মজুমদার বাড়িতে আপনারা ? 

আজ্ঞে হ্যাঁ, বলল ফেলুদা, ‘ঘুরঘুটিয়া।’ ‘আসুন । 

 

 Bengali Detective Story

ড্রাইভার দরজা খুলে দিলেন, আমরা চল্লিশ বছরের পুরনাে গাড়ির ভিতর ঢুকে সামনের দিকে পা ছড়িয়ে হেলান দিয়ে আরাম করে বসলাম। ড্রাইভার হ্যান্ডল মেরে স্টার্ট দিয়ে গাড়ি ঘুরঘুটিয়ার দিকে রওনা করিয়ে দিলেন। রাস্তা ভাল নয়, গাড়ির স্প্রিংও পুরনাে, তাই আরাম বেশিক্ষণ টিকল না। তবুও, পলাশীর বাজার ছাড়িয়ে গাড়ি গ্রামের খােলা রাস্তায় পড়তেই চোখ আর মন এক সঙ্গে জুড়িয়ে গেল।

ফেলুদা ঠিকই বলেছিল ; ধানে ভরা ক্ষেতের ওপরে গাছপালায় ঘেরা ছােট ছােট গ্রাম দেখা যাচ্ছে, আর তারই আশেপাশে জমাটবাঁধা ধোঁয়া ছড়িয়ে বিছিয়ে আছে মেঘের মতাে মাটি থেকে আট-দশ হাত উপরে। চারিদিক দেখে মনে হচ্ছিল একেই বােধ হয় বলে ছবির মতাে সুন্দর । 

এরকম একটা জায়গায় যে আবার একটা পুরনাে জমিদার বাড়ি থাকতে পারে সেটা বিশ্বাসই হচ্ছিল না ; কিন্তু মিনিট দশেক চলার পর রাস্তার দুপাশের গাছপালা দেখে বুঝতে ৪৯৬ 

পারলাম আম জাম কাঁঠাল ভরা একটা বাগানের মধ্যে দিয়ে চলেছি। তারপর রাস্তাটা ডান দিকে ঘুরে একটা পােড়াে মন্দির পেরােতেই সামনে দেখতে পেলাম নহবৎখানা সমেত একটা শেওলাধরা প্রকাণ্ড সাদা ফটক। আমাদের গাড়িটা তিনবার হর্ন দিয়ে ফটকের ভিতরে ঢুকতেই সামনে বিশাল বাড়িটা বেরিয়ে পড়ল। 

পিছনে সন্ধ্যার আকাশ থেকে লালটাল উবে গিয়ে এখন শুধু একটা গাঢ় বেগুনি ভাব রয়েছে। অন্ধকার বাড়িটা আকাশের সামনে একটা পাহাড়ের মতাে দাঁড়িয়ে আছে। বাড়িটার অবস্থা যে প্রায় যাদুঘরে রাখার মতাে সেটা কাছে গিয়েই বুঝতে পারলাম।

 




 

দেয়ালে সাঁতা ধরেছে, সবঙ্গে পলেস্তারা খসে গিয়ে ইট বেরিয়ে পড়েছে, সেই ইটের মধ্যেও আবার ফাটল ধরে তার ভিতর থেকে গাছপালা গজিয়েছেগাড়ি থেকে নেমে ফেলুদা প্রশ্ন করল, ‘এদিকে ইলেকট্রিসিটি নেই বােধহয় ? ‘আজ্ঞে না’ বলল ড্রাইভার, ‘তিন বছর থেকে শুনছি আসবে আসবে, কিন্তু এখনও পর্যন্ত আসেনি। 

আমরা যেখানে দাঁড়িয়েছি, সেখান থেকে উপর দিকে চাইলে দোতলার অনেকগুলাে ঘরের জানালা দেখা যায়; কিন্তু তার একটাতেও আলাে আছে বলে মনে হল না । ডান দিকে কিছু দূরে ঝােপঝাড়ের ফাঁক দিয়ে একটা ছােট্ট ঘর দেখা যাচ্ছে, যাতে টিমটিম করে একটা লণ্ঠন জ্বলছে। বােধহয় মালী বা দারােয়ান বা ওইরকম কেউ থাকে ঘরটাতে। মনে মনে বললাম, ফেলুদা ভাল করে খোঁজখবর নিয়ে এ কোথায় এসে হাজির হল কে জানে।

একটা লণ্ঠনের আলাে এসে পড়ল বাড়ির সদর দরজা দিয়ে বাইরের জমিতে। তারপরেই একজন বুড়াে চাকর এসে দরজার মুখটাতে দাঁড়াল। ইতিমধ্যে ড্রাইভার গাড়িটাকে নিয়ে গেছে বােধহয় গ্যারেজের দিকে। চাকরটা ভুরু কুঁচকে একবার আমাদের দিকে দেখে নিয়ে বলল, “ভিতরে আসুন। আমরা দুজনে তার পিছন পিছন বাড়ির ভিতর ঢুকলাম। 

 


Thakurmar Jhuli Golpo ( চাষা ও চাষাবউ )


Bengali Detective Story

 

লম্বায়-চওড়ায় বাড়িটা যে অনেকখানি জায়গা জুড়ে আছে সেটা বেশ বুঝতে পারছিলাম । কিন্তু আর সবই কেমন যেন ছােট ছােট। দরজাগুলাে বেঁটে বেঁটে, জানালাগুলাে কলকাতার যে কোনও সাধারণ বাড়ির জানালার অর্ধেক, ছাতটা প্রায় হাত দিয়ে ছোঁয়া যায়। ফেলুদাকে জিজ্ঞেস করতে বলল দেড়শাে-দুশাে বছর আগের বাংলা দেশের জমিদার বাড়িগুলাের বেশির ভাগই নাকি এই রকমই ছিল।

লম্বা বারান্দা পেরিয়ে ডান দিকে ঘুরে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতেই একটা আশ্চর্য নতুন জিনিস দেখলাম। ফেলুদা বলল, একে বলে চাপা-দরজা। ডাকাতদের আটকাবার জন্য এরকম দরজা তৈরি হত। এ দরজা বন্ধ করলে আর খাড়া দাঁড়িয়ে থাকে না ভাঁজ হয়ে মাথার উপরে সিলিং-এর মতাে টেরচাভাবে শুয়ে পড়ে। দরজার গায়ে যে ফুটোগুলাে দেখছিস, সেগুলাে দিয়ে বল্লম ঢুকিয়ে ডাকাতদের খুঁচিয়ে তাড়ানাে হত। 

দরজা পেরিয়ে একটা লম্বা বারান্দা, তার শেষ মাথায় কুলঙ্গিতে একটা প্রদীপ জ্বলছে। তারই পাশে একটা দরজা দিয়ে একটা ঘরে গিয়ে ঢুকলাম আমরা তিনজনে।। 

 এ ঘরটা বেশ বড়। আরও বড় মনে হত যদি এত জিনিসপত্র না থাকত। একটা প্রকাণ্ড খাট ঘরের প্রায় অর্ধেকটা দখল করে আছে। তার মাথার দিকে বাঁ পাশে একটা টেবিল, তার ‘ পাশে একটা সিন্দুক। এ ছাড়া চেয়ার রয়েছে তিনটে, একটা এমনি আলমারি, আর মেঝে থেকে ছাত অবধি বইয়ে ঠাসা বাঁ পাশে একটা টেবিল, তার পাশে একটা সিন্দুক। এ ছাড়া চেয়ার রয়েছে আর রয়েছে খাটের উপর কম্বল মুড়ি দিয়ে শােয়া একজন বৃদ্ধ ভদ্রলােক।

টেবিলের উপর রাখা একটা মােমবাতির আলাে, তাঁর মুখে পড়েছে, আর সেই আলােতে বুঝতে পারছি সাদা দাড়ি গোঁফের ফাঁক দিয়ে ভদ্রলােক আমাদের দিকে চেয়ে হাসছেন। ‘বসুন’, বললেন কালীকিঙ্কর মজুমদার। নাকি বােসাে বলব ? তুমি তাে দেখছি বয়সে আমার চেয়ে অর্ধেকেরও বেশি ছােট। তুমিই বলি, কী বলাে ? 

“নিশ্চয়ই! 

