5 Best Thakurmar Jhuli – ছোটোদের মজার মজার ঠাকুরমার ঝুলি

Thakurmar Jhuli is a very popular story in Bengali. Hare, you found top Thakurmar Jhuli . Today, we have gone a lot of distance from reading the storybooks. Because we don’t have sufficient time for going to the library and reading the storybooks In this age of the Internet. But, if we can read the story on this internet, then it is very interesting. So we have brought a few collections of Bengali story for you. Hope you will enjoy the stories in this busy lifestyle. In this post you will find the latest Thakurmar Jhuli, You can read here  Bangla Thakurmar Jhuli Golpo, Download Thakurmar Jhuli PDF.




 

Thakurmar Jhuli

 

কাজলরেখা 

 

বহুদিন আগে বঙ্গদেশে এক সওদাগরের নাম ছিল ধনেশ্বর সাধু। মা লক্ষ্মীর দয়ায় তার ঘরে কোনও অভাব ছিল না। টাকা-পয়সা, লােক-লস্কর,বিষয়-আশয় আর এক মেয়েকে নিয়ে ধনেশ্বর সাধু মহা সুখী। সওদাগরের মেয়ের নাম কাজলরেখা। তার রূপে চারদিক আলাে হয়ে ওঠে। সে যখন হাসে, তখন হীরের আলাে ছিটকায়; কঁ দিলে মুক্তো ঝরে। কাজলরেখার বয়স যখন দশ, সওদাগরের ঘরে এল ছেলে রত্নেশ্বর। মেয়ের পর ছেলেকে পেয়ে ধনেশ্বরের সুখের পাত্র যেন উপচে উঠতে চায়। কিন্তু হঠাৎ একদিন তার ভাগ্যাকাশে ঘনিয়ে এল এক টুকরাে কালাে মেঘ। জুয়া খেলে সব টাকাকড়ি খােয়ালেন সওদাগর। হাতিশালায় হাতি, আস্তাবলের ঘােড়া, পাইক-বরকন্দাজ, ঝি চাকর-কর্মচারী সবাই ছেড়ে চলে গেল ধনেশ্বরের গৃহ।

বিরাট অট্টালিকা খাঁ-খাঁ করে। ধুলাে আর ঝুলে ভরে যায়, চড়ই আর চামচিকেরা বাসা তৈরী করে তার কোণে কোণে। এমনি করে যখন দিন কাটে, ধনেশ্বরের শুন্য প্রাসাদে একদিন হঠাৎ এক সন্ন্যাসী এসে হাজির। অভাবের সংসার
সদাগরের। তবুও সন্ন্যাসীর সেবায় কোনও ঘাটতি রাখলেন না তিনি। চলে যাবার সময় সন্ন্যাসী খুশী হয়ে ধনেশ্বরকে দিলেন একটি শুকপাখি আর একটি আংটি। বললেন, এই আংটি পরে ধর্মমতি শুকপাখিকে প্রশ্ন কোরাে। পাখি যা বলবে সেইমত যদি কাজ করাে, সব ফিরে পাবে। সন্ন্যাসী চলে গেলে সওদাগর শুককে প্রশ্ন করেন, বলাে ধৰ্মৰ্মতি, কবে আমার এই কষ্টের শেষ হবে? এক মেয়ে আর বংশের বাতি— একমাত্র ছেলে, কিন্তু কি করে পালন করি তাদের ? নিজের দোষে টাকাকড়ি আর জমিজায়গা যা কিছু ছিলাে সবই তাে গেছে চলে।

 




 


Rupkothar Golpo – ১০টি সেরা ছোটোদের মজার মজার রূপকথার গল্প


 

কি করে পালন করি দুই স্নেহধনে।কহ গাে উপায় পাখি মাের কানে কানে।সওদাগরের বিলাপ শুনে পাখি বলে, সন্ন্যাসীর দেওয়া আংটি বাজারে বেচে দাও। সেই পয়সায় ডিঙিগুলি সারিয়ে নিয়ে আর জিনিসপত্র সওদা করে পুরদেশে বাণিজ্যে যাও। হারানাে টাকাকড়ি সব আবার ফিরে আসবে তােমার ঘরে।

শুক পাখির কথা শুনে সওদাগর পুরদেশে যান বাণিজ্যে। সেখানে বেচাকেনার শেষে ধনেশ্বর সওদাগর দেখেন তার হারানাে সম্পদের তিনগুণ ফিরে পেয়েছেন ব্যবসায়ে। লােকলস্কর, হাতিঘােড়া সপ্তডিঙাভরা ধন সম্পদে সওদাগরের প্রাসাদ যায় আবার ভরে।

সওদাগর এবার বাড়ি ফিরে মেয়ের দিকে মন দেন। মেয়ে বড়
হয়েছে তার রূপেগুণে চারদিক আলাে। কিন্তু উপযুক্ত পাত্র কোথায় ? সওদাগর আবার শুকপাখির কাছে যান ; কাজলরেখার বিয়ের খবর জানতে চান। ধর্মমতি শুক তখন সদাগরকে বলে ? সাধু ধনেশ্বর, তুমি বাণিজ্য করে যা-কিছু হারিয়েছিলে, তার অনেক বেশি পেলে। কিন্তু এই মেয়েই তােমার
দুঃখের কারণ হবে। মরা স্বামীর সঙ্গে ওর বিয়ে হবে। তাই যাও ওকে এক্ষুণি বনবাসে রেখে এসােগে।

সওদাগর তার মেয়েকে প্রাণের চেয়ে বেশি ভালবাসেন। পাখির কথা শুনে সওদাগর তাই বুক চাপড়ে কাঁদতে থাকেন। কিন্তু সন্ন্যাসীও তাঁকে বলেছেন – পাখির কথা মান্য করে চলতে। তাই
কাদতে কাদতেই আবার তিনি ডিঙি সাজান। কাজলরেখাকে বলেন, তাকে নিয়েই এবার বিদেশ যাবেন। সেখানে যদি পছন্দমত পাত্র মেলে, বিয়ে দেবেন তার।

কাজলরেখা বাপের সঙ্গে পাড়ি দেয় দূর বিদেশের পথে। যেতে যেতে পথে পড়ে এক গভীর বন। সেই বনের ধারে সওদাগর ডিঙি বাঁধেন। তখন কাজলরেখা মনে মনে ভীষণ ভয় পায়। বাবার সঙ্গে পাখির কথা শুনেছিল।
কাদতে কাদতে মেয়ে তখন বাপকে বলে :

পাহাড় থেকে ভাটিয়াল নদী সাগর বইয়া যায়।চারখুনাের কথা গাে বাপ শুধাও না তায়।

 

 

জিজ্ঞাস কর গাে বাপ জিজ্ঞাস করাে তারে। বনেলা পঙ্খীর কথায় কে দেয় কন্যা বনান্তরে।
কাজলরেখার কথা শুনে ধনেশ্বর সাধু মরমে মরে যান। মনে মনে ভাবেন সওদাগর, একি বিষম দায়! বাপ হয়ে মেয়েকে নিয়ে এসেছি বনে বিসর্জন দেবার জন্য। ওদিকে বনের মধ্যে অনেকদূর গিয়ে বাপ আর মেয়ে দুজনেই ক্লান্ত হয়ে পড়েন। পথের ধারে একটি মন্দিরের চাতাল। সেখানেই বসেন দুজনে। মন্দিরের কপাট বন্ধ। ভরদুপুর বেলা। তবু বনের মধ্যে কি গভীর অন্ধকার। কাজলরেখা খিদে-তেষ্টায় কাতর। তখন সওদাগর মেয়েকে মন্দিরের চাতালে রেখে জলের খোঁজে যান। মেয়ে ভাবে, বাবা বুঝি আর ফিরবে না।

বার বছরের মেয়ে কাজলরেখা। অন্ধকার বনের মধ্যে একলা
পড়ে। ভয় পেয়ে সে মন্দিরের বন্ধ কপাটে দেয় ঠেলা। কপাট যায় খুলে। কাজলরেখা ঢােকে মন্দিরে, আর অমনি কপাট যায় বন্ধ হয়ে। কাজলরেখা কপাট ধরে অনেক টানাটানি করে, কিন্তু দরজা আর খােলে না। ততক্ষণে ধনেশ্বর ফিরে এসেছেন মেয়ের জন্য পদ্মপাতায় করে জল নিয়ে। মেয়েকে কোথাও দেখতে না পেয়ে সওদাগর ডাকেন কাজল! কাজল! কোথায় ।




গেলি মা?

