Home Thakurmar Jhuli Thakurmar jhuli -Thakurmar jhuli golpo -Thakurmar jhuli bengali - শীত বসন্ত

Thakurmar jhuli -Thakurmar jhuli golpo -Thakurmar jhuli bengali – শীত বসন্ত

Thakurmar jhuli -Thakurmar jhuli golpo -Thakurmar jhuli bengali

 

     শীত বসন্ত   

                             

এক রাজার দুই রাণী, সুয়ােরাণী আর দুয়ােরাণী। সুয়ােরাণী যে, নুনটুকুউন হইতেই নখের আগায় আঁচড় কাটিয়া, ঘরকন্নায় ভাগ বটিয়া সতান।একপাশ করিয়া দেয়। দুঃখে দুয়ােরাণীর দিন কাটে।

সুয়ােরাণীর ছেলে-পিলে হয় না। দুয়ােরাণীর দুই ছেলে, শীত আর। বসন্ত আহা, ছেলে নিয়া দুয়ােরাণীর যে যন্ত্রণা! রাজার রাজপুত্র, সৎ-মায়ের গঞ্জনা খাইতে-খাইতে দিন যায়।

একদিন নদীর ঘাটে স্নান করিতে গিয়া সয়ােরাণী দুয়ােরাণীকে ডাকিয়া বলিল -“আয় তাে, তাের মাথায় ক্ষার খৈল দিয়া দি।” ক্ষার খৈল দিতে-দিতে সুয়ােরাণী চুপ করিয়া দুয়ােরাণীর মাথায় এক ওষুধের বড়ি টিপিয়া দিল।

দুঃখিনী দুয়ােরাণী টিয়া হইয়া “টি, টি” করিতে করিতেউড়িয়া গেল। বাড়ি আসিয়া সুয়ােরাণী বলিল,-“দুয়ােরাণী তাে জলে ডুবিয়া

মরিয়াছে!”

রাজা তাহাই বিশ্বাস করিলেন।

রাজপুরীর লক্ষ্মী গেল, রাজপুরী আঁধার হইল; মা-হারা শীত-বসন্তের দুঃখের আর সীমা পরিসীমা রহিল না।

টিয়া হইয়া দুঃখিনী দুয়ােরাণী উড়িতে উড়িতে আর এক রাজার রাজ্যে গিয়া পড়িলেন। রাজা দেখেন, সােনার টিয়া। রাজার এক টুকটুকে মেয়ে, সেই মেয়ে বলিল, “বাবা, আমি সােনার টিয়া নিব।” টিয়া-দুয়ােরাণী রাজকন্যার কাছে সােনার পিঞ্জরে রহিলেন।

Thakurmar jhuli -Thakurmar jhuli golpo -Thakurmar jhuli bengali 

দিন যায়, বছর যায়, সুয়ােরাণীর তিন ছেলে হইল। ও মা! এক-এক ছেলে যে, বাঁশের পাতা-পাটকাঠি, ফু দিলে উড়ে, ছইতে গেলে মরে। সুয়ােরাণী। কাদিয়ে কাটিয়া রাজ্য ভাসাইল।

পাট কাটি তিন ছেলে নিয়া সুয়ােরাণী গুমরে গুমরে আগুনে পুড়িয়া ঘর করে। মন-ভরা জ্বালা, পেট ভরা হিংসা,আপনার ছেলেদের থালে পাঁচ পরমান্ন অষ্টরন্ধন, ঘিয়ে চপ চপ পঞ্চ ব্যাঞ্জন সাজাইয়া দেন ; শীত বসন্তের পাতে আলুন আতেল কড়কড়া ভাত সড়সড়া চাল শাকের উপর ছাইয়ের তাল ফেলিয়া দিয়া চলিয়া যান।
সতীন তত ‘উরী পুরী দক্ষিণ-দুরী’,—সতীনের ছেলে দুইটা যে, নাদু-নুদুস- আর তাহার তিন ছেলে পাট কাটি! হিংসায় রাণীর মুখে অন্ন রুচে না, নিশিতে নিদ্রা হয় না।

রাণী তাে পথের ধুলা এলাইয়া, তিন কোণের কুটা জ্বালাইয়া, বাসি উনুনের ছাই দিয়া, ভাঙ্গা-কুলায় করিয়া সতীনের ছেলের নামে ভাসাইয়া দিল।

কিছুতেই কিছু হইল না। শেষে, একদিন শীত বসন্ত পাঠশালায় গিয়াছে; কিছুই জানে না, শেষে বাড়ীতে আসিতেই রণমূর্তি সৎ-মা তাহাদিগে গালিমন্দ দিয়া খেদাইয়া তাহার পর রাণী, বাঁশ-পাতা ছেলে তিনটাকে আছাড় মারিয়া থুইয়া, উথাল পাতাল করিয়া এ জিনিস ভাঙ্গে ও জিনিসচুরে;আপন মাথার চুল ছিড়ে, গায়ের আভরণ। ছুঁডিয়া মারে।

দাসী, বাঁদী, গিয়া রাজাকে খবর দিল!