ফেলুদা আমার কথা চিঠিতেই লিখে দিয়েছিল, এখন আলাপ করিয়ে দিল । একটা জিনিস লক্ষ করলাম যে আমাদের দুজনেরই নমস্কারের উত্তরে উনি কেবল মাথা নাড়লেন। 

খাটের সামনেই দুটো পাশাপাশি চেয়ারে বসলাম আমরা দুজনে। ‘চিঠিটা পেয়ে কৌতূহল হয়েছিল নিশ্চয়ই, ভদ্রলােক হালকা হেসে জিজ্ঞেস করলেন। 

না হলে আর অ্যাদূর আসি ? ‘বেশ, বেশ।’

মজুমদার মশাই সত্যিই খুশি হয়েছেন এটা বেশ বােঝা যাচ্ছিল। না এলে আমি দুঃখ পেতাম। মনে করতাম তুমি দাম্ভিক। আর তা ছাড়া তুমিও একটা পাওনা থেকে বঞ্চিত হতে । অবিশ্যি জানি না এ সব বই তােমার আছে কি না। 

ভদ্রলােকের দৃষ্টি টেবিলের দিকে ঘুরে গেল। চারটে মােটা মােটা বই রাখা রয়েছে মােমবাতির পাশেই। ফেলুদা উঠে গিয়ে বইগুলাে নেড়েচেড়ে দেখে বলল, ‘সর্বনাশ, এ যে দেখছি সবই দুষ্প্রাপ্য বই। আর প্রত্যেকটা আমার পেশা সম্পর্কে। আপনি নিজে কি কোনওকালে ? 

 




 

না’, ভদ্রলােক হেসে বললেন, আমি নিজে কোনওদিন গােয়েন্দাগিরি করিনি । ওটা বলতে পার আমার যুবাবয়সের একটা শখ বা “হবি। আজ থেকে বাহান্ন বছর আগে আমাদের পরিবারে একটা খুন হয়। পুলিশ লাগানাে হয়। ম্যালকম বলে এক সাহেব-গােয়েন্দা খুনি ধরে দেয়। সেই ম্যালকমের সঙ্গে কথাবার্তা বলে আমার গােয়েন্দাগিরি সম্পর্কে কৌতূহল হয়। তখনই এইসব বই কিনি। সেই সঙ্গে অবিশ্যি গােয়েন্দা কাহিনী 

পড়ারও খুব শখ হয়। এমিল গ্যাবেরিওর নাম শুনেছ ? 

হ্যাঁ হ্যাঁ, উৎসাহের সঙ্গে বলে উঠল ফেলুদা, ফরাসি লেখক, প্রথম ডিটেকটিভ উপন্যাস লেখেন।’ 

হু, মাথা নেড়ে বললেন কালীকিঙ্কর মজুমদার, তার সব কটা বই আমার আছে। আর তা ছাড়া এডগার অ্যালেন পাে, কোনান ডয়েল, এ তাে আছেই। বই যা কিনেছি তার সবই চল্লিশ বছর বা তারও বেশি আগে। তার চেয়ে বেশি আধুনিক কিছু নেই আমার কাছে।

আজকাল অবিশ্যি এ লাইনের কাজ অনেক বেশি অগ্রসর হয়েছে, অনেক সব নতুন বৈজ্ঞানিক উপায় আবিষ্কার হয়েছে। তবে তােমার বিষয় যেটুকু জেনেছি, তাতে মনে হয় তুমি আরও সরলভাবে, প্রধানত মস্তিষ্কের উপর নির্ভর করে কাজ করছ। আর বেশ সাক্সেসফুলি করছ। কথাটা ঠিক বলেছি কি ? 

‘সাক্সেসের কথা জানি না, তবে পদ্ধতি সম্বন্ধে যেটা বললেন সেটা ঠিক।’ 

 




Bengali Detective Story

সেটা জেনেই আমি তােমাকে ডেকেছি।’ ভদ্রলােক একটু থামলেন। ফেলুদা নিজের জায়গায় ফিরে এসেছে। মােমবাতির স্থির শিখাটার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে কালীকিঙ্করবাবু বললেন, আমার যে শুধু সত্তরের উপর বয়স হয়েছে তা নয়, আমার শরীরও ভাল নেই। আমি চলে গেলে এ সব বইয়ের কী দশা হবে জানি না; তাই ভাবলাম অন্তত এই কটা যদি তােমার হাতে তুলে দিতে পারি তা হলে এগুলাের যত্ন হবে, কদর হবে। 

ফেলুদা অবাক হয়ে তাকের বইগুলাের দিকে দেখছিল। বলল, এ সবই কি আপনার নিজের বই ? কালীকিঙ্করবাবু বললেন, বইয়ের শখ মজুমদার বংশে একমাত্র আমারই। আর নানা বিষয়ে যে উৎসাহ ছিল আমার সেটা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ। 

‘তা তাে বটেই। আর্কিয়লজির বই রয়েছে, আর্টের বই, বাগান সম্বন্ধে বই, ইতিহাস, জীবনী, ভ্রমণ কাহিনী…এমন কী থিয়েটারের বইও তাে দেখছি। তার মধ্যে কিছু বেশ নতুন বলে মনে হচ্ছে। এখনও বই কেনেন নাকি ?  ‘তা কিনি বইকী। রাজেন বলে আমার একটি 

ম্যানেজার গােছের লােক আছে, তাকে মাসে দু-তিনবার করে কলকাতায় যেতে হয়, তখন লিস্ট করে দিই, ও কলেজ স্ট্রিট থেকে নিয়ে আসে।’ 

ফেলুদা টেবিলের উপর রাখা বইগুলাের দিকে দেখে বলল, আপনাকে যে কী বলে ধন্যবাদ দেব বুঝতে পারছি না।’ 

কালীকিঙ্করবাবু বললেন, ‘বইগুলাে নিজের হাতে করে তােমার হাতে তুলে দিতে পারলে আরও বেশি খুশি হতাম, কিন্তু আমার দুটো হাতই অকেজো হয়ে আছে। 

আমরা দুজনেই একটু অবাক হয়ে ভদ্রলােকের দিকে চাইলাম। উনি হাত দুটো কম্বলের তলায় ঢুকিয়ে রেখেছেন ঠিকই, কিন্তু সেটার যে কোনও বিশেষ কারণ আছে সেটা বুঝতে পারিনি। 

‘আরথ্রাইটিস জানাে তাে ? যাকে সােজা বাংলায় বলে গেঁটে বাত । হাতের আঙুলগু আর ব্যবহার করতে পারি না। এখন অবিশ্যি আমার ছেলে কিছুদিন হল এখানে এসে রয়েছে, নইলে আমার চাকর গােকুলই আমাকে খাইয়ে-টাইয়ে দেয়।’ 

আপনার চিঠিটা কি আপনার ছেলে লিখেছিলেন ? 

না, ওটা লিখেছিল রাজেন। বৈষয়িক ব্যাপারগুলাে ওই দেখে। ডাক্তার ডাকার দরকার হলে গাড়ি করে গিয়ে নিয়ে আসে বহরমপুর থেকে। পলাশীতে ভাল ডাক্তার নেই। 

লক্ষ করছিলাম ফেলুদার দৃষ্টি মাঝে মাঝে চলে যাচ্ছে ঘরের কোনায় রাখা সিন্দুকটার দিকেবলল, আপনার সিন্দুকটার একটু বিশেষত্ব আছে বলে মনে হচ্ছে। তালাচাবির ব্যবস্থা নেই দেখছিকম্বিনেশনে খােলে বুঝি ? কালীকিঙ্করবাবু হেসে বললেন, ঠিক ধরেছ। একটা বিশেষ সংখ্যা আছে ; সেই অনুযায়ী নবটা ঘােরালে তবে খােলে। এ সব অঞ্চলে এককালে ডাকাতদের খুব উপদ্রব ছিল, জাননা 

তাে । আমার পূর্বপুরুষই তাে ডাকাতি করে জমিদার হয়েছে। তারপর আবার আমরাই ডাকাতের হাতে লাঞ্ছনা ভােগ করেছি। তাই মনে হয়েছিল তালার বদলে কম্বিনেশন করলে হয়তাে আর একটু নিরাপদ হবে।’ 