মন্দিরের ভিতর থেকে মেয়ে সাড়া দেয়। তখন সওদাগর দরজায় ধাক্কা মারেন। বারবার ধাক্কা মারা সত্ত্বেও কপাট কিন্তু আর খােলে না; বাপ আর মেয়ে দু’ধার থেকে টানাটানি করেন, ধাক্কাধাক্কি করেন ;তবু খােলে না। বাইরে থেকে সওদাগর মেয়েকে জিজ্ঞাসা করেন, ভিতরে কি দেখছাে? কাজলরেখা বাবাকে জানায়, মন্দিরের ভিতরে ভীষণ আঁধার। এককোণে
জ্বলছে ঘিয়ের প্রদীপ। সেই প্রদীপের আলােয় দেখা যায়-মন্দির ঘরে একটি শয্যা পাতা, আর সেই শয্যায় শুয়ে আছেন অনিন্দ্য সুন্দর এক মৃত কুমার কুমারের সর্বাঙ্গে বিধে আছে অসংখ্য সূচ।

কাজলরেখার কথা শুনে সওদাগর বােঝেন— শুকপাখির কথাই সত্যি হলাে! মেয়েকে ডেকে বলেন, ওই মরা কুমারই তােমার স্বামী, ওকে নিয়েই তুমি থাকো এই মন্দিরে। স্বামীর প্রাণ ফিরিয়ে এনাে। তােমার হাতের শাখা ও কপালের সিঁদুর অক্ষয় হােক। মারে, তাের কপালের লিখনই এই! বাপকে দুষিস না-আমি ফিরে যাই।

এই বলে বিলাপ করতে করতে সওদাগর ফিরে চলেন ঘরের পথে। গভীর বনে বন্ধ মন্দিরের মধ্যে কাজলরেখা পড়ে থাকে একা। মৃত স্বামীর শিয়রে বসে কাজলরেখা গায় তার দুঃখের গান :

 

Thakurmar Jhuli
Thakurmar Jhuli

 

জাগাে জাগাে সুন্দর কুমার কত নিদ্রা যাও। আমি অভাগিনী ডাকি, আঁখি মেলে চাও ।কর্মদোষে বেহুলা নারী শিয়রে বসিয়া।মরা পতির কাছে বাপ দিয়া গেছে বিয়া।

গান গায় আর কঁদে কাজলরেখা। কিছুক্ষণ পরে মন্দিরের বন্ধ কপাট যায় খুলে মন্দিরের ভিতরে ঢােকে এক সন্ন্যাসী কাজলরেখা ভাবে যে সন্ন্যাসীর হাতের স্পর্শে বন্ধ কপাট যায় খুলে, সেই সন্ন্যাসী নিশ্চয়ই তার স্বামীকে বাঁচিয়ে তুলতে পারবেন। সাধুর পায়ের ওপর পড়ে অশ্রুরােদন করে কাজলরেখা। অভয় দিয়ে সাধু বলেন— ভয় নেই কন্যা। এই মৃত কুমার এক রাজপুত্র। এর গায়ে যত সূচকাটা আছে, সব তুমি একটি একটি করে তােল।

শুধু চোখের কাটা দুটি রেখে দাও। এই নাও গাছের পাতা। স্নান
করে শুদ্ধ হয়ে পাতার রস দেবে কুমারের দুই চোখে, তুলে নেবে চোখের দুটি সূচ। তখনই জেগে উঠবে কুমার। কিন্তু সাবধান, যত বিপদেই পড়াে, স্বামীর কাছে আত্মপরিচয় দেবার চেষ্টা করাে না। তাহলেই কিন্তু তােমার স্বামী প্রাণ হারাবে। তােমার পরিচয় রাজকুমারকে দেবে ধর্মমতি শুক। যতদিন তা না হয়, ততদিন তােমার কষ্ট। এই কথাগুলি বলেই সন্ন্যাসী যেমন হঠাৎ
এসেছিলেন, তেমনই হঠাৎই গেলেন চলে।




 


Bengali Love Quotes – ১০০০+ মহান ব্যক্তিদের ভালোবাসার উক্তি


 

তখন কাজলরেখা সন্ন্যাসীর কথামতন কুমারের দেহ থেকে একটি একটি করে তুলতে থাকে সূচ। সাতদিন সাতরাত কেটে যায় সব সূচ তুলতে। বাকি থাকে শুধু দুটি চোখের দুটি সূচ। কাজলরেখা তখন মন্দিরের কপাট ভেজিয়ে রেখে বেরিয়ে পড়ে জলের সন্ধানে। কিছুদূর যেতেই চোখে পড়ে এক বিশাল সরােবর। টলমলে কালাে জলে ভরা। কাজলরেখা সরােবরে নামতে যাবে স্নানের জন্য।

এমন সময় সরােবরের অপর পার থেকে একটি লােক এগিয়ে আসে তার দিকে। দেখে মনে হয় গরিব চাষী, সঙ্গে কাজলরেখার সমবয়সী একটি মেয়ে। লােকটি কাজলরেখাকে জানায় সে বড়ােগরিব। মেয়েকে দুবেলা দুমুঠো খেতে দেয় এমন সঙ্গতি নেই। তাই মেয়েকে সে বিক্রি করে দিতে বেরিয়েছে পথে। কিন্তু গ্রামে তাে এমন লােক নেই যে তার মেয়েকে কিনবে। তখন একজন সন্ন্যাসী তাকে বললেন যে, বনের মধ্যে থাকেন এক রাজকন্যা। তিনি একলা থাকেন, তার একটি দাসীর দরকার, তুমি তার কাছেই যাও। কাজলরেখা রূপে গুণে সুন্দর। মেয়েটির দুঃখের কথা ভেবে তার মনে বড় কষ্ট হল। কাজলরেখা ভাবল, বনের পাখির কথা শুনে এক বাপ তার মেয়েকে বনে ফেলে রেখে চলে গেছে।

পেটের ক্ষুধা মেটাতে আর এক বাপ তার মেয়েকে বিক্রি করতে বেরিয়েছে। এ জগতে না জানি আরও কত কষ্টে কাঁদছে কত লােক। তখন হাতের কঙ্কণা দিয়ে সে মেয়েটিকে কিনে নেয় চাষীর কাছ থেকে। তার নাম রাখে কঙ্কণা দাসী।

কঙ্কণা দাসীকে মন্দিরের পথ দেখিয়ে দিয়ে কাজলরেখা বলে –
তুমি মন্দিরে যাও। দেখবে ঘরের মধ্যে শুয়ে আছেন এক মৃত রাজকুমার; তার দু’চোখে দুটি সূচ বেঁধা। তার কাছে যেও না। দেখবে ঘরের কোণে। রাখা আছে গাছের কিছু পাতা। সেই পাতা বেটে রাখবে। আমি স্নান করে ফিরে সেই পাতার রস ঢেলে দেবাে কুমারের চোখে। তখনই বেঁচে উঠবেন কুমার।