‘সুয়ােরাণীর ডরে।

থর থর করে –

রাজা আসিয়া বলিলেন, “এ কি!”

রাণী বলিল, “কি! সতীনের ছেলে, সেই আমাকে গালমন্দ দিল।

শীত বসন্তের রক্ত নহিলে আমি নাইব না!”

অমনি রাজা জল্লাদকে ডাকিয়া আজ্ঞা দিলেন, “শীত-বসন্তকে কাটিয়া রাণীকে রক্ত আনিয়া দাও।”

শীত-বসন্তের চোখের জল কে দেখে! জল্লাদ শীত-বসন্তকে বাধিয়া। নিয়া গেল।

Thakurmar jhuli -Thakurmar jhuli golpo -Thakurmar jhuli bengali

 

এক বনের মধ্যে আনিয়া, জল্লাদ, শীত-বসন্তের রাজ-পােষাক খুলিয়া। বাকল পরাইয়া দিল।

শীত বলিলেন – “ভাই, কপালে এই ছিল!”

বসন্ত বলিলেন – “দাদা, আমরা কোথায় যাব?”

কঁদিতে কঁদিতে শীত বলিলেন, “ভাই, চল, এতদিন পরে আমার মা’র কাছে যাব।”

খড়গ নামাইয়া রাখিয়া দুই রাজপুত্রের বাঁধন খুলিয়া দিয়া, ছলছল চোখে জল্লাদ বলিল, – “রাজপুত্র ! রাজার আজ্ঞা, কি করিব –কোলে-কাখে করিয়া মানুষ করিয়াছি, সেই সােনার অঙ্গে আজ কি না খড়গ ছোঁয়াইতে হইবে!—আমি তা’ পারিব না রাজপুত্র।—আমার কপালে যা

থাকে থাকুক, এই বাকল চাদর পরিয়া বনের পথে চলিয়া যাও, কেহ আর রাজপুত্র বলিয়া চিনিতে পারিবে না।”

বলিয়া, শীত বসন্তকে পথ দেখাইয়া দিয়া, দুইটা শিয়াল কুকুর কাটিয়া, জল্লাদ, রক্ত নিয়া রাণীকে দিল।

রাণী সেই রক্ত দিয়া স্নান করিলেন;খি খিল্ করিয়া হাসিয়া আপনার। তিন ছেলে কোলে, পাঁচ পাত সাজাইয়া, খাইতে বসিলেন।

Thakurmar jhuli -Thakurmar jhuli golpo -Thakurmar jhuli bengali 

শীত বসন্ত দুই ভাই চলেন, চলেন, বন আর ফুরায় না। শেষে, দুই।ভাইয়ে এক গাছের তলায় বসিলেন।

বসন্ত বলিলেন, –“দাদা, বড় তৃষ্ণা পাইয়াছে, জল কোথায় পাই?”

শীত বলিলেন,– “ভাই, এত পথ আসিলাম। জল তাে কোথাও দেখি

না! আচ্ছা, তুমি বস, আমি জল দেখিয়া আসি।”

বসন্ত বসিয়া রহিল, শীত জল আনিতে গেলেন।

যাইতে, যাইতেঅনেক দূরে গিয়া,শীত বনের মধ্যে এক সরােবর দেখিতে পাইলেন। জলের তৃষ্ণায় বসন্ত না-জানি কেমন করিতেছে, কিন্তু কিসে করিয়া জল নিবেন? তখন, গায়ের যে চাদর, সেই চাদর খুলিয়া, শীত সরােবরে নামিলেন।

সেই দেশের যে রাজা, মারা গিয়াছেন। রাজার ছেলে নাই, পুত্র নাই, রাজসিংহাসন খালি পড়িয়া আছে। রাজ্যের লােকজনে শ্বেত রাজহাতীর পিঠে পাটসিংহাসন উঠাইয়া দিয়া হাতী ছাড়িয়া দিল। হাতী যাহার কপালে রাজটিকা

দেখিবে, তাহাকেই রাজসিংহাসনে উঠাইয়া নিয়া আসিবে, সে-ই রাজ্যের রাজা হইবে।

রাজসিংহাসন পিঠে শ্বেত রাজহাতী, পৃথিবী ঘুরিয়া কাহারও কপালে রাজটিকা দেখিল না। শেষে ছুটিতে ছুটিতে, যে বনে শীত বসন্ত, সেই বনে,আসিয়া দেখে, এক রাজপুত্র গায়ের চাদর ভিজাইয়া সরােবরে জল নিতেছে।