কথাটা শেষ করে ভদ্রলােক ভুরু কুঁচকে কী যেন ভাবলেন। তারপর তাঁর চাকরের নাম ধরে একটা হাঁক দিলেন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বুড়াে গােকুল এসে হাজির হল। কালীকিঙ্করবাবু বললেন, ‘একবার খাঁচাটা আন তাে গােকুল। এঁদের দেখাব।’ 

গােকুল কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই একটা খাঁচায় একটি টিয়া নিয়ে এসে হাজির। মােমবাতির আলােয় টিয়ার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। 

কালীকিঙ্করবাবু পাখিটার দিকে চেয়ে বললেন, বলাে তাে মা,—ত্রিনয়ন, ত্রিনয়নবলাে তাে।’  কিছুক্ষণ সব চুপচাপ। তারপর আশ্চর্য পরিষ্কার গলায় পাখি বলে উঠল, ‘ত্রিনয়ন, ও 

ত্রিনয়ন

আমি তাে থ। পাখিকে এত পরিষ্কার কথা বলতে কখনও শুনিনি। কিন্তু ওখানেই শেষ 

 সঙ্গে আরও দুটো কথা জুড়ে দিল টিয়া—একটু জিরাে!  তারপর আবার পুরাে কথাটা পরিষ্কার করে বলে উঠল টিয়া—‘ত্রিনয়ন, ও ত্রিনয়ন—একটু জিরাে ।’ 




 

 

Bengali Detective Story

ফেলুদার ভুরু কুঁচকে গেছে। বলল, ‘ত্রিনয়ন কে ? 

 

কালীকিঙ্করবাবু হাে হাে করে হেসে উঠে বললেন, ‘সেটি বলব না তােমাকে। শুধু এইটুকু বলব যে যেটা বলছে সেটা হল একটা সংকেত। বারাে ঘণ্টা সময় আছে তােমার । দেখাে 

তাে তুমি সংকেতটা বার করতে পার কি না। আমার সিন্দুকের সঙ্গে সংকেতটার যােগ আছে বলে দিলাম।’ 

ফেলুদা বলল, ‘টিয়াকে ওটা শেখানাের পিছনে কোনও উদ্দেশ্য আছে কি না সেটা জানতে পারি কি ?  ‘নিশ্চয়ই পার’, বললেন কালীকিঙ্কর মজমদার। বয়সের সঙ্গে অধিকাংশ মানুষের স্মরণশক্তি কমে আসে সেটা জানাে তাে ? বছর তিনেক আগে একদিন সকালে হঠাৎ দেখি সিন্দুকের সংকেতটা মনে আসছে না। বিশ্বাস করবে ?সারাদিন চেষ্টা করেও নম্বরটা মনে। করতে পারিনি। শেষটায় মনে পড়ল মাঝরাত্তিরে ! নম্বরটা লিখে রাখিনি কোথাও, কারণ কখন যে কার কী অভিসন্ধি 

হয় সেটা তাে বলা যায় না। তাই মনে হয়েছিল ওটা মাথায় রাখাই ভাল। এক আমার ছেলে জানত, কিন্তু সে থাকে বাইরে বাইরে। তাই পরদিনই একটি টিয়া সংগ্রহ করে নম্বরটা একটা সাংকেতিক চেহারা দিয়ে পাখিটাকে পড়িয়ে দিই। এখন ও মাঝে মাঝেই সংকেতটা বলে ওঠে—অন্য পাখি যেমন বলে “রাধাকিষণ’ বা “ঠাকুর ভাত দাও”।’ 

ফেলুদা সিন্দুকটার দিকে দেখছিল। হঠাৎ ভূকুটি করে চেয়ার ছেড়ে উঠে এগিয়ে গেল সেটার দিকে। তারপর ফিরে এসে টেবিলের উপর থেকে মােমবাতিটা তুলে নিয়ে আবার গেল সিন্দুকটার দিকে। 

‘কী দেখছ ভাই ? বললেন কালীকিঙ্করবাবু। তােমার ডিটেকটিভের চোখে কিছু ধরা পড়ল নাকি ? 

ফেলুদা সিন্দুকের সামনেটা পরীক্ষা করে বলল, আপনার সিন্দুকের দরজার উপর কিঞ্চিৎ বলপ্রয়ােগ করা হয়েছে বলে মনে হয়। বােধহয় কেউ দরজাটা খুলতে চেষ্টা করেছিল । 

কালীকিঙ্করবাবু গম্ভীর হয়ে গেলেন।। ‘তুমি এ বিষয়ে নিশ্চিত ? 

ফেলুদা মােমবাতিটা আবার টেবিলের উপর রেখে বলল, ঝাড়পোঁছ করতে গিয়ে এরকম দাগ পড়বে বলে মনে হয় না । কিন্তু এ ধরনের ঘটনার কোনও সম্ভাবনা আছে কি ? সেটা আপনিই ভাল বলতে পারবেন।’ 

কালীকিঙ্করবাবু একটু ভেবে বললেন, বাড়িতে লােক বলতে তাে আমি, গােকুল, রাজেন, আমার ডাইভার মণিলাল, ঠাকর আর মালী । আমার ছেলে বিশ্বনাথ দিন পাঁচেক হল এসেছে। ও থাকে কলকাতায়। ব্যবসা করে। আমার সঙ্গে যােগাযােগ বিশেষ নেই। এবারে এসেছে—ওই যা বললাম আমার অসুখের খবর পেয়ে। গত সােমবার সকালে আমার বাগানের বেঞ্চিটায় বসে ছিলাম। ওঠার সঙ্গে সঙ্গে চোখে অন্ধকার দেখে আবার বেঞ্চিতেই পড়ে যাই।

রাজেন পলাশী থেকে বিশ্বনাথকে ফোন করে দেয় । ও পরদিনই ডাক্তার নিয়ে চলে আসে। মনে হচ্ছে একটা ছােটখাটো হার্ট অ্যাটাক হয়ে গেল। যাই  হােক—আমার এমনিতেও আর বেশিদিন নেই সেটা আমি জানি। এই শেষ ক’টা দিন কি সংশয়ের মধ্যে কাটাতে হবে ? আমার ঘরে ঢুকে ডাকাত আমার সিন্দুক ভাঙবে?’ 

ফেলুদা কালীকিঙ্করবাবুকে আশ্বাস দিল। ‘আমার সন্দেহ নির্ভুল নাও হতে পারে। হয়তাে সিন্দুকটা যখন প্রথম বসানাে হয়েছিল তখন ঘষাটা লেগেছিল। দাগগুলাে টাটকা না পুরনাে সেটা এই মােমবাতির আলােতে বােঝা যাচ্ছে না। কাল সকালে আর একবার দেখব। আপনার চাকরটি বিশ্বাসী তাে ? 

‘গােকুল আছে প্রায় ত্রিশ বছর । ‘আর রাজেনবাবু ? ‘রাজেনও পুরনাে লােক। মনে তাে হয় বিশ্বাসী। তবে ব্যাপারটা কী জান—আজ যে বিশ্বাসী, কাল যে সে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না এমন তাে কোনও গ্যারান্টি নেই।’ 

ফেলুদা মাথা নেড়ে কথাটায় সায় দিয়ে বলল, “যাই হােক, গােকুলকে বলবেন একটু দৃষ্টি রাখতে। আমার মনে হয় না চিন্তার কোনও কারণ আছে।’ 

 

 

‘যাক ! 