দাসী চলে যেতেই কাজলরেখার বাঁ চোখের পাতা কেঁপে ওঠে।
কাজলরেখা ভাবে সব কথা দাসীকে বলা ঠিক হয়নি। দুরুদুরু বুকে তাড়াতাড়ি নামে স্নান করতে সরােবরের জলে।

 




 

 Bengali Thakurmar Jhuli

 

ওদিকে মন্দিরের পথে যাওয়ার সময় কঙ্কণা দাসীর মনে কুবুদ্ধি খেলা করে। পাতা বেটে, রস করে সে আর কাজলরেখার জন্য অপেক্ষা করে না। নিজেই গিয়ে পাতার রস ঢেলে দেয় কুমারের দুই চোখে। তার আগে তুলে নেয় সূচ দুটি। সঙ্গে সঙ্গে এক অদ্ভুত ব্যাপার ঘটে যায়। ধড়মড়িয়ে উঠে বসেন কুমার শয্যায়, যেন হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেছে তাঁর। সামনে কঙ্কণা দাসীকে দ্যাখেন কুমার। তার হাত দুটি ধরে বলেন, কি চাও বলাে, কন্যা ? তুমিই কি আমার প্রাণ ফিরিয়ে দিয়েছাে? দাসী বলে, কুমার আমায় বিয়ে করাে।

রাজকুমার কঙ্কণা দাসীর কাছে প্রতিজ্ঞা করেন, বলেন, যার কৃপায় তিনি প্রাণ ফিরে পেয়েছেন, সে-ই তার ঘরণী। কুমারের কথা শেষ হয়। তখনই ঘরে ঢােকে কাজলরেখা। ভিজে কাপড়, সদ্যপােয়া মুখ, অপরূপ সুন্দরী।

কাজলরেখাকে দেখে মুগ্ধ কুমার বলেন – কোথা হতে আইলে কন্যা কিবা নাম ধর।
কিবা নাম বাপ-মার কোন দেশে ঘর।
কাজলরেখা কুমারের কথার উত্তর দেবার আগেই কঙ্কণা দাসী বলে কঙ্কণে কিনেছি কন্যা নাম কঙ্কণা দাসী। এইভাবে অদৃষ্টের খেলায় কাজলরেখা হলাে দাসী কঙ্কণা, আর কঙ্কণা দাসী হলাে নকল রাণী। সন্ন্যাসী বলেছেন, নিজের থেকে স্বামীর কাছে নিজের পরিচয় দিলে তার স্বামী মারা যাবেন। কাজলরেখা তাই আত্মপরিচয় দেয় না। স্বামীর সঙ্গে নকল রাণীর। দাসী হয়ে সে যায় স্বামীর রাজ্যে।

রাজবাড়িতে কাজলরেখা কাজ করে দাসীর মত। সে জল তােলে, ঝাট দেয়, ঘরদোর-পরিষ্কার করে, আর নকল রাণীর ফাই- ফরমাশ খাটে। নকল রাণীর মনে বড় ভয়, কাজলরেখা কখন না জানি নিজের কথা খুলে বলে রাজকুমারকে। তাই সে কোন সময়ও তাকে চোখের আড়াল করে না। সব সময় তার ফাই- ফরমাশ আর তার খবরদারি কাজলরেখার ওপর। এদিকে কাজলরেখার মিষ্টি স্বভাব, হাবভাব আর তার রূপ দেখে সূচরাজা ভাবেন, এ নিশ্চয়ই কোনও বড় ঘরের মেয়ে। বারবার তাই কাজলরেখাকে একই প্রশ্ন করেন –




কে তুমি সুন্দর কন্যা কোথা বাড়িঘর। কিবা নামটি মাতাপিতার কিবা নাম তােমার। তুমি যে হইবে কন্যা রাজার ঝিয়ারি। কর্মের লিখনে তুমি ফির বাড়ি বাড়ি।
কাজলরেখা উত্তর দেয়—আমি যে কঙ্কণা দাসী শুন দিয়া মন। তােমার নারী কিনলাে দিয়া হাতের কঙ্কণ। বনে ছিলাম বনবাসী দুঃখে দিন যায়।
ভাতকাপড় জোটে মাের তােমারই কৃপায়।মাও নাই বাপও নাই গর্ভমােদর ভাই। আসমানের মেঘ যেন ভাসিয়া বেড়াই।

দিনের পর দিন কাজলরেখার পরিচয় জানতে না পেরে রাজা পাগলের মত হয়ে যান। খান না, ঘুমােন না, রাজকার্যে মন দিতেও পারেন না। শেষে অনেক ভেবে রাজা ঠিক করলেন দেশভ্রমণে বেরােবেন। বৃদ্ধ মন্ত্রীকে ডেকে সূচরাজা পরামর্শ দেন, তিনি যখন থাকবেন না, তখন মন্ত্রী যেন কৌশলে।
কাজলরেখার পরিচয় জেনে নেন। তারপর সূচরাজা যান নকল রাণীর কাছে। তাকে বলেন যে তিনি দেশ ভ্রমণে যাবেন। কি আনবেন রাণীর জন্য, জিজ্ঞাসা করেন।

নকল রাণী রাজাকে ফর্দ দেয়— বেতের ঝাইল আর কুলা, আমলি কাঠের চেঁকি আর কাঁসার বেক খাড়য়ার। এরপর রাজা যান দাসী কাজলরেখার কাছে। একই প্রশ্ন করেন তাকে, কি নিয়ে আসবেন তার জন্য? কাজলরেখা বলে, রাজার অনুগ্রহে তার কোন কিছুরই অভাব নেই। তার জন্য কিছুই আনতে হবে না। তবু রাজার মন ভরে না। অনেক পীড়াপীড়ির পর কাজলরেখা বলে, রাজা তার জন্য যেন ধর্মমতি শুক পাখিকেই নিয়ে আসেন।

সূচরাজা বিদেশ যান, দেশে দেশে ঘােরেন। কত গ্রাম- শহর-গঞ্জ
দেখেন। নকল রাণীর মনােনীত জিনিস তিনি সহজেই পেয়ে যান। কিন্তু কাজলরেখার চাওয়া সেই ধর্মমতি শুক, সে তিনি আর কোথায় পাবেন? খুঁজে খুঁজে সময় চলে যায়। শেষে দেশে ফেরবার আর যখন মাত্র পনেরাে দিন বাকি, তখন রাজা হাটে-বাজারে তেঁড়া দেওয়ান ঃ কেউ যদি একটি ধর্মমতি শুকপাখি নিয়ে আসতে পারে, রাজা অনেক দাম দিয়ে তার কাছ থেকে কিনে নেবেন সেই পাখি। সূচরাজ জানতেন না, তিনি তখন আছেন কাজলরেখার বাপের দেশে।

 


Bengali Sad Story – পড়ে দেখুন কান্না চলে আসবে বলে দিলাম


ধনেশ্বর সওদাগর রাজার দেওয়া টেড়া শুনে ভাবলেন, মেয়ে কাজলরেখা ছাড়া আর কেউ তাে ধর্মমতি শুকের সংবাদ জানে না। সুখেই থাক আর দুঃখেই থাক, কাজলরেখা যেখানে আছে, এই পাখি নিশ্চয় সেখানেই পৌঁছবে। এই কথা ভেবে ধনেশ্বর সুচরাজার লােকের কাছে বেচে দিলেন তার পাখি। দেশে ফিরে রাজা নকলরাণীকে দিলেন তার বেতের কুলা আর ঝাইল , আমলি কাঠের চেঁকি আর কঁাসার বেক খাড়ুয়া।
কাজলরেখাকে দিলেন অনেক কষ্টে জোগাড় করা সেই ধর্মমতি শুকপাখি।