—রাজপুত্রের কপালে রাজটিকা। দেখিয়া, শ্বেত রাজহাতী অমনি শুড় বাড়াইয়া শীতকে ধরিয়া সিংহাসনে তুলিয়া নিল।

“ভাই বসন্ত, ভাই বসন্ত” করিয়া শীত কত কাদিলেন। হাতী কি তাহা মানে? বন-জঙ্গল ভাঙ্গিয়া, পাট হাতী শীতকে পিঠে করিয়া ছুটিয়া গেল।

Thakurmar jhuli -Thakurmar jhuli golpo -Thakurmar jhuli bengali 

 

জল আনিতে গেল, দাদা আর ফিরে না। বসন্ত উঠিয়া সকল বন খুঁজিয়া,“দাদা দাদা” বলিয়া ডাকিয়া খুন হইল। দাদাকে যে হাতীতে নিয়াছে, বসন্ত তাে তাহা জানে না; বসন্ত কাঁদিয়া কাঁদিয়া সারা হইল। শেষে, দিন গেল, বিকাল

গেল, রাত্রি হইল;তৃষ্ণায় ক্ষুধায় অস্থির হইয়া, দাদাকে হারাইয়া কঁদিয়া কাদিয়া।বসন্ত এক গাছের তলায় ধূলা-মাটিতে শুইয়া ঘুমাইয়া পড়িল।

দুঃখিনী মায়ের বুকের মাণিক ছাই-পাঁশে গড়াগড়ি গেল!

খুব ভােরে, এক মুনি, জপ-তপকরিবেন, জল আনিতে সরােবরে যাইতে, দেখেন, কোন্ এক পরম সুন্দর রাজপুত্র গাছের তলায় ধূলা-মাটিতে পড়িয়া।আছে। দেখিয়া, মুনি বসন্তকে বুকে করিয়া তুলিয়া নিয়া গেলেন।

শ্বেত রাজহাতীর পিঠে শীত তাে সেই নাই-রাজার রাজ্যে গেলেন! যাইতেই, রাজ্যের যত লােক আসিয়া মাটিতে মাথা ছোঁয়াইল, মন্ত্রী, অমাত্য,সিপাই সান্ত্রীরা সকলে আসিয়া মাথা নােয়াইল, নােয়াইয়া সকলে রাজসিংহাসনে তুলিয়া নিয়া শীতকে রাজা করিল।

প্রাণের ভাই বসন্ত, সেই বা কোথায়, শীত বা কোথায়! দুঃখিনী মায়ের দুই মাণিক বোঁটা ছিড়িয়া দুই খানে পড়িল।

 রাজা হইয়া শীত, ধন-রত্ন, মণি-মাণিক্য, হাতী-ঘােড়া, সিপাই-লস্কর লইয়া রাজত্ব করিতে লাগিলেন। আজ এ রাজাকে হারাইয়া দিয়া তাহার রাজ্য নেন, কাল ও-রাজাকে হারাইয়া দিয়া তাহার রাজ্য আনেন, আজ মৃগয়া করেন,

কাল দিগ্বিজয়ে যান, এই রকমে দিন যায়!

মুনির কাছে আসিয়া বসন্ত, গাছের ফল খায়, সরােবরের জলে নায়,। দায়, থাকে। মুনি চারিপাশে আগুন করিয়া বসিয়া থাকেন, কতদিন কাঠ-কুটো ফুরাইয়া যায়, বসন্তের পরনে বাকল, হাতে নড়ি, বনে বনে ঘুরিয়া কাঠকুটা

কুড়াইয়া, মুনির জন্য বহিয়া আনে।

তাহার পর বসন্ত বনের ফুল তুলিয়া মুনির কুটীর সাজায় আর সারাদিন ভরিয়া ফুলের মধু খায়।

তাহার পর, সন্ধ্যা হইতে-না-হইতে, বনের পাখী সব একখানে হয়, আপন-আপন বাসায় যায়, বসন্ত মুনির পাশে বসিয়া কত শাস্ত্রের কথা, কত। মন্ত্রের কথা এইসব শােনে। এইভাবে দিন যায়।

 রাজসিংহাসনে শীত আপন রাজ্য লইয়া, বনের বসন্ত আপন বন লইয়া; – দিনে দিনে পলে পলে কাহারও কথা কাহারও মনে থাকিল না।

তিন রাত যাইতে না যাইতে সুয়ােরাণীর পাপে রাজার সিংহাসন কঁপিয়া উঠিল, —দিন যাইতে-না-যাইতে রাজার রাজ্য গেল, রাজপাট গেল। সকল হারাইয়া, খােয়াইয়া, রাজা আর সুয়ােরাণীর মুখ দেখিলেন না; রাজা বনবাসে গেলেন।