কালীকিঙ্করবাবুকে খানিকটা আশ্বস্ত বলে মনে হল। আমরা উঠে পড়লাম। ভদ্রলােক বললেন, ‘গােকুল তােমাদের ঘর দেখিয়ে দেবে। লেপ কম্বল তােশক বালিশ মশারি—সব কিছুরই ব্যবস্থা আছে। বিশ্বনাথ একটু বহরমপুরে গেছে—এই ফিরল বলে। ও এলে তােমরা খাওয়া-দাওয়া করে নিয়াে। কাল সকালে যাবার আগে যদি চাও তাে আমার গাড়িতে করে আশেপাশে একটু ঘুরে দেখে নিয়াে। যদিও দ্রষ্টব্য বলে খুব যে একটা কিছু আছে তা নয়।’ 

ফেলুদা টেবিলের উপর থেকে বইগুলাে নিয়ে এল। গুড নাইট করার আগে কালীকিঙ্করবাবু আর একবার হেঁয়ালির কথাটা মনে করিয়ে দিলেন। — 

‘ওটার সমাধান করতে পারলে তােমাকে আমার গ্যাবােরিওর সেটটা উপহার দেব।’ গােকুল আমাদের সঙ্গে নিয়ে দুটো বারান্দা পেরিয়ে আমাদের ঘর দেখিয়ে দিল । আগে থেকেই ঘরে একটা লণ্ঠন রাখা ছিল। সুটকেস আর হােল্ডঅলও দেখলাম ঘরের এক কোণে 

রাখা রয়েছে। কালীকিঙ্করবাবুর ঘরের চেয়ে এ ঘরটা ছােট হলেও, জিনিসপত্র কম থাকাতে হাঁটাচলার জায়গা এটাতে একটু বেশিই। ফরসা চাদর পাতা খাটের উপর বসে ফেলুদা বলল, সংকেতটা মনে পড়ছে, তােপসে ? 

এইরে ! ত্রিনয়ন নামটা মনে আছে, কিন্তু সমস্ত সংকেতটা জিজ্ঞেস করে ফেলুদা প্যাঁচে ফেলে দিয়েছে। 

‘পারলি না তাে ? ঝােলা থেকে আমার খাতাটা বার করে সংকেতটা লিখে ফেল।। গ্যাবােরিওর বইগুলাের ওপর বেজায় লােভ হচ্ছে।’ 

খাতা পেনসিল নিয়ে বসার পর ফেলুদা বলল, আর আমি গােটা গােটা অক্ষরে লিখে ফেললাম– 

‘ত্রিনয়ন, ও ত্রিনয়ন—একটু জিরাে। ‘ লিখে নিজেরই মনে হল এ আবার কীরকম সংকেত। এর তাে মাথা মুণ্ডু কিছুই বােঝা যায় না। ফেলুদা এর সমাধান করবে কী করে?  ফেলুদা এদিকে বিছানা ছেড়ে উঠে গিয়ে জানালা খুলে বাইরে দেখছে । জ্যোৎস্না রাত।

বােধহয় পূর্ণিমা। আমি ফেলুদার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। এটা বাড়ির পিছন দিক। ফেলুদা বলল, একটা পুকুর-টুকুর গােছের কিছু আছে বলে মনে হচ্ছে ডান দিকটায়।’ ঘন গাছপালার ফাঁক দিয়ে দূরে জল চিকমিক্‌ করছে সেটা আমিও দেখেছি। 

একটানা ঝিঝি ডেকে চলেছে। তার সঙ্গে এই মাত্র যােগ হল শেয়ালের ডাক। আমার মনে হল এত নির্জন জায়গায় এর আগে কখনও আসিনি। 

জানালা দিয়ে ঠাণ্ডা হাওয়া আসছিল, ফেলুদা পাল্লা দুটো বন্ধ করতেই একটা মটোরের আওয়াজ পেলাম। এটা অন্য গাড়ি, সেই বিশাল প্রাচীন আমেরিকান গাড়ি নয়। 

 




 

‘বিশ্বনাথ মজুমদার এলেন বলে মনে হচ্ছে, ফেলুদা মন্তব্য করল। তার মানে এবার খেতে ডাকবে। সত্যি বলতে কী, বেশ খিদে পেয়ে গিয়েছিল। একটায় ট্রেন ধরব বলে সকালে খেয়ে বেরিয়েছি। পথে রাণাঘাট স্টেশনে অবিশ্যি মিষ্টি আর চা খেয়ে নিয়েছিলাম। হয়তাে 

এমনিতে খিদে পেত না, কারণ ঘড়িতে বলছে সবেমাত্র আটটা বেজেছে, কিন্তু এখানে ততা আর কিছু করার নেই—এমন কী লণ্ঠনের আলােতে বইও পড়া যাবে না—তাই মনে হচ্ছিল খেয়ে-দেয়ে কম্বলের তলায় ঢুকতে পারলে মন্দ হয় না। এতক্ষণ খেয়াল করিনি, এবার দেখলাম আমাদের ঘরের দেওয়ালে একটা ছবি রয়েছে, আর ফেলা সেটার দিকে চেয়ে আছে। ফোটো নয় ; আঁকা ছবি আর বেশ বড়।

সেটা যে কালীকিঙ্করবাবুর পূর্বপুরুষের ছবি তাতে কোনও সন্দেহ নেই। খালি গায়ে বসে আছেন বাবু চেয়ারের উপর ; পাকানাে গোঁফ, কাঁধ অবধি লম্বা চুল, টানাটানা চোখ, আর বিরাট চওড়া কাঁধ।  ‘মুগুর ভাঁজা কুস্তি করা শরীর, ফিস্ ফিস্ করে বলল ফেলুদা। মনে হচ্ছে ইনিই সেই প্রথম ডাকাত জমিদার।’  বাইরে পায়ের শব্দ। আমরা দুজনেই দরজার দিকে চাইলাম। গােকুল বাইরে একটা লণ্ঠন: রেখে গিয়েছিল, তার আলােটা ঢেকে প্রথমে একটা ছায়া ঘরের মেঝেতে পড়ল, আর তারপর একটা অচেনা মানুষ চৌকাঠের বাইরে এসে দাঁড়াল। 

ইনিই কি বিশ্বনাথ মজুদার ? না, হতেই পারে না। খাটো করে পরা ধুতি, গায়ে ছাই রঙের পাঞ্জাবি, ঝুপাে গোঁফ আর চোখে পুরু চশমা। ভদ্রলােক গলা বাড়িয়ে ভুরু কুঁচকে বােধহয় আমাদের খুঁজছেন। 

‘কিছু বলবেন রাজেনবাবু ? ফেলুদা প্রশ্ন করল। ভদ্রলােক যেন এতক্ষণে আমাদের দেখতে পেলেন। এবার সর্দিব গলায় কথা এল— ‘ছােটবাবু ফিরেছেন। ভাত দিতে বলেছি ; গােকুল আপনাদের খবর দেবে। রাজেনবাবু চলে গেলেন। ‘কীসের গন্ধ বলাে তাে ? আমি জিজ্ঞেস করলাম ফেলুদাকে ।। ‘বুঝতে পারছিস না ? ন্যাফথ্যালিন। গরম পাঞ্জাবিটা সবেমাত্র বার করেছে ট্রাঙ্ক থেকে। 

রাজেনবাবুর পায়ের শব্দ মিলিয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে আবার বুঝতে পারলাম আমরা কী আশ্চর্য থমথমে পরিবেশের মধ্যে রয়েছি। এরকম জায়গায় দিনের পর দিন মানুষ থাকে কী করে ? ফেলুদা পাশে থাকলে সাহসের অভাব হবে না জানি, কিন্তু না থাকলে এই আদ্যিকালের পােড়াে জমিদার বাড়িতে পাঁচ মিনিটও থাকার সাধ্যি হত না আমার। কালীকিঙ্করবাবু আবার নিজেই বললেন 

এ বাড়িতে নাকি এককালে খুন হয়েছিল। কোন্ ঘরে 

কে জানে ! 

ফেলুদা এর মধ্যে লণ্ঠন সমেত টেবিলটাকে কাছে টেনে এনে খাটে বসে খাতা খুলে সংকেত নিয়ে ভাবা শুরু করে দিয়েছে। দু-একবার যেন ত্রিনয়ন বলে বিড়বিড় করতেও শুনলাম। আমি আর কী করি, দরজা দিয়ে বেরিয়ে বাইরের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। 

 




 

ওটা কী ? বুকটা ধড়াস করে উঠল। কী জানি একটা নড়ে উঠেছে বারান্দার 

ওদিকটায়–যেখানে লণ্ঠনের আলাে অন্ধকারে মিশে গেছে । 

দাঁত দাঁতে চেপে রইলাম অন্ধকারের দিকে। এবার বুঝলাম ওটা একটা বেড়াল। ঠিক সাধারণ সাদা বা কালাে বেড়াল নয় ; এটার গায়ে বাঘের মতাে ডােরা। বেড়ালটা কিছুক্ষণ আমার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থেকে একটা হাই তুলে উলটো দিকে ফিরে হেলতে দুলতে অন্ধকারের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল।

কে জানে। তিনি কি দোতলায় থাকেন না একতলায় ? রাজেনবাবুই বা কোথায় থাকেন ? আমাদের এমন ঘর দিয়েছে কেন যেখান থেকে কারুর কোনও সাড়া-শব্দ পাওয়া যায় না ?