তারপর সচরাজা বৃদ্ধ মন্ত্রীর কাছে সব খোঁজখবর নেন-রাজ্যের কথা আর কাজলরেখার পরিচয়ের কথা। মন্ত্রী রাজাকে বললেন, কাজলরেখার সঠিক পরিচয় তিনি জানতে পারেননি, তবে সে যে খুব বড়-বংশের মেয়ে,
সে-বিষয়ে তার কোন সন্দেহ নেই। রাজা যখন ছিলেন না, তখন রাণীর অন্যায় জেদ প্রজাদের খেপিয়ে তুলেছিল। রাজ্যের বিপদ হতে পারত; কিন্তু কাজলরেখার পরামর্শ মতন কাজ করে মন্ত্রী সে বিপদ কাটিয়ে ওঠেন। সূচরাজা আর বৃদ্ধ মন্ত্রী দুজনেই বুঝলেন কে আসল রাণী আর কে আসল দাসী। তবু
আরও নিশ্চিন্ত হবার জন্য মন্ত্রী রাজাকে বললেন, বিদেশ ঘুরে দেশে ফিরলেন মহারাজ। আপনার বন্ধুদের দুদিন-নিমন্ত্রণ করে খাওয়ান। একদিন রাঁধুক আপনার রাণী, আর একদিন দাসী কাজলরেখা। কথাটা রাজার মনে ধরলাে।

 




সেইমতাে ব্যবস্থা হলাে। নকল রাণী রাঁধলে চালতার অম্বল, ডৌয়ার ঝাল, কচুশাকের ঘণ্ট, আরও কত কি আবােল-তাবােল। বন্ধুদের সঙ্গে খেতে বসে রাজার মাথা হেট। পরদিন দাসীর পালা। কাজলরেখা ভােরে উঠে স্নান করল,
নদীর জল এনে পাকশালা পরিষ্কার করল। তারপর বসল রান্নায়। রান্না হল। চিকন চালের ভাত, পাঁচ রকম মাছ, পায়েস আর পিঠা, চই চপড়ি আর পােয়া। রান্নার শেষে ঘরে দিল জলের ছিটা; কাঁঠালের পিড়ি পেতে তার সামনে থালায় সাজাল পঞ্চব্যাঞ্জন, পাশে দিল পাতিলেবুর টুকরাে আর লবণ, বাটিতে সাজিয়ে দিল দই, দুধ আর ক্ষীর; দুধে দিল সবরি কলা, ঝারিতে
রাখল আচমনের জল, বাটায় দিল মশলার পান। রাজার বন্ধুরা সুন্দর সুন্দর খাবার আর পরিপাটি ব্যবস্থার খুব প্রশংসা করলেন। সূচরাজা যত বােঝেন, তত হা-হুতাশ করেন।

আবার একদিন রাজা পরীক্ষায় ডাকেন দুজনকে। বলেন, বন্ধুরা আসবে ঘরদোর সাজাও সব ভালাে করে। যে যত সুন্দর করে পারাে আলপনা আঁকো। নকলরাণী আঁকে কাউয়ার ঠ্যাঙ, বগার পায়া, হরুর টাইল আর ধানের ছড়া। দাসী আঁকে ধানের ছড়া; কিন্তু তার মাঝে সাজিয়ে দেয় মা লক্ষ্মীর পায়ের পাতা, পাশে আঁকে দেবদেবীর মূর্তি, কৈলাস পাহাড়ের শিবদুর্গা আর গােকুলের লক্ষীনারায়ণের মূর্তি। রাজার পাত্রমিত্র মন্ত্রী কর্মচারী সবাই একবাক্যে কাজলরেখার সুন্দর আলপনার প্রশংসা করেন। রাজা আর তার বৃদ্ধমন্ত্রী বুঝতে পারেন সবই, কিন্তু কি করে কাজলরেখার সত্য পরিচয় জানা যাবে তা তারা ভেবে পান না।

এদিকে রাত্রে যখন সবাই ঘুমায়, কাজলরেখা জেগে থাকে। জাগে আর তার সাধের শুকপাখির কাছে গিয়ে কাঁদে। কাদে আর বলে, বলাে শুক,
বলাে, বাপ-মা আমার কেমন আছে? দশটি বছর কেটে গেল, একদিনের জন্যও দেখলাম না তাঁদের। জাগাে, পাখি, বাপের কথায় মরা স্বামীকে বাঁচিয়ে তুলতে সেবা করলাম। এমন কপাল আমার, হাতের কাকণ দিয়ে যে দাসীকে কিনলাম, সেই আজ রাণী হয়ে আমাকে দাসী করে রেখেছে। পাখি তুমি বলাে, কবে আমার দুঃখের দিন শেষ হবে? কাজলরেখা রােজ কঁাদে আর এই কথা বলে।

একদিন শুকপাখি তাকে জানায় তার দেশের বাড়িতে বাপ-মা ভাল আছেন। তবে মেয়েকে বনবাসে রেখে এসে কেঁদে কেঁদে ধনেশ্বর সওদাগর অন্ধ হয়ে গেছেন। কাজলরেখার শােকে সওদাগরের লােকলস্কর প্রজা কর্মচারী দেশ ঘরের যত মানুষ সবাই কাতর। তবে কাজলের কপালে
আরও দু’বছর দুঃখ ভােগ রয়েছে। তারপর স্বামী আর রাজ্যপাট সবই সে ফিরে পাবে।

 




এদিকে সূচরাজার প্রাসাদে হাসি নেই, আলাে নেই। রাজার মন উতলা। রাজপাটে নেই মন। নকলরাণীর ওপর তার সন্দেহ হয়। কিন্তু কাজলরেখা তাে নিজের পরিচয় খুলে বলে না; তাই রাজা কিছু করতেও পারেন না। ওদিকে কাজলরেখার মনেও সুখ নেই। রােজ রাতে পাখির কাছে নিজের দুঃখের কথা বলে একটু হালকা হয়। হয়ত এভাবেই পাখির কথামত কাজলরেখার দুঃখের আর দুটো বছর যেত কেটে। কিন্তু সূচরাজার মতিগতি
দেখে নকলরাণী ভয় পায়। কাজলরেখাকে তাে সে মােটেই দেখতে পারতাে না ৷

এখন তার নামে বদনাম রটায় কাজলরেখা নাকি মােটেই ভাল মেয়ে নয়। রাজার বন্ধুদের মধ্যে একজন ছিল সােনাধর সওদাগর। কাজলরেখাকে তার খুব পছন্দ। দাসীকে সে নিজের দেশে নিয়ে যেতে চায়। কিন্তু কাজলরেখা তার স্বামীর দেশ ছেড়ে যাবে কেন? তখন নকলরাণী আর রাজার সেই দুষ্ট বন্ধু দুজনে মিলে শলা-পরামর্শ করে রাজার কানে কাজলরেখার চরিত্র নিয়ে নানা মিথ্যে কথা বলে। সূচরাজার মন এমনিতেই উদভ্রান্ত; এই সব কথা শুনে তিনি আরও পাগলের মত হয়ে যান। খুব রেগে গিয়ে কোন কিছু না ভেবে তিনি সেই বন্ধুকে বললেন- যাও মেয়েটাকে রেখে এসাে সাগরদ্বীপে। বিনা দোষে দোষী কাজলরেখা চোখের জলে বুক ভাসায়। কিন্তু, সন্ন্যাসীর নির্দেশে নিজের থেকে কিছু বলতেও পারে না। অকুল সমুদ্রে ডিঙি ভাসে কাজলরেখাকে নিয়ে। রাজার বন্ধু ডিঙিতে বসে কাজলরেখাকে নিজের পরিচয় দেয়। তাকে বিয়ে করতে বলে। কাজলরেখা মহা বিপদে পড়ে। বলে—