সুয়ােরাণীর যে, সাজা! ছেলে তিনটা সঙ্গে, এক নেকড়া পরনে এক নেকড়া গায়ে, এ দুয়ারে যায়, – “দূর, দূর!” ও দুয়ারে যায় – “ছেই, ছেই!!” তিন ছেলে নিয়া সুয়ােরাণী চক্ষের জলে ভাসিয়া পথে পথে ঘুরিতে লাগিলেন।

ঘুরিতে ঘুরিতে সুয়ােরাণী সমুদ্রের কিনারে গেলেন। – আর সাত সমুদ্রের ঢেউ আসিয়া চক্ষের পলকে সুয়ােরাণীর তিন ছেলেকে ভাসাইয়া নিয়া গেল। সুয়ােরাণী কাঁদিয়া আকাশ ফাটাইল; বুকে চাপড়, কপালে চাপড় দিয়া, শােকে দুঃখে পাগল পাষাণ মরিয়া, সুয়ােরাণী সকল জ্বালা এড়াইল।

সুয়ােরাণীর জন্য পিপড়াটিও কাদিল না, কুটাটুকুও নড়িল না;—সাত সমুদ্রের জল সাত দিনের পথে সরিয়া গেল। কোথায় বা সুয়ােরাণী, কোথায় বা তিন ছেলে— কোথাও কিছু রহিল না।

Thakurmar jhuli -Thakurmar jhuli golpo -Thakurmar jhuli bengali  

সেই যে সােনার টিয়া – সেই যে রাজার মেয়ে! সেই রাজকন্যার যে স্বয়ম্বর। কত ধন, কত দৌলত, কত কি লইয়া কত দেশের কত রাজপুত্র আসিয়াছেন। সভা করিয়া সকলে বসিয়া আছেন, এখনাে রাজকন্যার বা’র নাই।

রূপবতী রাজকন্যা আপন ঘরে সিঁথিপাটি কাটিয়া, আলতা কাজল পরিয়া,সােনার টিয়াকেডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, –

“ সােনার টিয়া, ব তাে আমার আর কি চাই?”

টিয়া, বলিল,-

“সাজতে ভাল কন্যা, যদি সােনার নূপুর পাই!”

রাজকন্যা কৌটা খুলিয়া সােনার নুপুর বাহির করিয়া পায়ে দিলেন।

সােনার নূপুর রাজকন্যার পায়ে রুণু ঝুণ করিয়া বাজিয়া উঠিল! রাজকন্যা। বলিলেন,-

“সােনার টিয়া, ব তাে আমার আর কি চাই?”

টিয়া, বলিল,-

“সাজতাে ভাল কন্যা, যদি ময়ূর পেখম পাই!”

রাজকন্যা পেটরা আনিয়া ময়ুরপেখম শাড়ী খুলিয়া পরিলেন। শাড়ীর রঙে ঘর উজ্জ্বল, শাড়ীর শােভায় রাজকন্যার মন উতল। মুখখানা ভার করিয়া টিয়া বলিল,-

“রাজকন্যা, রাজকন্যা, কিসের গরব কর;–

শতেক নহর হীরার হার গলায় না পর!”

রাজকন্যা শতেক নহর হীরার হার গলায় দিলেন। শতেক নহরে শতেক হীরা ঝক্ঝক্ করিয়া উঠিল!

টিয়া, বলিল,-

“শতেক নহর ছাই!

নাকে ফুল কানে দুল।

সিঁথির মাণিক চাই!”

রাজকন্যা নাকে মােতির ফুলের নােলক পরিলেন;সিঁথিতে মণি মাণিক্যের সিঁথি পরিলেন।

তখন রাজকন্যার টিয়া বলিল,-

“রাজকন্যা রূপবতী নাম থুয়েছে মায়।

গজমােতি হ’ত শােভা যােল-কলায়।

আনিল গজমােতি, কেমন এল বর?

রাজকন্যা রূপবতীর ছাইয়ের স্বয়ম্বর!”

শুনিয়া, রূপবতী রাজকন্যা গায়ের আভরণ, পায়ের নূপুর, ময়ূর পেখম কানের দুল উঁডিয়া, ছিড়িয়া, মাটিতে, লুটাইয়া পড়িলেন। কিসের স্বয়ম্বর, কিসের কি!