Detective Story in Bengali 

 

আমি ঘরে ফিরে এলাম। ফেলুদা খাটের উপর পা তুলে দিয়ে খাতা হাতে নিয়ে, ভাবছে । আর না পেরে বললাম, এরা এত দেরি করছে কেন বলাে তাে ?

ফেলুদা ঘড়ি দেখে বলল, তা মন্দ বলিসনি। প্রায় পনেরাে মিনিট হয়ে গেল।’ বলেই আবার খাতার দিকে মন দিল।  আমি ফেলুদার পাওয়া বইগুলাে উলটে-পালটে দেখলাম। একটা বই আঙুলের ছাপ সম্বন্ধে, একটার নাম ‘ক্রিমিনলজি’, আর একটা ক্রাইম অ্যান্ড ইটস ডিটেকশন’। চার নম্বর বইটার নামের মানেই বুঝতে পারলাম না। তবে এটায় অনেক ছবি রয়েছে, তার মধ্যে পর পর দশ পাতায় শুধু বিভিন্ন

রকমের পিস্তল আর বন্দুক। ফেলুদা রিভলভারটা সঙ্গে এনেছে।

তার কিছু পরেই শুনলাম কর্কশ গলায় টিয়ার ডাক। তারপরেই আবার সব চুপচাপ। বিশ্বনাথ বাবুর ঘরটা কোথায়  প্রশ্নটা মাথায় আসতেই মনে পড়ল ফেলুদা তাে গােয়েন্দাগিরি করতে আসেনি ; আর সেকি ? টার কোনও প্রয়ােজনও নেই। কাজেই রিভলভারেরই বা দরকার হবে কেন ?

বইগুলাে সুটকেসে রেখে খাটে বসতে যাব, এমন সময় আচমকা অচেনা গলার আওয়াজ পেয়ে বুকটা আবার ধড়াস করে উঠল ।।  এবারের লােকটিকে চেনায় কোনও অসুবিধা নেই। ইনি গােকুল নন, রাজেনবাবু নন ; গাড়ির ড্রাইভার নন, আর রান্নার ঠাকুর তাে ননই। কাজেই ইনি বিশ্বনাথবাবু ছাড়া আর কেউ হতে পারেন না। 

‘আপনাকে অনেক দেরি করিয়ে দিলাম, ভদ্রলােক ফেলুদাকে নমস্কার করে বললেন । ‘আমার নাম বিশ্বনাথ মজুমদার। 

সেটা আর বলে দিতে হয় না। বাপের সঙ্গে বেশ মিল আছে চেহারায়। বিশেষ করে চোখ আর নাকে। বয়স চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ হবে, মাথার চুল এখনও সবই কাঁচা, গোঁফ-দাড়ি নেই, ঠোঁট দুটো অসম্ভব রকম পাতলা। ভদ্রলােককে আমার ভাল লাগল না।

কেন ভাল লাগল না সেটা অবিশ্যি বলা মুশকিল। একটা কারণ বােধহয় উনি আমাদের এতক্ষণ বসিয়ে রেখেছেন, আর আরেকটা কারণ—যদিও এটা ভুল হতে পারে—ভদ্রলােক আমাদের দিকে চেয়ে হাসলেও সে হাসিটা কেন জানি খাঁটি বলে মনে হল না। যেন আসলে সত্যি করে আমাদের দেখে খুশি হননি , সেটা হবেন আমরা চলে গেলে পর ।

ফেলুদা আর আমি বিশ্বনাথবাবুর সঙ্গে নীচে নেমে সােজা গিয়ে হাজির হলাম খাবার ঘরে। আমি ভেবেছিলাম মাটিতে বসে খেতে হবে—এখন দেখছি বেশ বড় একটা ডাইনিং টেবিল রয়েছে, আর তার উপরে রুপপার থালা বাটি গেলাস সাজানাে রয়েছে। 

যে-যার জায়গায় বসার পর বিশ্বনাথবাবু বললেন, “আমার আবার কি শীত কি গ্রীষ্ম দুবেলা চান করার অভ্যাস, তর হয়ে গেল।  ভদ্রলােকের গা থেকে দামি সাবানের গন্ধ পেয়েছি আগেই ; এখন মনে হচ্ছে বােধহয় সেন্টও মেখে এসেছেন। বেশ শৌখিন লোেক সন্দেহ নেই। সাদা সিল্কের শার্টের উপর গাঢ় 

সবুজ রঙের হাত কাটা কার্ডিগান, আর তার সঙ্গে ছাই 

রঙের টেরিলিনের প্যান্ট। 

বাটি চাপা ভাত ভেঙে মােচার ঘণ্ট দিয়ে খাওয়া শুরু করে দিলামথালার চারপাশে গােল করে সাজানাে বাটিতে রয়েছে আরও তিন রকমের তরকারি, সােনা মুগের ডাল, আর রুই মাছের ঝোল। 

বাবার সঙ্গে কথা হয়েছে ? জিজ্ঞেস করলেন বিশ্বনাথবাবু। হ্যাঁ, বলল ফেলুদাউনি আমাকে ভীষণ লজ্জায় ফেলে দিয়েছেন।বই উপহার দিয়ে ? হ্যাঁআজকের বাজারে ওই বই যদি পাওয়াও যেত, তা হলে দাম পড়ত কমপক্ষে পাঁচসাত শশা টাকা 

বিশ্বনাথবাবু হেসে বললেন, আপনাকে ডেকে পাঠিয়েছেন জেনে আমি বাবাকে বেশ একটু ধমকই দিয়েছিলাম। শহুরে লােকদের এই অজ পাড়াগাঁয়ে ডেকে এনে কষ্ট দেবার কোনও মানে হয় না। 

ফেলুদা কথাটার প্রতিবাদ করল । ‘কী বলছেন মিস্টার মজুমদার। আমার তাে এখানে এসে দারুণ লাভ হয়েছে। কষ্টের কোনও কথাই ওঠে না। 

 বিশ্বনাথবাবু ফেলুদার কথায় তেমন আমল না দিয়ে বললেন, “আমার তাে এই চার দিনেই প্রাণ হাঁপিয়ে উঠেছে। বাবা যে কী করে একটানা এতদিন রয়েছেন জানি না। 

বাইরে একবারেই যান না ? ‘শুধু তাই না। বেশির ভাগ সময়ই ওঁর এই অন্ধকার ঘরে খাটের উপর শুয়ে থাকেন। দিনে কেবল দুবার কিছুক্ষণের জন্য বাগানে গিয়ে বসেন। এখন অবিশ্যি শরীরের জন্য 

সেটাও বন্ধ।। 

‘আপনি আর কদিন আছেন ? ‘আমি ? আমি কালই যাব। বাবার এখন ইমিডিয়েট কোনও ডেঞ্জার নেই। আপনারা তাে বােধহয় সাড়ে আটটার ট্রেনে ফিরছেন ? 

‘আজ্ঞে হ্যাঁ। ‘তা হলে আপনারাও যাবেন, আর আমিও বেরােব । 

ফেলুদা ভাতে ডাল ঢেলে বলল, আপনার বাবার তাে নানারকম শখ দেখলাম ; আপনি নিজে কি একেবারে সেন্ট পার্সেন্ট ব্যবসাদার ? 

‘হ্যাঁ মশাই। কাজকম্ম করে আর অন্য কিছু করার প্রবৃত্তি থাকে না। বিশ্বনাথবাবুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমরা যখন ঘরে ফিরে এলাম তখন বেজেছে প্রায় সাড়ে নটা। এখানে ঘড়ির টাইমের আর কোনও 

মানে নেই আমার কাছে, কারণ সাতটা থেকেই মনে হচ্ছে মাঝরাত্তির। 

ফেলুদাকে বললাম, ‘বালিশগুলােকে উলটো দিকে করে শুলে তােমার কোনও আপত্তি আছে ? 