শুন রাজা আমার কাহিনী বাপে বনবাসে দিল জানি কলঙ্কিণী। রাজার বাড়ি দাসী ছিলাম কলঙ্কী হইয়া। ঘরের বাহির হইলাম আমি কলঙ্ক লইয়া।
ডুবাইয়া দাও না মােরে এই সাগর জলে। মাষেরে না দেখাই মুখ কোনাে কালে।

 




Thakurmar Jhuli Rupkothar Golpo

 

কিন্তু সােনাধর সওদাগর কাজলরেখার কথা শুনতে চায় না। বিয়ে করবে বলে তাকে জোর করে নিজের দেশে নিয়ে যেতে চায়। উপায় না দেখে কাজলরেখা তখন দেবতাদের ডাকে। বলে, আমি যদি সতী নারী হই, সমুদ্রে উঠুক চরা, ডিঙি যেন আর না এগােয়। কাজলরেখার ডাকে সাগরের দেবতা সাড়া দিলেন। অকূল সমুদ্রে উঠল চরা; সােনাধরের ডিঙি সেই চরায়
গেল আটকে। মাঝিমাল্লারা বলে, এ কন্যা কোনও মানুষ নয়; ডাকিনী কিংবা যােগিনী। তখন সােনাধর কাজলরেখাকে সেই চরায় নামিয়ে দিয়ে চলে যায়।

ওদিকে কাজলরেখার বাপের বাড়িতে এতদিনে অনেক কিছু ঘটে গেছে। মেয়ের শােকে ধনেশ্বর কেঁদে কেঁদে মারা গেছেন। ছেলে রত্নেশ্বর বাপের সপ্তডিঙি নিয়ে আবার বাণিজ্যে বেরিয়ে পড়েছে। বেচাকেনা সেরে দেশে ফেরার পথে ঝড়তুফানের মুখে রত্নেশ্বরের সপ্তডিঙি নােঙর ফেলে সেই মাঝদরিয়ার চরে। যেখানে কাজলরেখা একা পড়ে আছে। সূচরাজার কথামত সােনাধর বণিক তাকে নির্বাসনে দিয়ে গেছে দু’মাস। চরের ওপর
জন্মায় আখের মত এক ধরনের গাছ। সেই গাছের মিষ্টি রস খেয়ে প্রাণে বেঁচে আছে কাজলরেখা। রত্নেশ্বর চরে ডিঙি বেঁধেছে ঝড়ের রাতে। ভাের হলে ঝড়ের দাপট কমে। রত্নেশ্বর চরে নামে। দেখে এক পরমা সুন্দরী কন্যা। ভায়ের চার বছর বয়সে বনবাসী হয়েছে কাজলরেখা। তাই ভাই আর বােন কেউ কাউকে চিনতে পারে না।

অকুল সাগরে অজানা চরে হঠাৎ কুড়িয়ে পাওয়া এক অপরূপ সুন্দরী মেয়ে। রত্নেশ্বর তাকে ডিঙিতে তুলে নিয়ে রওনা দেয় দেশের পথে। দেশেফিরে রত্নেশ্বর যেই নিজেদের বিরাট অট্টালিকায় ঢােকে, কাজলরেখার আর কিছু বুঝতে বাকি থাকে না। বাড়িঘর দেখে সে সবই চিনতে পারে। কিন্তু সন্ন্যাসীর নিষেধ কাজলরেখা ভাইয়ের কাছে নিজের পরিচয় দিতে পারে না।

তাতে যে তার ফেলে আসা স্বামী সূচরাজার মৃত্যু ঘটবে। শূন্য পুরী; মা নেই; বাপ নেই; দু’জনেই কন্যার শােকে মারা গেছেন। নেই সেই প্রিয় শুকপাখিটিও। কাজলরেখা এখন নিজেদের বাড়িঘরে থেকে ঘরে ঘরে ঘােরে আর মনে মনে কাদে। বলে—
হায় বাপ ধনেশ্বর রইছ কোথাকারে।তােমার কন্যা ঘরে আসে বার বছর পরে।

বাড়ীর দাসদাসীরা কাজলরেখাকে কাঁদতে দেখে পরিচয় জিজ্ঞাসা করে। কন্যা উত্তর দেয় না, শুধু চোখের জল ফেলে। খবর যায় সওদাগরের কাছে। রত্নেশ্বর নিজে এসে হাজির হয়। কাজলরেখা যে তার দিদি, সে তাে আর জানে না। তাই তার মনের কথাটুকু রত্নেশ্বর অকপটে বলে ফেলে কাজলরেখার কাছে। বলে, অকুলদরিয়ার চরে তাকে দেখে সে মুগ্ধ হয়েছিল;
তাই বিয়ে করবে বলে সে কন্যাকে নিয়ে এসেছে নিজের গৃহে। ভাই রত্নেশ্বরের কথা শুনে কাজলরেখা মনে মনে বিপদ গােণে। কাজলরেখা রত্নেশ্বরকে বলে

হাড়ি কি ডােমের কন্যা নাহিকো ঠিকানা। জানিয়া বিয়া করিতে শাস্ত্র করে মানা। আমার যে পরিচয় কন্যা আমি কইতে নারি দশবছর কালে বাপ করল বনচারী। শুকপক্ষী আছে এক সূচরাজার পুরে। পরিচয় কথা সেই কহিবে তােমারে।

কাজলরেখার কথা শুনে রত্নেশ্বর’ শুকপক্ষীকে আনার জন্য প্রচুর ধনরত্ন দিয়ে সূচরাজার রাজ্যে পাঠাল দূত। সে রাজ্যে তখন রাজা নেই। রাজপুরীতে নকল রাণী একা। কাজলরেখাকে রাগের বশে সমুদ্রে বিসর্জন দিতে বলে সূচরাজা মনের দুঃখে দেশ ছাড়া। রত্নেশ্বরের দূত যখন অনেক ধনরত্ন নিয়ে।

 




রাজদরবারে হাজির হল, তখন অন্দর মহল থেকে সব কথা শুনে নকল রাণী ভাবলাে, এই সুযােগ! পাখিটাকে বেচে দিই; ওইটা এ বাড়িতে আসার পর থেকেই রাজার মন উতলা হয়েছে।

রত্নেশ্বর সওদাগর পাখি পেয়ে মহা খুশি। নগরে গ্রামে ঢােল পিটিয়ে দেয়—সমুদ্র থেকে যে জলপরীকে নিয়ে এসেছে, তাকেই বিবাহ করবে সে। বিবাহের আগে সভার মধ্যে ধর্মশুক ঘােষণা করবে জলপরীর আসল পরিচয়। এই অদ্ভুত খবর খুব তাড়াতাড়ি ছড়িয়ে পড়লাে দিকেদিকে। সভার দিন কাছাকাছি, সব দেশ থেকে রাজ-রাজড়ারা এসে হাজির হলেন ধর্মশুক আর জলপরীকে দেখার জন্য। বিদেশ ভ্রমণে বেরিয়ে ছিলেন যে সূচরাজা, তিনিও দেশ বিদেশ ঘুরতে ঘুরতে রত্নেশ্বর বণিকের সভায় এসে হাজির হলেন। সােনার খাঁচায় করে ধর্মমতি শুককে নিয়ে আসা হলাে সভার মাঝখানে। সূচরাজা পাখিকে দেখেই চিনলেন। মনে মনে সব ব্যাপারটা তিনি আঁচ করতে পারছিলেন। জলপরী যে কাজলরেখাই , তা যেন সূচরাজা ভেবেই নিয়েছিলেন। তবু কৌতুহল মেটানাের জন্য তিনি সভায় বসে রইলেন।