রাজপুত্রদের সভায় খবর গেল, রাজকন্যা রূপবতী স্বয়ম্বর করিবেন না, রাজকন্যার পণ, যে রাজপত্র গজমােতি আনিয়া দিতে পারিবেন, রাজক তাঁহার হইবেন –না পারিলে রাজকন্যার নফর হইয়া থাকিতে হইবে।

সকল রাজপুত্র গজমােতির সন্ধানে বাহির হইলেন।

কত রাজ্যের কত হাতী আসিল, কত হাতীর মাথা কাটা গেল—যে সে হাতীতে কি গজমােতি থাকে? গজমােতি পাওয়া গেল না।

রাজপুত্রেরা শুনিলেন,

সমুদ্রের কিনারে হাতী,

তাহার মাথায় গজমােতি।

সকল রাজপুত্রে মিলিয়া সমুদ্রের ধারে গেলেন।

সমুদ্রের ধারে যাইতে-না-যাইতেই একপাল হাতী আসিয়া অনেক রাজপুত্রকে মারিয়া ফেলিল, অনেক রাজপুত্রের হাত গেল, পা গেল। গজমােতি কি মানুষে আনিতে পারে ?রাজপুত্রেরা পলাইয়া আসিলেন।

আসিয়া, রাজপুত্রেরা কি করেন— রূপবতী রাজকন্যার নফর হইয়া রহিলেন।

কথা শীতরাজার কানে গেল। শীত বলিলেন, “কি! রাজকন্যার এত তেজ, রাজপুত্রদিগকে নফর করিয়া রাখে! রাজকন্যার রাজ্য আটক কর।”রাজকন্যা শীতরাজার হাতে আটক হইয়া রহিলেন।

Thakurmar jhuli -Thakurmar jhuli golpo -Thakurmar jhuli bengali 

 

আজ যায় কাল যায়, বসন্ত মুনির বনে থাকেন। পৃথিবীর খবর বসন্তর কাছে যায় না, বসন্তর খবর পৃথিবী পায় না।

মুনির পাতার কুঁড়ে; পাতার কুঁড়েতে এক শুক আর সারী থাকে।

একদিন শুক কয়, —

“সারি, সারি! বড় শীত!”

সারী বলে, –

“গায়ের বসন টেনে দিস!”

শুক বলে,-

“বসন গেল ছিড়ে, শীত গেল দূর,

কোন্‌খানে, সারি, নদীর কূল ?”

সারী উত্তর করিল, –

“দুধ-মুকুটে’ ধবল পাহাড় ক্ষীর-সাগরের পাড়ে,

গজমােতির রাঙা আলাে ঝরঝরিয়ে পড়ে।

আলাের তলে পদ্ম-পাতে খেলে দুধের জল,

হাজার হাজার ফুটে আছে সােনার কমল।”

শুক কহিল, –

“সেই সােনার কমল, সেই গজমােতি

কে আনবে তুলে’ কে পাবে রূপবতী!”

শুনিয়া বসন্ত বলিলেন –

“শুক সারী মেসাে মাসী

কি বলছিস্ বল

আমি আনবাে গজমােতি।

সােনার কমল।”

শুক সারী বলিল,-“আহা বাছা, পারিবি?”

বসন্ত বলিলেন, “তবে, মুনির কাছে গিয়া ত্রিশূলটা চা!”

সারী বলিল, “শিমূল গাছে কাপড়-চোপড় আছে,

মুকুট আছে, তাই নিয়া যা।”

বসন্ত মুনির কাছে গেল। গিয়া বলিল, “বাবা, আমি গজমােতি আর। সােনার কমল আনিব, ত্রিশূলটা দাও।”

মুনি ত্রিশূল দিলেন।

মুনির পায়ে প্রণাম করিয়া, ত্রিশূল হাতে বসন্ত শিমূল গাছের কাছে গেলেন। গিয়া দেখেন, শিমুল গাছে কাপড়-চোপড়, শিমুল গাছে রাজমুকুট।

বসন্ত বলিলেন, “হে বৃক্ষ, যদি সত্যিকারের বৃক্ষ হও, তাে, তােমার কাপড়-চোপড় আর তােমার রাজমুকুট আমাকে দাও।”

বৃক্ষ বসন্তকে কাপড়-চোপড় আর রাজমুকুট দিল। বসন্ত বাকল ছাড়িয়া কাপড়-চোপড় পরিলেন; রাজমুকুট মাথায় দিলেন। দিয়া, বসন্ত, ক্ষীর সাগরের উদ্দেশে চলিতে লাগিলেন।

 যাইতে, যাইতে, যাইতে, বসন্ত কত পর্বত, কত বন, কত দেশ-বিদেশ ছাড়াইয়া বার বচ্ছর তের দিনে দুধ-মুকুটে’ ধবল পাহাড়ের কাছে গিয়া পেীছিলেন। ধবল পাহাড়ের মাথায় দুধের সর থব থব, ধবল পাহাড়ের গায়ে দুধের ঝরণা ঝর ঝর, বসন্ত পাহাড়ে উঠিলেন।

উঠিয়া দেখেন, ধবল পাহাড়ের নীচে ক্ষীরের সাগর-

ক্ষীর সাগরে ক্ষীরের ঢেউ ঢল ঢল করে –

লক্ষ হাজার পদ্মফুল ফুটে আছে থরে।

ঢেউ থই থই সােনার কমল, তারি মাঝে কি?