‘কেন বল তাে ? 

 




 

তা হলে আর চোখ খুললেই ডাকাতবাবুটিকে দেখতে হবে না। ফেলুদা হেসে বলল, ঠিক আছে। আমার কোনও আপত্তি নেই। ভদ্রলােকের চাহনিটা যে আমারও খুব ভাল লাগছিল তা বলতে পারি না।’ শশাবার আগে ফেলুদা লণ্ঠনের আলােটাকে কমিয়ে দিল, আর তার ফলে ঘরটাও যেন 

আরও ছােট হয়ে গেল । 

চোখ যখন প্রায় বুজে এসেছে, তখন হঠাৎ ফেলুদার মুখে ইংরিজি কথা শুনে অবাক হয়ে এক ধাক্কায় ঘুম ছুটে গেল। স্পষ্ট শুনলাম ফেলুদা বলল 

‘দেয়ার ওয়াজ এ ব্রাউন ক্রো।’ 

আমি কনুইয়ের ভর করে উঠে বসলাম, ব্রাউন ক্রো ? কাক আবার ব্রাউন হয় নাকি? এ সব কী আবােল-তাবােল বকুছ ফেলুদা ? 

‘গ্যাবােরিওর বইগুলাে বােধহয় পেয়ে গেলাম রে তােপসে।’ ‘সে কী ? সমাধান হয়ে গেল? 

‘খুব সহজ।…এদেশে এসে সাহেবরা যখন গােড়ার দিকে হিন্দি শিখত, তখন উচ্চারণের সুবিধের জন্য কতগুলাে কায়দা বার করেছিল। দেয়ার ওয়জ এ ব্রাউন ক্রো—এই কথাটার সঙ্গে কিন্তু বাদামি কাকের কোনও সম্পর্ক নেই।

এটা আসলে সাহেব তার বেয়ারাকে দরজা বন্ধ করতে বলছে—দরওয়াজা বন্ধ করাে। এই ত্রিনয়নের ব্যাপারটাও কতকটা সেই রকম। গােড়ায় ত্রিনয়নকে তিন ভেবে বার বার হোঁচট খাচ্ছিলাম। 

‘সে কী ? ওটা তিন নয় বুঝি ? আমিও তাে ওটা তিন ভাবছিলাম।’ ‘উহু। তিন নয়। 

ত্রিনয়নের ত্রি-টা হল তিন। আর নয়ন হল নাইন। দুইয়ে মিলে থ্রি-নাইন। “ত্রিনয়ন ও ত্রিনয়ন হল ত্রি-নাইন-ও-থ্রি-নাইন। এখানে “ও” মানে “জিরাে’ অথাৎ শূন্য। 

আমি লাফিয়ে উঠলাম। তা হলে একটু জিরাে মানে— ‘এইট-টু-জিরাে। জলের মতাে সােজা। সুতরাং পুরাে সংখ্যা হচ্ছে—থ্রি-নাইনজিরাে-থ্রি-নাইন-এইট-টু-জিরাে। কেমন, চুকল মাথায় ? এবার ঘুমাে।’ 

মনে মনে ফেলুদার বুদ্ধির তারিফ করে আবার বালিশে মাথা দিয়ে চোখ বুজতে যাব, এমন সময় আবার বারান্দায় পায়ের আওয়াজ। 

রাজেনবাবু। এত রাত্রে ভদ্রলােকের কী দরকার ? আবার ফেলুদাকে জিজ্ঞেস করতে হল, কিছু বলবেন রাজেনবাবু ? ‘ছােটবাবু জিজ্ঞেস করলেন আপনাদের আর কিছু দরকার লাগবে কি না।’ 

না না, কিছু না। সব ঠিক আছে।’ ভদ্রলােক যেভাবে এসেছিলেন সেইভাবেই আবার চলে গেলেন। 

 


Thakurmar Jhuli ছোটোদের মজার মজার ঠাকুরমার ঝুলি


 

চোখ বন্ধ করার আগে বুঝতে পারলাম জানালার খড়খড়ি দিয়ে আসা চাঁদের আলােটা হঠাৎ ফিকে হয়ে গেল আর সেই সঙ্গে শােনা গেল দূর থেকে ভেসে আসা মেঘের গর্জন। তারপর বেড়ালটা কোখেকে জানি দুবার ম্যাও ম্যাও করে উঠল। তারপর আর কিছু মনে নেই। 

সকালে উঠে দেখি ফেলুদা ঘরের জানালাগুলাে খুলছে। বলল, ‘রাত্তিরে বৃষ্টি হয়েছিল টের পাসনি ?  রাত্রে যাই হােক, এখন যে মেঘ কেটে গিয়ে ঝলমলে রােদ বেরিয়েছে সেটা খাটে শােয়া 

অবস্থাতেও বাইরের গাছের পাতা দেখে বুঝতে পারছি। 

আমরা ওঠার আধ ঘণ্টার মধ্যে চা এনে দিল বুড়াে গােকুল। দিনের আলােতে ভাল করে, ওর মুখ দেখে মনে হল গােকুল যে শুধু বুড়াে হয়েছে তা নয় ; তার মতাে এমন ভেঙে পড়া দুঃখী ভাব 

আমি খুব কম মানুষের মধ্যেই দেখেছি।  ‘কালীকিঙ্করবাবু উঠেছেন ?’ ফেলুদা জিজ্ঞেস করল।  

গােকুল কানে কম শােনে কি না জানি না ; সে প্রশ্নটা শুনে কেমন যেন ফ্যালফ্যাল মুখ করে ফেলুদার দিকে দেখল ; তারপর দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করতে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। 

সাড়ে সাতটা নাগাত আমরা কালীকিঙ্করবাবুর ঘরে গিয়ে হাজির হলাম । 

ভদ্রলােক ঠিক কালকেরই মতাে বিছানায় শুয়ে আছেন কম্বলের তলায় ! তাঁর পাশের জানালাটা দিয়ে রােদ আসে বলেই বােধহয় উনি সেটাকে বন্ধ করে রেখেছেন। ঘরটা তাই সকাল বেলাতেও বেশ অন্ধকার। যেটুকু আলাে আছে সেটা আসছে বারান্দার দরজাটা দিয়ে।

আজ প্রথম লক্ষ করলাম ঘরের দেয়ালে কালীকিঙ্করবাবুর একটা বাঁধানাে ফোটোগ্রাফ রয়েছে। ছবিটা বেশ কিছুদিন আগে তােলা, কারণ তখনও ভদ্রলােকের গোঁফ-দাড়ি পাকতে শুরু করেনি। 

ভদ্রলােক বললেন, ‘গ্যাবােরিওর বইগুলাে আগে থেকেই বার করে রেখেছি, কারণ আমি জানি তুমি সফল হবেই।  ফেলুদা বলল, ‘হয়েছি কি না সেটা আপনি বলবেন। থ্রি-নাইন-জিরাে-থ্রি-নাইন-এইট-টু-জিরাে। —ঠিক আছে ?  ‘সাবাশ গােয়েন্দা ! হেসে বলে উঠলেন কালীকিঙ্কর মজুমদার। নাও, বইগুলাে নিয়ে তােমার থলির মধ্যে পুরে ফেলাে। আর দিনের আলােতে একবার সিন্দুকের গায়ের দাগগুলাে দেখাে দেখি । আমার তাে দেখে মনে হচ্ছে না ওটা নিয়ে চিন্তা করার কোনও কারণ আছে।’ 

ফেলুদা বলল, ঠিক আছে। আপনি নিশ্চিন্ত থাকলেই হল। 

ফেলুদা আরেকবার ধন্যবাদ দিয়ে প্রথম ডিটেকটিভ ঔপন্যাসিকের লেখা বই চারখানা তার ঝােলার মধ্যে পুরে নিল। 

‘তােমরা চা খেয়েছ তাে ? কালীকিঙ্করবাবু জিজ্ঞেস করলেন। ‘আজ্ঞে হ্যাঁ । ‘ড্রাইভারকে বলা আছে। গাড়ি বার করেই রেখেছে। তােমাদের স্টেশনে পৌঁছে দেবে। বিশ্বনাথ খুব ভােরে বেরিয়ে গেছে। বলল ওর দশটার মধ্যে কলকাতায়

পৌঁছতে পারলে সুবিধে হয়। রাজেন গেছে বাজারে। গােকুল তােমাদের জিনিসপত্র গাড়িতে তুলে দেবে। …তােমরা কি স্টেশনে যাবার আগে একটু আশেপাশে ঘুরে দেখতে চাও ? 