তারপর পাখি শােনালাে জলপরীর পরিচয়। সবাই জানলাে, ধর্মশুকের কথাতেই অমঙ্গল এড়ানাের জন্য ধনেশ্বর সওদাগর তার মেয়ে কাজলরেখাকে একদিন বনবাসে রেখে এসেছিলেন।

 


Bengali Jokes – ১০০০+ হাসির জোকস – হেসে পেট ব্যাথা হয়ে যাবে


 

সেই জলপরীই এই কাজলরেখা। শুক কাজলরেখার দুঃখের কাহিনী এক-এক করে বর্ণনা করে শােনালাে সবাইকে।

কাজলরেখার দুঃখ-কষ্টের কাহিনী আর গুণের কথা শুনে সভার যত লােক, দেশ-বিদেশের মান্যগণ্য রাজা-রাজাড়া, বণিক সওদাগর সবাই ধন্য ধন্য করলেন, একবাক্যে প্রশংসা করতে লাগলেন কাজলরেখার। শুধু রত্নেশ্বর সাধু লজ্জায় আর অনুতাপে মুখ লুকালাে। শুকপাখি যখন তাকে দেখিয়ে বললাে— ভাই হয়ে রত্নেশ্বর তার দিদিকে বিয়ে করতে চায়, তােমরা সবাই শােনাে— তখন সভা ছেড়ে রত্নেশ্বর চলে গেল দিদি কাজলরেখার কাছে।

সভায়-উপস্থিত সূচরাজা চোখের জল ফেলেন আর রত্নেশ্বরের পাত্র-মিত্র কর্মচারীদের কাছে কাজলরেখার কুশল জানতে চান। না বুঝে, না ভেবে নকলরাণীর কুমন্ত্রণায় তিনি তার স্ত্রী কাজলরেখাকে বিসর্জন দিয়েছিলেন সাগরজলে। কত কষ্টই না সে ভােগ করেছে সেই নির্জন দ্বীপে। সূচরাজার পরিচয় পাওয়ার পর রত্নেশ্বর সওদাগর খুব ধুমধাম করে তার দিদির বিয়ের আসর বসালাে নতুন করে। রাজা কাজলরেখাকে পেয়ে পরিতুষ্ট মনে ফিরে গেলেন নিজের রাজ্যে।

রাজ্যে ফিরে সচরাজা কাজলরেখাকে লুকিয়ে রাখলেন প্রাসাদের একটি ঘরে। তারপর নকলরাণীর সঙ্গে দেখা করলেন। বললেন বিদেশে ঘুরে বেড়াবার সময় তিনি জানতে পেরেছেন তাদের কঙ্কণা দাসী আসলে রত্নেশ্বর সদাগরের বােন। সূচরাজার ঘরে কাজলরেখা যে দাসী হয়ে কষ্টভােগ করেছে পরে তাকে সাগরে নির্বাসন দেওয়া হয়েছে— এসব কথা শুনে রত্নেশ্বর খুব ক্রুদ্ধ হয়েছেন। তিনি সৈন্যসামন্ত যােগাড় করে সূচরাজ্য আক্রমণ করতে আসছেন। এখন তাদের কোথাও লুকিয়ে থাকতে হবে সব ধনরত্ন সঙ্গে নিয়ে। এই সব কথা বলে সূচরাজা লােক লাগালেন মাটি কেটে একটি সুড়ঙ্গ বানাতে। দুদিন লাগলাে সেই সুড়ঙ্গ কাটতে। তারপর রাজা নকলরাণীকে বললেন, দামী গহনাগাঁটি আর যত ধনরত্ন সব নিয়ে তারা দিন কয়েক সুড়ঙ্গের মধ্যে থাকবেন।

 




রত্নেশ্বর তাদের দেখতে না পেয়ে লুঠ করে চলে গেলে, তারা আবার বাইরে বেরিয়ে আসবেন। নকলরাণী এইকথা শুনে।
নিজের যত গহনা, আর শুকপাখি বিক্রি করে যত মণিমুক্তো পেয়েছিল, সেই সব নিয়ে সবার আগে তাড়াহুড়া করে ঢুকলাে সুড়ঙ্গের মধ্যে। তারপর সূচরাজা হুকুম দিলেন মাটিচাপা দিয়ে সুড়ঙ্গের মুখ বন্ধ করে দিতে। তাই করা হল। নকলরাণী কঙ্কণা দাসী যে রাজার কাছে মিথ্যা পরিচয় দিয়ে কাজলরেখাকে দশটি বছর রাজপুরীতে দাসী করে রেখেছিল, তার জন্য।

এইভাবে সে পেল সমুচিত শাস্তি। ওদিকে কাজলরেখাকে রাণী হিসেবে পেয়ে সবাই খুশি। রাজা তাে খুশিই। বৃদ্ধ মন্ত্রীও খুব খুশি, কারণ তিনি কাজলরেখার সুন্দর বুদ্ধির পরিচয় আগেই পেয়েছিলেন। খুশি সব প্রজারাওঁ;
কারণ কাজলরেখার মিষ্টি কথা, শান্ত স্বভাব, অমায়িক ব্যবহার আর গরিব লােকেদের প্রতি তার দয়া আর অসীম মমতায় তারা বাঁধা পড়ে গেছে তার কাছে। এরপর থেকে কাজলরেখা আর সুচরাজা মহাসুখে দিন কাটাতে লাগলেন।

 

 

   সমাপ্ত


 

এক দুষ্ট ভূতের গল্প 

 

ভূত আছে কি নেই – এ তর্কের মধ্যে না গিয়ে বরং আছে একথা মেনে নিলে গােল মেটে। মানুষের মধ্যে যেমন ভাল-মন্দ দুইই আছে, ভূতেদের মধ্যেও তেমনি। ভাল ভূতেরা মানুষের কোনও ক্ষতি করে না ; বরং কোন কোন সময় দেখা গেছে, তারা মানুষের অনেক উপকার করেছে। কিন্তু মন্দ ভূতেরা মানুষের ভাল তাে করেই না, বরং সব সময়েই তাদের চেষ্টা থাকে কি করে মানুষের ক্ষতি করা যায়। মন্দ ভূতেদের মাথায় সব সময় দুষ্টবুদ্ধি কিলবিল করছে। ভূতেদের চেহারা কেমন তা কেউ জানে । তারা যেকোন সময় ইচ্ছে করলেই মানুষ, জানােয়ার কিংবা পাখির মত চেহারা ধারণ করতে পারে। তবে ভূতের মাথায় যতই দুষ্টুবুদ্ধি থাকুক, আসলে তাে ভূতই। তাই অনেক সময় মানুষের সঙ্গে বুদ্ধির দৌড়ে দুষ্টু ভূতেদেরও হার মানতে দেখা গেছে। এ গল্প এক দুষ্টু ভূতের পরাজয়ের গল্প।

 


Bengali Horror Story ( ভূতের সঙ্গে গল্পসল্প )