দুধের বরণ হাতীর মাথে —গজমােতি!

বসন্ত দেখিলেন, চারিদিকে পদ্মফুলের মধ্যে দুধ বরণ হাতী দুধের জল ছিটাইয়া খেলা করিতেছে-সেই হাতীর মাথায় গজমােতি। সােনার মতন,মণির মতন হীরার মতন গজমােতির জ্বলজ্বলে আলাে ঝর ঝর করিয়া পড়িতেছে।

গজমােতির আলােতে ক্ষীর সাগরে হাজার চাঁদের মেলা, পদ্মের বনে পাতে পাতে সােনার কিরণ খেলা। দেখিয়া, বসন্ত অবাক হইয়া দাঁড়াইয়া রহিলেন।

তখন, বসন্ত কাপড়-চোপড় কষিয়া, হাতের ত্রিশুল আঁটিয়া ধবল পাহাড়ের উপর হইতে ঝাপ দিয়া গজমােতির উপরে পড়িলেন।

অমনি ক্ষীর সাগর শুকাইয়া গেল, পদ্মের বন লুকাইয়া গেল;দুধ-বরণ হাতী এক সােনার পদ্ম হইয়া জিজ্ঞাসা করিল,-

“কোন দেশের রাজপুত্র কোন্ দেশে ঘর?”।

বসন্ত বলিলেন,-

“বনে বনে বাস, আমি মুনির কোঙর।”

পদ্ম বলিল, – “মাথে রাখ গজমােতি, সােনার কমল বুকে,

রাজকন্যা রূপবতী ঘর করুক সুখে!”

বসন্ত সােনার পদ্ম তুলিয়া বুকে রাখিলেন, গজমােতি তুলিয়া মাথায়, রাখিলেন। রাখিয়া, ক্ষীর-সাগরের বালুর উপর দিয়া বসন্ত দেশে চলিলেন।

অমনি ক্ষীর-সাগরের বালুর তলে কাহারা বলিয়া উঠিল,—“ভাই, ভাই! আমাদিগে নিয়ে যাও।”

বসন্ত ত্রিশূল দিয়া বালু খুঁড়িয়া দেখেন, তিন যে সােনার মাছ! তিন সােনার মাছ লইয়া বসন্ত চলিতে লাগিলেন।।

বসন্ত যেখান দিয়া যান, গজমােতির আলােতে দেশ উজল হইয়া উঠে।

লােকেরা বলে, “দেখ, দেখ, দেবতা যায়!”

বসন্ত চলিতে লাগিলেন।

Thakurmar jhuli -Thakurmar jhuli golpo -Thakurmar jhuli bengali  

শীতরাজা মৃগয়ায় বাহির হইয়াছেন। সকল রাজ্যের বন খুঁজিয়া, একটা হরিণ যে, তাহাও পাওয়া গেল না। শীত সৈন্য-সামন্তের হাতে ঘােড়া দিয়া একগাছতলায় আসিয়া বসিলেন।

গাছতলায় বসিতেই শীতের গায়ে কাঁটা দিল। শীত দেখিলেন, এই তাে সেই গাছ! এই গাছের তলায় জল্লাদের কাছ হইতে বনবাসী দুই ভাই আসিয়া বসিয়াছিলেন, ভাই বসন্ত জল চাহিয়াছিল, শীত জল আনিতে গিয়াছিলেন।

সব কথা শীতের মনে হইল, রাজমুকুট ফেলিয়া দিয়া, খাপ তরােয়াল ছুঁড়িয়া দিয়া, শীত, “ভাই বসন্ত!” “ভাই বসন্ত!” করিয়া ধূলায় লুটাইয়া কঁদিতে লাগিলেন।

সৈন্য-সামন্তেরা দেখিয়া অবাক! তাহারা দোল চৌদাল আনিয়া রাজাকে তুলিয়া রাজ্যে লইয়া গেল।

গজমােতির আলােতে দেশ উজল করিতে করিতে বসন্ত রূপবতী রাজকন্যার দেশে আসিলেন। রাজ্যের লােক ছুটিয়া আসিল, – “দেখ, দেখ,

কে আসিয়াছেন।”

বসন্ত বলিলেন-“আমি বসন্ত, ‘গজমােতি আনিয়াছি।”

রাজ্যের লােক কাদিয়া বলিল- “এক দেশের শীতরাজা রাজকন্যাকে আটক করিয়া রাখিয়াছেন।

শুনিয়া, বসন্তশীতরাজার রাজ্যে গিয়া, তিন সােনার মাছ রাজাকে পাঠাইয়া দিয়া বলিলেন – “রূপবতী রাজকন্যার রাজ্যের দুয়ার খুলিয়া দিতে আজ্ঞা হউক!”