ফেলুদা বলল, আমি ভাবছিলাম সাড়ে দশটার ট্রেনটার জন্য অপেক্ষা না করে এখনই বেরিয়ে পড়লে হয়তাে ৩৭২ ডাউনটা ধরতে পারব।’ 

‘তা বেশ তাে, তােমাদের মতাে শহুরে লােকেদের পল্লী গ্রামে বন্দি করে রাখতে চাই না আমি । তবে তুমি আসাতে আমি যে খুবই খুশি হয়েছি—সেটা আমার একেবারে অন্তরের কথা।’ 

কাল রাত্তিরের বৃষ্টিতে ভেজা রাস্তা দিয়ে গাড়িতে করে পলাশী স্টেশনের দিকে যেতে আমি সকাল বেলার রােদে ভেজা ধান ক্ষেতের দৃশ্য দেখছি, এমন সময় শুনলাম ফেলুদা ড্রাইভারকে একটা প্রশ্ন করল। 

‘স্টেশনে যাবার কি এ ছাড়া আর অন্য কোনও রাস্তা আছে ? 

‘আজ্ঞে না বাবু’, বলল মণিলাল ড্রাইভার।  ফেলুদার মুখ গম্ভীর। একবার ভাবলাম জিজ্ঞেস করি ও কী ভাবছে, কোনও সন্দেহের 

কারণ ঘটেছে কি না ; কিন্তু সাহস হল না। 

 




Bengali Detective Story

রাস্তায় কাদা ছিল বলে দশ মিনিটের জায়গায় পনেরাে মিনিট লাগল স্টেশনে পৌঁছতে । মাল নামিয়ে গাড়ি ছেড়ে দিলাম। ফেলুদা কিন্তু টিকিট ঘরের দিকে গেল না। মালগুলাে স্টেশনমাস্টারের জিম্মায় রেখে আবার বাইরের রাস্তায় বেরিয়ে এল। 

রাস্তায় সাইকেল রিকশার লাইন। সবচেয়ে সামনের রিকশার মালিকের কাছে গিয়ে ফেলুদা জিজ্ঞেস করল, এখানকার থানাটা কোথায় জানেন ? 

‘জানি, বাবু। ‘চলুন তাে। তাড়া আছে।’ 

প্রচণ্ডভাবে প্যাঁক প্যাঁক করে হর্ন দিতে দিতে ভিড় কাটিয়ে কলিশন বাঁচিয়ে আমরা পাঁচ মিনিটের মধ্যে থানায় পৌঁছে গেলাম। ফেলুদার খ্যাতি যে এখন পর্যন্ত পৌঁছে গেছে সেটা বুঝলাম যখন সাব-ইন্সপেক্টর মিস্টার সরকার ওর পরিচয় দিতে চিনে ফেললেন। ফেলুদা বলল, ‘ঘুরঘুটিয়ার কালীকিঙ্কর মজুমদার সম্বন্ধে কী জানেন বলন তাে।’ 

‘কালীকিঙ্কর মজুমদার ? সরকার ভুরু কুঁচকোলেন। তিনি তত ভাল লােক বলেই জানি মশাই। সাতেও নেই পাঁচেও নেই। তাঁর সম্বন্ধে তাে কোনওদিন কোনও বদনাম শুনিনি। 

“আর তাঁর ছেলে বিশ্বনাথ ? তিনি কি এখানেই থাকেন ? ‘সম্ভবত কলকাতায়। কেন, কী ব্যাপার, মিস্টার মিত্তির ? ‘আপনার জিপটা নিয়ে একবার আমার সঙ্গে আসতে পারবেন ? ঘােরতর গােলমাল বলে মনে হচ্ছে।’ 

কাদা রাস্তা দিয়ে লাফাতে লাফাতে জিপ ছুটে চলল ঘুরঘুটিয়ার দিকে। ফেলুদা প্রচণ্ড চাপা উত্তেজনার মধ্যে শুধু একটিবার মুখ খুলল, যদিও তার কথা আমি ছাড়া কেউ শুনতে 

পেল না।  ‘আরথ্রাইটিস, সিন্দুকে দাগ, ডিনারে বিলম্ব, রাজেনবাবুর গলা ধরা, ন্যাফথ্যালিনসব ছকে পড়ে গেছে রে তােপসে। ফেলু মিত্তির ছাড়াও যে অনেক লােকে অনেক বুদ্ধি রাখে। সেটা সব সময় খেয়াল থাকে না।’ 

মজুমদার বাড়ি পৌঁছে প্রথম যে জিনিসটা দেখে অবাক লাগল সেটা হল একটা কালাে রঙের অ্যাম্বাসাডর গাড়ি। ফটকের বাইরে গাড়িটা দাঁড়িয়ে রয়েছে এটাই নিঃসন্দেহে বিশ্বনাথবাবুর গাড়ি। জিপ থেকে নামতে নামতে ফেলুদা বলল, ‘লক্ষ কর গাড়িটাতে কাদাই 

লাগেনি। এ গাড়ি সবেমাত্র রাস্তায় বেরােল। 

বিশ্বনাথবাবুর ড্রাইভারই বােধহয় কারণ এ লােকটাকে আগে দেখিনি—আমাদের দেখে রীতিমতাে ঘাবড়ে গিয়ে মুখ ফ্যাকাসে করে গেটের ধারে পাথরের মতাে দাঁড়িয়ে রইল । 

‘তুমি এ গাড়ির ড্রাইভার ? ফেলুদা প্রশ্ন করল। ‘আ-আজ্ঞে হ্যাঁ ‘বিশ্বনাথবাবু  আছেন ? 

লােকটা ইতস্তত করছে দেখে ফেলুদা আর অপেক্ষা না করে সােজা গিয়ে ঢুকল বাড়ির ভিতর—তার পিছনে দারােগা, আমি আর একজন কনস্টেবল।। 

আবার সেই প্যাসেজ দিয়ে গিয়ে সেই সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে উপরে উঠে ফেলুদা এবং আমরা তিনজন সােজা ঢুকলাম কালীকিঙ্করবাবুর ঘরে। ঘর খালি। বিছানায় কম্বলটা পড়ে আছে। আর যা ছিল সব ঠিক তেমনিই আছে, কিন্তু মালিক নেই। 

‘সর্বনাশ !’ বলে উঠল ফেলুদা। 

সে সিন্দুকটার দিকে চেয়ে আছে। সেটা হাঁ করে খােলা। বেশ বােঝা যাচ্ছে তার থেকে 

অনেক কিছু বার করে নেওয়া হয়েছে। 

দরজার বাইরে গােকুল এসে দাঁড়িয়েছে। সে থরথর করে কাঁপছে । তার চোখে জল । দেখে মনে হয় যেন তার শেষ অবস্থা। 

তার উপর হুমড়ি দিয়ে পড়ে ফেলুদা বলল, ‘বিশ্বনাথবাবু কোথায় ? ‘তিনি পিছনের দরজা দিয়ে পালিয়েছেন।’ ‘দেখুন তাে মিস্টার সরকার। দারােগা আর কনস্টেবল অনুসন্ধান করতে বেরিয়ে গেল। 

শােনাে গােকুল’—ফেলুদা দুহাত দিয়ে গােকুলের কাঁধ দুটোকে শক্ত করে ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে বলল—একটিও মিথ্যে কথা বললে তােমায় হাজতে যেতে হবে। কালীকিঙ্করবাবু 

কোথায় ? 