বহু দিন আগে হিমাচলের কাংড়া অঞ্চলের চম্পাবতী গ্রামে শ্যামলাল নামে একটি লােক বাস করত। একদিন সে কিছুদূরের লক্ষ্মীনগর গ্রামে তার শ্বশুরবাড়ি যাবার জন্য সেজে-গুজে তৈরী হল। শ্যামলালের মনে খুব ফুর্তি। এবার সে তার বউকে বাপের বাড়ি থেকে নিয়ে আসতে চলেছে। একটা লাঠির ডগায় কাপড়ের পুটলীর মধ্যে সে তার বউ আর শ্বশুরবাড়ির লােকেদের জন্য হরেক রকম জিনিস নিল। শ্যামলালের মা তাকে বলেছিল— গাঁয়ের পণ্ডিতের কাছে গিয়ে যাত্রার শুভ সময়টা জেনে নিতে। কিন্তু শ্যামলালের

 

Thakurmar Jhuli
Thakurmar Jhuli

 

আর দেরি করতে মােটেই ইচ্ছে ছিল না। সময় শুভ-অশুভ বিচার না করেই সে পুটলী-বাঁধা লাঠিটা কাধের ওপর নিয়ে শ্বশুরবাড়ির দিকে যাত্রা করল। শ্বশুরবাড়ীর গাঁয়ের কাছাকাছি তিন রাস্তার ঠিক মােড়ের মাথায় একটা বিরাট শিমূল গাছ ছিল। সেই গাছের মগডালে ছিল একটা দুষ্টু ভূতের বাসা। সে তার বাসার মধ্যে বসে বসে সব সময় লক্ষ্য করত পথ দিয়ে কে কোথায় যাচ্ছে। শিমূল গাছের কাছাকাছি আসতেই শ্যামলালকে দেখতে পেল সেই দুষ্টু ভূতটা!

 




ভূতেরা যেমন তড়িঘড়ি চেহারা পাল্টাতে পারে, তেমনি তাদের আরও একটা ক্ষমতা আছে। মানুষের হাঁড়ির খবর তাদের একেবারে নখের ডগায়।
ভূতটা তার সেই ক্ষমতার বলে জানতে পারল শ্যামলাল কোথায় যাচ্ছে। আর সেই সঙ্গে জানতে পারল শ্যামলাল সে সময় যাত্রা করেছিল সে-
সময়টা ছিল বারবেলা। বারবেলায় যাত্রা করলে মানুষদের ভূতেরা নাকি সহজেই কাবু করতে পারে। ভূতটা এমনিতে তাে দুষ্ট ছিলই, তার ওপরে
ছিল ভীষণ হিংসুটে। সে মনে মনে বলল- দাঁড়াও, তােমার শ্বশুরবাড়ি থেকে বউ নিয়ে আসা বার করছি। এই বলে চোখের নিমেষে ভূতটা
অবিকল শ্যামলালের রূপ ধারণ করল। তারপর শিমূল গাছের বাসা থেকে নেমে এসে ছায়ার মত সে শ্যামলালের পিছু ধরল।

 

Thakurmar Jhuli Khulbe a Mojar Golpo

 

শ্যামলাল প্রথমে এসব কিছু বুঝতে পারেনি। শ্বশুরবাড়ি পৌঁছানর পর তার বউয়ের চোখে পড়ল ব্যাপারটা। হুবহু তার স্বামীর মত দেখতে আর একজন সব সময় যেন স্বামীর সঙ্গে ছায়ার মত লেপ্টে রয়েছে। তার স্বামী যা করে, সঙ্গে সঙ্গে লােকটাও তাই করে। কে যে তার আসল স্বামী, কিছুতেই সে তা বুঝে উঠতে পারে না। সে বলে তােমাদের মধ্যে কে আমার স্বামী?

আসল শ্যামলাল তার বউয়ের কথায় পেছনে ফিরে তাকিয়ে সত্যিই অবাক হয়ে গেল। সে রেগে গিয়ে ভূতটাকে প্রশ্ন করল, তুমি কে? ভূতও সঙ্গে সঙ্গে শ্যামলালের মত রাগ দেখিয়ে বলল, তুমি কে? শ্যামলাল বলল, আমি চম্পাবতী গাঁয়ের শ্যামলাল। এটা আমার শ্বশুরবাড়ি। তুমি এখানে কেন ?

 


Bengali Detective Story – এই বছরের সেরা গোয়েন্দা গল্প


 

শ্যামলাল যা বলল ভূতটাও হুবহু সেই একই কথা বলল। শ্যামলাল ভীষণ ভয় পেয়ে গেল। সে তখন তার বউকে বলল- তুমি তৈরী হয়ে
নাও। আমরা এখনি রওনা হব। শ্যামলাল যা যা বলল ভূতটা ঠিক তাই-তাই বলল। শ্যামলালের ভালমানুষ বউটা পড়ল মহা সমস্যায়। যা হয় দেখা।
যাবে। এই ভেবে সে চম্পাবতী গাঁয়ে যাবার জন্য তৈরী হল, সেই দুষ্ট ভূতও তাদের সঙ্গে সঙ্গে চলল।

 




 

আবার সেই শিমূল গাছের কাছাকাছি এসে শ্যামলাল ডানদিকে তার নিজের গ্রামের দিকে যাবার জন্য বৌয়ের হাত ধরে টানতেই, ভূতটাও বউয়ের
আর এক হাত ধরে টানাটানি করতে লাগল। শ্যামলাল যত বলে তুমি। আমার বউকে ছেড়ে দাও। ভূতটাও সেই একই ভাবে শ্যামলালকে বলে-
তুমি আমার বউকে ছেড়ে দাও। টানাটানির চোটে বেচারা বউটার নাজেহাল অবস্থা! তবে বউটার বুদ্ধিসুদ্ধি ছিল। হঠাৎ তার মাথায় একটা মতলব এসে
গেল। সে বলল দেখ, টানাটানি করে আমায় মিছেমিছি কষ্ট দিচ্ছ কেন? তার চেয়ে চল আমরা রাজার কাছে যাই। তিনিই বিচার করে বলে দেবেন
আমি কার সঙ্গে যাব?

আসল শ্যামলাল বলল— ঠিক কথা। নকল শ্যামলালও তার সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল— ঠিক কথা! রাজামশাই পাত্রমিত্রদের নিয়ে রাজসভায় বসে আছেন। এমন সময় দুই শ্যামলাল বউটাকে নিয়ে সেখানে এসে হাজির হল। আসল শ্যামলাল বলল— রাজামশাই বিচার করুন।
নকল শ্যামলালও সেই একই রকম ভাবে বলে উঠল— রাজামশাই বিচার করুন।

রাজা তাে অবাক। তার সঙ্গে অবাক পাত্রমিত্ররাও। রাজা মন দিয়ে দুজনের কথা শুনলেন। রাজা ছিলেন খুবই বুদ্ধিমান। তিনি বুঝলেন-এদের
মধ্যে একজন নকল শ্যামলাল আছে। তার মনে হল -নকল শ্যামলালটা নিশ্চয় ভূত। তা না হলে একেবারে হুবহু একই রকম চেহারা দুজনের হতে
পারে না। তিনি মনে মনে একটা ফন্দী আঁটলেন। তার এক ভৃত্যকে দিয়ে একটা মাটির কুঁজো আনালেন।

 




 

ভৃত্য কুঁজো নিয়ে এলে পরে তিনি দুজনকে উদ্দেশ করে বললেন- দেখ বাপু, তােমাদের সমস্যাটা যেমন জটিল তেমনই সূক্ষ্ম। তাই আমাকে
বিচারটাও করতে হবে সূক্ষ্মভাবে। তােমাদের দুজনকে একটা পরীক্ষা দিতে। হবে। সেই পরীক্ষায় যে জয়ী হবে, সেই বউকে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারবে।
রাজার কথা শুনে আসল শ্যামলাল বলল— আমি রাজী। নকল শ্যামলালও সেই একই কথার প্রতিধ্বনি করে বলল— আমি রাজী।