সকলে বলিলেন, “দেবতা, গজমােতি আনিয়াছেন। তা, রাজা আমাদের, ভাইয়ের শােকে পাগল; সাত দিন সাত রাত্রি না গেলে তাে দুয়ার খুলিবে না।” ত্রিশূল হাতে, গজমােতি মাথায় বসন্ত, দুয়ার আলাে করিয়া সাত দিন সাত রাত্রি বসিয়া রহিলেন।

আট দিনের দিন রাজা একটু ভাল হইয়াছেন, দাসী গিয়া সােনার মাছ কুটিতে বসিল। অমনি মাছেরা বলিল,-

“আঁশে ছাই, চোখে ছাই,

কেটো না কেটো না মাসি, রাজা মােদের ভাই!”

দাসী ভয়ে বটি-মটি ফেলিয়া, রাজার কাছে গিয়া খবর দিল।

রাজা বলিলেন– “কৈ কৈ! সােনার মাছ কৈ ?

সােনার মাছ যে এনেছে সে মানুষ কৈ ?”

রাজা সােনার মাছ নিয়া পড়িতে-পড়িতে ছুটিয়া বসন্তের কাছে গেলেন।

দেখিয়া বসন্ত বলিলেন, – “দাদা!”

শীত বলিলেন, – “ভাই!”

হাত’হইতে সােনার মাছ পড়িয়া গেল;শীত বসন্তের গলা ধরিয়া কাদিতে লাগিলেন। দুই ভায়ের চোখের জল দর দর করিয়া বহিয়া গেল।

শীত বলিলেন, “ভাই সুয়াে-মার জন্যে দুই ভাইয়ের এতকাল

ছাড়াছাড়ি।”

তিন সােনার মাছ তিন রাজপুত্র হইয়া, শীত বসন্তের পায়ে প্রণাম করিয়া বলিল,-“দাদা আমরাই অভাগী সুয়ােরাণীর তিন ছেলে;আমাদের মুখ চাহিয়া মায়ের অপরাধ ভুলিয়া যান।”

শীত বসন্ত, তিন ভাইকে বুকে লইয়া বলিলেন, “ সে কি ভাই, তােরা এমন হইয়া ছিলি! সুয়াে -মা কেমন, বাবা কেমন ?”

তিন ভাই বলিল, – “সে কথা আর কি বলিব, বাবা বনবাসে, মা

মরিয়া গিয়াছেন;তিন ভাই ক্ষীর-সমুদ্রের তলে সােনার মাছ হইয়া ছিলাম।”

শুনিয়া শীত বসন্তের বুক ফাটিল; চোখের জলে ভাসিতে ভাসিতে গলাগলি পাঁচ ভাই রাজপুরী গেলেন।

Thakurmar jhuli -Thakurmar jhuli golpo -Thakurmar jhuli bengali

রাজকন্যার সােনার টিয়া পিঞ্জরে ঘােরে আর কেবলি কয় –

“দুখিনীর ধন

সাত সমুদ্র ঘেঁচে’ এনেছে মাণিক রতন!”

রাজকন্যা বলিলেন—

“কি হয়েছে, কি হয়েছে আমার সােনার টিয়া!”

টিয়া বলিল—“যাদু আমার এল, কন্যা, গজমােতি নিয়া!”

সত্য সত্যই; দাসী আসিয়া খবর দিল, শীতরাজার ভাই রাজপুত্রযে,

গজমােতি আনিয়াছেন!

শুনিয়া রাজকন্যা রূপবতী হাসিয়া টিয়ার ঠোঁটে চুমু খাইলেন। রাজকন্যা বলিলেন, “দাসী লাে দাসী, কপিলা গাইয়ের দুধ আন্, কঁচা হলুদ বাটিয়া আন; আমার সােনার টিয়াকে নাওয়াইয়া দিব!”

দাসীরা দুধ-হলুদ আনিয়া দিল। রাজকন্যা সােনা রূপার পিড়ি, পাট কাপড়ের গামছা, নিয়া, টিয়াকে স্নান করাইতে বসিলেন।

হলুদ দিয়া নাওয়াইতে-নাওয়াইতে রাজকন্যার আঙ্গুলে লাগিয়া টিয়ার মাথার ওষধ বডি খসিয়া পড়িল। অমনি চারিদিক আলাে হইল, টিয়ার অঙ্গ ছাড়িয়া দুয়ােরাণী দুয়ােরাণী হইলেন।

মানুষ হইয়া দুয়ােরাণী রাজকন্যাকে বুকে সাপটিয়া বলিলেন, –

“রূপবতী মা আমার! তােরি জন্যে আবার জীবন পাইলাম।” থতমত খাইয়া রাজকন্যা রাণীর কোলে মাথা গুজিলেন।

রাজকন্যা বলিলেন, “মা, আমার বড় ভয় করে, তুমি পরী, না দেবতা, এতদিন টিয়া হইয়া আমার কাছে ছিলে?”

রাণী বলিলেন, “রাজকন্যা, শীত আমার ছেলে, গজমােতি যে

আনিয়াছে, সেই বসন্ত আমার ছেলে।”

শুনিয়া রাজকন্যা মাথা নামাইল।

Thakurmar jhuli -Thakurmar jhuli golpo -Thakurmar jhuli bengali 

পরদিন রূপবতী রাজকন্যা শীতরাজাকে বলিয়া পাঠাইলেন, “দুয়ার খুলিয়া দিন, গজমােতি যিনি আনিয়াছেন তাহাকে গিয়া বরণ করিব।”

রাজা দুয়ার খুলিয়া দিলেন।

বাদ্য-ভাণ্ড করিয়া রূপবতী রাজকন্যার পঞ্চ চৌদোলা শীতরাজার রাজ্যে পৌঁছিল।।

শীতরাজার রাজদুয়ারে ডঙ্কা বাজিল, রাজপুরীতে নিশান, উড়িল,—রূপবতী রাজকন্যা বসন্তকে বরণ করিলেন।

শীত বলিলেন, – “ভাই, আমি তােমাকে পাইয়াছি, রাজ্য নিয়া কি

করিব? রাজ্য তােমাকে দিলাম।” রাজপােষাক পরিয়া সােনার থালে গজমােতি রাখিয়া, বসন্ত, শীত সকলে রাজসভায় বসিলেন।

রাজকন্যার চৌদোলা রাজসভায় আসিল। চৌদোলায় রবিরঙের আঁকন, ময়ুরপাখার ঢাক। ঢাকন্ খুলিতেই সকলে দেখে, ভিতরে, এক যে স্বর্গের। দেবী, রাজকন্যা রূপবতী কোলে করিয়া বসিয়া আছেন!

রমা সভা চুপ করিয়া গেল!

স্বর্গের দেবীর চোখে জল ছ-ছল রাজকন্যাকে চুমু খাইয়া চোখের জলে ভাসিয়া স্বর্গের দেবী ডাকিলেন,—“আমার শীত বসন্ত কৈ রে!”

রাজ-সিংহাসন ফেলিয়া শীত উঠিয়া দেখেন, – মা! বসন্ত উঠিয়া

দেখেন, -মা! সুয়ােরাণীর ছেলেরা দেখেন,—এই তঁাহাদের দুয়াে-মা! সকলে পড়িতে পড়িতে ছুটিয়া আসিলেন।।

তখন রাজপুরীর সকলে একদিকে চোখের জল মােছে, আর একদিকে পুরী জুড়িয়া বাদ্য বাজে।

শীত বসন্ত বলিলেন, “আহা, এ সময় বাবা আসিতেন, সুয়াে-মা

থাকিতেন!”

সুয়াে-মা মরিয়া গিয়াছে, সুয়াে-মা আর আসিল না;সকল শুনিয়া বনবাস ছাড়িয়া রাজা আসিয়া শীত বসন্তকে বুকে লইলেন।

তখন রাজার রাজ্য ফিরিয়া আসিল, সকল রাজ্য এক হইল, পুরী আলাে করিয়া রাজকন্যার গলায় গজমােতি ঝলমল করিয়া জ্বলিতে লাগিল। দুঃখিনীদুয়ােরাণীর দুঃখ ঘুচিল। রাজা, দুয়ােরাণী, শীত বসন্ত, সুয়ােরাণীর তিন ছেলে,রূপবতী রাজকন্যা—সকলে সুখে দিন কাটাইতে লাগিলেন।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Must Read

Bengali Horror Story – ভূতের সঙ্গে গল্পসল্প

Today, we have gone a lot of distance from reading the storybooks. Because we don't have sufficient time for going to the library and...

Thakurmar Jhuli Golpo – চাষা ও চাষাবউ

Today, we have gone a lot of distance from reading the storybooks. Because we don’t have sufficient time for going to the library and...

Bengali Sad Story – তোমায় ছাড়া বেঁচে থাকি কি করে

Today, we have gone a lot of distance from reading the storybooks. Because we don't have sufficient time for going to the library and...

Bengali Detective Story – কঠিন শাস্তি

Today, we have gone a lot of distance from reading the storybooks. Because we don't have sufficient time for going to the library and...

Bangla Rupkothar Golpo –  রাখাল ও পরীর

Today, we have gone a lot of distance from reading the storybooks. Because we don't have sufficient time for going to the library and...