গােকুলের চোখ যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। ‘আজ্ঞে—আজ্ঞেতাঁকে খুন করেছেন।’ 

কে ? ‘ছােটবাবু। ‘কবে ? ‘যেদিন ছােটবাবু এলেন সেদিনই। রাত্তির বেলা। বাপ-বেটায় কথা কাটাকাটি হল । ছােটবাবু সিন্দুকের নম্বর চাইলেন, কতাবাবু বললেন—আমার টিয়া জানে, তার কাছ থেকে জেনে নিয়াে, আমি বলব না। তারপরে–তারপরে–তার কিছুক্ষণ পরে–ছােটবাবু আর তেনার গাড়ির ডেরাইভারবাবু, দুজনে মিলে  —  গােকুলের গলা ধরে এল। বাকিটা তাকে খুব কষ্ট করে বলতে হল— 

‘দুজনে মিলে কাবাবুর লাশ নিয়ে গিয়ে ফেলল ওই পিছনের দিঘির জলে—গলায় পাথর বেঁধে । আমার মুখ বন্ধ করেছেন ছােটবাবু প্রাণের ভয় দেখিয়ে ! 

‘বুঝেছি। —আর রাজেনবাবু বলে তাে কোনও লােকই নেই, তাই না ? ‘ছিলেন, তবে তিনি মারা গেছেন আজ দুবছর হয়ে গেল।’ 

আমি আর ফেলুদা এবার ছুটলাম নীচে। সিঁড়ি দিয়ে নেমে বাঁয়ে ঘুরলেই পিছনের বাগানে যাবার দরজা। বাইরে বেরােনাে মাত্র মিস্টার সরকারের চিৎকার শুনলাম— 

‘পালাবার চেষ্টা করবেন না মিস্টার মজুমদার—আমার হাতে অস্ত্র রয়েছে। 

ঠিক সেই মুহূর্তেই শােনা গেল একটা জলে ঝাঁপিয়ে পড়ার শব্দ আর একটা পিস্তলের আওয়াজ ।।  আমরা দুজনে দৌড়ে গাছ-গাছড়া ঝােপঝাড় ভেঙে এগিয়ে গিয়ে দেখলাম একটা প্রকাণ্ড তেতুল গাছের নীচে মি. সরকার হাতে, রিভলভার নিয়ে আমাদের দিকে পিছন করে দাঁড়িয়ে আছেন। তেঁতুল গাছের পরেই কালকের দেখা পুকুরটা—তার জলের বেশির ভাগই সবুজ পানায় ঢাকা। 

‘লােকটা আগেই লাফ দিয়েছে।’ বললেন মি. সরকার। সাঁতার জানে না। —গিরিশ, দেখাে তাে দেখি টেনে তুলতে পার কি না।’ কনস্টেবল বিশ্বনাথবাবুকে শেষ পর্যন্ত টেনে তুলেছিল। এখন 

ছােটবাবুর দশা ওই টিয়াপাখির মতাে ; খাঁচায় বন্দি। সিন্দুক থেকে টাকাকড়ি গয়নাগাটি যা নিয়েছিলেন সবই উদ্ধার পেয়েছে। লােকটা ব্যবসা করত ঠিকই, কিন্তু তার সঙ্গে জুয়া ইত্যাদি অনেক বদ-অভ্যাস ছিল, যার ফলে ইদানীং ধার-দেনায় তার অবস্থা শােচনীয় হয়ে উঠেছিল। 

 




ফেলুদা বলল, ‘কালীকিঙ্করবাবুর সঙ্গে দেখা করার প্রায় কুড়ি মিনিট পর রাজেনবাবু হাজির 

হন, আর রাজেনবাবু চলে যাবার প্রায় আধ ঘণ্টা পর বিশ্বনাথবাবুর সাক্ষাৎ পাই। তিনজনকে একসঙ্গে একবারও দেখা যায়নি। এটা ভাবতে ভাবতেই প্রথমে সন্দেহটা জাগে—তিনটে লােকই আছে তাে ? নাকি একজনেই পালা করে তিনজনের ভূমিকা পালন করছে ? তখন অ্যাকটিং-এর বইগুলাের কথা মনে হল। তা হলে কি বিশ্বনাথবাবুর এককালে শখ ছিল থিয়েটারের ?

তিনি যদি ছদ্মবেশে ওস্তাদ হয়ে থাকেন, অভিনয় জেনে থাকেন তা হলে এইভাবে এই অন্ধকার বাড়িতে আমাদের বােকা বানানাে তাঁর পক্ষে কঠিন নয়। হাতটা তাঁকে কম্বলের নীচে লুকিয়ে রাখতে হয়েছিল কারণ নিজের হাতকে মেক-আপ করে কী করে তিয়াত্তর বছরের বুড়াের হাত করতে হয় সে বিদ্যে তাঁর জানা ছিল না। সন্দেহ একেবারে পাকা হল যখন সকালে দেখলাম কাদার উপরে বিশ্বনাথবাবুর গাড়ির টায়ারের ছাপ পড়েনি। 

আমি কথার ফাঁকে প্রশ্ন করলাম, তােমাকে এখানে আসতে লিখেছিল কে ? ফেলুদা বলল, “সেটা কালীকিঙ্করবাবুই লিখেছিলেন তাতে কোনও সন্দেহ নেই। বিশ্বনাথবাবু সেটা জেনেছিলেন। তিনি আসতে বাধা দেননি কারণ আমার বুদ্ধির সাহায্যে 

তাঁর সংকেতটি জানার প্রয়ােজন হয়েছিল । 

শেষ পর্যন্ত আমাদের দশটার ট্রেনই ধরতে হল। রওনা হবার আগে ফেলুদা তার সুটকেস আর ঝােলা থেকে আটখানা বই বার করে আমার হাতে দিয়ে বলল, ‘খুনির হাত থেকে উপহার নেবার বাসনা নেই আমার। তােপসে, বুকশেলফের ফাঁকগুলাে ভরিয়ে দিয়ে আয় তাে।’  আমি যখন বই রেখে কালীকিঙ্করবাবুর ঘর থেকে 

বেরােচ্ছি, তখনও টিয়া বলছে, ‘ত্রিনয়ন, ও ত্রিনয়ন—একটু জিরাে।’ 

বােম্বাইয়ের বােম্বেটে 

লালমােহন গাঙ্গুলী ওরফে জটায়ুর হাতে মিষ্টির বাক্স দেখে বেশ অবাক হলাম। সাধারণত ভদ্রলােক যখন আমাদের বাড়িতে আসেন তখন হাতে ছাতা ছাড়া আর কিছু থাকে না। নতুন বই বেরােলে বইয়ের একটা প্যাকেট থাকে অবিশ্যি, কিন্তু সে তাে বছরে দু বার । আজ একেবারে মির্জাপুর স্ট্রিটের হালের দোকান কল্লোল মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের পঁচিশ টাকা দামের সাদা কার্ড বাের্ডের বাক্স, সেটা আবার সােনালি ফিতে দিয়ে বাঁধা।

বাক্সের দু পাশে নীল অক্ষরে লেখা কল্লোলস্ ফাইভ মিক্স সুইটমিটস’—মানে পাঁচ-মেশালি মিষ্টি। বাক্স খুললে দেখা যাবে পাঁচটা খােপ করা আছে, তার একেকটাতে একেক রকমের মিষ্টি। মাঝেরটায় থাকতেই হবে কল্লোলের আবিষ্কার ‘ডায়মন্ডা-হিরের মতাে পলকাটা রুপাের তবক দেওয়া রস-ভরা কড়া পাকের সন্দেশ। 

এমন বাক্স লালমােহনবাবুর হাতে কেন ? আর ওঁর মুখে এমন কেল্লাফতে হাসি হাসি ভাবই বা কেন ? 

ভদ্রলােক ঘরে ঢুকে বাক্স টেবিলে রেখে চেয়ারে বসতেই ফেলুদা বলল, ‘বােম্বাইয়ের সুখবরটা বুঝি আজই পেলেন ? 

লালমােহনবাবু প্রশ্নটা শুনে অবাক হলেও তাঁর মুখ থেকে হাসিটা গেল না, কেবল ভুরু 

 




 

 

সমাপ্ত

গল্পটি আপনার কেমন লাগলো রেটিং দিয়ে জানাবেন
[Total: 0   Average: 0/5]
বন্ধুদের সঙ্গে "Share" করুন।
Open chat
1
যোগাযোগ করুন
আপনার গল্পটি প্রকাশ করার জন্য যোগাযোগ এখনে।