Thakurmar Jhuli fairy tales

 

তাদের কথা শুনে রাজা মাটির কুঁজোটাকে দেখিয়ে বললেন- এই কুঁজোর মধ্যে যে ঢুকতে পারবে বউ তারই।
রাজার কথা শুনে আসল শ্যামলালের মুখ গেল শুকিয়ে। কুঁজোর ওই সরু মুখ দিয়ে কোন মানুষ কি গলতে পারে ? ভূতটা কিন্তু রাজার কথায়
আনন্দে নেচে উঠল। আসলে ভূত তাে! চেহারাটাকে যেমন খুশী ছছাট-বড় করা তাদের কাছে জলের মত সােজা। চোখের নিমেষে চেহারাটাকে ছােট
একটা টিকটিকির মত করে সুড়ৎ করে কুঁজোর মধ্যে ঢুকে গেল ভূতটা। রাজামশাইও সঙ্গে সঙ্গে কুঁজোর মুখটা বন্ধ করে দিয়ে বললেন— থাক
ব্যাটা ভূত তুই এই কুঁজোর মধ্যে বন্দী হয়ে!

তারপর আর কি? শ্যামলাল আনন্দে গদগদ হয়ে রাজামশাইকে ভক্তিভরে প্রণাম করে, তার জয়গান করতে করতে বউয়ের হাত ধরে ফিরে
গেল চম্পাবতী গাঁয়ে তার নিজের বাড়িতে।

 

                         সমাপ্ত


 

পেত্নীর মৃত্যু 

Bengali Horror Story
Bengali Horror Story

কোন এক সময় মণিপুর রাজ্যের কোন এক গাঁয়ে লাই খুট সাং
বি নামে একটা পেত্নী ছিল। তার মস্ত বড় লম্বা দুটো হাত। রাতের অন্ধকার ঘনিয়ে এলেই গ্রামের লােকেদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সে অত্যাচার চালাত।

যে বাড়িতে কোন বয়স্ক পুরুষ কিংবা জোয়ান-মরদ নেই, লাই খুট সাং বি ঠিক সেই বাড়িতেই হানা দিত। সুযােগ-সুবিধা মত লম্বা হাত দিয়ে ধরে কাউকে তুলে আনত। পরে তার ঘাড় মটকে খেয়ে নিত। এমনিভাবে দিনের পর দিন ঐ পেত্নীটার উপদ্রবে গ্রামের লােক অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। ওটাকে মেরে ফেলার অনেক চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু কেউই তেমন সুবিধে
করতে পারেনি। ওর ভয়ে গ্রামবাসী বয়স্ক পুরুষ ও জোয়ানেরা সূর্য অস্ত যাবার আগেই ঘরে ফিরে আসত।

কিন্তু একবার একজন সাহসী যুবক ও তার বুদ্ধিমতী বৌয়ের জন্য কিভাবে সাং বি পেত্নীর হামলা চিরতরে বন্ধ করেছিল— সেই ঘটনাই এবার বলব।

 

Thakurmar Jhuli Golpo 

 




এক যুবক তার বৌ ও দুটো ছােট বাচ্চা নিয়ে গ্রামের শেষ প্রান্তে এক কুটিরে থাকত। তার অবস্থা খুব একটা ভাল ছিল না; ছােটখাট হাতের কাজ করে সে সংসার চালাত। খুবই কষ্টে- সৃষ্টে দিন কাটত তাদের।

 


Thakurmar Jhuli Golpo ( চাষা ও চাষাবউ )


কাজের তাগিদে ঐ যুবকটি কখনও একটানা দু-তিন দিন ঘরে ফিরতে পারত না। সেই সময় বৌটাই বাচ্চাদের সামলে- সুমলে রাখত।
একবার যুবকটিকে বড় একটা লাভজনক কাজের দায়িত্ব নিয়ে বেশ দূরের একটা গ্রামে যেতে হয়েছিল। তার ফিরে আসতে চার-চারটে দিন কেটে গেল। সেই সুযােগে লাই খুট সাং বি সেই কুটিরে শিকার জোটানাের আশায় আনাগােনা শুরু করে দিল। একজন দরদী বুড়ির মত গলার স্বরটা মােলায়েম করে গভীর রাতে লাই খুট লত মা, বাবা ঘরে ফিরে এসেছে?

কিন্তু বৌটাতো ভারি বুদ্ধিমতী। সে ভাল করেই জানত যে এত রাতে সাং বি পেত্নী ছাড়া আর কেউই আসতে পারে না। সে-ও তাই চটপট উত্তর দিত, হ্যাগো দিদা, সন্ধ্যার আগেই ফিরেছে। ছেলেদের ঘুম পাড়িয়ে খেয়ে। এইমাত্র শুয়েছে, অগত্যা সাং বি পিঠটান দিত।

পরপর চারদিন পেত্নীটা ঐ কুটিরে এসে হানা দেয়। বােটাও একই রকম জবাব শুনিয়ে তাকে ফিরে যেতে বাধ্য করে।




 

পঞ্চম দিনে বৌটার বর ফিরে এল। সে সাং বি পেত্নীর কথা জানাল। কী কৌশলে বানিয়ে মিথ্যে কথা বলে ওকে সে ফিরিয়ে দিয়েছে তা-ও বলল। তারপর দু’জনে মিলে এক শলা-পরামর্শ করল। ঠিক হল, সাং বি পেত্নী আবার এলে বৌটা এবারও মিথ্যে কথাই বলবে। বরটা ঘরে থাকা সত্ত্বেও বৌটা বলবে যে সে ঘরে নেই। তারপর দেখা যাবে কী হয়।

পঞ্চম দিনেও যথারীতি সং বি এল এবং একই প্রশ্ন করল— মা, বাবা ঘরে ফিরছে?

বৌটা একটু দুরে তার বাচ্চাদের কোলে নিয়ে বেশ সতর্ক হয়ে বসেছিল। বরটা একটা ধারালাে তলােয়ার হাতে নিয়ে দরজার কোণে দাঁড়িয়েছিল।

 

বৌটা ভয়ার্ত কণ্ঠস্বরে ফিসফিস করে বলল— না গাে দিদা;এত রাত হল, তবুও আমার মরদটা ফিরল না। কোথায় নেশা-ভাঙ্গ করে পড়ে আছে।

সং বি পেত্নী ভাবল—এই তাে মওকা। বহু দিনের চেষ্টায় পর শিকারটা হাতের মুঠোয় এল। সে তাে আনন্দে একেবারে দিশেহারা। ঘরের ভেতর থেকে কাউকে তুলে নেবার জন্য সে বাড়িয়ে দিল তার মস্ত লম্বা হাতটা।

যেই না সাং বি ঘরের ভেতর হাতটা ঢুকিয়েছে – অমনি যুবকটা
সমস্ত গায়ের জোর খাটিয়ে তার হাতের তলােয়ার দিয়ে পেত্নীর হাতে মারল এক কোপ। তক্ষুণি তার হাতটা কেটে পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে সাং বি বিকট স্বরে আর্তনাদ করে উঠল। সেই বিকট চিৎকারে গােটা গ্রামটাই যেন কেঁপে উঠল। সাং বি মারা গেলে গ্রামবাসীরা সবাই পেত্নীর উপদ্রব থেকে রক্ষা পেল।

 

সমাপ্ত

One thought on “5 Best Thakurmar Jhuli – ছোটোদের মজার মজার ঠাকুরমার ঝুলি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *